বনফুলের ছায়ায় অণুগল্পের বেড়ে ওঠা

সালাহউদ্দীন আহসান

বাংলা গদ্য সাহিত্যে নিকট আধুনিক সময়ে যা সংযোজন তন্মধ্যে বিস্ময়করভাবে অণুগল্পের আবির্ভাব ও এর প্রভাবিত বিকাশকে আলাদাভাবেই দেখতে হয়। এটা সাহিত্যের এমন একটি নবধারা যা সাহিত্যানুরাগী, সাহিত্য-পাঠক ও অজস্র লিখিয়েকেও উৎসাহী করে তুলেছে। এখানে শৈল্পিক রীতিতে ক্ষুদ্র অবয়বে জীবনের খণ্ডিত দর্শন, সমাজের অচিন্ত্যনীয় চিত্রাঙ্কন, জীব ও প্রকৃতির নির্দিষ্ট বন্ধনের মহিমাগাঁথা সারল্যের মিশেলে এগিয়ে চলে। সর্বজন মোহিত অণুগল্পের সদর্পে সাহিত্যপাতায় স্থান করে নেওয়ার এও অন্যতম প্রধান কারণ।

অণুগল্পের প্রতি মানুষের ঝোঁক-আগ্রহের আতিশয্য এটিকে আরও সুবিন্যস্ত একটি অধ্যায়ের দিকে ধাবিত করছে। তবে আধুনিকের পুনঃআধুনিকায়নের ভাবনাটাও কষা হচ্ছে নানাক্ষেত্রে। নিয়ম ও বিচার-বিশ্লেষণের পসরা সাজিয়ে সরলকে করা হচ্ছে গরল। ফলে কেউ কেউ ভাবতেই শুরু করেছেন, বনফুল আদৌ অণুগল্প লিখেননি। অনুগল্পের পথিকৃৎ হওয়া তো বেশ দূরের! কেউ তো দিবাস্বপ্নে আচ্ছন্ন হয়ে যুক্তি কাটছে, ডাক্তারবাবু বনফুল তাঁর প্রেসকিপশন ডায়েরিতে জীবন-দর্শনের খণ্ডচিত্রগুলো টুকে রাখতেন; অবসরে পূর্ণতা দেবার আশায়। কিন্তু সে অবসর তাঁর জীবনে আর আসেনি।

বনফুলের সাহিত্য সমালোচনায় এ-জাতীয় সকল কিছু প্রলাপ বৈ কিছুই নয়। তাঁর সমস্ত সাহিত্য সম্ভার, জীবনালেখ্য, পরিষ্কার আত্মকথন ও কৈফিয়তনামাই এর জলজ্যান্ত প্রমাণ। ‘বনফুলের গল্প সমগ্র’ গ্রন্থের ভূমিকায় চমকপ্রদ এক বনফুলের আত্মপরিচয় পাই আমরা–‘আমার লেখা যাহারা ভালোবাসেন তাঁহাদের কাছে আমার লেখা সম্বন্ধে ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন। যাহারা ভালোবাসেন না তাঁহাদের কাছে আরও নিষ্প্রয়োজন। যাহারা আমার লেখার সহিত পরিচিত নহেন তাহারা গল্পগুলি পড়িলেই আমার স্বরূপ জানিতে পারিবেন। তাহাদের উদ্দেশ্যেও আমার বিশেষ কিছু নিবেদন নাই।’

বনফুল স্বমহিমায় উদ্ভাসিত একটি সাহিত্য সম্পদ। আপন আলয়ে আপনার মতন গড়ে তুলেছেন সাহিত্যের এক সুবিশাল ভাণ্ডার। তার লিখিত ছোটগল্পের সংখ্যা ৫৮৬টি। যেগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই বলা যায় ‘অনুপম সৃষ্টি’। তিনি যে গল্পের ধারায় রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে ছাপিয়ে অণুগল্প বা ক্ষুদ্র গল্পের নতুনতম ধারার সফল সচলায়ন করেছেন, স-কথাটিই রসিকতার ছলে, ব্যক্তিত্বের আবহে জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর উল্লিখিত ক্ষুদ্রাকার ভূমিকায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই ভূমিকাতেও অনুগল্পের বনফুল তাঁর সুবাস সুসংক্ষিপ্ত অথচ বিপুল অর্থবাহী-রূপে হাজির করেছেন; এই না বনফুল, এই তো বলাইচাঁদ!

ছোটগল্পের সংজ্ঞায় রবি ঠাকুরের বহুল পরিচিত উক্তিটি তুলে ধরা যায়–

‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা,
ছোট ছোট দুঃখ কথা,
নিতান্ত সহজ সরল।
নাহি বর্ণনার ছটা,
ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব, নাহি উপদেশ।
অন্তর অতৃপ্ত রবে,
সাঙ্গ করি মনে হবে,
শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।’

সংজ্ঞার যদি সার্থক উদাহরণ দিতে হয় তাহলে বনফুলের ছোটগল্পের বিকল্প খুঁজে পাওয়া বাস্তবিক অর্থেই ভার। আধ পৃষ্ঠা-এক পৃষ্ঠায়ও যে একটা আস্ত ছোটগল্প লিখে ফেলা যায়, তা যে কেউ বনফুল পড়লেই বুঝতে পারবেন।

পুরো গল্পজুড়ে কাহিনি ও চরিত্রের যে বলিষ্ঠ গাঁথুনি পাঠক পাবেন তাতে তাঁর মনে স্পষ্টতই একটি চিত্রকল্প ফুটে উঠবে। অমৃত এক স্বাদের নেশায় কীসের যেন আকুতি জেগে উঠবে অজান্তেই। তবে এটাই তাঁর গল্পের বিশেষত্ব নয়। গল্প পড়তে পড়তে পাঠক যে কল্পনার ডাল-পালা ছড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন তা একেবারে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে গল্পের শেষ বাক্যে বা লাইনে গিয়ে। আরও বাঙময় করে বললে, গল্পের শেষ বাক্যে বা শেষ লাইনে পাঠক যে ঝাঁকুনিটা খাবেন, নিশ্চিতভাবেই বলে দেয়া যায় তার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত থাকবেন না। বনফুলের গল্প বলার নিজস্বতা, গল্পের আকার অবয়ব ও অবকাঠামোগত দিক বিবেচনা করার পর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণেই প্রলুব্ধ হই, ছোটগল্প যদি হয় ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ তবে বনফুলের গল্প হলো বিন্দুর মাঝে সিন্ধুদর্শন। এজন্যই বলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে ছাপিয়ে তিনি দাঁড় করিয়েছেন গল্পের নতুন ধারা। তাই হলো অণুগল্প, যা বিমোহিত করেছে বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত পরতকেও।

বনফুলেরই লেখা ‘পাঠকের মৃত্যু’ নামে বিখ্যাত গল্পটি হয়তো-বা অনেকেরই পড়া আছে। তবে ‘নিমগাছ’ গল্প থেকে একটু তুলে দিয়ে বনফুলের সংক্ষিপ্ত অথচ ক্ষুরধার বাক্যবিন্যাস এবং অপ্রত্যাশিত চমকের একটি উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করা যেতেই পারে।

‘কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ, কেউ বা ভাজছে গরম তেলে। কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কতো লোক–দাঁত ভালো থাকে, হঠাৎ একদিন একটা নতুন ধরনের লোক এলো। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো শুধু। নিমগাছটার ইচ্ছা করতে লাগলো লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভেতর শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পেছনে আবর্জনার স্তুপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইলো সে।’

হয়তো ভাবছি গল্পটি শেষ। ভুল, এখনও শেষ হয়নি। শেষ বাক্যটি যে এখনও বাকি আছে! পুরো এক পৃষ্ঠাজুড়ে নিমগাছের বর্ণনা দেয়ার পর শেষ বাক্যটি লক্ষ্য করুন–‘ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটির ঠিক এক দশা!’

মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর পাঠকের অজ্ঞাতসারেই মন থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যাবে, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এই হলো বনফুল; এই তো বনফুলের অনুগল্পের সুবাস!

বনফুল ডাক্তার হওয়ার সুবাদে আপন চোখে মানুষের কষ্ট বেদনা ও সামাজিক নানা কৃষ্টির মানচিত্র প্রেসকিপশন ডায়েরিতে অণুপ্লট বা নির্দেশিকা হিসেবে লিখে রাখতেন; অবসরে পূর্ণতায় নেওয়ার প্রত্যাশায়। কিন্তু অবসর সময় তিনি আর পাননি। তাই অণুপ্লটগুলোই তিনি প্রকাশ করে ফেলেন–যারা বলেছিলেন, এ কথা বলে তারা বনফুল সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন বৈ কি। কেননা, প্যাথলজিস্ট বলাইবাবু বা আমাদের বনফুল তাঁর ৬৫ বছর ধরে বিস্তৃত সাহিত্য-জীবনে লিখেছেন কয়েক হাজার কবিতা, অজস্র প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ৫৮৬টি ছোটগল্প, ৬০টি উপন্যাস, ৫টি নাটক এবং বেশ কিছু একাঙ্ক নাটিকা। লিখেছেন প্রহসন। তার প্রহসন রবীন্দ্রনাথকেও মুগ্ধ করেছিল; ব্যাপারটা বিরাট দারুণই বটে। যার জীবনের পঁয়ষট্টি বসন্ত কেটেছে সাহিত্যের সমাদরে তিনি তার কাননের একান্ত শ্রেষ্ঠ সম্পদ অণুগল্পকে দাঁড় করাবার অবসর পাননি; কথাটা আর যাই হোক, সত্য নয়। বরঞ্চ বনফুল খুবই সচেতনভাবে অনুগল্পের ধারাটি সৃষ্টি করেছেন। আর এটা যে তাঁর অনুপম নিজস্বতা, তাও বলেছেন অকপটে। এই তত্ত্বটি উন্মোচিত হওয়ার পর বলাইয়ের ব্যাপারে তাদের ধারণাটুকু বদলাবে নিশ্চয়! তাঁরাও হয়তো বলবেন, বনফুলই বাংলা সাহিত্যে অণুগল্পের স্রষ্টা। তাঁরই ছায়ায় বেড়ে উঠেছে সাহিত্যের এই আধুনিক সৃজন।

আগের সংবাদবজ্রাঘাতে বাবা-ছেলের মৃত্যু
পরবর্তি সংবাদশূন্য বুকের দীর্ঘশ্বাস