চলে এসো এক বরষায়

রাকিবুল হাসান

বইমেলার আলোগুলো নিভে গেছে অনেক আগেই। রাত এখন একটা। চারদিকে ভয়ংকর নীরবতা। একজন গার্ড চেয়ারে বসে হালকা তন্দ্রাসুখে দুলছে। আরেকজন এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছে। গার্ডের কানঘেঁষে মাঝেমধ্যে হঠাৎ দুএকটা নিশাচর ফুড়ুৎ করে ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে। বিড়বিড় করে নিরীহ গার্ড গাল দিচ্ছে, ‘শালার পক্ষী, আমারেই খালি চোখে দেখলি!’

আমি হাসি থামিয়ে রাখতে না পেরে শব্দ করে হেসে উঠলাম। গার্ড পেছনে তাকাতে তাকাতে বলল, ‘কে রে, কে!’ কাউকে দেখতে না পেয়ে গার্ড বুঝি ভয় পেয়ে গেল। শার্টের বোতাম খুলে বুকে কয়েকবার থুথু দিলো। তারপর নিঃশব্দে দূরে ঝিমোতে থাকা অন্য গার্ডের কাছে গিয়ে বসে পড়ল।

রাতের বেলা নাকি মৃত লেখকদের আত্মা ঘোরাঘুরি করে বইমেলায়। স্টলে স্টলে ঘুরে নিজেদের বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়ে যায়। পৃথিবীবাসী সেই অটোগ্রাফ দেখতে পায় কিনা তা দেখার বিষয় না। লেখকদের এটা একটা রোগ। অটোগ্রাফ দিতে না পারলে আঙুল চুলকায়। সেই মৃত লেখকদের সঙ্গে কথা বলার খায়েশ আমার অনেক দিনের। তাই খুব কৌশলে লুকিয়ে আছি গার্ডদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। আজকের রাত বইমেলায় ঘুরে ঘুরে কাটাবো। আকাশে মেঘ জমছে। আঁধার ঘন হচ্ছে। বৃষ্টি নামবে হয়তো। এই মওসুমের প্রথম বৃষ্টি। বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা ভালোলাগা কাজ করছে। মওসুমের প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে যদি আজ কোনো লেখকের দেখা পেয়ে যাই, বিষয়টা মন্দ হয় না।

অন্য প্রকাশের পেছনে লুকিয়ে মোবাইলের হালকা আলোয় পড়ছি হুমায়ূন আহমেদের ‘মাতাল হাওয়া’। চুরি করে বই পড়া। মধ্যরাতের এলোমেলো বাতাসে ‘মাতাল হাওয়া’ কেমন অধিকার করে নিলো আমাকে। মৃত লেখকদের খুঁজতে এসেছি ভুলেই গেলাম। ঘড়ির কাঁটা একটা থেকে তিনটায় গিয়ে পড়লো। হঠাৎ মাথায় কারও শীতল স্পর্শে চমকে উঠলাম। এই বুঝি গার্ডের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। নিশ্চিত বইচোর বলে ধোলাই দেবে। নয়তো কোন মুরোদে কেউ এই রাতে স্টলের পেছনে লুকিয়ে থাকবে। বুকে সাহস জমিয়ে ইন্নালিল্লাহ পড়তে পড়তে ফিরে তাকালাম।

‘চুরি করে বই পড়া হচ্ছে?’

আমি উত্তর না দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। চোখের তারায় আঁধারগুলো যেন আলোতে ফেটে পড়তে চাইছে। এই শীতল হাওয়ায়, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে আমার সামনে কালো একটা ক্যাপ মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন হুমায়ূন আহমেদ। আমি মুচকি হেসে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বললাম, ‘জি, স্যার। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে, মওসুমের প্রথম বৃষ্টি, সেই বৃষ্টিতে চুরি করে পড়ছি আপনার মাতাল হাওয়া।’

হালকা শব্দে হেসে উঠলেন হুমায়ূন আহমেদ, ‘দুইটা জিনিস সবচেয়ে বেশি আনন্দের। কারো বই চুরি করে পড়া এবং কারও মন চুরি করে লুকোচুরি খেলা। আমি আমার লেখায় লুকোচুরি খেলাটাই খেলি। মানুষ খেলাটা খুব পছন্দ করে। আমি যদি সরাসরি সব মন্তব্য করতাম, কারও কাছে নিন্দিত হতাম, কারও কাছে নন্দিত।’

‘আপনি কি নিন্দাকে ভয় পান?’

‘উঁহু। আমি ভয় পাই মানুষের আক্রোশ। যতই অপরাধ করি, মাফ চাইলে আল্লাহ মাফ করে দিবেন। মানুষের আক্রোশ কখনো আরেকটি মানুষের সামান্যতম অপরাধ মাফ করে না।’

বৃষ্টির তেজ বেড়েছে। হুমায়ূন আহমেদ আমার হাত ধরে বললেন, ‘চলো বৃষ্টিতে ভিজি। মওসুমের পয়লা বৃষ্টি খুব আনন্দের।’

২

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বৃষ্টি বিলাসী হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘বৃষ্টির কোন গানটা তোর সবচেয়ে বেশি ফেভারিট?’

‘যদি মন কাঁদে, তবে চলে এসো চলে এসো এক বরষায়।’

‘তারপর?’

‘বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান।’

‘এই মধ্যরাতে বাদলা দিনে গানটা ভালো লাগবে না। ওটা ডিলিট।’

আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি নাই। বইমেলা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।’

চশমার কাঁচটা উপরে তুলতে তুলতে স্যার বললেন, ‘সারা জীবন আমি থাকব নাকি! তোরা লেখ। আমি তো লিখলাম।’

‘কিন্তু সমস্যা হলো স্যার, সহজ করে লিখতে চাইলেই মানুষ মনে করে, আপনার মতো লিখছে। উপাধি জুটে যায়।’

‘জুটুক উপাধি। কয়দিন আর মানুষ বলবে? ভালো লিখলে, মানুষের অনুভূতি স্পর্শ করতে পারলে, মানুষ পড়বেই।’

আমি স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি গভীর দৃষ্টিতে। বাচ্চাদের মতো উৎসাহে বৃষ্টিতে ভিজছেন। মুখটা আকাশের দিকে তোলা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ছে কপালে, চোখে, গালে, থুতনিতে। এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে স্যার অন্য পৃথিবীতে চলে গেছেন। তাই সর্দি কিংবা জ্বরের ভয় নেই। মায়াটুকুই আসল। মায়াহীন সবকিছু নকল। মায়া আছে বলেই আমরা বন্ধনে জড়াই, বন্ধন ছিন্নকারী সবকিছুকে ডরাই। আমরা কেউ চাই না মায়াটুকু কেটে যাক। রং-বর্ণ-গন্ধহীন হয়ে যাক জীবন। সবটুকু শক্তি দিয়ে তাই বুকের ভেতর মায়া পুষে রাখি। মায়ার পাখির উষ্ণ নরোম আরামে মুখ গুঁজে থাকি। মায়া কেটে গেলে বুঝা যায় মানুষ কতটা একা, কতটা দুঃখী।

আচমকা জিজ্ঞেস করলাম, ‘নবিজি’ বইটা কিন্তু শেষ করেননি।’

‘করতে পারিনি।’

‘কেন?’

‘কারণ তো অনেক।’

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। প্রশ্নটায় স্যার কি বিব্রত হয়েছেন, বুঝতে পারলাম না। প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য বললাম, ‘একটা উপন্যাস লিখবো ভাবছি। প্লট দেন স্যার।’

স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ‘প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আমাদের দেশের দামাল ছেলেরা বিমান ছিনতাই করতে যায়। এত চমৎকার ঘটনা থাকতে আর কিছু লাগে না।’

বৃষ্টি বাড়ছে। বৃষ্টির শব্দের সাথে আমাদের হাসির শব্দ মিলে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

৩

রাত শেষ হয়ে আসছে। একটু পর আজান পড়বে ফজরের। আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘স্যার, এখন যেখানে থাকেন, সেখানে লিখতে দেয় আপনাকে?’

মাথা নেড়ে স্যার বললেন, ‘দেয় তো। সেখানে লিখতে কিছুই লাগে না। ভাবলেই লেখা হয়ে যায়।’

‘শেষ কোন বইটা লিখেছেন সেখানে?’

‘আমার আত্মবয়ান।’

‘উপন্যাস না আত্মজীবনী?’

‘আত্মজীবনী টাইপের। তবে ডিফরেন্ট। অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর।’

আমার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আবেগ সামলাতে না পেরে বললাম, ‘যেমন…’

স্যার বললেন, ‘কেন ‘নবিজি’ শেষ করিনি, আমি মারা গেছি নাকি আমাকে মারা হয়েছে–এইসব প্রশ্নের উত্তর।’

আমি থমকে গেলাম। কপাল কুঁচকে গেলো। ‘মারা হয়েছে মানে?’

স্যার বললেন, ‘ডোন্ট ওরি। বইটা এখানে ছাপানো যাবে না। জান্নাতে গেলে তোমাকে পড়তে দেবো।’

ফজরের আজান পড়ছে। বৃষ্টিও পড়ছে। মওসুমের প্রথম বৃষ্টি। আমি এবং স্যার ভিজে একাকার। আমি স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি। বৃষ্টির জলে আমার চশমার কাঁচটা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে।

আগের সংবাদমাদরাসায় যেতে না চাওয়ায় বাবার ভর্ৎসনা : হাফেজিয়া মাদরাসা ছাত্রের আত্মহত্যা
পরবর্তি সংবাদবজ্রাঘাতে বাবা-ছেলের মৃত্যু