
মুসান্না মেহবুব
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এতই নৈরাজ্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে, একজন মানুষ ঘর থেকে বেরোলে প্রাণ নিয়ে বা সুস্থ অবস্থায় যে ঘরে ফিরতে পারবে, সেই নিশ্চয়তাটুকু নেই। খুন, গুম, এক্সিডেন্টে নিহত—অপমৃত্যুই যেন আজ এ দেশের মানুষের নিয়তি। অপমৃত্যু এতটাই স্বাভাবিক হয়েছে, স্বাভাবিক মৃত্যু যেন এখন অনেকটা ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’।
সম্প্রতি দেশজুড়ে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণে সরলপ্রাণ মানুষ নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। সরকার, প্রশাসন ও গণমাধ্যম থেকে এটাকে বারবার গুজব বলে আসলেও সাধারণ মানুষের আতঙ্ক যেন থামছে না। এ আতঙ্ক থেকে মানুষজন হিংস্র ও বেপোরায়া হয়ে উঠেছে। কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলেই গণপিটুনী দিচ্ছে। তাই অপমৃত্যুর তালিকায় সম্প্রতি নতুন একটি উপসর্গ যুক্ত হয়েছে, গণপিটুনীতে নিহত। গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্রেফ সন্দেহের বশে এরকম গণপিটুনির শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন নিরীহ ব্যক্তি। তাদের মধ্যে কয়েকজন মারাও গেছেন।
মানুষ কতটা হিংস্র ও আতঙ্কগ্রস্ত হলে সেরেফ সন্দেহের বশে একজন মানুষকে হত্যা করে ফেলতে পারে, তা কি ভাবা যায়? একজন মানুষের কাছে আরেকজন মানুষের ন্যুনতম নিরাপত্তাটুকু নেই। কারও ওপর সন্দেহ হলেই তাকে গণপিটুনী দিয়ে হত্যা করে ফেলা হচ্ছে, কিংবা জখমি করা হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
এমন নৈরাজ্য ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে ইসলামের দৃষ্টিতে করণীয় কী, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম তরুণ আলেম ও মুফতি, মাওলানা তাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইসলামের পরিভাষায় এই পরিস্থিতিকে ‘ফিতনাহ’ বলা হয়।
মুফতি তাজুল আরও বলেন, ফিতনা ও অন্তর্কলহ সম্পর্কে মহানবী (সা.) সতর্ক করে গেছেন। এক হাদিসে এসেছে, ‘সামনে এমন ফিতনা আসবে, যাতে উপবিষ্ট ব্যক্তি দণ্ডায়মান ব্যক্তি থেকে উত্তম হবে। দণ্ডায়মান ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি থেকে উত্তম হবে। চলমান ব্যক্তি ওই ব্যক্তি থেকে উত্তম হবে, যে দৌড়াচ্ছে। ফিতনা যে কাউকেই গ্রাস করবে। তাই যে ব্যক্তি কোনো আশ্রয় পায়, সে যেন তা গ্রহণ করে—অর্থাৎ ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে।’
মুফতি তাজুল বলেন, মুসলমানদের পারস্পরিক রক্তপাতের বিরুদ্ধে হাদিস শরিফে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া গুনাহর কাজ আর তাকে হত্যা করা কুফরি।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, একদল মুসলিম অন্য কোনো মুসলমানকে স্রেফ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে খুন করতে পিছপা হয় না। ছেলেধরা সন্দেহে মুসলমানরা দলবদ্ধ হয়ে একটা মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে ফেলছে, অথচ কুরআনে পাকে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কাছে যদি ফাসিক ব্যক্তি কোন খবর নিয়ে আসে তোমারা তা যাচাই করে দেখো।’
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ক্রমেই যুগ সংকুচিত হবে, আমল কমে যাবে, কৃপণতা ও লোভ বাড়বে, ফিতনা ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেতে থাকবে এবং হারজ বেড়ে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হারজ কী জিনিস? নবী (সা.) ইরশাদ করেন, হত্যাকাণ্ড, হত্যাকাণ্ড।’
মুফতি তাজুল ইসলাম বলেন, ফিতনার সময় মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা.-এর নির্দেশনা হলো, যে ব্যক্তি কোনো আশ্রয়স্থল খুঁজে পায়, সে যেন তা গ্রহণ করে, অর্থাৎ ফিতনা থেকে বেঁচে থাকে। তাই আমাদের উচিত, ফিতনার এ সময়ে যত পারা যায় নিজেকে গুটিয়ে রাখা, এবং ফিতনা দূরীভূত হবার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে প্রার্থনা করতে থাকা।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছিল চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেম ড. আ ফ ম খালেদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ছেলেধরা গুজবকে কেন্দ্র করে নির্দোষ মানুষকে সেরেফ সন্দেহের বশে গণপিটুনী দিয়ে যে মেরে ফেলা হচ্ছে, এটা অপরাধ তো অবশ্যই, সেই সঙ্গে দেশের প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশও।
তিনি বলেন, মানুষ কাউকে অপরাধী সন্দেহ হলে তাকে পুলিশে না ধরিয়ে দিয়ে বিচার নিজেদের হাতে তুলে নেয়। কারণ মানুষের স্বাভাবিক একটা বিশ্বাস জন্মে গেছে যে, পুলিশের হাতে দিলে এ লোক নানা পারপাসে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে। আর পুলিশ যদি না ছাড়েও, তাহলে বিচারিক দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে অনেক বছর লেগে যাবে বিচার বাস্তবায়নে, ততদিনে বিচার ও অভিযোগের গড়বড় হয়ে সুষ্ঠু বিচার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল এ ধারণার অপনোদন কল্পে ড. আ ফ ম খালেদ হোসেন বলছেন, পুলিশকে আগে জনসাধারণের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে অন্তত মহামারি আকারের অপরাধগুলোর তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে হয়তো নৈরাজ্যকর এ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
