
রাগিব রব্বানি
‘গাইবান্ধা থেকে ট্রলার ভাড়া করে আমরা উজানভাঙ্গার চর এলাকার দিকে যাচ্ছিলাম, ট্রলারে প্যাকেট করে রাখা ত্রাণসামগ্রীর স্তুপ, আড়াই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিচ্ছিলাম আমরা, পাড় থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় লোকজন ত্রাণের স্তুপ দেখে আমাদের ডাকছিল করুণ আর্তি নিয়ে, কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত উজানভাঙার চরসহ গাইবান্ধার একদম ভেতরের দিকের এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছানো, যেখানে ত্রাণসাহায্য খুব অল্প হারে পৌঁছোচ্ছে, কোনো জায়গায় একদম পৌঁছাচ্ছেই না এবং মানুষজন নিদারুণ অসহায়ত্ব নিয়ে দিন কাটাচ্ছে, তাই পাড়ের মানুষের আর্তিতে আমরা সাড়া দিতে পারছিলাম না, ব্যাপারটা প্রচণ্ড খারাপ লাগছিল আমার কাছে।’ বলছিলেন ত্রাণ-সাহায্য নিয়ে গাইবান্ধার বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে আসা মাওলানা এহসান সিরাজ।
এহসান সিরাজ জানান, ত্রাণ দিতে গিয়ে স্থানীয় বেশ অনেক মানুষের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। এবারের বন্যাকে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হিসেবে দেখছেন তাঁরা। ৭০-৮০ বছরের প্রবীণ অনেকে বলছেন, তাঁদের বুঝ হবার পর থেকে এমন ভয়াবহ বন্যা তাঁরা আর দেখেননি।
গত বৃহস্পতিবার কওমি মাদরাসা পড়ুয়াদের ফেসবুকগ্রুপ আসহাবে কাহাফের উদ্যোগে আলেমদের একটি টিম গিয়েছিল গাইবান্ধার বন্যাকবলিত এলাকার মানুষজনকে ত্রাণসাহায্য দিতে। এহসান সিরাজ ছিলেন সেই টিমে।
টিমের অপর সদস্য মাওলানা মনযূরুল হক বলেন, বন্যাজর্জরিত মানুষজনের অবস্থা খুবই করুণ। ভেতরের দিকে কোনোরকম ত্রাণসাহায্যই পৌঁছুচ্ছে না। ত্রাণ যা যাচ্ছে গাইবান্ধা জেলা শহরের আশপাশে আশ্রয় নেওয়া মানুষজনই পাচ্ছে। কিন্তু জেলার ভেতর দিককার মানুষজন, যারা নিজের সহায়-সম্পদের মায়া ছাড়তে পারছে না, তাঁরা খুবই মানবেতরভাবে জীবনযাপন করছে।
আসহাবে কাহাফের টিম উজানভাঙ্গার চর, মুক্তমনির চর এবং ঘুনঘরি বাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছে। এই এলাকাগুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থা বন্যার কারণে অনেকটা দুর্গম হবার কারণে সেখানকার মানুষজনের কাছে ত্রাণ-সাহায্য নিয়ে কেউ যাচ্ছে না। এমনকি সরকারি কোনো উদ্যোগ বা তৎপরতা সেখানে নেই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন আসহাবে কাহফের টিমের কাছে।
এই এলাকাগুলোর মানুষের দুর্দশার কথা জানাতে গিয়ে মাওলানা মনযূরুল হক বলেন, বানভাসি মানুষের জীবন তো জীবন নয়, যেন পতঙ্গের মতো ভেসে থাকার চেষ্টা। সেখানে সাতারকাঁটা আর হাঁটার মধ্যে কোনো তফাৎ নাই।
মাওলানা এহসান সিরাজ বলেন, বন্যায় সহায়-সম্পত্তি সব হারিয়ে গাইবান্ধা জেলা শহরের আশপাশে যারা অাশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মোটামুটি পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসাহায্য পৌঁছুলেও জেলার ভেতরের লোকজন নিদারুণ মানবেতরভাবে দিন কাটাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় আমরা খুব অল্প পরিমাণ ত্রাণ নিয়ে যেতে পেরেছিলাম, এবং দুর্গম ওই এলাকাগুলোতে তা বিতরণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় তা এতটাই অল্প ছিল যে, আমাদের নিজেদেরই লজ্জা লেগেছে এটুকু ত্রাণ তাদের হাতে তুলে দিতে।
এহসান সিরাজ বলেন, একজন মানুষের একগ্লাস পানির দরকার, আমরা তাকে একফোঁটা পানি দিতে পেরেছি, অবস্থাটা এমন।
এহসান সিরাজ আরও বলেন, ওই এলাকাগুলোতে বন্যাপরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই, পানি এই কমছে তো এই বাড়ছে, এমন অবস্থা।
তিনি বলেন, স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে কথা হলে তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়মিত আপডেট পাঠাচ্ছেন বন্যাপরিস্থিতির, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা থেকে গণমাধ্যমগুলো অদৃশ্য বাধার শিকার হচ্ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ১০ জুলাই থেকে আজ ২৯ জুলাই পর্যন্ত ২০ দিনে চলমান বন্যায় পানিতে ডুবে, সাপের কামড়ে, বজ্রপাত ও অন্যান্য কারণে ১১৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে বন্যার কারণে দুর্ভোগের পর এখন প্রতিদিন বহু মানুষ বিভিন্ন রোগের শিকার হচ্ছেন। এরইমধ্যে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেল্থ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার জানান, ১০ জুলাই থেকে রোববার পর্যন্ত দুর্গত এলাকায় বিভিন্ন কারণে (ডায়রিয়া, সাপে কাটা, পানি ডোবা ইত্যাদি) ১১৯ জন মারা গেছেন।
এর মধ্যে জামালপুরে সর্বোচ্চ ৩৬ জন, নেত্রকোণায় ১৯ জন, চট্টগ্রামে একজন, কক্সবাজারে একজন, বগুড়ায় আটজন, গাইবান্ধায় ২০ জন, লালমনিরহাটে চারজন, নীলফামারীতে দুইজন, সুনামগঞ্জে পাঁচজন, কুড়িগ্রামে চারজন, টাঙ্গাইলে ১১ জন, ফরিদপুরে একজন এবং শেরপুর, সিরাজগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুইজন করে মারা গেছে।
তাদের মধ্যে পানিতে ডুবে ৯৮ জন, বজ্রপাতে ৭ জন, সাপের কামড়ে ১০ জন, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ১ জন এবং অন্যান্য কারণে তিনজনের মৃত্যু রয়েছে।
গেল তিন সপ্তাহে (১০ জুলাই থেকে ২৯ জুলাই) বন্যা দুর্গত এলাকায় ১৬ হাজার ৯৫৯ জন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত একদিনে ১ হাজার ২০৯ জন অসুস্থ হয়েছেন, তাদের দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলমান বন্যায় দেশের ২৮ জেলায় ৬০ লাখ ৭৪ হাজার ৪১৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান জানিয়েছেন।
গতকাল রোববার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ৭৬টি উপজেলাকে ‘দুর্গত এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই হাজার ৪৬০টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে জানিয়ে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বন্যা দীর্ঘায়িত হবে না। পানি দুয়েক দিনের মধ্যে কমে যাবে। বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হলেও ত্রাণের কোনো সমস্যা হবে না।’
দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি শনিবার থেকে কমছে জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, গত সপ্তাহের শেষ থেকে সারা দেশে এবং দেশের উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গেছে। এই মুহূর্তে সব জায়গায় পানি হ্রাস পাচ্ছে।
‘এই সপ্তাহে দেশে এবং উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই এবং আগামী সপ্তাহেও ভারী বৃষ্টিপাতের লক্ষণ নেই। দুই সপ্তাহের মধ্যে বড় বন্যার ঝুঁকি দেশে নেই।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামসুদ্দিন আহমেদ জানান, আগামী ১০ দিন ভারতীয় অংশে বাংলাদেশের উজানে বিশেষ করে নেপাল, আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম। তবে হালকা ধরনের বৃষ্টিপাত হবে। একই সাথে বাংলাদেশেরও বিভিন্ন অংশে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হবে।
