ওলিপুরির ছেলের বক্তব্যে অনলাইনে বিতর্ক : কে কী বলছেন?

মুসান্না মেহবুব

দেশের বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরির ছেলে মাওলানা কামরুল ইসলামের কিছু বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই বিতর্কের জেরে দুটো পক্ষ তৈরি হয়ে ফেসবুকে একপক্ষ আরেক পক্ষকে নানা ধরনের আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। একপক্ষ সমর্থন করছেন মাওলানা কামরুল ইসলামকে, আর আরেক পক্ষ তাঁর বক্তব্য মানতে না পেরে অবস্থান নিয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে কয়েকদিন ধরে চলছে কাঁদা ছোড়াছুড়ি।

কী বলেছেন মাওলানা কামরুল ইসলাম

বেশ কিছুদিন আগে পৃথক দুই মাহফিলে প্রদত্ত মাওলানা কামরুল ইসলামের দুটো বয়ানের দুই আংশিক ভিডিও ক্লিপ কয়েকদিন আগে কে বা কারা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। ভিডিও ক্লিপ দুটোর একটিতে মাওলানা কামরুল ইসলাম দলবদ্ধভাবে হালকায়ে জিকির আয়োজনের বিপরীতে কথা বলেছেন। কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি প্রমাণ করার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, এ ধরনের জিকির সুন্নাহ সম্মত না। খানিকটা আক্রমণাত্মক ভঙিতেই ছিল তাঁর এ আলোচনা। ফলে চরমোনাইপন্থী ও ইসলামি আন্দোলনের ভক্ত-সমর্থকরা এ বক্তব্যে ব্যতীত হয়েছেন এবং তাঁদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ আক্রমণাত্মক অবস্থানে গিয়ে কামরুল ইসলাম ওলিপুরিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন।

ভাইরাল হওয়া অপর ভিডিওতে দেখা যায়, মাওলানা কামরুল ইসলাম কুরআন-সুন্নাহকে হক প্রমাণের জন্য যুক্তির আশ্রয় নেওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং কুরআনের আয়াত থেকে দলিল টেনে নিজের এ বক্তব্যকে প্রমাণিত করারও চেষ্টা করেছেন। এর সূত্র ধরে টকশোতে উলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণের সমালোচনাও করেছেন তিনি।

কে কী বলছেন?

প্রথম ভিডিও’র প্রতিক্রিয়ায় চরমোনাইপন্থী ও ইসলামী আন্দোলনের ভক্ত-সমর্থক ও কর্মীরা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ক্ষোভের এক পর্যায়ে সমর্থক ও কর্মীদের বড় একটি অংশ মাওলানা কামরুল ইসলামকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও হেয়প্রতিপন্ন করেন। তাদের কেউ কেউ তাঁকে বাবার অবাধ্য সন্তান হিসেবে অভিহিত করেন। এমনকি তিনি আহলে হাদিসের দোসর হয়ে গেছেন বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। ফলে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের দলের বিরোধী বা চরমোনাই পীরের জিকিরের পদ্ধতি যারা পছন্দ করেন না কিংবা ইসলামী আন্দোলনের বাইরে যাঁরা আছেন তাদের বড় একটি অংশ মাওলানা কামরুল ইসলামের পক্ষাবলম্বন করেন এবং দলিলিভিত্তিক কথার জবাব দলিলভিত্তিকভাবে দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁদের অনেকে আবার কামরুল ইসলাম ওলিপুরিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের জবাবে আক্রমণাত্মক কথাবার্তাও বলেন চরমোনাইপন্থীদেরকে।

এদিকে হালকায়ে জিকিরের সমালোচনার ভিডিওর পাশাপাশি মাওলানা কামরুলের টকশো বিরোধী বক্তব্য যখন ভাইরাল হয়, তখন এর বিরুদ্ধে কথা বলেন আমেরিকাপ্রবাসী লেখক মাওলানা রশীদ জামীল। তিনি ‘বাঁশ থেকে যখন কঞ্চি মোটা হয়ে যায়’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস লিখেন ফেসবুকে। স্ট্যাটাসটিতে তিনি মাওলানার কামরুলের বাবা মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরির ওয়াজের ময়দানে অনন্য অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, তাঁর এই অনন্যতার মূল কারণ তিনি যুক্তির মাধ্যমে কোরআনের ব্যাখ্যা মুসলিম সমাজের কাছে সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারেন। ‘যাঁরা তাঁকে শুনেন, তাঁরা ব্যাপারটি বুঝতে পারেন। বুঝতে পারেননি তাঁর সন্তান।’

রশীদ জামীল বলেন, ‘কোরআনে কারিমের তাফসির করবার জন্য সতেরটি ইলমের দরকার হয়। কথাটি আমরা তার বাবার বয়ান থেকেও অনেকবার শুনেছি। আফসোস, তিনি যদি শুনতেন! অবশ্য উদ্দেশ্য যদি হয় একটু সস্তা পরিচিতি, তাহলে তরিকা গলদ হলেও ট্যাকনিক ঠিকাছে। ভবিষ্যত ফকফকা। আজকাল ওয়াজের মার্কেটে বেশিরভাগ বস্তুই এই কোয়ালিটির।’

রশীদ জামীলের এই স্ট্যাটাস বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাঁর স্ট্যাটাসের কমেন্ট বক্সে পক্ষে বিপক্ষে শালীন ও অশালীন ভাষায় ব্যাপক মন্তব্য পড়তে থাকে। অনেকে মাওলানা কামরুল ইসলামকে নানাভাবে তাচ্ছিল্য করতে থাকেন। বিপরীতে কামরুল ইসলামের বিপক্ষের লোকজনকেও অনেকে আক্রমণাত্মক কথা বলতে থাকেন। রশীদ জামীলকে তাঁর বক্তব্যের জন্যও অনেকে নিন্দা-মন্দ করেন।

বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহ স্ট্যাটাসের কমেন্ট বক্সে এসে লিখেন, ‘হবিগঞ্জের এক মাহফিলে গিয়ে শুনেছিলাম এই ছেলেটা তার বাবাকে মানে না এবং উগ্র টাইপের। বাংলাদেশের আলেমরা নাকি সশস্ত্র জিহাদ না করে ভুলের মধ্যে আছে (!) এমন সব মন্তব্য এই ছেলের।’ তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরেও পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা হয়।

তবে সমঝদারদের অনেকে রশীদ জামীলের পোস্টে এসে বলেন, দালীলিক কথার জবাব দালীলিকভাবে দেওয়া উচিত।

রশীদ জামীল এই কথার প্রেক্ষিতে ‘ফাহমে কুরআন ও তাফহিমে কুরআন’ শিরোনামে আরও একটি স্ট্যাটাস লিখেন। সেখানে তিনি মাওলানা কামরুল ইসলামের বক্তব্যকে কুরআন-হাদিস থেকে দলিল টেনে দালিলিকভাবে খণ্ডন করেন।

তাঁর এই স্ট্যাটাসের পর অনেকেই সাধুবাদ জানান। এবং বলেন যেকোনো ধরনের দালিলিক কথার জবাব দালিলিকভাবে হওয়াই উচিত। রশীদ জামীল প্রথমেই এরকম দালিলিকভাবে কামরুল ইসলামের বক্তব্যের সমালোচনা করলে এত বিতর্কের সৃষ্টি হতো না।

সমালোচনার জবাবে কী বলছেন মাওলানা কামরুল ইসলাম?

পুরনো দুটো বয়ানের ভিডিওক্লিপ হঠাৎ করে যে এমন সমালোচিত হবে, মাওলানা কামরুল ইসলাম ভাবতে পারেননি। সমালোচনা যখন শুরু হয়, তিনি অনলাইনে নিস্ক্রিয় ছিলেন। পরে পরিচিতজনদের ধারাবাহিক ফোনকল পেয়ে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এরই পরিপ্রেক্ষিত তিনি গতকাল দুই পর্বে দুটো জবাবি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপ করেন। দুটো ভিডিওতেই তিনি হালকায়ে জিকিরের বিপরীতে বলা কথাগুলোকে আরও দলিল-আদিল্লার সমন্বয়ে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন। সাথে সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, জিকিরের নামে মজলিস কায়েম করা এবং মজলিসে জিকির করতে বসে ‘লাফালাফি’ করার বিশুদ্ধ একটা দলীলও কেউ কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ থেকে দেখাতে পারবেন না। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেছেন, দুই বছর আগে প্রদত্ত তাঁর জিকির সম্পর্কিত ওই ভিডিওকে কাটছাট করে হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কুরআন-হাদিসের আলোকে বলা তাঁর অনেক বক্তব্য নির্দিষ্ট একটা দলের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ায় তাঁরাই এই কাজটি করছে এবং তাঁকে হেস্তনেস্ত করার চেষ্টা করছে।

এদিকে টকশো বিষয়ক তাঁর বিতর্কিত বক্তব্য সম্পর্কে দুই পর্বে প্রকাশিত তাঁর জবাবি ভিডিওতে কোনো ধরনের আলোচনা করেননি তিনি।

আগের সংবাদআল মাকরীজী : যিনি ইসলামী ইতিহাস সংকলন করেছেন
পরবর্তি সংবাদপাঠ্যক্রমের রাজনীতি : স্কুল-কলেজের বইয়ে পরিবর্তন-বিতর্ক কতটা যৌক্তিক?