
আবুল কাসিম আদিল
আধুনিক নাগরিক আইনের দাবি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরতে না চাওয়া উচিত নয়, তা না-হয় মানলাম; কিন্তু আপনি ফিরে যেতে বলছেন কোন যু্ক্তিতে, তা কি ব্যাখ্যা করতে পারবেন? রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে যুক্তি কী ছিল? যে যুক্তিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন, সে যুক্তি কি এখনও বিদ্যমান নেই? মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হরণ করে তাদেরকে বাস্তুচ্যুত করেছিল, তারা মিয়ানমারে গণহত্যার শিকার হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তাদেরকে আশ্রয় দেয়। এখন মিয়ানমার কি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব স্বীকার করেছে? তাদের সহায়-সম্পত্তি ফিরিয়ে দিয়েছে? আবার যে তাদের ওপর গণহত্যা চালানো হবে না, সেই নিশ্চয়তা কি পাওয়া গেছে? তা না-হলে তাদেরকে ফেরত পাঠানোর পক্ষে যুক্তিটা কী? আমরা আশ্রয় দিয়েছি বলেই তাদেরকে আজীবন রাখতে বাধ্য নই, আমরা যেতে বললে তাদের চলে যাওয়া উচিত— এই যুক্তি যুক্তি হিসেবে ঠিক হলেও মেনে নেওয়া যে কত কঠিন, মৃত্যুপুরী থেকে যারা একবার ফিরে এসেছে, স্রেফ তারাই বুঝতে পারে। ধরুন আপনি নিজেই এরকম গণহত্যা থেকে বহু কষ্টে বেঁচে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিলেন। গণহত্যার মুখে আবার পড়বেন না, সে রকম নিশ্চয়তা এখনও তৈরি হয় নি। তাহলে কি আপনাকে যতই যৌক্তিকতা বোঝানো হোক, আপনি ফিরে যেতে চাইবেন? জাতীয়তাবাদী চিন্তার উর্ধ্বে উঠে মানবিকভাবে ভাবতে পারলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক প্রত্যাবসানের অযৌক্তিকতা বুঝতে পারবেন, অন্যথায় নয়।
এক শ্রেণীর লোক শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার বিপক্ষে কথা বলেছে। ক্ষমতাসীনদের বড় অংশ এ ব্যাপারে অনলাইনে-অফলাইনে সরব ছিল। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, হঠাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশ্রয়দানের কথা ঘোষণা করলে এই শ্রেণীটা রাতারাতি ভোল-বোল পাল্টে ফেলল। প্রধানমন্ত্রী যে কত বড় একটা মানবিক কাজ করেছেন, এবং সেই বছরের নোবেল প্রাইজটার বৈধ হকদার যে তিনিই— এই বিষয়ে তাদের কারো দ্বিমত ছিল না। হঠাৎ এমন কী ঘটল যে, সেই মানবিক কাজটা শোধরাতে হবে?
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে শেখ হাসিনা নোবেল প্রাইজ একটা পেতেই পারেন, এই বিষয়ে দ্বিমত করার কিছু নেই। কাজটা অবশ্যই মানবিক ছিল। এরচে অনেক ঠুনকো কাজ করেও, কিছু না করেও, এমন কি শান্তির বিপক্ষে কাজ কাজ করেও অতীতে অনেকে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছে; তাহলে শেখ হাসিনা পাবেন না কেন? নোবেল প্রাইজ একটা শেখ হাসিনার পাওয়াই উচিত। ঠুনকো নয়, অনেক বড় কাজই তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ তখন করেছিল। কিন্তু নিন্দুকরা বলছে, শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলই নোবেল প্রাইজের জন্য। প্রথমে সরকার রাজি ছিল না। কিন্তু যখন আশ্রয়দানের মধ্যে নোবেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখল, তখন আশ্রয়দানের কথা ঘোষণা করল। যেহেতু নোবেল পাওয়া হলো না, পাওয়ার সম্ভাবনাও আর নেই— তাই এখন ফেরত পাঠানোর তোড়জোড় শুরু করেছে। নিন্দুকদের এই অভিযোগ যে সত্য নয়, তা প্রমাণ করা সরকারেরই কর্তব্য। যা-ই হোক, লোভের বশে মানবিক কাজ করলেও তা মানবিকই। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ভালো কাজ সবসময়ই ভালো।
আধুনিক নাগরিক আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গারা এই ভূখণ্ডে থাকতে না পারলেও মানবিক অধিকারে থাকতে পারে। সৃষ্টিকর্তা সীমানা দিয়ে মানুষ পাঠান নি। মানুষ নিজেদেরকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করেছে। আমি এই বিভক্তি আইনগতভাবে মানলেও মন থেকে গ্রহণ করি না। পৃথিবীতে যখন রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার ভঙ্গুরতাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র মানুষের অধিকার দিতে পারছে না বলেই রাষ্ট্র ভাঙছে। বৃহৎ রাষ্ট্র ক্ষুদ্র হচ্ছে, ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। ক্ষুদ্রতর রাষ্ট্র ক্ষুদ্র হতে হতে মিলিয়ে গেলে সীমানামুক্ত রাষ্ট্র গঠিত হবে।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না, এ কথা তারা কখনো বলে নি। তারা বলছে: তাদেরকে যদি নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাদের জায়গা-জমি ফেরত দেওয়া হয়, এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়— তাহলে তারা সবাই একসঙ্গে ফিরে যাবে। এজন্য তারা বাংলাদেশের মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে বসতেও রাজি। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া তাদের বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপনা করছে। অনকে ইচ্ছাকৃতভাবে, কেউ কেউ ভুল উদ্ধৃতি দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।
খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক বৈধ-অবৈধ ভারতীয় নাগরিক বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। বাংলাদেশে বেকার-সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে অনেকে এদেরকে দায়ী করেন। রাষ্ট্র-কর্তৃক তাড়িত নয় যারা, যাদের উপস্থিতি দেশের যুবকদের বেকারত্বের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে— তাদের ব্যাপারে তো কখনো কাউকে উচ্চবাচ্চ করতে দেখা যায় না। অথচ এদের ব্যাপারেই উচ্চবাচ্চ হওয়ার কথা বেশি। এ কারণে এই সন্দেহ অমূলক নয় যে, রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ স্রেফ জাতীয়তাবাদী আবেগ-প্রসূতই নয়, এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও ক্রিয়াশীল আছে। ফলে নিশ্চিত হওয়া কঠিন যে, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সংবাদপত্রে যেসব নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়, তার কত শতাংশ সত্য আর কত শতাংশ মিথ্যা। রোহিঙ্গাদের দ্বারা যেসব হতাহতের কথা শোনা যায়, তার প্রত্যেকটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিকটবর্তী। কথা হলো, নিহত লোকগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কেন গিয়েছিল। সাহায্য করতে নিশ্চয় নয়। সাহায্যকারীদেরকে তো হত্যা করার কথা নয়। এ পর্যন্ত অনেক সংগঠনের দায়িত্বশীলেরা রোহিঙ্গা-আশ্রয় শিবিরে সাহায্যার্থে গিয়েছে। এমন হতাহতের খবর শোনা যায় না। বিশেষ দলের লোকই হতাহতের শিকার হচ্ছে, এই সরকারের আমলে যাদের সব ধরনের অপকর্ম করার লাইসেন্স আছে। ধারণা করা অমূলক নয় যে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অন্য উদ্দেশ্য ছিল। হয়ত সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করা ছাড়া রোহিঙ্গা মা-বোনদের ইজ্জত-আব্রু বাঁচানোর আর কোনো পথ ছিল না।
লেখক : তরুণ আলেম ও চিন্তক
