
ফাতেহ ডেস্ক
গোয়াহাটি থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। আসাম রাজ্যের নেলির মরিগাঁও জেলার বরখাল গ্রাম। ২৯ বছরের গুলবাহার বেগম এ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি গৃহবধূ। আগামী ৩১ আগস্ট শনিবার এনআরসির যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে, তাতে তাঁর নাম থাকবে না। কারণ তাঁর বাবাকে বেআইনি বিদেশি বলে চিহ্নিত করেছে বিদেশি ট্রাইবুনাল। নেলির অসমিয়া ভাষী মুসলিম পরিবারের সদস্য তিনি। এঁরা ওই অঞ্চলের বহু পুরনো বাসিন্দা।
গুলবাহারদের গ্রামের অন্যদিকে, জাতীয় সড়কের অপর পারে যে উদ্বাস্তু কলোনি সেখানে বাস করেন ৪৫ বছরের মনোতোষ ত্রিবেদী। তিনি হিন্দু বাঙালি। তাঁর মা ও স্ত্রী-র নাম তালিকায় উঠবে কিনা সেটা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। মনোতোষ একটা ছোট দোকান চালান। সেই দোকানে পূজা-অর্চনার জিনিসপত্র বিক্রি হয়। গুলবাহারের মত মনোতোষও জানেন না- পরিবারের দুই নারী সদস্যের নাম যদি এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় না ওঠে, তাহলে বিদেশি ট্রাইবুনালের আইনজীবীদের খরচ তিনি জোগাতে পারবেন কিনা।
অবশ্য ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে যে- যাদের নাম এনআরসি তালিকায় উঠবে না, তারা সঙ্গে সঙ্গেই বিদেশিতে পরিণত হবেন না। তা সত্ত্বেও বহু মানুষ জানেন না- তারা ১ সেপ্টেম্বর কী করবেন। মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়ে দিয়েছে তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষেরা যাতে এনআরসিভুক্ত হতে পারেন, সে জন্য বিদেশি ট্রাইবুনালের কাছে আবেদনের ব্যাপারে সবরকম সাহায্য করা হবে।
এর আগে এই বিষয়ে গত ১৯ আগস্ট ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একটি পর্যালোচনা বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল ও রাজ্যের শীর্ষ আমলারা। সেখানে রাজ্যের তরফ থেকে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়। একটি সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে- বিদেশি ট্রাইবুনাল কেবলমাত্র বিদেশি ঘোষণা করতে পারে। সোনওয়াল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে- এনআরসি আপডেট প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন উঠলে পরে সরকার কোনও আইন আনতে পারে। যদিও তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি যে এনআরসির ধাক্কা সামলাতে সে আইনে কী থাকবে।
গুলবাহারের বাবা গুল মোহাম্মদের বয়স ৬৯ বছর। তিনি আগে দিনমজুরের কাজ করতেন। ১৯৫১ সালের এনআরসি-তে তাঁর নাম ছিল। তিনি তখন এক বছরের শিশু। ২০০৯ সালে বিদেশি ট্রাইবুনাল তাকে বিদেশি ঘোষণা করেছে। গত ১৮ মাস ধরে তিনি ডিটেনশন ক্যাম্পে রয়েছেন। এনআরসি আইনানুসারে ঘোষিত বিদেশি ও তাদের উত্তরসূরীরা এনআরসি তালিকায় থাকবেন না।
গুলবাহারের স্বামী গ্রামের একজন ড্রাইভার। গুলবাহারের মা জুনাকি বেগম হাইওয়ের ধারে একটি ছোট পানের দোকান চালান। গুলবাহারের বোনের বিয়ে হয়েছে এক মেকানিকের সঙ্গে। তাঁদের আর্থিক দুর্দশা এতটাই যে- গুল মোহাম্মদকে আটক রাখার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদনও করতে পারেননি তাঁরা।
“আমি জানি না বিষয়টা এত জট পাকানো কেন। আমার বাবার নাম ১৯৫১ সালের এনআরসি-তে ছিল। মোরিগাঁও জেলার বিদেশি ট্রাইবুনাল রায় দিয়েছে তিনি বিদেশি। আসেল ওরা রাজ্য সরকার যে অভিযোগ এনেছিল তাতেই সায় দিয়েছে। রাজ্যের অভিযোগ ছিল আমার বাবা ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশে জন্মেছেন, ১৯৭১ সালের পর বেআইনিভাবে আসামে এসেছেন। আমরা খুব চিন্তায় আছি। আমার ও আমার বোনের নাম ওঠেনি। এরপর কী করব জানি না। বাবার মত আমাদেরও ক্যাম্পে পাঠাবে! আমরা এত গরিব যে উকিল দিতে পারব না, কোর্টেও যেতে পারব না।”
মনোতোষ ত্রিবেদীর মা ৭২ বছর বয়সী অঞ্জলি। তাঁর ১৯৫৫ সালের রিফিউজি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন এনআরসি কর্মকর্তারা। মনোতোষের স্ত্রী সন্তোষীর বাবার ১৯৭১ সালের ম্যাট্রিকুলেশনের সার্টিফিকেট অবশ্য একেবারে নাকচ হয়ে যায়নি। সার্টিফিকেট নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা। ফলে তিনি একটু আশা করছেন, নাম থাকলেও থাকতে পারে। খসড়া এনআরসি তালিকায় অবশ্য দুই শাশুড়ি-বৌমা কারোরই নাম ছিল না।
মনোতোষ অবশ্য বলছেন, চূড়ান্ত এনআরসিতে দুজনের কারোরই নাম থাকবে না। “এনআরসি প্রকাশিত হওয়ার পর আমাদের কী করতে হবে, সে নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা উচিত। যাদের নাম বাদ যাবে তাদের নিয়ে সরকার কী করবে! আমরা হচ্ছি সেই ভারতীয় যারা এখনকার বাংলাদেশে ধর্মীয় নিপীড়নের জন্য এখানে এসেছি। কী হচ্ছে সে নিয়ে কিছুই স্পষ্ট নয়।”
৪৮ বছর বয়সী অজিত তালুকদার আরেক হিন্দু বাঙালি। তিনি মনোতোষ ত্রিবেদীর বন্ধুও বটে। অজিতের নাম খসড়া এনআরসি-তে ওঠেনি। তাঁর ১৫ বছর, ১৩ বছর ও ৫ বছরের তিন সন্তানের নামও বাদ পড়েছে ২৬ জুনের প্রকাশিত অতিরিক্ত তালিকাছুটের লিস্টে। অজিতের অনেক প্রশ্ন। তিনি বলেন,‘আমার বাবার কাগজপত্রে ভূষণ তালুকদার ও দাস দুরকম পদবী ছিল। ফলে সমস্যা হয়েছে। আমার ও ছেলেমেয়েদের নাম সম্ভবত তালিকায় উঠবে না। তাহলে আমাকে কি ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিদেশি ট্রাইবুনালে লাইন দিতে হবে? ওরা কি আমাদের আটকে রাখবে?’
১৯৮৩ সালে নেলি হত্যাকাণ্ডে মারা গিয়েছিলেন ২০০০ জনেরও বেশি মানুষ। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি মুসলমান। সে ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন আব্দুল হামিদের বাবা। আহত হয়েছিলেন তাঁর মা ও বোন। আব্দুল হামিদের বয়স এখন ৭০। তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মরিগাঁওয়ের বিদেশি ট্রাইবুনালে মামলা নথিবদ্ধ হয়েছিল। সে মামলা জিতেছেন আব্দুল হামিদরা। কিন্তু তাঁর নাম খসড়া তালিকায় নেই।
“আমি একটা ইটভাটায় কাজ করি। ভাটা মালিকের কাছ থেকে ধার নিয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করে বিদেশি ট্রাইবুনালে মামলা লড়েছি। এখন কাজ করছি সে টাকা শোধ দেবার জন্য। ৩১ আগস্টের তালিকায় যদি আমার পরিবারের লোকের নাম না ওঠে, আমি জানি না তারপর কী করব।” বলছেন হামিদ।
সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
