
রাগিব রব্বানি
চলতি ও বিগত দশকে কুরআন তেলাওতের মান ও হিফজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বলতে গেলে এক বিপ্লব সাধিত হয়েছে। আর এ বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ কারিগর হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের হাফেজ ও কারি সাহেবানদের কুরআন তেলাওতে বিশুদ্ধি আনয়ন ও আন্তজার্তিক মানে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হাফেজদের এ অভিভাবক সংস্থা। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহমাতুল্লাহি আলায়হির ভাই হাফেজ কারি মুহাম্মদ বজলুল হক। প্রতিষ্ঠাকালে তিনিই ছিলেন সংগঠনের চেয়ারম্যান ও প্রধান ব্যক্তি। উসতাদুল হুফফাজ হাফেজ কারি আবদুল হক তখন ছিলেন শিক্ষা সম্পাদক। বছর দুয়েক পরে সংগঠনের সকলের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্তক্রমে হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হন তিনি।
হুফফাজ-সংশ্লিষ্টদের চেষ্টা ও মেহনতে একই সুর ও লাহজায় বিশুদ্ধ তেলাওতকারী হাজার হাজার হাফেজে কুরআন তৈরি হয়েছেন বাংলাদেশে। বছর বছর আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের শিশু-কিশোর হাফেজরা যে সম্মান ও পুরস্কারে সমুজ্জ্বল করেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে, এর পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান এই হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের। কারণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী মাদরাসাগুলো কিংবা মাদরাসাগুলোর উসতাদ নানাভাবে হুফফাজুল কুরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
সংগঠনটির দপ্তর সচিব হাশিম বিন জাহিদ তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের কাছে। তিনি জানান, হুফফাজুল কুরআনের কার্যক্রম মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত। ১. জাতীয় হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন। ২. হিফজ-শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স। ৩. হিফজ শিক্ষাবোর্ড।
জাতীয় হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা
১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবছর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন৷ হিফজ ছাত্রদের ইয়াদ ও তেলাওতের মানে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরির লক্ষ্যেই মূলত এ উদ্যোগ।
দেশব্যাপী বিভিন্ন ধাপে বাছাইপর্বের আয়োজন করে মূল প্রতিযোগীদের সিলেক্ট করা হয়। প্রথমে সারাদেশে উপজেলা ভিত্তিক চলে এ বাছাইপর্ব। উপজেলার বাছাইয়ে যারা উত্তীর্ণ হয় তাদেরকে নিয়ে জেলাভিত্তিক বাছাইপর্বের আয়োজন করা হয়। জেলাভিত্তিক বাছাইয়ে যারা টিকবে, তাদেরকে নিয়ে বিভাগীয় জোন ভিত্তিক বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
সারাদেশে হুফফাজের ১৪টি বিভাগীয় জোন আছে। বিভাগীয় জোন থেকে ৩৩ জন করে প্রতিযোগী প্রতিযোগিতার মূল পর্বে অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগিতায় ১০ পারা ২০ পারা ৩০ পারা—এই মোট তিনটি গ্রুপে তিরিশ জন প্রতিযোগীকে বিজয়ী হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়।
হিফজ-শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স
হুফফাজুল কুরআনের এই কার্যক্রমটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের হিফজখানাগুলোর শিক্ষকদের তেলাওতের সুর ও লাহজা তৈরি এবং বিশুদ্ধ উচ্চারণে অভ্যস্ত করার জন্যই হিফজ প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করা হয়।
সরাসরি সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ঢাকায় বছরে মোট ৬টি কোর্সের আয়োজন করা হয়। ৪০ দিন মেয়াদী এসব কোর্সে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হিফজ শিক্ষক এবং হিফজ শিক্ষক হতে আগ্রহী হাফেজগণ অংশগ্রহণ করেন। ৬ কোর্সে প্রতিবছর দুই থেকে আড়াই হাজার হাফেজ এখান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকেন। প্রশিক্ষণ শেষে হুফফাজ কর্তৃক প্রদত্ত সনদপত্রও বর্তমানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদরাসায় হিফজ শিক্ষক নিয়োগে এ সনদপত্র চাওয়া হয়। অথবা নূন্যতম হুফফাজের লাহন ও সুর আছে কি-না, তা যাচাই করা হয়।
হিফজ শিক্ষাবোর্ড
হাফেজদের তেলাওতের মান তৈরি ও উচ্চারণ বিশুদ্ধিকরণের ধারাবাহিকতায় হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন ২০১১ সাল থেকে হুফফাজুল কুরআন হিফজ শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ১০ পারা, ২০ পারা ও ৩০ পারা—মোট তিনটি গ্রুপে প্রতিবছর কেন্দ্রীয় পরীক্ষার আয়োজন করে থাকে। দেশের প্রায় ১৩ শো হিফজখানা এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। গত কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় তিন গ্রুপে প্রায় বারো হাজার হিফজ-শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে।
