
মুসান্না মেহবুব
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাজারপন্থী বক্তা গিয়াসউদ্দীন আত-তাহেরীর বিরুদ্ধে মামলা এবং নজরদারির বিষয়টাকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না হকপন্থী ওয়ায়েজরাও। তারা বলছেন, তাহেরীসহ মাজারপন্থী অনেক বক্তাই ইসলামের অপব্যাখ্যা ও ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ঠিক, কিন্তু এর প্রতিকারের জন্য আইনি লড়াইয়ে যাওয়া কিংবা প্রশাসনিক কোনো হস্তক্ষেপ গ্রহণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাদের অপব্যাখ্যা এবং বিভ্রান্তির জবাবে মানুষের মধ্যে হক কথা পৌঁছে দেওয়াই যথেষ্ট। মানুষ এখন অনেক সচেতন। কোনটা ইসলামের ভুলব্যাখ্যা এবং কোনটা সঠিক, সামান্য আলোকপাত করলেই তাঁরা বুঝে নিতে পারেন।
কী বলছেন ওয়ায়েজরা?
দেশের খ্যাতিমান ওয়ায়েজ মুফতী হাবিবুর রহমান মিসবাহ বলছেন, তাহেরীর বিভ্রান্তি বন্ধ করতে আইনি লড়াইয়ে যাওয়া মানে একটা সিলসিলা জারি করে দেওয়া। আজ তাহেরীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, একই অভিযোগে কাল হকপন্থী আলেমদের বিরুদ্ধেও মামলা হতে পারে, আর এমনটা ঘটতে থাকলে ফলাফল কিন্তু ভালো আসবে না।
হাবিবুর রহমান মিসবাহ আরও বলেন, আমি মনে করি, ধর্মীয় বিষয়-আশয়ে বিতর্ক ও মতানৈক্যের সমাধান করা আদালতের কাজ না। এটার জন্য ওলামায়ে কেরাম আছেন। ধর্ম সম্পর্কে কোনো বিভ্রান্তি ছড়ালে ওলামায়ে কেরাম এর বিরুদ্ধে দলিল-প্রমাণ ও আলোচনার মাধ্যমে তা দূর করে দেন। এমনটাই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। তাই এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এসব বিষয়ে আদালত পর্যন্ত যাওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। বরং আমি মনে করি আহলে হক ওলামায়ে কেরামের বিরোধী যেসব বক্তা আছেন, তাদেরকে কোনোরূপ শারীরিক হেনস্থা করাও অনুচিত। এটা উশৃঙ্খলাকে উস্কে দেয়। এবং তা আহলে হক ওলামায়ে কেরামের কর্মপন্থার বিরোধীও।
একই কথা বলছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনও। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, আদালত ইতিমধ্যে তাহেরীর বিরুদ্ধে করা মামলাটা খারিজ করে দিয়েছে৷ আমি লক্ষ্য করেছি, ইদানীং ধর্মীয় বিভেদ-বিতর্ক নিয়ে আদালত কোনো পদক্ষেপ নেন না। আলেম-ওলামার সমাধানের ওপর ছেড়ে দেন। এটা খুব ভালো দিক। ধর্মীয় বিভেদ আদালত পর্যন্ত গড়ালে সেটার ফলাফল ভালো আসবে না আমাদের বাংলাদেশে।
ড. আ ফ ম খালিদ আরও বলেন, মামলা যিনি করেছেন আমি ঠিক চিনি না তাকে, কী উদ্দেশ্যে করেছেন সেটাও ক্লিয়ার না। তবে এভাবে মামলা করা সামগ্রিকভাবে আমাদের জন্য ক্ষতিকর। তাহেরীর চেয়েও আরও মারাত্মক মারাত্মক কথা বলেন, আমাদের আহলে হক আলেমদেরকে নাম ধরে ধরে অশালীন কথাবার্তা বলেন, এমন অনেকেই আছেন, তাদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না এনে কেবল তাহেরীর বিরুদ্ধে মামলা করার কারণ কী? এটা শুভলক্ষণ নয়। এবং মামলার এ সিলসিলা জারি হওয়াটা আমাদের পক্ষে সমর্থনযোগ্যও নয়।
তাহেরীকে নিয়ে কেন এত আলোচনা?
তাহেরীকে নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হৈচৈ চলছে। ওয়াজ মাহফিলে বয়ান করতে গিয়ে বলা তার বেশ কিছু কথাবার্তা ভাইরাল হয়ে মানুষের বিনোদন ও হাস্যরসের খোরাকে পরিণত হয়েছে। এর আগেও গত দুই/আড়াই বছরে বেশ কয়েকবার তার ওয়াজ ও বিশেষ পদ্ধতির ‘জিকিরে’র কারণে অনলাইন এক্টিভিস্টদের হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি।
ধর্মীয় ও সমঝদার মানুষের কাছে এসব কারণে তিনি সমালোচিতও হয়ে আসছেন নিয়মিত। তবে মানুষজন সমালোচনার চেয়ে তার কথাবার্তাকে বিনোদন হিসেবেই নিয়েছে বেশি। একই সঙ্গে বক্তা ও ধর্মপ্রচারক হিসেবে তার অবস্থান কোন পর্যায়ে, সে ব্যাপারটাও এতদিনে সবার কাছে পরিস্কার হয়ে গিয়েছে।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া তার একটি ওয়াজে প্রদত্ত কথাবার্তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষজন যখন সেরেফ বিনোদন ও হাস্যরস করছিল, তখনই শোনা গেল তাহেরীর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে একটি মামলা দায়েরের কথা।
মামলা দায়েরের কারণ কী?
গত রোববার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইবুনালের আসসামছ জগলুল হায়দারের আদালতে মামলাটি করেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী সদস্য মো. ইব্রাহিম খলিল। মামলার অভিযোগে বাদী বলেন, ‘ইসলাম ধর্মের পথপ্রদর্শক হজরত মুহম্মদ (সা.) এর আদর্শ ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ওয়াজ মাহফিলের মধ্যে নাচ-গান সমর্থন করে না। ইসলামের রীতিনীতি অনুযায়ী আসামির কর্মকাণ্ড মুনাফেকির শামিল। ওয়াজের মধ্যে গান গাওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। এক ব্যক্তির উক্তি দিয়ে তার বিড়ি খাওয়ার দোয়াটিও ইসলামের কোথাও নেই। তার এসব বক্তব্যে ইসলাম ধর্মকে ব্যঙ্গ ও অবমাননা করা হয়েছে। ‘বসেন বসেন বইসা যান, ঢেলে দেই’ এসব বাক্য ওয়াজে ব্যবহার করা হয়, যা সম্পূর্ণ অশ্লীল। ইসলাম ধর্মে এ রকম শব্দের উল্লেখ নেই।’ কিছু কিছু ইউটিউবারকে তিনি ধান্দাবাজ বলেও উল্লেখ করেন।
অভিযোগে বাদী আরও উল্লেখ করেন, আসামি তাহেরীর এসব কর্মকাণ্ড ইসলামে বিদআত বলে গণ্য। তিনি ইসলাম ধর্মের অপপ্রচারকারী। ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তার প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ওয়াজের মধ্যে নাচ, গান করেন। জিকিরের নামে এসব নাচ-গান ইসলাম সমর্থন করে না।
সাইবার ট্রাইবুনালে মামলাটি উত্থাপনের পর তা গ্রহণ করা হবে কি না, এ বিষয়ে আলাপের দিন ধার্য করা হয় গতকাল সোমবার। সোমবার আসসামছ জগলুল হায়দারের আদালত জানান আজ মঙ্গলবার মামলাটির বিষয়ে কথা হবে। তারপর আজ মঙ্গলবার জগলুল হায়দার মামলাটি খারিজ করে দেন।
অনলাইন এক্টিভিস্টরা কীভাবে দেখছেন?
আইনজীবী ইব্রাহিম খলিল এ মামলাটি করার আগে তাহেরিকে নিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল হচ্ছিল, তখন তার বক্তব্যের ওপর প্রশাসনিক নজরদারি জারির খবরও প্রচারিত হয়েছিল গণমাধ্যমে। ফলে তখন থেকেই অনলাইন এক্টিভিস্টের অনেকে তাহেরির বিরুদ্ধে আইনি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছিলেন। মামলা হবার পর এই পক্ষ বিরোধিতাকে আরও জোরদার করেন। তাদের মতে, তাহেরী ওয়াজকে বিনোদনের মঞ্চ বানিয়ে ফেলছেন ঠিক, কিন্তু এটা দেশের আইনে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। তার ব্যক্তিত্ব এবং কথাবার্তায় যে ইসলামি মূল্যবোধে ব্যাপকভাবে আঘাত আসছে, এমনও না। তাকে মানুষ এখন নিছক বিনোদনের চোখে দেখে। তাই তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থাগ্রহণ অযৌক্তিক।
