
যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের বাইরে কিউবার দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ক্যারিবীয় সাগরের একটি উপসাগর গোয়েন্তানামো। মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটি আছে এখানে। জায়গাটার নাম কিউবা। মার্কিন সরকার ১৯০৩ সালে ৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি অধিগ্রহণ করে নিজেদের দখলে এনেছিল। এখানে, এই নৌঘাঁটিতেই ২০০২-এর ১১ জানুয়ারি তাঁরা নির্মাণ করে কুখ্যাত গোয়েন্তানামো বে কারাগারটি। নির্যাতনের বোধহয় এমন কোনো কায়দা নেই, যা এখানে প্রয়োগ করা হয় না। অবাক করা ব্যাপার হলো, এখানের কোনো বন্দিই নিয়মতান্ত্রিক বিচারে দ-প্রাপ্ত না, সেরেফ সন্দেহের বশে তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়, তারপর তথ্য আদায়ের বাহানায় বিনা বিচারে চলতে থাকে নির্যাতনের স্টিম রোলার। মার্কিন স্বার্থ-বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত সন্দেহে আটক এসব কয়েদিদের অধিকাংশই আখেরে একদম নির্দোষ প্রমাণিত হন। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়–আট বছর গোয়য়েন্তানামোর নির্যাতন-সেলে বন্দি থাকার পর ১৯৮ জনের মধ্যে ১৩০ জনেরও বেশি বন্দি নির্দোষ খালাস পেয়েছেন।
গোয়েন্তানামো’র ভাগ্যাহত এমনই কিছু বন্দীর লেখা একগুচ্ছ কবিতা ফাতেহ সাপ্তাহিকীর পাঠকদের জন্য লিটলম্যাগ আনতারা’র সৌজন্যে নিম্নে পরিবেশিত হলো। কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন আহমেদ তানভীর ও শামিম শেখ।
আহমেদ তানভীরের অনুবাদ
সত্যিই কি কখনও?
উসামা আবু কাবীর
(আমেরিকার বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা ৮ জন জর্ডান নাগরিক গ্রেফতার করে। ৭৭৮ জন বন্দীর মধ্যে উসামা বিন কাবির গোয়েন্তানামোবের বিশেষ সেলে বন্দী ছিলেন।)
সত্যিই কি বৃষ্টির পরে ফের বেড়ে উঠবে ঘাস?
সত্যিই বসন্তে আবার জাগবে ফুলেরা আবার?
সত্যিই কি পাখিরা যতনে বাসা বাঁধবে আবার?
সত্যিই কি মাছেরা স্রোতের ভেতরে কাটবে সাঁতার?
এ কথা সত্য, আমলেই সত্য, রূপকথা তো নয়
কিন্তু এটা কি সত্য? একদিন ছেড়ে যাবো গুয়েন্তানামোর বলয়?
সত্যিই কি একদিন ফিরে যাবো নিজের বাড়ি?
তবু ফেরার স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নের জাহাজ আসে সারি সারি।
আমার সন্তানদের কাছে যাবো, একদম পাশাপাশি
আমার বয়সীর কাছে যাবো, যাকে বড় ভালোবাসি
যাবো আমার বাবা-মা’র কাছে, আমার একান্ত অন্তর
স্বপ্ন দেখি ফিরে যাবার, খুঁজি শুধু মুক্তি পাবার মন্তর।
শুনতে পাচ্ছ কি হে বিচারক আমার চিৎকার?
আমি তো দোষী নই, ভাবিনি কখনও অপরাধ করার
মুক্তি দাও, মুক্তি দাও, যেখানে তোমার ইচ্ছে হয়
সুবিচার আর সমবেদনা ফুটে উঠুক জগতময়।
মৃতের কাব্য
জুমাহ আল দুসাইরি
(বাহরাইনি কবি। গোয়েন্তানামোর নির্যাতন সইতে না পেরে তিনি একে একে ১২ বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন জেলের ভেতর।)
আমার রক্ত নেবে না
নাও আমার লাশের কাফন আর—
এ দেশের বাকিটুকু।
কবরে শোয়ানো নিঃসঙ্গ লাশের কিছু ছবিও তুলে নিতে পারো।
ওসব পাঠিয়ে দিও সমগ্র দুনিয়ায়। বিচারকের কাছে আর—
মানুষের বিবেকের কাছে,
পাঠিয়ো তাদের কাছে—যারা গণ্যমান্য আর উদারমনা।
দুনিয়াজোড়া তাদের অপরাধের বোঝা বহন করতে দিও,
আর এটা তো পবিত্র হৃদয়।
সন্তানাদি কিংবা ইতিহাসের বোঝাও যেন তারা কাঁধে নেয়,
এ হৃদয় বিনষ্ট অথচ নিষ্পাপ খুব,
শান্তিকে বাধাগ্রস্ত করে এ আত্মা ভুগেছে ভীষণ।
সাগরের জন্য গীতিকাব্য
ইবরাহিম আল রুবাইশ
(১৯৮৯ সালের ৭ জুলাই সৌদি আরবে জন্ম। তিনি ছিলেন জাজিরাতুল আরবের আল কায়দা প্রধান।)
হে জলদি, আমার প্রিয়জনের খবর বলো,
অবিশ্বস্ত বন্ধনের জন্য নয়, আমরা পরস্পর যথেষ্ট বাধাহীন
প্রেয়সী আমার পরিবার নিয়ে এলো, তোমার অস্ত্রে ফুটছে ধ্বংস।
বিস্তৃত সৈকতে কেবল বিষাদ, বন্দিদশা, ব্যথা আর অবিচার
তোমার এমন তিক্ততা ধারণের ধৈর্য্য নেই তো আমার
দূরগামি যত কেউ তোমার, যেন মৃত্যুর মত স্থিরতা
এ নীরবতার ভেতর ভাঁজ করে রাখা ভীষণ কপটতা।
এমনই যদি হয়, নাবিক হত্যা করবে তোমাকে
নৌসেনার ঢেউয়ের তোড়ে মারবে তোমাকে
মৃদু, শ্রবণহীন, নির্বাক, উপেক্ষিত আর ক্ষুব্ধ তুফান—
তুমি করো হে ধারণ
বায়ু যদি ক্ষেপে যায়, অবিচার আসবেই
বায়ু যদি থেমে যায়, তবু প্রবাহ থাকবেই।
হে সমুদ্র, আমাদের শিকল কি তেমাকে পীড়া দেয়?
এটা তো তোমার দুয়ারে নিত্য আসে আর যায়
আমাদের পাপের কথা জানো কি?
আমাদের এ দুর্দশার কারণটা বুঝো কি?
সমুদ্র, আমাদের বন্দিত্ব নিয়ে মশকরা করছো বুঝি?
শত্রুদের সাথে করছো মিত্রতা আর—
আমাদের দিচ্ছো শত্রুর মতো পাহারা।
ওই পাথরগুলোকে বলবে নাকি আমাদের অপরাধ?
কিউবা নয়, তোমার জন্য রয়েছে সেখানকার অনূদিত কাহিনী
তিনটি বছর ধরে তুমি পাশাপাশি, কী এমন পেয়েছো?
সাগরের কাব্যতরী? জ্বলন্ত আত্মায় পুতে রাখা জ্বলন্ত কবর?
কবির শব্দাবলীই আমাদের ক্ষমতা
তার চরণগুলো করে আমাদের বেদনার্ত আত্মার দাসত্ব।
শামিম শেখের অনুবাদ
শেকলের বন্দিত্ব
সামি আল হাজ্ব
(সুদানে ১৯৬৯ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে জন্ম। আফগানিস্তানে আল জাজিরার ফটো সাংবাদিক। ১৫ ডিসেম্বর, ২০০১ সালে পাকিস্তানে গ্রেফতার। গোয়েন্তানামোবে থেকে ২০০৮ সালের ১ মে মুক্তি পান।)
যখন গাছের ডালে পায়রার গুঞ্জন শুনি
চোখের উষ্ণ জল আমার মুখ ঢেকে ফেলে
স্কাইলার্ক যখন কিচিরমিচির করে
আমার চিন্তা আমার সন্তানের জন্য কম্পোজ করে একটি বার্তা—
মুহাম্মদ! আমি বন্দী
এই নিরাশ সময়ে আমার জন্য শুধু আল্লাহর করুণা অপেক্ষমাণ
অত্যাচারীরা আমার বন্দিত্ব নিয়ে খেলা করছে
অথচ বিশ্বে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে স্বাধীনভাবে।
তারা আমাকে প্রস্তাব দেয় স্বজাতির সাথে গুপ্তচরবৃত্তির
এ নাকি আমার জন্য কল্যাণ
তারা আমাকে প্রস্তাব দেয় ডলার ও বাসস্থানের
এবং শান্তির সন্ধানে যেখানে ইচ্ছে যাওয়ার স্বাধীনতার।
এ প্রস্তাব বিদ্যুৎ চমকের মতো আমাকে আকর্ষণ করে
কিন্তু আমি জানি,
এ প্রস্তাব একটি বুভুক্ষু সরীসৃপ
যে তার মুখে বহন করে প্রবঞ্চনার গরল
তাদের রয়েছে প্রকাশের অধিকার
এবং স্বাধীনতার অভিজাত ও নন্দিত স্মৃতিস্তম্ভ।
কিন্তু আমি তাদের কাছে বলতে চাই
ভাস্কর্যই প্রকৃত বিচারক নয়,
আমেরিকা, এতিমদের পিঠে তুমি চড়ে বসেছো
তাদের সন্ত্রাসী বানাচ্ছো প্রতিনিয়ত
সাবধান বুশ,
এ পৃথিবীই কেবল মিথ্যাবাদী অহংকারীকে সমর্থন দেয়।
আমি আল্লাহর কাছে প্রেরণ করি ফরিয়াদ এবং আমি অত্যাচারিত স্বদেশে ফেরার জন্য কাতর।
মুহাম্মদ! আমায় ভুলো না।
তোমার পিতার খোদাভীরু আদর্শকে সমর্থন করো
আমাকে অপমানিত করেছে জিঞ্জিরের বন্দিত্ব
চলো এখন বিপ্লবে আমি পংক্তি সাজাই
এই শিকল পড়া বন্দিত্ব
এই অন্ধকার রাত্রী
এই নিপীড়িত চোখের জলে ডুবে
আমি কিভাবে রচনা করবো কবিতা!
আমার আত্মা উন্মুক্ত সমুদ্রের মতো যন্ত্রণায় অস্থির
প্রতিশোধে হিংস্র
আমি নির্বাসিত
কিন্তু আমাকে নির্বাসন দিয়েছে সন্ত্রাস
আমার চেতনা আমাকে মোহাবিষ্ট করে?
প্রভু, সন্তানের সাথে আমার সাক্ষাৎ দাও
প্রভু, সত্যের জন্য বরাদ্দ করো সাফল্য।
