
ইমরান আবদুল্লাহ
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের নেতৃত্বে সংগৃহীত ‘এক লক্ষ মুফতি, উলামা ও আইম্মার দস্তখতসম্বলিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ-বিরোধী মানবকল্যাণে শান্তির ফতোয়া’ প্রকাশের তিন বছর পার হলেও ধর্মীয় অঙ্গনে এই ফতোয়া নিয়ে এখনও বড় ধরনের আপত্তি ও বিতর্ক থেকে গেছে। ‘শান্তি’র এ ‘ফতোয়া’ নিয়ে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বিগত তিন বছরে ইসলামের ঘোরতর শত্রু এবং মুসলিম-নিপীড়ক রাষ্ট্রপ্রধানদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে বাহবা কুড়িয়ে নিয়ে আসলেও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাদী ইসলামি ঘরানার সাধারণ শ্রেণি যেমন এই ফতোয়াকে সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি, তেম্নি ইসলাম বিষয়ে পণ্ডিতজনদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও এটাকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে মেনে নেননি।
প্রথমত, ফতোয়ায় ১ লক্ষ মুফতি, আলেম ও মসজিদের ইমামের সাক্ষরের দাবি করা হলেও ব্যাপকভাবে অভিযোগ আছে, সাক্ষরকারীদের মধ্য থেকে সিংহভাগেরই ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দানের যোগ্যতা ছিল না। অনেকে এমন আছেন, যাঁদের কাছ থেকে ফতোয়ার বিষয়বস্তু উল্লেখ ছাড়াই সাক্ষর গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, ফতোয়াটিতে দেশের আলেমসমাজের বড় একটি অংশেরই কোন মতামত গ্রহণ করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, ফতোয়াটা এমন আঙ্গিকে করা হয়েছে, যার দ্বারা ইসলামের অন্যতম ফরজ বিধান জিহাদকে খাটো ও গুরুত্বহীনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে—এমনই মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ আলেম। ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’—কথাটির যে অপব্যবহার পশ্চিমা বিশ্ব করে থাকে, পশ্চিমের ‘গুড মুসলিম’ প্রকল্পের যা অন্যতম অংশ, তা এই ফতোয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। ইসলামে সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই, শান্তিপ্রতিষ্ঠাই ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকলে এর সুরক্ষার জন্য এবং কাফেরদের দ্বারা মুসলমানেরা নিপীড়িত হলে তা প্রতিরোধের জন্য জিহাদ করাটাও সমানভাবে সত্য, বরং অপরিহার্য। এমনকি, ইসলামের দেফায়ি বা প্রতিরক্ষামূলক জিহাদের নীতি, যা কেবল ইসলামের নীতিই নয়, বরং যেকোন জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত, সেটিও এই ফতোয়ায় ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলেই গন্য হয়েছে। ইরাকে আমেরিকা যা করেছে, ফিলিস্তিনে ইজরাইল যা করছে, কাশ্মীরে ভারত যা করছে—এর প্রেক্ষিতে সেই অঞ্চলগুলি এবং বিশ্ব মুসলিমের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে বা হওয়া উচিত, সে বিষয়ে ফতোয়াটি কিছুই বলে না।
সন্ত্রাসবাদ কোন মনোলিথিক ব্যাপার না। এমনকি ফরাশি বিপ্লবের নেতা রবসপিয়ের বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসহীন নৈতিকতা মূলত অকার্যকর ব্যাপার।’ নৈতিকতা বা শান্তির সাথে প্রতিরোধ এবং সংগ্রামের যে সুষম সংযোগ ইসলামে আছে, সে ব্যাপারে ফতোয়াটি কোন দিক নির্দেশনা দেয় না। মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ ইসলামের শান্তির দিকটা তুলে ধরতে গিয়ে দ্বিতীয় এই দিকটা, যেটা ইসলাম ক্ষেত্রবিশেষে অপরিহার্য করে দিয়েছে, সেটাকে ছোট করে ফেলেছেন। মোটকথা ভারসাম্য রক্ষা করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। ফলত তাঁর উদ্যোগে প্রকাশিত জঙ্গিবাদ-বিরোধী ফতোয়াটি ওলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
তৃতীয়ত, বিশেষজ্ঞ আলেমগণ মনে করেন, ধর্মীয় কোনো বিষয়ে যোগ্যতার বাছবিচার না করে গণহারে মতামত গ্রহণ করা শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে অনুচিত। ধর্মীয় বিষয়ে বা ফিকহি কোনো বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণ জ্ঞান না রেখে সে ব্যাপারে ফতোয়া দেওয়া শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম।
চতুর্থত, মাওলানা মাসউদের আলোচিত এ ফতোয়ার একটি অংশে মুজাহিদদের বহুল প্রচলিত আত্মঘাতী বা ফেদায়ি হামলাকে স্পষ্টভাবে হারাম বলা হয়েছে। এ বিষয়ে সিলেটের কাজির বাজার মাদরাসার প্রধান মুফতী মাওলানা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে বা নিরপরাধ মানুষের অবস্থানস্থলে আত্মঘাতী যে হামলাগুলো হয়েছে বা হয়, সেগুলো হারাম, বরং এই পুরো প্রক্রিয়াটাই তো হারাম। মানে, ইসলামের নামে যে সন্ত্রাসী হামলাগুলো হয়, সেগুলোর কথা বলছি। এই হামলাগুলো আত্মঘাতী হোক বা এম্নিতেই হোক, হারাম। এগুলো কোনোভাবেই জিহাদের পর্যায়ে পড়ে না, বরং জিহাদকে এর দ্বারা কলুষিত করা হয়। তবে যে সমস্ত এলাকায় জিহাদ ফরজ হয়ে আছে, এবং মুজাহিদিনরা যে সমস্ত অঞ্চলে কাফেরদের মুকাবেলা করছেন, সেই জায়গাগুলোতে কোনোভাবেই যদি কাফেরকে দমানো না যায়, আর কোনো মুজাহিদ যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে বলেন, আমার প্রাণের বিনিময়ে হলেও শত্রুদের বড় একটা ক্ষতি সাধন করব, তাহলে এক্ষেত্রে আত্মঘাতী হামলা, মুজাহিদিনরা যেটাকে ফেদায়ি আক্রমণ বা ইসতেশহাদি হামলা বলে থাকেন, এটাকে হারাম বলা যাবে না। কেননা ইসলামের ইতিহাসে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে।
পঞ্চমত, মাওলানা মাসউদের তৈরি এই শান্তির ফতোয়া রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন অনেকেই। মাওলানা মাসউদ তার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রায়ই ‘জঙ্গিবাদ’র অভিযোগ আনেন, ‘পাকিস্তানপন্থা’র অভিযোগ আনেন। ফলে, তার উদ্যোগে তৈরি এই ফতোয়ার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়েও অনেকের মধ্যে দ্বিধা রয়ে গেছে।
ষষ্ঠত, মাওলানা মাসঊদের গৃহীত শান্তির ফতোয়াটিতে, জিহাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্ব ও আমেরিকার গত এক দশকে তৈরি করা সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞাটিকে কোন সমালোচনা-পর্যালোচনা ছাড়াই ধ্রুব বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। ফতোয়াটি পড়লে দেখা যায়, ফতোয়াটিতে যে প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়া হয়েছে, সেগুলো মূলত পরিপ্রেক্ষিতহীন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে লড়াইরত বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীর মোটিফ, সংগ্রামের ধরণ বা কারণ এক নয়। কিন্তু, ফতোয়াটিতে পশ্চিমা স্টাইলে, মুসলিমদের দ্বারা সংঘটিত যেকোন ধরণের সশস্ত্র আন্দোলনকেই বাছবিচারহীনভাবে সন্ত্রাসবাদ বলা হয়েছে। বা সন্ত্রাসবাদ যে কোন লিনিয়ার ব্যাপার নয়, কোনটি সন্ত্রাসবাদ কোনটি সংগ্রাম, কোনটি ন্যায্য কোনটি অন্যায্য, সন্ত্রাসবাদ কোন ধর্মপ্রধান ব্যাপার কিনা, কেবল মুসলিমরাই সন্ত্রাস করে কিনা, আজকের মুসলিম বিশ্বে যে অস্থিরতা বিরাজমান তার কারণ কী, কীভাবে সন্ত্রাসবাদের উত্থান—এসব প্রশ্ন নিয়ে ফতোয়াটি আশ্চর্যরকম নীরব। বরং, ফতোয়ার উদ্যোক্তা ফরিদউদ্দীন মাসঊদকে দেখা যায় আমেরিকার প্রেসিডেন্টের রাজ মেহমান হতে। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম বিশ্বে এই ফতোয়ার কোন প্রভাব পড়েনি।
‘সন্ত্রাসবাদ’ মুসলমানদের আবিষ্কার নয়। ফরাশি বিপ্লবের অন্যতম নায়ক রবস্পিয়েরই প্রথম ‘সন্ত্রাস’ চালু করেছিলেন ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠার জন্যে। পশ্চিমা কলোনিয়ালিজম ভেঙে পড়া এবং নিও-কলোনিয়াল যুগের সূচনা, স্নায়ুযুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদের প্রতি আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী লোভ এবং নাইন ইলেভেনের পরে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে পশ্চিমের ঘোষিত ক্রুসেড—এসবই মুসলিম বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, ধ্বংস করে দিয়েছে দেশের পর দেশ, লক্ষ-কোটি মানুশ মারা গেছে সাম্রাজ্যবাদের নতুন আগ্রাসনে। এর বিরুদ্ধে মুসলম বিশ্বে স্বতস্ফুর্ত বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই অবস্থাটিরই সুযোগ নিয়েছে অনেক অপরিণামদর্শী চরমপন্থী, তারা ঘোলাজলে মাছ শিকার করতে চেয়েছে, কেউ কেউ ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আর এদের শক্তিশালী করার পেছনেও মার্কিনিদের প্রত্যক্ষ মদদ আজ আর লুকানো কোন ব্যাপার নয়৷ ফলে, মুসলিম বিশ্বের এই সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী ডকট্রিনকে আমলে না নিয়ে, পশ্চিমা সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদকে সংজ্ঞায়িত করে একপেশে ‘গুড মুসলিম’টাইপের ফতোয়া দিলে, মুসলিম বিশ্বে তা গ্রহনযোগ্য হওয়ার কথা নয়। বিপুল প্রচার-প্রচারণা ও ঢাকঢোল সত্ত্বেও, সম্ভবত একারণেই ফরিদউদ্দীন মাসঊদের তত্ত্বাবধানে রচিত শান্তির ফতোয়াটি পশ্চিমেরই কেবল মন যোগাতে পেরেছে, মুসলিম জনপদগুলোতে এর কোন আবেদন তৈরি হয়নি। কারণ এই ফতোয়া পশ্চিমের পক্ষ নিয়ে উপেক্ষা করেছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার—মুসলিম বিশ্বের শতাব্দীকালেরও অধিক সময়ের যন্ত্রণা, কষ্ট, কুরবানি ও সংগ্রামের স্পর্শকাতর ইতিহাস।
