সন্ত্রাস ধারণার উৎপত্তি, বিকাশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর ব্যবহার

তুহিন খান

একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর সবচে আলোচিত বিষয়গুলির একটি হল ‘টেররিজম’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’। ‘সন্ত্রাসবাদ’-কে ‘জঙ্গিবাদ’-ও বলা হয়ে থাকে। নাইন ইলেভেনের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘অনন্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন, যাকে বুশ ‘ক্রুসেড’ নামেও আখ্যায়িত করেন। একবিংশ শতকে আমেরিকার ঘোষিত এই নয়া ক্রুসেড পৃথিবীর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে নতুন পথে প্রবাহিত করে। কিন্তু, কী এই ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘জঙ্গিবাদ’? কাকে বলে ‘জঙ্গিবাদ’? আমেরিকা ও ইওরোপের সন্ত্রাসবিরোধী অনন্ত যুদ্ধের ‘সন্ত্রাসী’রা আসলে কারা? কীভাবে গঠিত হল সন্ত্রাসবাদের পশ্চিমা ধারণা ও মিথ? কীভাবে এর ব্যবহার হল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে?

সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ : উৎপত্তি ও বিকাশ

‘সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘জঙ্গিবাদ’ কী, এ নিয়ে জাতিসংঘ কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে। জার্মানভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডয়েচে ভ্যালের একটি প্রতিবেদনে এর কারণ হিশেবে বলা হয়েছে–‘সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ ব্যাপারে কোন অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।’ দেখা যাচ্ছে, কোনটি ‘টেররিজম’ আর কোনটি নয়, এ নিয়ে কোন পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে পারেনি খোদ জাতিসংঘই। ফলে, ইওরোপের নির্ধারিত ও নির্মাণকৃত সন্ত্রাসবাদের ধারণাই সারা বিশ্বে আধিপত্যশীল চিন্তা হিশেবে এই শতকের শুরুভাগে প্রচারিত হয়েছে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ‘টেরোরিজম’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ফ্রেঞ্চ দার্শনিক ফ্রাঙ্কোস নোয়েল বাবেউফ, ১৭৯৪ সালে। ম্যাক্সিমিলিয়ান রবস্পিয়েরের ‘জ্যাকোবিন’ রেজিমের সমালোচনায় তিনি শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। ফরাশি বিপ্লবের পর প্রথম ফ্রেঞ্চ রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পরে, ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ পর্যন্ত যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ফ্রান্সে সংঘটিত হয়, ইতিহাসে তা ‘রেইন অফ টেরর’ বা ‘দ্য টেরর’ নামে পরিচিত। সেসময় অবশ্য শব্দটা পজিটিভ অর্থেই ব্যবহার করেছিল নবগঠিত ফ্রান্সের বিপ্লবী শাসকগোষ্ঠী। এখন ‘টেরোরিজম’কে সাধারণত সরকার বা প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের বিদ্রোহ হিশেবে দেখা হয়, কিন্তু গোড়ায় ব্যাপারটি এমন ছিল না। তখন বরং, সরকারকর্তৃক প্রতিবিপ্লবী, বিদ্রোহী বা ফ্রান্সের নয়া শাসকরা যাদের ‘জনতার শত্রু’ বলে ঘোষোণা দিত, তাদের ‘জনতার আদালতে’ বিচারকেই শাসকগোষ্ঠী ‘টেরোর’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে ফরাশি বিপ্লবের পরে গঠিত প্রথম সরকার ‘ন্যাশনাল কনভেনশন’-এর অন্যতম প্রধান সদস্য বার্ট্রাণ্ড বারেরের উক্তিটি বেশ বিখ্যাত : লেটস টেরর বি দ্য অর্ডার অফ দ্য ডে! মজার ব্যাপার, টেরোরিজমের প্রাথমিক উৎপত্তিকালীন ধারণার সাথে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা, ইত্যাদি পশ্চিমা ধারণার সম্পর্ক বেশ নিবিড়। ফরাশি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নায়ক ম্যাক্সিমিলিয়েন রবস্পিয়ের বিশ্বাস করতেন, জনগণতন্ত্রের যেকোন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো ‘নৈতিকতা’, কিন্তু ‘নৈতিকতা’কে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই ‘টেরর’ জরুরি। এ ব্যাপারে তার বিখ্যাত উক্তি হলো : ‘নীতিহীন সন্ত্রাস শয়তানের কাজ, আর সন্ত্রাসহীন নীতি হল অকাজ।…সন্ত্রাস মূলত নৈতিকতার জন্মদান।’

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, সন্ত্রাসবাদের এই পজেটিভ সংজ্ঞা বিদ্রোহ অর্থে পরিবর্তিত হয়। ১৮৮০-৯০-এ, তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আর্মেনিয়ানরা এই সন্ত্রাসবাদী পন্থায়ই বিদ্রোহ করেছিলো। একই সময়ে, ‘ইনার মেসিডোনিয়ান রেভুলুশনারি অর্গানাইজেশন’ (IMRO), মেসিডোনিয়ান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এই সন্ত্রাসবাদী বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে, বিশ শতকের ত্রিশের দশকে, সন্ত্রাসবাদের এই সংজ্ঞা আরেকবার পরিবর্তিত হয়। এসময়, সন্ত্রাসবাদের আগের অর্থ, স্টেট বা গভমেন্টের বিরুদ্ধে অত্যাচারিতদের বিদ্রোহ, পালটে যায়, এবং কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র বা শাসককর্তৃক জনগণের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনকেই এসময় ‘টেরোরিজম’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। হিটলারের নাজিবাহিনী বা মুসোলিনির ফ্যাশিস্ত মতবাদ অথবা রাশিয়ায় স্টালিনের শাসনকে একারণেই ‘টেরোরিজম’ আখ্যা দেয়া হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, উপনিবেশিত ভূখণ্ডগুলিতে নয়া জাগরণের প্রেক্ষিতে, সন্ত্রাসবাদের অর্থ আরেকবার পরিবর্তিত হয়। এসময়, এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জাতিবাদের উন্মেষ ঘটে, এবং কলোনিয়াল শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও তৎপরতা তৈরি হয়। একে ইওরোপ তখন ‘টেরোরিজম’ নামে অভিহিত করে। অবশ্য, বিশ্বব্যাপী কলোনিয়ালিজমের পতনের পরে, এই বিদ্রোহীদের আর টেরোরিস্ট বলা সম্ভব হয় নাই। কারণ, ততদিনে অনেক দেশই স্বাধীন হয়ে গেছে এবং এই ‘টেরোরিস্ট’রা বীরের মর্যাদা পেয়েছে। তাদের নতুন নাম হয়েছে ‘ফ্রিডম ফাইটার’। এ ব্যাপারে পিএলও-র চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এক ভাষণে বলেন, ‘সন্ত্রাসী আর বিদ্রোহীর পার্থক্য হলো, তাদের কাজের কারণ ও লক্ষ্য আলাদা। যে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায় এবং দখলদার ও উপনিবেশের হাত থেকে নিজ জাতিকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করে, তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলা যায় না।’ কলোনিয়ালিজমের পতনের পরেও, নিও কলোনিয়াল প্রেক্ষিতে, স্বাধীন দেশগুলোতে বিভিন্ন আন্তঃজাতিবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হয়, যেগুলোকে ‘সন্ত্রাস’ নামে নামকরণ করা হয়। এছাড়া, এসময়, সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরে, তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন হওয়া নানা দেশে কম্যুনিস্ট বিপ্লবের লক্ষ্যে নানা সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি হয়। এদেরকেও ‘সন্ত্রাসী’ হিশেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

ষাট-সত্তরের দশক পর্যন্ত ‘টেরোরিজম’ এই অর্থেই চালু থাকে। সত্তরের দশককে চিহ্নিত করা হয় ‘কোল্ড ওয়র’ বা ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’র কাল হিশেবে। পশ্চিমা বিশ্ব এসময় সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন কম্যুনিস্ট ব্লকের সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক–নানারকম স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এসময় ‘টেরোরিজম’ শব্দটি আগের চাইতে অনেক বৃহত্তর অর্থে ও উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়। আশির দশকের শুরুতে আমেরিকার রিগ্যান প্রশাসন কম্যুনিস্টবিরোধী কৌশলের অংশ হিশেবে ‘টেরোরিজম’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা শুরু করে। বিশ্বব্যাপী ছোট ছোট বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলনগুলোকে আমেরিকা ও পশ্চিমা উদারনীতিবাদী সোসাইটির বিরুদ্ধে কম্যুনিস্ট ব্লকের বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র হিশেবে প্রচার করা হয়। সেসময় ক্লেয়ার স্টারলিঙ্গয়ের ‘দ্য টেরর নেটওয়ার্ক’র মত বইগুলি বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলনগুলোকে ক্রেমলিনের চক্রান্ত এবং পশ্চিমের ‘মুক্ত বিশ্বব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করে। এসময় টেরোরিজমকে মূলত কম্যুনিস্টদের চক্রান্ত হিশেবে নতুন অর্থ দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে বার্মায় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে চালানো বোমা হামলায় ২১ জন নিহত হয়। এই ঘটনায় আমেরিকা উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করে, এবং ‘রাষ্ট্রকর্তৃক পরিচালিত সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির উত্থান ঘটে। শুরু হয় টেরোরিজমের আদর্শিক উদ্দেশ্য তৈরি ও বিশ্বায়ন, টেরোরিজমকে পশ্চিমের বিরুদ্ধে ‘অন্য’দের চক্রান্ত হিশেবে চিত্রায়িত করার যুগের সূচনা হয়।

জিহাদ ও টেরোরিজম

গত শতকের শুরুর দিকে তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং মুসলমানদের দীর্ঘকালব্যাপী বিশ্ব শাসনের অফিশিয়াল সমাপ্তি ঘটে। এসময় বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশগুলোর বেশিরভাগই ইওরোপের কলোনি ছিল, এবং তুরস্কের খেলাফত বিলুপ্তির প্রেক্ষাপটেই মূলত, মুসলিম দেশগুলোয় কলোনির বিরুদ্ধে জাতিবাদী বিদ্রোহের সূচনা হয়। গোটা আরব অঞ্চল এসময় আরব জাতিবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পশ্চিমা কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে লিপ্ত হয়। এমনকি ভারত উপমহাদেশেও মুসলমানরা প্রথম ব্যাপকভাবে জাতিবাদী স্বরাজ আন্দোলনে যোগ দেয় ‘খেলাফত আন্দোলনে’র মধ্য দিয়েই।

এসময় মুসলিম বিশ্বের ক্রমাগত অবনতি, বিশ্বের পরাশক্তির আসন থেকে ছিটকে পড়া এবং পশ্চিমের বস্তুবাদী দর্শনের আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে মুসলিম বিশ্বে দুই ধরণের চিন্তা গড়ে ওঠে। মুসলিম চিন্তকদের একটি দল পশ্চিমা দর্শন, সেক্যুলারিজম, জাতিবাদ, নেশন স্টেট ইত্যাদিকে মেনে নিয়ে, এগুলোকে ইসলামি পন্থায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তারা মুসলমানদের এগিয়ে যাবার জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষাকে অপরিহার্য বলে মনে করতেন। পশ্চিমা দর্শন ও চিন্তাকে গ্রহণ করে নেওয়াকেই তারা মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর ভাবতেন। অপর দলটি মুসলমানদের এই পতনের কারণ হিশেবে কোরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত আদর্শ থেকে সরে যাওয়াকেই দায়ী করেন এবং পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী দর্শনের বিরুদ্ধে ইসলামি মূল্যবোধ ও আদর্শের পুনর্জাগরণ কামনা করেন। এথনিক জাতিবাদের বিরুদ্ধে এসময় বিশ্বব্যাপী ইসলামি জাতিবাদ-ও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চিন্তার এই ধারাটিকে বলা হয় ‘ইসলামিজম’ বা ‘ইসলামপন্থা’।

চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশকের মধ্যেই, গত শতকে, এশিয়া, আফ্রিকা ও মিডল ইস্টের ইওরোপিয়ান মুসলিম কলোনিগুলো স্বাধীন হয়ে যায়। কিন্তু, স্বাধীন এই রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা চলে যায় মূলত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত জাতিবাদী সেক্যুলার গ্রুপটির হাতে। ফলে, নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেও, ইসলামপন্থীদের সাথে সেক্যুলার গভমেন্টের নানারকম টানাপোড়েন চলতে থাকে। ইসলামিস্টদের মধ্যেও দুই ধরণের চিন্তা জারি ছিল। ইসলামিস্টদের বড় একটা অংশ মনে করতেন, নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, গণমুখী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই এই সেক্যুলার পশ্চিমপন্থী শাসকদের মোকাবেলা করতে হবে। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড বা পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামি ছিল এই ঘরানার দল। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করতেন, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক পন্থায় এই শাসকদের হটানো এবং পশ্চিমের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তারা সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন। যদিও ষাটের দশক পর্যন্তও এই চিন্তার লোকেরা মুসলিম বিশ্বে ছিলেন সংখ্যালঘু, কিন্তু সত্তরের দশক থেকে বিশ্বব্যাপী পরিবর্তিত হতে থাকা ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে এই প্রবণতাটি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। এদেরকেই বলা হয় ‘জিহাদিস্ট’।

গত শতকের পঞ্চাশের দশক নাগাদ মুসলিম দেশগুলোতে জাতিবাদী সেক্যুলার ধারাটি ক্ষমতায় আসে এবং ক্ষমতা বেশ শক্তপোক্ত করে তোলে। এসময় বিভিন্ন মুসলিম দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জনগণের ম্যাণ্ডেট ছাড়াই বিভিন্ন সেনাশাসক ও স্বৈরশাসকের উত্থান ঘটে এবং পশ্চিমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এই জাতিবাদী গোষ্ঠীটি মূলত আমেরিকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। মুসলিম বিশ্বের এই শাসকদের অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতারোহণ ও জনগণের উপর এবং বিশেষত ইসলামিস্টদের উপর যাবতীয় দমন-পীড়ন সত্ত্বেও আমেরিকা এদের ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করে এবং বিপরীতে এদের মাধ্যমে ঐ দেশগুলোতে আমেরিকান স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা চালায়। কোথাও কোথাও আমেরিকা পুরোপুরি সফল হয়, কোথাও জাতিবাদী নেতৃত্বের দৃঢ়তার কারণে কিছুটা সফল হয়; কিন্তু এই প্রক্রিয়ার ফলে গোটা মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার লিবারাল ডেমোক্রেসির মুখোশ খুলে যায় এবং মুসলিম বিশ্বের সেক্যুলার গোষ্ঠীটির সাথে ইসলামপন্থীদের বিরোধ ক্রমেই তীব্রতর হয়ে উঠতে থাকে। এই পর্যায়ে, ষাটের দশক থেকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যায়, যা মুসলিম বিশ্বের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ইসলামপন্থীদের গ্লোবাল জিহাদিস্ট ধারাটিকে বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

প্রথমত, ১৯৬৭ সালের আরব-ইজরাইল যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে ইজরাইলের জন্মে পশ্চিমা বিশ্ব ও আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদ মুসলমানদের ক্ষুব্ধ করে তোলে, পশ্চিমা গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিগুলি ক্রমেই খেলো হতে থাকে তাদের কাছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সম্মিলিত আরব শক্তি ইজরাইলের কাছে পরাজিত হয়, এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইজরাইল স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসে। এসময় আরবের জাতিবাদী পশ্চিমপন্থী নেতৃত্বের প্রতি মুসলিম বিশ্বের জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলন বিশ্বের সকল মুসলমানের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ফিলিস্তিনেই মুসলমানদের প্রথম কেবলা হিশেবে পরিচিত বায়তুল মাকদিস অবস্থিত। ফলে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামটি একটি ধর্মীয় রূপ পায়। আরব-ইজরাইল যুদ্ধে আরবের জাতিবাদী নেতৃত্বের পরাজয়ের ফলে, সেক্যুলার জাতিবাদী আন্দোলনের প্রতি আস্থা হারানো মুসলমানরা ফিলিস্তিন উদ্ধারের জন্য সশস্ত্রপন্থাকেই আদর্শ মনে করেন। এরই প্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনের পিএলও-র পরিবর্তে হামাস মুসলিম বিশ্বে অধিকতর জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, ১৯৭৯ সালের ইরান রেভ্যুলুশন। ইরানে আমেরিকার তাবেদার রেজা শাহ পাহলবির পতন ঘটিয়ে ইসলামি বিপ্লব করেন আয়াতুল্লাহ খোমিনি। এই বিপ্লবে ইরানের বামপন্থী সংগঠনগুলো বেশ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, রুশ ব্লকের সাথে ইরানের এক ধরণের সখ্য তৈরি হয়। আমেরিকাবিরোধী, রুশের সাথে সখ্যের এই বিপ্লব শুরু থেকেই আমেরিকার রোষানলে পড়ে। ফলে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কোনঠাসা করতে নতুন স্ট্রাটেজি হাতে নেয় আমেরিকা। শিয়া-সুন্নি বিরোধের রাজনীতি এসময় মুসলিম বিশ্বে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি ইসলামের নেতৃত্ব সৌদি আরবের হাতেই ছিল তখন। ইরানের শিয়া বিপ্লবের বিরুদ্ধে এসময় আমেরিকা সৌদি আরবকে কাজে লাগায়। আশির দশকের শুরু থেকেই শিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে ‘সালাফি ইসলাম’ সৌদি সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এসময় ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রত্যক্ষ উস্কানিতে আরবের একাধিক দেশ বিভিন্নরকম সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, যার মধ্যে ইরাক-ইরান যুদ্ধ অন্যতম। ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, পশ্চিমা মদদে পরিচালিত এসব অভিযান সেসময় মুসলিম বিশ্বের বেশিরভাগ মানুশই ভালভাবে নেয় নাই। ইরানের শিয়াদের সাথে আকিদাগত বৈরিতা থাকলেও, ইসলামি বিশ্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবকামী নেতৃত্ব সেসময় ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানকে পশ্চিমা চাল হিশেবেই শনাক্ত করেছে। এসময় সৌদি স্পন্সরড ‘সালাফি ইসলাম’ বিভিন্ন মুসলিম দেশে প্রচারিত হয়, এবং জিহাদিস্টদের বর্তমান স্ট্রাকচার ও চিন্তাধারা তৈরিতে অনেকাংশে সহায়তা করে।

তৃতীয়ত, রুশ-আফগান যুদ্ধ। ইরান বিপ্লবের বছরই, সোভিয়েত রাশিয়া আফগানিস্তান আক্রমণ করে। ফিলিস্তিন-ইজরাইল যুদ্ধের পরে, এই যুদ্ধকেই মুসলিম বিশ্বে মুসলমানদের উপর নির্যাতনের বড় উদাহরণ হিশেবে দেখা হয়। আফগানিস্তানের স্বাধীনতাকামী মুজাহিদ গ্রুপগুলোকে এসময় আমেরিকা সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দেয়। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এসময় রুশ দখলদারিত্ব ও কম্যুনিজমের বিপক্ষে একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তান, সৌদি ও আমেরিকার সহায়তায় আফগান যুদ্ধে রাশিয়াকে নাকানিচুবানি খাওয়ায় আফগান মুজাহিদরা, কম্যুনিস্ট ব্লকের পতন ঘটে, সমাপ্তি ঘটে স্নায়ুযুদ্ধেরও। এতদিন সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদ বা মিলিট্যান্সি মূলত মুসলিম ভূখণ্ডে কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, দেশের স্বাধীনতা বা জাতিবাদী আন্দোলনের কৌশল ছিল। আন্দোলনপন্থী ইসলামিস্টরাও তাদের পলিটিকাল কর্মকাণ্ডকে জিহাদ মনে করতেন। কিন্তু রুশ-আফগান যুদ্ধের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা মুজাহিদ নেটওয়ার্ক এবং ওসামা বিন লাদেনের আল কায়েদা গঠনের মাধ্যমে শুরু হয় জিহাদিস্টদের নতুন যুগ–গ্লোবাল জিহাদিজম এবং আমেরিকান ও পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের যুগ।

মূলত এসব ঘটনার ভেতর দিয়েই মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিকভাবে ইসলামিজমের পাশাপাশি জিহাদিস্ট ধারাও গুরুত্বপূর্ণ হতে শুরু করে। সেক্যুলার জাতিবাদী ধারার সরকারগুলোর পশ্চিমের ক্রীড়নকের মত আচরণ এবং স্বজাতির মনোভাব বোঝার ব্যর্থতা ততদিনে প্রকাশ পেয়ে গেছে। ফলে, বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা নতুন নেতৃত্বের প্রতি ঝুঁকতে থাকেন। এক্ষেত্রে, আফগান যুদ্ধের সফলতা তাদের ব্যাপকভাবে প্রাণিত করে। নব্বইয়ের দশকে, তাই দেখা যায়, কাশ্মীরে সশস্ত্র ইসলামপন্থার উত্থান ঘটে। আফগান যুদ্ধের সফলতা দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে মার খেতে থাকা মুসলিম বিশ্বকে একটু চমকে দেয়। জিহাদিস্টরা বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

সন্ত্রাসবাদের নতুন সংজ্ঞা : বৈশ্বিক অনন্ত যুদ্ধ

এরপরেই আসে নাইন ইলেভেন। ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলা টেরোরিজমের অর্থ ও এর রাজনৈতিক মর্ম এবং ফলাফল, সম্ভবত চিরকালের জন্য বদলে দেয়। টুইন টাওয়ার হামলা তার যাবতীয় ষড়যন্ত্রতত্ত্বসহই, গোটা বিশ্বে এক নতুন যুদ্ধের সূচনা করে–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বের অনুসরণেই যেন, মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও পশ্চিমের নয়া ক্রুসেডের ঘোষোণা দেন। কম্যুনিস্ট ব্লকের পরিবর্তে এবার মুসলিম বিশ্ব হয়ে ওঠে পশ্চিমের প্রধান শত্রু।

এরপরের ঘটনা সকলেরই জানা। টেরোরিজম ও আল কায়েদা খোঁজার দোহাই দিয়ে একের পর এক মুসলিম দেশগুলো আক্রমণ করতে থাকে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। ইরাক ধ্বংস হয়ে যায়, লিবিয়া ধ্বংস হয়ে যায়। সিরিয়ায় জ্বলতে থাকে আগুন। আফগানিস্তান জড়িয়ে পড়ে প্রায় দুই দশকব্যাপী এক যুদ্ধে। বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের বিরুদ্ধে তৈরি করা হয় প্রবল ঘৃণা আর ভয়ের কালচার। মুসলমানদের যেকোন আন্দোলন বা স্বাধিকার সংগ্রাম, ধর্মচর্চা বা নিজস্ব কালচার পালনও ‘টেরোরিজম’ হিশেবে চিহ্নিত হয়। দেশে দেশে বিভিন্ন চিন্তার ইসলামিস্টদের ‘জঙ্গিবাদী’ বা ‘মৌলবাদী’ হিশেবে চিহ্নিত করা হয়, মুসলমানদের বর্বর, পশ্চাদপদ ও সভ্যতার জন্য হুমকি হিশাবে প্রচার করা হয়। বিভিন্ন দেশের জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়ে। জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের ধুয়া তুলে মুসলিম দেশগুলোর সেক্যুলার নেতৃত্ব একে অপরকে হারানোর রাজনৈতিক খেলায় মেতে ওঠে, দেশে দেশে তৈরি হয় বিভক্তি। জিহাদ আর জঙ্গিবাদের অজুহাতে এসময় পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে কত লাখ লাখ মানুশ হত্যা করা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নাই। জঙ্গিবাদের এই অস্ত্র তুলে দেওয়া হয় পৃথিবীর বিভিন্ন ইসলামবিদ্বেষী শাসকদের হাতেও। ইজরাইল হামাস ও হিজবুল্লাহকে জঙ্গি ঘোষণা দেয়, কিন্তু ইজরাইলকে কেউ জঙ্গি বা টেরোরিস্ট বলে না। ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তি কাশ্মীরের মুসলমানদের সংগ্রামকে ভারতের অন্য আরো প্রদেশের জাতিবাদী সশস্ত্র সংগ্রামের চাইতে ভিন্নভাবে দেখে, তাদের যেকোন ন্যায্য আন্দোলনের নাম হয় ‘জঙ্গিবাদ’। এই শতকের প্রথম দশকে, এভাবেই সন্ত্রাসবাদের আমেরিকান ও পশ্চিমা সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়, এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ হয়ে ওঠে প্রধাণত ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমের অনন্ত যুদ্ধ।

দ্বিতীয় দশকের এই সময়ে এসে, পশ্চিমে উগ্র ডানপন্থার জয়জয়কার। তৈরি হচ্ছে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী এক ভয়াবহ প্রজন্ম, যারা তাদের পূর্বসূরীদের মত লিবারাল ছদ্মবেশ ধরতে রাজি না। তারা সরাসরিই আক্রমণ করছে মুসলিমদের, আফ্রিকানদের, অভিবাসীদের। পশ্চিমের গত শতকে করা পাপের বোঝা চেপেছে এই প্রজন্মের উপরে, তাই তারা নিজেরাই ছুঁড়ে ফেলতে চাচ্ছেন পশ্চিমা নীতিবাদের খোলস। অন্যদিকে আরব বসন্তের ফলে, আরব বিশ্বে এসেছে ক্ষমতার পালাবদল। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে আরবের জনগণ, যার ফলও এসেছে হাতেনাতে। স্বৈরশাসকদের পতন ঘটেছে। কিন্তু আমেরিকার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে দেশগুলি একের পর এক জড়িয়ে পড়ছে গৃহযুদ্ধে। অন্যদিকে পশ্চিমের এই উগ্র ডানপন্থার ফলে, বিশ্বের সব অঞ্চলেই ধীরে ধীরে উগ্রবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতাপ বাড়ছে। এই সময়ে এসে, সন্ত্রাসবাদ বা টেরোরিজমের পশ্চিমে তৈরি মিথ ভেঙে পড়ছে। আফগানিস্তানে প্রায় দুই দশকের যুদ্ধের পর জয়ের পথে তালেবান, ফিলিস্তিন-কাশ্মীর এগিয়ে যাচ্ছে চূরান্ত পরিণতির দিকে। মুসলিম বিশ্ব একটা নতুন ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের যে মিথ তৈরি করে পশ্চিমা বিশ্ব মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল, সেই যুদ্ধের আগুন এখন পশ্চিমের নিজের ঘরেই জ্বলছে। ওয়র অন টেরর–পৃথিবীর রাজনীতি বদলে দেওয়া এই অনন্ত যুদ্ধের মাশুল সবপক্ষকেই সম্ভবত দিতে হবে, আরো দীর্ঘদিন।

আগের সংবাদলক্ষ আলেমের ফতোয়া : কেন সহিংসতা বন্ধে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে?
পরবর্তি সংবাদরাষ্ট্র বনাম ধর্ম : বৈধ ও অবৈধ সহিংসতা