
রাগিব রব্বানি
বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের ফলে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে জন্মহার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে স্বাধীনতার সময়ে যেখানে মাত্র ৮ শতাংশ দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের মাথায় সেই হার এখন দাঁড়িয়েছে ৬৩ শতাংশে। স্বাধীনতার সময়ে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারী গড়ে ছয়টির বেশি সন্তান জন্ম দিতেন। বর্তমানে সেই গড় দাঁড়িয়েছে ২টি বা তার সামান্য কিছু বেশিতে। অর্থাৎ তখন প্রজনন হার ছিল ৬ দশমিক চার, আর বর্তমানে ২ দশমিক শূন্য ৫। এটা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব।
বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ এই স্লোগান দিয়ে আশির দশক থেকে সারাদেশে ব্যাপকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রচারণা চালায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দেশি-বিদেশি একশ্রেণির এনজিও সংস্থা। ২০০৪ সালে স্লোগান পরিবর্তন করে নতুন স্লোগান যুগ করা হয়—’দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।’
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দেশে খাদ্য-বাসস্থান সংকট সৃষ্টির অজুহাতে গত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রচারণার ফলে এখন ব্যাপকভাবে মানুষ এই পদ্ধতি গ্রহণ করছে। আর অনিবার্য ও আশঙ্কাজনকভাবে কমছে জন্মের হার।
কী বলছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর?
জন্মহার কমে যাওয়ার এই বিষয়টায় সম্প্রতি টনক নড়েছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরেরও। এক সন্তান গ্রহণ নীতির আওতায় ২০০৪ সালে প্রবর্তিত ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ স্লোগান থেকে তারা এবার পুরনো স্লোগানে ফিরে যাচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে স্লোগান পরিবর্তনের একটি পরিপত্র জারি করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। পরিপত্রে ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’কে মূল স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলা হয়।
সরকারের জনসংখ্যানীতিতে এই পরিবর্তন বিষয়ে গত বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে সাংবাদিকদের কাছে সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ বা এক সন্তাননীতির অভিজ্ঞতাটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে খুব ভালো না। চীন ইতিমধ্যে একসন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, চীন, জাপান ও ইউরোপের কিছু দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এক সন্তানের পরিবারের শিশুরা একাকিত্বে ভোগে। এ ছাড়া আরও কিছু সামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে অনেক দেশেই যুব জনগোষ্ঠীর সংকট দেখা দিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ জনসংখ্যানীতিতে পরিবর্তন এনেছে।
তবে জনসংখ্যানীতিতে সরকারের এই পরিবর্তন (দুই সন্তাননীতিতে ফিরে যাওয়া) জন্মহারের আশঙ্কাজনক কমতি কতটা ঠেকাতে পারবে তা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, ইসলামের দৃষ্টিকোণ
প্রসঙ্গত, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সেক্যুলারদের আবিস্কৃত এবং ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটা বিষয়৷ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে কম সন্তান গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে, কিন্তু ইসলাম সাময়িক জরুরত কিংবা অসুস্থতার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণে বাধা না দিলেও সাধারণভাবে অধিক সন্তান গ্রহণে উৎসাহ দেয়। আবু দাউদ ও সহিহ ইবনে হিব্বানের হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি একজন সম্ভ্রান্ত বংশের ধনী নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু তার সন্তান হয় না। আমি কি তাকে বিয়ে করব?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি দ্বিতীয়বার এলো, নবিজি দ্বিতীয়বারেও নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার আসল, তৃতীয়বারেও তাকে নিষেধ করলেন। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা অধিক ভালোবাসাপরায়ণ ও অধিক সন্তান জন্মদানকারিনী নারীকে বিয়ে করো। কেননা, অবশ্যই আমি তোমাদের আধিক্য নিয়ে (কেয়ামত দিবসে) অন্যান্য উম্মতের সাথে গর্ব করব। উক্ত হাদিসের ভাষ্য স্পষ্ট। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম অধিক সন্তান গ্রহণের ব্যাপারে সরাসরি উদ্বুদ্ধ করেছেন।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি একদিকে যেমন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, অপরদিকে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। চীনসহ বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে তারা নতুনভাবে চিন্তা করছে। এই পদ্ধতির প্রভাব যেভাবে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষ যে হারে এটাকে গ্রহণ করছে, তা কমানো না গেলে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা খুব নিকটেই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
