
রাগিব রব্বানি
বৃহত্তর ময়মনসিংহের ওলামায়ে কেরামের স্বনামখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ইত্তেফাকুল উলামার তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি একটি শিক্ষাবোর্ড গঠিত হয়েছে। ইত্তেফাকুল উলামা দীর্ঘদিন ধরে বৃহত্তর ময়মনসিংহের জনসাধারণের ধর্মীয় চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। পাশাপাশি মাদরাসা-শিক্ষা ক্ষেত্রেও রেখেছে বিশেষ অবদান। বিগত ২৩ বছর ধরে সংগঠনটির উদ্যোগে ময়মনসিংহ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদরাসার মিজান ও হেদায়াতুন্নাহু জামাতের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতি বছর বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করে আসছে। বিগত শিক্ষাবছর প্রায় দেড়হাজার ছাত্র বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
এরই ধারাবাহিতায় মাদরাসা-শিক্ষা-ব্যবস্থার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গত ২৫ মে সংগঠনটির তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় ইত্তেফাকুল মাদারিসিল কাওমিয়্যাহ নামক নতুন শিক্ষাবোর্ড। ময়মনসিংহের বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আবদুর রহমান হাফেজ্জীকে চেয়ারম্যান, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদীকে কো-চেয়ারম্যান এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে মহাসচিব বানিয়ে ইতিমধ্যেই পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেছে শিক্ষাবোর্ডটি। চলতি শিক্ষাবর্ষের সমাপণী পরীক্ষা বোর্ডের অধীনে গ্রহণ করতে জোর তৎপরতা চলছে।
ইতিমধ্যে প্রায় তিনশোর মতো মাদরাসা বোর্ডটির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আরও দুই থেকে আড়াই হাজার মাদরাসা অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ায় আছে বলে জানিয়েছেন ইত্তেফাকুল উলামা ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বোর্ডের ইমতিহান কমিটির সদস্য মাওলানা মানাজির আহসান খান তাবশীর।
মাদরাসা-শিক্ষার উন্নয়নে যা ভাবছে বোর্ডটি
মাদরাসা-শিক্ষা উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে নতুন এ শিক্ষাবোর্ড, জানতে চাইলে মাওলানা মানাজির আহসান খান তাবশীর ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, কওমি মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে যথেষ্ট গ্যাপ আছে আমাদের দেশে। বৈষম্যও আছে। শহরের মাদরাসাগুলোর তুলনায় গ্রাম বা মফস্বলের মাদরাসাগুলোর পড়াশোনার মান নিম্ন মানের। কিন্তু এটাকে শহরের ভালো মাদরাসাগুলোর মানে উন্নীত করতে খুব একটা প্রচেষ্টা কারোর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। সে-রকম ভাবনা বা উদ্যোগও চোখে পড়ে না। ইত্তেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া প্রধানত এ দিকটায় সবচেয়ে বেশি জোর দেবে। গ্রামের মাদরাসাগুলোর পড়াশোনার মান শহরের সবচেয়ে ভালো মাদরাসাটির মানে কীভাবে উন্নীত করা যায়, এ ব্যাপারে বিশেষ চিন্তা করছেন সংগঠনের মুরুব্বিগন। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের প্রতিটা মাদরাসার পড়াশোনার মান যেন সমানভাবে উন্নত, সমৃদ্ধ ও যুগোপযোগী হয়, সে ব্যাপারে কাজ করা।
বোর্ডটি কি কেবল বৃহত্তর ময়মনসিংহ ভিত্তিক, নাকি পুরো দেশব্যাপী এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে জানতে চাইলে মাওলানা তাবশীর জানান, বোর্ডের লক্ষ্য পুরো দেশব্যাপী কাজ করা, বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাইরে থেকেও বোর্ডে আসার সুযোগ চাইছে কয়েকটি জেলা। তবে আপাতত বৃহত্তর ময়মনসিংহের মাদরাসাগুলোর ওপরই জোর দেওয়া হবে।
ইত্তেফাকের ইলহাকভুক্ত প্রতিটা মাদরাসার পড়াশোনাসহ সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে বলেও জানান মাওলানা তাবশীর। তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ বোর্ডের পক্ষ থেকে গুরুত্ব সহকারে অডিট করা হবে প্রতিটা মাদরাসা। মাদরাসার পড়াশোনার মানের দিকেও নজর দেওয়া হবে বিশেষভাবে। পাশাপাশি এসব মাদরাসার ছাত্ররা এক মাদরাসা থেকে আরেক মাদরাসায় ভর্তি হবার সময় বোর্ডের পক্ষ থেকে বিশেষ ছাড়পত্রের ব্যবস্থা রাখারও চিন্তা আছে। যাতে ছাত্রটি পূর্বের মাদরাসায় কোন ক্লাসে পড়ল, কী কারণে সেখান থেকে চলে এলো, তা পরিস্কার থাকে। নইলে বর্তমানে দেখা যায়, এক মাদরাসা থেকে নাহবেমির পড়ে অপর মাদরাসায় পরের বছর এক/দুই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে উপরের জামাতে ভর্তি হয়ে যায় অনেক ছাত্র। আবার এক মাদরাসায় ফেল করে অন্য মাদরাসায় পরের ক্লাসে ভর্তি হবার সুযোগও নেয় অনেকে। ছাড়পত্র চালুর মাধ্যমে এই প্রবণতাকে রোধ করতে আমরা সচেষ্ট হবো। কারণ ছাড়পত্রে নির্দিষ্ট ছাত্রের রেজাল্ট, কোন ক্লাসে পড়েছে, কেন মাদরাসা থেকে সে চলে যাচ্ছে, সবকিছু উল্লেখ থাকবে।
বেফাক বোর্ডে যে জামাতগুলোর পরীক্ষা নেওয়া হবে, এগুলো বাদে বাকি সব জামাতের জন্য বোর্ড পরীক্ষার আয়োজন করবে ইত্তেফাক। আর এটা এ বছর থেকেই শুরু হবে। এ বিষয়ে মাওলানা তাবশীর বলেন, বেফাক বোর্ডের জামাতগুলোতে সাধারণত দেখা যায় খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়, সেই গুরুত্ব অন্যান্য জামাতগুলোতে থাকে না৷ আমরা বোর্ড পরীক্ষা চালুর মাধ্যমে সেই জামাতগুলোর পড়াশোনার মানও উন্নত ও সমৃদ্ধ করব। কারণ দরসে নেযামির সবগুলো জামাত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন বোর্ড গঠনের প্রয়োজন হলো কেন?
দেশে সমৃদ্ধ একটা বোর্ড—বেফাক—আছে, আবার আঞ্চলিকভাবেও বৃহত্তর ময়মনসিংহে কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়ার তত্ত্বাবধানে তানজিম বোর্ড কাজ করছে অনেক আগ থেকে, তারপরও নতুন করে কেন বোর্ড গঠনের জরুরত পড়ল জানতে চাইলে মাওলানা তাবশীর বলেন, আসলে আমাদের মাদরাসা-শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যাপক এবং প্রচুর কাজ করা দরকার। প্রথমত জাতীয় বোর্ড হিসেবে বেফাক থেকে সে পরিমাণ কাজ আসছে না। আর আঞ্চলিক বোর্ড তানজিমের সঙ্গে আমরা কাজ করতে চেয়েছি। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের চিন্তার সঙ্গে তাঁদের চিন্তার অমিল থাকার কারণে আমাদেরকে নতুনভাবে ভাবতে হয়েছে। এবং আমরা আমাদের এই ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা-শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেছি।
