প্রতারণা ও গাদ্দারি : কাশ্মীর যেভাবে হাতছাড়া হয়েছে

রাকিবুল হাসান

কাশ্মীর। পৃথিবীর স্বর্গ খ্যাত অপরূপ এ উপত্যকায় খ্রিষ্টাব্দ অষ্টম শতাব্দীতে ইসলামের আগমন ঘটে তারপর কালের পরিক্রমায় পুরো উপত্যকাই একসময় মুসলিম অধ্যুষিত হয়ে ওঠে। ১৫৮৬ সালে মোঘল সম্রাট আকবরের সময় কাশ্মীর মোঘল সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত হয়। বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগিরের সময়কাল অবধি দুর্দণ্ড প্রতাপে তা পরিচালিত হয় মোঘল শাসকদের হাতে। আওরঙ্গজেবের ইন্তেকালের পর এখানে মোঘল কর্তৃত্ব দুর্বল হতে শুরু করে এবং ১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে আফগান শাসক আহমদ শাহ দুররানি কাশ্মীরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে শিখ রাজা রঞ্জিত সিং মুসলিম অধ্যুষিত এ ভূমি দখল করে নেন এবং এর মধ্য দিয়েই মূলত কাশ্মীরি মুসলমানদের বঞ্চনার ইতিহাসের সূচনা হয়। সাতাশ বছরের শিখ শাসনে পর্যুদস্ত হয় এ জনপদ। গরু জবাই নিষিদ্ধের পাশাপাশি ভারী করের বোঝা চাপানো হয় কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর। হাজার হাজার মানুষ জুলুমের আতিশয্যে ঘরবাড়ির মায়া ত্যাগ করে হিজরত করতে বাধ্য হয়।

২

১৮৪৩ সাল। পাঞ্জাব এখনো ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। মহারাজা রণজিৎ সিং কিছুদিন হলো মারা গেছেন। সেনাবাহিনীর সহায়তায় সিংহাসনে বসেছেন শিশুপুত্র দিলীপ সিং। শিশুর মাথায় হাত রেখে রাজ্য পরিচালনা করছেন রাজমাতা মহারাণী ঝিন্দন।

এই সময় পঞ্জাবের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নরত করার জন্য শতদ্রু নদীতে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ। কিন্তু বিষয়টা ভালো ঠেকেনি মহারাণীর কাছে। তিনি শতদ্রু নদীর তীরে শিখ সেনাপতি শের সিং ও তার পুত্র ছত্র সিংকে পাঠালেন ইংরেজদের বাধা দিতে। মহারাণীর এই তৎপরতায় অপমানবোধ করলেন লর্ড হার্ডিঞ্জ। অপমানের শোধ নিতে ১৮৪৫ সালে শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন তিনি।

যুদ্ধে পরাজিত হয় শিখ বাহিনী।  মুদকি, ফিরোজ শাহ, আলিওয়াল দখল নেয় ইংরেজরা। অবস্থা বেগতিক দেখে সন্ধি করতে বাধ্য হয় মহারাণী। ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইংরেজদেরকে দিতে হয় এক কোটি টাকা। ইংরেজ সরকার লাহোরে একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট নিযুক্ত করে মহারাজা দিলীপ সিংকে নিয়ে আসে ব্রিটিশ শাসনাধীনে। ক্ষতিপূরণের এক কোটি টাকা গুনতে গিয়ে খালি হয়ে যায় মহারাণীর রাজকোষ। তাই বাধ্য হয়ে তিনি ডোগরা দলপতি মহারাজা গুলাব সিংয়ের কাছে ৭৫ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দেন জম্মু ও কাশ্মীর।

৩

জম্মু-কাশ্মীরের মালিকানা বদলের শতবর্ষ পার হয়ে গেছে। এখন ১৯৪৭। শ্রীনগরের সিংহাসনে আসীন গুলাব সিংয়ের উত্তরপুরুষ মহারাজা হরি সিং। ভারতবর্ষ থেকে চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে ব্রিটিশদের। যাওয়ার আগে তৈরী করেছে ভারত বিভক্তি আইন ‘ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স এ্যাক্ট’। এতে বলা হয়েছে, কাশ্মীর চাইলে ভারত কিংবা পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে পারবে।

ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন চাইছেন যে কারো সঙ্গে যোগ দিক হরি সিং। হরি সিং চাইছেন কারো সঙ্গেই থাকবেন না। তিনি থাকবেন স্বাধীন। ১৫ আগস্টের আগেই একদিন হরি সিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। উদ্দেশ্য তাকে রাজি করানো। হরি সিং ধরে ফেললেন লর্ড সাহেবের কূটনীতি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পেটের পীড়ার অজুহাত দেখিয়ে বাতিল করে দিলেন লর্ড সাহেবের বৈঠক। বৈঠকও হলো না, প্যানপ্যানও শুনতে হলো না।

এর চার বছর আগে ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস-ঘনিষ্ট কাশ্মীরি নেতা শেখ আবদুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্স ছেড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল কনফারেন্স। ১৯৪৪ সালে কায়েদে আজম শ্রীনগরে গেলে মুসলিম কনফারেন্স তার সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করে। শেখ আবদুল্লাহ তখন কায়েদে আজমকে ন্যাশনাল কনফারেন্সের পক্ষ থেকেও সংবর্ধনা গ্রহণের দাওয়াত দেন। কায়েদে আজম উভয় দলের দাওয়াতই গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তখন কায়েদে আজম শেখ আবদুল্লাহকে আহ্বান জানান, তিনি যেন কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের অংশ হয়ে যান।  এই পরামর্শ শুনে শেখ আবদুল্লাহ চিৎকার করে উঠলেন এবং বললেন, ‘বাইরের লোকদের কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে নাক গলানোর কোনো অধিকার নেই। মিস্টার জিন্নাহর উচিত কাশ্মীর থেকে চলে যাওয়া।’

৪

১৪ আগস্ট স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তান, ১৫ আগস্ট ভারত। দেশীয় বেশীরভাগ রাজা-মহারাজা ভারতের সাথে যুক্ত হয়েছেন, কেউ কেউ পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়েছেন। তবে হরি সিং এই দুই দলের একদলেরও নন। তিনি স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করতে চান, তাই ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তার উপর ক্ষেপে আছে। তার রাজ্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় বেশিরভাগ প্রজা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে, আবার বেশিরভাগ হিন্দু প্রজা ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে। খুব কম সংখ্যক মানুষ তার পক্ষে আছে।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না আজকাল। তিনি চাইছেন কাশ্মীরের খোলামেলা পরিবেশে একটু অবসর যাপন করে আসবেন। দেশভাগের ধকল তো কম গেলো শরীরের ওপর দিয়ে। এই শরীরে আর কতটুকু মানায়! তিনি তার সামরিক সচিব কর্নেল উইলিয়াম বীরনিকে শ্রীনগর পাঠালেন ২২ আগস্ট শুক্রবার। হরি সিংয়ের কাছে ছোট একটি অনুরোধ লিখলেন, ‘দুই সপ্তাহের অবকাশ যাপনে আমি আপনার কাশ্মীরে আসতে চাই।’

পাঁচদিন পর সামরিক সচিব ফিরে এলেন মুখ ভার করে। হরি সিং বলে দিয়েছেন, তার অনুমতি ছাড়া জিন্নাহ কাশ্মীরে ঢুকতে পারবেন না। এমনকি পর্যটক হিসেবেও না। জিন্নাহ ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি ভেবেছিলেন এই অবকাশ যাপনের সুযোগে হরি সিংকে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য মানসিকভাবে তৈরী করবেন। তা আর বোধহয় হচ্ছে না। এদিকে গুপ্তচর খবর দিয়েছে, মহারাজা হরি সিং পাকিস্তান এবং ভারত কারো সঙ্গেই যুক্ত হতে চাচ্ছে না। স্বাধীন থাকতে চাচ্ছে।

জিন্নাহ তখন  শেখ আবদুল্লাহর কাছে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হওয়ার আহবান জানিয়ে ডা. মুহাম্মদ দীন তাসির এবং সরদার শওকত হায়াতসহ কয়েকজনের একটি প্রতিনিধি দল পাঠালেন। কিন্তু শেখ আবদুল্লাহ তাদের সঙ্গে বেয়াদবিমূলক আচরণ করে তাদের বিদায় করেন। এমনকি সরদার শওকত হায়াতকে গ্রেফতারের হুমকিও দেন।

৫

সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এক গোপন বৈঠক ডাকলেন। বৈঠকের প্রতিপাদ্য বিষয় কাশ্মীর। কাশ্মীরকে কীভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা যায় , তা-ই আলোচনা হবে আজ।

বৈঠকে সবাই একমত হলো, এখনই কাশ্মীর আক্রমণ করা যাবে না। মহারাজা ভারতের সাহায্য চাইতে পারেন। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনী এগিয়ে এলে তাদের প্রতিরোধ করতে পারবে না সদ্য গঠিত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। খুঁজতে হবে নতুন কোনো কৌশল, চালতে হবে নতুন কোনো চাল।

কর্নেল আকবর খান প্রস্তাব দিলেন , সরাসরি ফৌজি অভিযানের বদলে কাশ্মীর উপত্যকার মুসলমান অধিবাসীদের টাকাপয়সা ও অস্ত্রশস্ত্রের যোগান দিয়ে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া হোক। হয়তো এ পন্থায় ফল পেতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব হবে।অনেকগুলি মাস অপেক্ষা করতে হবে তাদের। কিন্তু পরিশেষে দেখা যাবে যে চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার বিদ্রোহী কাশ্মীরি নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে শ্রীনগর শহরে জড়ো হয়েছে এবং পকিস্তানের সাথে যোগ দিতে মহারাজাকে বাধ্য করেছে।

আরেকটি প্রস্তাব দিলেন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাঠান উপজাতির মুখ্যমন্ত্রী আবদুল কাইয়ুম খান। তিনি বললেন, কাশ্মীরি মুসলমানদের উদ্ধারে ফৌজি অভিযানের বদলে পাঠানদের পাঠানো যায়। তারা যেমন শক্ত সবল, তেমনি দৃঢ় প্রত্যয়ী।

পাঠানদের কাজে লাগানোর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নির্দেশ দিলেন, কর্মকাণ্ড চালু রাখতে অর্থের জোগান দেবে সিক্রেট ফান্ড। সভার সিদ্ধান্ত বাইরের কাকপক্ষী, এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনী, সিভিল সার্ভিস বা পাকিস্তান সরকারে কর্মরত কোন ইংরেজ ফৌজি অফিসারও যেন জানতে না পারে। ইটস আ হাই সিক্রেট মিশন।

কাশ্মীরে বিপন্ন মুসলানদের উদ্ধারে একপায়ে খাড়া হয়ে যায় পাঠানরা। তাদের পাশেই তাদের মুসলিম ভাইয়েরা নির্যাতিত হবে, ভারতের সেবাদাসে পরিণত হবে, এটা মানা যায় না। দেশ ভিন্ন হয়েছে ঠিক, রক্ত আর ধর্ম তো বদলায়নি। মুসলিম ভাইদের সাহায্যে দেশের সীমানা ডিঙাতে প্রস্তুতি গ্রহণ করে তারা।

৬

অস্ত্র কিনতে লন্ডন যাচ্ছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার ফ্রাংক মেসারভী। আসলে তিনি যাচ্ছেন না, মতলব করেই পাকিস্তান সরকার অস্ত্র কিনতে তাকে পাঠাচ্ছে। ফলে কাশ্মীরে যখন পাঠানরা আক্রমণ করবে তখন এই ইংরেজ সেনাপ্রধান অন্তত ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে থাকবেন। ঘটনা জানলেও কিছু করার থাকবে না তার।

একটু পরেই ফ্লাইট। মেসারভী রেডি হচ্ছিলেন। ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠলো ল্যান্ডফোন। কল করেছেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গভর্নর স্যার জর্জ কানিংহাম। কানিংহাম বললেন, এখানে অদ্ভুত কিছু ঘটছে মনে হচ্ছে। আমি ধরতে পারছি না। পাঠানদের ভেতরে কেমন যেন সাজ সাজ রব। বারবার আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলছে। পাঠানদের ক্ষেপিয়ে তোলা মুখ্যমন্ত্রীর চাল হতে পারে। কাশ্মীরে সৈন্য পাঠানোর নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল আছে, জানেন?

মেসারভী বললেন, আছে। তবে আপনাকে এতটুকু বলতে পারি, কোনো অঘটন ঘটতে দেখলে বাধা দেবোই। পিএম আমাকে বলেছেন, কাশ্মীরে আক্রমণের মতলব তার নেই।
কানিংহাম বললেন, পিএমকে বিষয়টা জানান।

মেসারভি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পিএম লিয়াকত আলী সঙ্গে দেখা করলেন। কানিংহামের তথ্য বিস্তারিত জানালেন। পিএম বললেন, এসব বরদাশত করবে না তার সরকার। সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে তিনি বলে দেবেন। মেসারভী ঘুণাক্ষরেও টের পেলো না, তার চলে যাওয়ার পর কী ঘটতে যাচ্ছে কাশ্মীরে।

৭

২৪ অক্টোবর রাত। শ্রীনগররের ঝলমলে দরবারে পালিত হচ্ছে শারদীয় পূজা দুর্গোৎসব। আজ উৎসবটি সমাপ্ত হবে অধীনস্থ রাজা ও ভূস্বামীদের আনুগত্যের শপথপত্র গ্রহণ করার মাধ্যমে। এটাই প্রথা—রাজা ও ভূস্বামীরা একে একে হাজির হয়ে রাজানুগত্যের প্রতীকস্বরূপ রেশমি রুমালে মোড়া একটি স্বর্ণখণ্ড মহারাজার হাতে তুলে দেবেন। আয়োজন চলছে। মানুষ তার ভাগ্য সম্পর্কে কত অনিশ্চিত। একটু পরই কী ঘটতে যাচ্ছে শহরে, জানতে পারলে উৎসবে মাততে পারতেন মহারাজ? ভাগ্য সম্পর্কে মানুষ জানে না বলেই এত নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারে।

পাঠানরা আরও আগেই ঢুকে পড়েছে কাশ্মীরে। এখন তারা শ্রীনগর থেকে ৫০ মাইল পূর্বে ঝিলাম নদীর তীরে। কাশ্মীরের একমাত্র পাওয়ার স্টেশনের যন্ত্রপাতির সঙ্গে ফিট করছে ডিনামাইট ফিউজ। ফিট করা শেষ হলেই একজন সাবধান করে দিলো সবাইকে। তারপর ফিউজে আগুন ধরিয়ে স্টেশন থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো সে। ঠিক দশ সেকেন্ড পরেই সশব্দে ফেটে গেলো ডিনামাইট। টুকরো টুকরো হয়ে গেলো মহুরা পাওয়ার স্টেশন এবং পাকিস্তান সীমান্ত থেকে লাদাখ পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে গেল তখনই।
ওই একটা ভয়ঙ্কর ধাক্কাতেই মুখ থুবড়ে পড়লো দরবার কক্ষের ঝলমলানি। দপ করে নিভে গেল হাজার ঝাড়বাতির রোশনাই। তবে শুধু দরবারই নয়, একটা গাঢ় ভয়ংকর অন্ধকার তখন সারা শ্রীনগর শহরকেই গ্রাস করেছে। অমন রমণীয় শহরটার ঘাড়ের ওপর যেন লাফিয়ে পড়লো ওৎ পেতে থাকা অন্ধকার। সবাই অবাক। ডাল লেকের ওপর ফুলের হাউসবোটগুলোয় প্রমোদ ভ্রমণরত বিদেশীরাও হতভম্ব। ব্যাপার কী? হঠাৎ কেন এমন রহস্যময় অন্ধকারে ডুবে গেল শহরটা? কারোর কাছে কারণটা সুস্পষ্ট হলো না। তবে কেউ কেউ যেন উপলব্ধি করলো যে এখন থেকে ফুলে ছাওয়া ভূস্বর্গ কাশ্মীরের নিবিড় হাতছানি, তার ঝলমলে সূর্যালোকের ডুবস্নান- এ সবেরই এবার শেষ।

৮

২৪ অক্টোবর শুক্রবার বিকাল পাঁচটার একটু আগে পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল ডগলাস গ্রেসি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের গোপন রিপোর্ট থেকে কাশ্মীর অভিযানের সম্পূর্ণ খবরটা প্রথম জানতে পারেন। পাঠান বাহিনী সম্পর্কে অবহিত হয়ে তিনি ছুটে গেলেন জেনারেল মেসারভীর বাসভবনে। সেখানকার প্রাইভেট টেলিফোন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ খবরটা ফাঁস করে দিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল স্যার রব লকহার্টের কাছে। এমন গোপন একটি খবর লকহার্টের মতো লোকের কাছে পৌছাক, এটা কোনো পাকিস্তানি নেতাই কল্পনাই করতে পারেননি।কেননা, রব লকহার্টের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলেই কাশ্মীর পুরোপুরি ভারতের হাতছাড়া হয়নি। স্তম্ভিত লকহার্ট কালবিলম্ব না করেই খবরটা পাঠিয়ে দিলেন ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও ফীল্ড মার্শাল অকিনলেকের কাছে।
খবরটা শুনেই লর্ড মাউন্টব্যাটেন,ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে আলাদা গোপন জায়গায় ডেকে ব্যাপারটা সম্পর্কে বললেন।

ইতিমধ্যে রাজা হরি সিং শ্রীনগর থেকে জম্মুতে পালিয়ে গিয়ে ভারতের কাছে সাহায্য কামনা করেন।

ডিফেন্স কমিটির পরামর্শে বসলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও ফীল্ড মার্শাল অকিনলেক। মহারাজা হরি সিংকে কীভাবে সাহায্য করা যায়, এটাই কমিটির আলোচ্য বিষয়।
অকিনলেক বললেন, আকাশপথে এক ব্রিগেড ইংলিশ প্যারাট্রুপার নামিয়ে দেয়া হোক। তারা পাঠানদের দমন করবে। মাউন্টব্যাটেন বললেন, আপনার সঙ্গে আমি একমত নই। ভারতীয় উপমহাদেশ এখন স্বাধীন। স্বাধীন কোনো দেশে বিদেশি ট্রুপস নামানে যায় না। যদি নামাতেই হয়, তাহলে ইন্ডিয়ান ট্রুপস নামাতে হবে। মাউন্টব্যাটেন এটাও বললেন, কাশ্মীর রাজ্য সরকারিভাবে যদি ভারতের সাথে যুক্ত হয়, তাহলেই ভারত কাশ্মীরে সেনা পাঠাতে পারবে। নয়তো পাঠানরা এবং ভারতীয়রা একই দলভুক্ত হিসেবে প্রতিভাত হবে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টিতে।

ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহায্য প্রদানের প্রস্তাব নিয়ে শ্রীনগরে এলেন  ভি.পি. মেনন, কর্নেল স্যাম মানেকশ এবং একজন ভারতীয় বায়ুসেনা অফিসার। ভারত শর্তারোপ-পূর্বক তাঁকে এ সাহায্য করতে সম্মত হয়। শর্ত হলো কংগ্রেস-ঘনিষ্ট কাশ্মীরি নেতা শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে সেখানে জরুরি অবস্থার একটি সরকার গঠন করতে হবে। হরিসিং শর্ত মেনে নেন। আর এর মধ্য দিয়েই কাশ্মীরে প্রবেশ করে ভারতীয় মিলিটারি। ১৯৪৭-এর ২৭ অক্টোবর ভারত বিশাল আকারে এয়ারলিফটিং-এর মাধ্যমে প্রায় ১০০টি সিভিল এবং মিলিটারি ট্রান্সপোর্ট বিমান ব্যবহার করে দুই ব্যাটেলিয়ন ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন শ্রীনগর এয়ারফিল্ডে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়।

এরপর নেহেরুর সঙ্গে আঁতাত করে কৌশলে কাশ্মিরের শাসনক্ষমতা কব্জায় নেন শেখ আবদুল্লাহ। তিনি নিজের শাসন টিকিয়ে রাখতে নেহেরুকে এই বলে প্রভাবিত করতেন যে, আমার সঙ্গে পাকিস্তান সরকার যোগাযোগ রাখছে। ১৯৫২ সালে তিনি নেহেরুর সঙ্গে ‘দিল্লি চুক্তি’তে সই করেন। সেখানে ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ ধারা যুক্ত করে জম্মু-কাশ্মিরকে আলাদা রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল অধিকৃত এই রাজ্যে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও শাসন প্রতিষ্ঠিত রাখা। ৩৭০ ধারা মূলত ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরু এবং শেখ আবদুল্লাহর মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি। এই ৩৭০ ধারার খসড়াও প্রস্তুত করেন শেখ আবদুল্লাহ। শেখ আবদুল্লাহ কাশ্মিরীদের সন্তুষ্ট রাখতে ৩৫ ধারাকেও আইনে যুক্ত করান এবং কাশ্মিরের বাইরের লোকদের জন্য কাশ্মিরের ভেতরে জমি কেনার পথ বন্ধ করেন। তবে শেখ আবদুল্লাহ অস্থায়ী ভাবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না, বরং স্থায়ী ভাবে জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষপাতী ছিলেন। যদিও কেন্দ্র তার সেই দাবি মেনে নেয়নি। ফলে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েও ৩৭০ ধারা বলে জম্মু-কাশ্মীর ছিল আলাদা স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য, যদিও সেই স্বায়ত্তশাসন ছিল ‘অস্থায়ী’।

১৯৮২ সালে তার ইন্তেকালের পর ছেলে ফারুক আবদুল্লাহ হন কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী। ফারুক আবদুল্লাহর পর তার ছেলে ওমর আবদুল্লাহ হন কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী।

৯

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৪৮ সালে ভারত কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। জাতিসংঘের ৪৭ নম্বর প্রস্তাবে কাশ্মীরে গণভোট, পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার, এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনতে আহ্বান জানানো হয়। এর ভিত্তিতে কাশ্মীরে যুদ্ধবিরতি বলবৎ হয় ১৯৪৮ সালে, তবে পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করে। তখন থেকেই কাশ্মীর কার্যত পাকিস্তান ও ভারত নিয়ন্ত্রিত দুই অংশে ভাগ হয়ে যায়।

অন্যদিকে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে চীন কাশ্মীরের আকসাই-চিন অংশটির নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, আর তার পরের বছর পাকিস্তান – কাশ্মীরের ট্রান্স-কারাকোরাম অঞ্চলটি চীনের হাতে ছেড়ে দেয়।

সেই থেকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান, ভারত ও চীন – এই তিন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে।

দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় ১৯৬৫ সালে, এরপর আরেকটি যুদ্ধবিরতি চু্ক্তি হয় । এরপর ১৯৭১-এর তৃতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭২-এর সিমলা চুক্তির মধ্যে দিয়ে বর্তমানের ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ বা নিয়ন্ত্রণ রেখা চূড়ান্ত রূপ পায়।

২০১৮ সালে ভারতশাসিত কাশ্মীর রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার – যাতে বিজেপিও অংশীদার ছিল। কিন্তু জুন মাসে বিজেপি জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, এবং তার পর থেকেই রাজ্যটি দিল্লির প্রত্যক্ষ শাসনের অধীনেই রয়েছে।

১০

গত ৫ আগস্ট ভারতের সংবিধানের ৩৫-ক ধারা ও ৩৭০ অনুচ্ছেদ কাশ্মীরকে যে মর্যাদা দিয়েছে তা বাতিল করেছে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রস্তাব করেন। সংসদের অনুমোদনের পরই রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। রাষ্ট্রপতির সইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেয়া ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত হল। সেই সঙ্গে একটি স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যের মর্যাদাও হারাল কাশ্মীর।

যে মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার নিজেদের আইনেরই বিরুদ্ধাচরণ করে ধারা ৩৭০ ও ৩৫-এ বিলুপ্ত করে দিয়ে অধিকৃত এ রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা খতম করে দিল, তখন থেকে ফারুক আবদুল্লাহ ও তার ছেলে ওমর আবদুল্লাহ এই প্রতিক্রিয়া তুলে ধরছেন যে, কাশ্মিরীদের প্রতি বড্ড জুলুম করা হয়েছে। অথচ এই পরিবার সাধারণ কাশ্মিরিদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছে। ১৯৪৭ সালে শেখ আবদুল্লাহ নেহেরুকে সমর্থন না দিলে আজ কাশ্মির স্বাধীন থাকত। শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বেই তো কাশ্মীরে প্রবেশ করে ভারতীয় মিলিটারি।

৩৭০ ও ৩৫ ধারার বিলুপ্তি মূলত ভারতের পক্ষ থেকে ওইসব কাশ্মিরি নেতাদের প্রতিই ধোঁকা, যারা ভারতের আশ্বাসের ওপর ভরসা করে ভারতীয় আইনের অধীনে শপথ করে স্বজাতির সঙ্গে গাদ্দারি করেছিলেন। শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ স্বজাতির সঙ্গে ধোঁকাবাজি না করতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি কায়েদে আজমের কথা শুনেননি। তিনি বরং নেহেরুর সঙ্গে মিলে কাশ্মীরিদের ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখেন। কাশ্মির প্রশ্নে ইতিহাস কায়েদে আজমকে বারবার সত্য এবং শেখ আবদুল্লাহকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

আগের সংবাদহিন্দুত্ববাদের সমালোচনায় শশী থারুর : বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
পরবর্তি সংবাদকাশ্মীরি বন্দীদের কোথায় রেখেছে ভারত সরকার