জমিয়তে আবার ভাঙন : সিলেটে নতুন দলের উদ্যোগ

মুসান্না মেহবুব

সিলেটে বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে ইসলামি রাজনৈতিক দল জমিয়তের নতুন আরেক গ্রুপের আত্মপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে চিন্তা ও আদর্শে মতানৈক্য তৈরি হবার কারণে স্বতন্ত্রভাবে জমিয়তের ব্যানারে কাজ করার জন্য এই গ্রুপের সূচনা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সিলেট জেলা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা তহুরুল হক জকিগঞ্জী। তিনি জানান, আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরীকে সংগঠনটির আমির হিসেবে মনোনীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে তাঁর সঙ্গে জমিয়তের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা বা কর্মীর সম্পৃক্তি নেই। সিলেট উপশহরস্থ জামিয়া লুগাতুল আরাবিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা তহুরুল হক ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের উভয় গ্রুপ (কাসেমি-ওয়াক্কাস) জমিয়তের আপোসহীন নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারেননি। হজরত মাদানি রহমতুল্লাহ আলায়হির চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে গেছেন তারা। এসব কারণে বিএনপি-সহ ইসলামের আদর্শ-বিচ্যুত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ২০০১ সালে জোট করবার পর থেকে মাওলানা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী ও মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ মূল জমিয়ত থেকে বের হয়ে আসেন। এবং খলিফায়ে মাদানি আল্লামা গাজীনগরী রহমতুল্লাহ আলায়হিকে সভাপতি বানিয়ে তাঁরা জমিয়তে উলামা বাংলাদেশ নামে নতুন দল গঠন করেন।

কিন্তু আল্লামা গাজীনগরীর ইন্তেকালের পর মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ এ দল থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ জমিয়তে উলামা নামে নতুন একটি দল গঠন করেন। আর আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী বাংলাদেশ জমিয়তে উলামা নামের দলটির মূল নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দুর্লভপুরী তার এ দলের কর্মকাণ্ড কেবল সিলেটে কানাইঘাট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখেন। ফরীদ মাসউদ জাতীয়ভাবে কাজ করলেও তিনি তাঁর সংগঠনকে ভোটের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না করে সামাজিক সংগঠনের রূপ দেন এবং এভাবেই অরাজনৈতিকভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

মাওলানা তহুরুল ইসলাম প্রথমে দুর্লভপুরীর সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ড কানাইঘাট ভিত্তিক হবার কারণে এবং জাতীয়ভাবে এর কোনো ভূমিকা না থাকার কারণে ফরীদ মাসউদের সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু এখানে এসেও তিনি হতাশ হন৷ কারণ ফরীদ মাসউদ এটাকে রাজনৈতিক দল থেকে আধ্যাত্মিক সংগঠনে রূপ দিয়েছেন। আর তাহুরুল হকের ইচ্ছা হলো জমিয়তের ব্যানারে তিনি রাজনীতি করবেন।

তহুরুল হক জানান, দুর্লভপুরী এবং ফরিদ মাসউদ—উভয়ের দলের কাছে তিনি বারবার আবেদন জানিয়েছেন তারা যেন ব্যাপা রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী কানাইঘাটের বাইরে নিজেদের তৎপরতা বাড়াতে আগ্রহবোধ করেননি এবং ফরীদ মাসউদও রাজনীতিতে ফিরে আসার জরুরত বোধ করেননি। দুই দলের তৎপরতাও অনেক নিস্তেজ। এসব কারণে তাদের থেকে হতাশ হন মাওলানা তাহুরুল হক। এদিকে জমিয়তের ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তৎপর ভূমিকা রাখতেও তাঁর বেশ আগ্রহ। কিন্তু জমিয়তের অপর দুই অংশ কাসেমি ও ওয়াক্কাস গ্রুপের সঙ্গে পূর্বের মতানৈক্য থাকবার কারণে তাদের সঙ্গেও মিশতে পারছেন না। এসব কারণে বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ব্যানারে তিনি জমিয়তের নতুন আরেকটি দল গঠন করতে উদ্যোগী হয়েছেন।

তাঁর এই দলে কারা কারা সম্পৃক্ত হচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড়মাপের উল্লেখযোগ্য কেউ এখনও সরাসরি মতামত দেননি, আপাতত তাঁরা কয়েক বন্ধু ও বেশ কিছু কর্মী কাজ করছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার অনেকে তাদেে সমর্থন দিচ্ছেন, তবে এখনই তাদের নাম বলতে রাজি হননি তাহুরুল হক।

নতুন এই দলটির অভিষেক কবে হবে জানতে চাইলে তাহুরুল হক বলেন, আমাদের সবকিছু গোছাতে মাস তিনেক সময় লাগবে। আমরা দেশব্যাপী কাজ করতে চাই। আপাতত আগামী তিন মাসে অন্তত তেইশটি জেলায় কমিটি গঠন করে রাজধানীর প্রেস ক্লাবে মাস তিনেক পর অভিষেক হবে। এবং তখনই কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হবে।

এর মূল নেতৃত্বে কে থাকবেন বা দলের চেয়ারম্যান কাকে বানানো হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনও ফিকির চলছে। আমাদের ইচ্ছা আছে আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরিকে চেয়ারম্যান মনোনীত করার।

ওলিপুরি’র সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনো কথাবার্তা হয়েছে কি না জানতো চাইলে তহুরুল হক বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি। জানান, সময়মতো সবকিছুই জানানো হবে।

এদিকে নতুন গঠিত এই দলকে সমর্থন দেবেন কিনা জানতে চেয়ে কথা হয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের অঙ্গসংগঠন ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি এখলাসুর রহমান রিয়াদের সঙ্গে। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, তারা যদি আঞ্চলিক কোনো দল গঠন করে, তাহলে এটাকে আমরা সর্বোচ্চ ব্যক্তি স্বাধীনতা বা বিচ্ছিন্নতাবাদ বলতে পারি। যেহেতু রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু যদি একই নামে আরেকটি ব্যাপক রাজনৈতিক দল গঠন করে, তাকে সমর্থন দেবার কোনো প্রশ্নই উঠে না। কারণ একই নামে নিবন্ধনকৃত একটি দল আছে।’

মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরীকে নতুন গঠিত জমিয়ত সংগঠনটির চেয়ারম্যান বানানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কতটুকু সত্য হবে প্রশ্ন তুলে এখলাসুর রহমান রিয়াদ বলেন, নিবন্ধিত জমিয়তের সাথে নুরুল ইসলাম ওলিপুরীর খুব ভালো সম্পর্ক এখনো আছে। তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। এখন তিনি নতুন দলের আমির হতে রাজি হবেন কিনা, এটা নিয়ে সন্দেহ আছে। কতজন কতকিছুই তো বলে মজলিশ জমানোর জন্য।’

অন্তর্গত কোনো বিভেদের কারণে মাওলানা তহুরুল হক নতুন দল গঠন করছেন কিনা জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, সম্প্রতি কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি। মিলেমিশে কাজ না করে নতুন দল কেন করা হচ্ছে—আল্লাহ মালুম। ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার দায়ভার তাদের নিজেদেরই কিন্তু নিতে হবে। ভাবতে হবে—রাজনীতি ব্যক্তি স্বার্থের জন্য করছি না ইসলামের জন্য। এই প্রশ্নটি করলেই অনেক সত্য বেরিয়ে আসে।’

উল্লেখ্য, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন। মূলত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতাকর্মীরাই দেশভাগ ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এ নামে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন। শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি রহমতুল্লাহ আলায়হির খলিফা-ছাত্র এবং তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার অনুসারীরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ব্যানারে রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণ করেন।

সত্তর আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি যখন চারদলীয় জোটের সঙ্গে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কিছু কিছু নেতা আপত্তি জানান। তাদের আপত্তিকে আমলে না নেবার কারণে একসময় তারা দলত্যাগ করে জমিয়তে উলামা বাংলাদেশ নামে নতুনভাবে কাজ শুরু করেন।

এদিকে বছর দেড়েক আগে মূল জমিয়তেও মতপার্থক্য দেখা দেয়। মুফতি ওয়াক্কাস এবং আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমির সমর্থকেরা বেশকিছু বিরোধের কারণে আলাদা হয়ে যান।

ঐতিহ্যবাহী ইসলামি এ রাজনৈতিক সংগঠনটি তাহুরুল হকের নতুন গ্রুপটিকে গোনায় ধরলে এখন মোট পাঁচটি গ্রুপে বিভক্ত।

১. জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (কাসেমী গ্রপ)।
২. জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (ওয়াক্কাস গ্রুপ)।
৩. জমিয়তে উলামা বাংলাদেশ (কানাইঘাটি জমিয়ত/ দুর্লভপুরী গ্রুপ)।
৪. বাংলাদেশ জমিয়তে উলামা (ফরীদ মাসউদ গ্রুপ)।
৫. বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (তাহুরুল হক জকিগঞ্জী)

আগের সংবাদউপমহাদেশে আহলে হাদিস মতবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ
পরবর্তি সংবাদকাশ্মীর ইস্যুতে এরদোগানের সঙ্গে ইমরান খানের বৈঠক