
রাকিবুল হাসান
বেড়ে ওঠা
আবু বাশার আমর বিন উসমান। আমরা চিনি তাকে জগদ্বিখ্যাত নাহুর ইমাম সিবাওয়াইহ বলে। সিবাওয়াইহ অর্থ আপেলের ঘ্রাণ। তার মা তাকে এই নামে ডাকতেন। কেউ বলেন তিনি ছিলেন সুদর্শন এবং লাল সুন্দর। তার লাল পেলব গাল আপেলের মতোই দেখতে। তাই তাকে ডাকা হতো সিবাওয়াইহ। তার জন্মসাল ঠিক কত, অধিকাংশ কিতাবে বর্ণনা না করলেও কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেছেন ১৪৮ হিজরি। দক্ষিণ ইরানের ইশতার প্রদেশের আল-বায়দা শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পরিবার হিজরত করে চলে আসেন ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র দক্ষিণ ইরাকের বসরায়। বসরায় তার পড়াশোনার হাতেখড়ি।
পড়াশোনা
শৈশবে তিনি ফার্সি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানতেন না। কিন্তু কালের পরিক্রমায় একদিন তিনি হয়ে ওঠেন আরবি ভাষার ব্যাকরণের কেন্দ্রীয় পুরুষ। এই শেখার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল বসরার মাদরাসায়। নাহুর ইমামদের সংস্পর্শে একটু একটু করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজেকে।
তার প্রসিদ্ধ শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম হাম্মাদ ইবনে সালামা। তিনি ছিলেন খুব তীক্ষ্ণ। আরবিতে ভুল একদম সহ্য করতে পারতেন না। একদিন তার সামনে হাদিস পড়তে গিয়ে ব্যাকরণ ধরতে না পারার কারণে সিবাওয়াইহ জবরের স্থানে দিয়ে বসেন পেশ। ভুলটা ধরে দিলেন শিক্ষক। সিবাওয়াইহ লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন। দৃঢ় সংকল্প করলেন এখানেই—এমনভাবে নাহু শিখব, কখনো যেন আর ভুল না হয়।
নাহু শেখার জন্য তিনি চলে যান আরবি ভাষার প্রথম অভিধান ‘আল-আইন’ রচয়িতা আল্লামা খলিল আহমদ ফারাহিদির কাছে। ছায়ার মতো লেগে থাকেন তার পেছনে। কুঁড়িয়ে নেন মণিমাণিক্য। এরপর নাহু শিখেন নাহুর প্রসিদ্ধ ইমাম আখফাশের কাছে। ইউনুস ইবনে হাবিবের কাছেও শিখেছেন।
তবে খলিল আহমদ ছিলেন তার সবচে প্রিয় শিক্ষক। খলিল আহমদের কাছে তখন পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছেন, এমন অনেকেই পড়তেন। তাদের মধ্যে নজর বিন শামিল, আলি বিন নসর জাহাজমি, মুআররিযুস সাদুসি। মুআররিয পড়তেন কবিতা, আলি পড়তেন হাদিস, সিবাওয়াইহ পড়তেন নাহু। খলিল আহমদ তার জন্য যেন বুকের দ্বার খুলে রেখেছিলেন। তার শেখার উৎসাহ দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বুকে জায়গা দিয়েছিলেন ধীরে ধীরে। ক্লাসে উপস্থিত কেউ কেউ বলেছেন, সিবাওয়াইহ যখন ক্লাসে আসতেন, খলিল আহমদ বলতেন, এমন ছাত্রকে মারহাবা, যাকে পড়িয়ে কখনো ক্লান্তি আসে না। অথচ তিনি সিবাওয়াইহ ছাড়া অন্য কেউ আসলে এ কথা বলতেন না।
মেধার ঝলক
প্রখর মেধা এবং সুক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন সিবাওয়াইহ। সবকিছুতেই তার নিজস্ব একটা মতামত থাকতো। কখনো শিক্ষকের সঙ্গেও লিপ্ত হতেন ইলমি বিতর্ক ও মুনাকাশায়। কোনো কোনো শিক্ষক তো তার বিতর্কে হয়রান হয়ে যেতেন।
ইমাম আখফাশ বলেন, আমি একদিন ইউনুস ইবনে হাবিবের কাছে বসা। এমন সময় সিবাওয়াইহ এসে প্রশ্ন করলেন, ‘مررت به المسكينِ؟’ মিসকিনি-তে যের হলো কেন?’
ইউনুস ইবনে হাবিব বললেন, ‘এটা বদল হওয়ার কারণে যের হয়েছে।’
সিবাওয়াইহ বললেন, ‘’مررتُ به المسكينُ’ জায়েজ। এই হিসেবে যে, বাক্যটি মূলত— المسكينُ مررتُ به।’’
ইউনুস বললেন, ‘এটা ভুল। বিশেষ্যের পূর্বে সর্বনাম আসতে পারে না।’
সিবাওয়াইহ বললেন, ‘খলিল আহমদ এটাকে শুদ্ধই বলেন।’ এরপর তিনি কয়েকটি কবিতা পড়ে শুনালেন। কিন্তু তবুও ইউনুস বললেন, ‘এটা ভুল, ভুলই।’
সিবাওয়াইহ এবার বললেন, ‘’مررتُ به المسكينَ’ মিসকিনা যবর হলো কেন?’
ইউনুস বললেন, ‘হাল হিসেবে।’
সিবাওয়াইহ বললেন, ‘আলিফ-লাম-যুক্ত শব্দ তো হাল হয় না।’
ইউনুস বললেন, ‘সত্যিই তো। তোমার শিক্ষক খলিল আহমদ কী বলেন?’
সিবাওয়াইহ বললেন, ‘এটা যবর হবে ‘তারাহহুমে’র ভিত্তিতে।’
ইউনুস উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘কী চমৎকার সমাধান!’
এভাবেই খলিল আহমদের অনুসরণ করেছেন তিনি। তার অনুসরণ করতে গিয়ে কখনো আরবের বাক্যপ্রণালীর সাথে মিলতো, কখনো মিলতো না।
শিক্ষকগণ বেঁচে থাকতেই বসরার মসজিদে দরস দিতে বসেছিলেন সিবাওয়াইহ। তার দরসে উপস্থিত হতো ছোট-বড় সবাই। এই দরসের বর্ণনা দিয়েছেন অনেক বড় বড় নাহুবিদ। কিছু কিছু মাসআলার সমাধান তিনিই কেবল দিতে পারতেন, আর কেউ পারতো না।
ইমাম কাসাঈর সঙ্গে বিতর্ক
ইসলামি বিশ্বের রাজধানী তখন বাগদাদ। বাগদাদের খলিফা হারুনুর রশিদ, মন্ত্রী ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ বারমাকি। এমন আলো ঝলমলে শহর সবাইকেই টানে, টানলো সিবাওয়াইহকেও। সিবাওয়াইহকে দেখে প্রথম সাক্ষাতেই মুগ্ধ হয়ে গেলেন মন্ত্রী ইয়াহইয়া বারমাকি। দেখলেন পারস্যের একটি ছেলে আরবি ভাষায় কী দারুণ অভিজ্ঞ। খোদ আরবদের সঙ্গেই লড়াই করে। তিনি ভাবলেন, কুফায় নাহুর ইমাম আল্লামা কাসাঈকে ডেকে আনতে হবে সিবাওয়াইহর সঙ্গে বিতর্কের জন্য। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে, শুরুতে ডাকতে চাননি ইয়াহইয়া, পরে সিবাওয়াইহর পীড়াপীড়িতে ডাকতে বাধ্য হন।
কাসাঈ কুফায় নাহুর মজলিশের নেতৃত্ব দেন। সঙ্গে বাদশাহ হারুনুর রশিদের দুই ছেলে আমিন এবং মামুনকেও পড়ান। ফলত শহরের গুরুত্বপূর্ণ লোক হিসেবে তিনি বিবেচিত হন। তিনি বুঝে ফেললেন, এই বিতর্কে জয়ী হয়ে এখানে আসন গাড়তে চায় সিবাওয়াইহ। দেখাতে চায় তার মেধা ও প্রতিভার বাহাদুরি। মুগ্ধ করে মনের ভেতর জায়গা করে নিতে চায় মন্ত্রী ও বাদশার।
কাসাঈ তার ছাত্রদের সঙ্গে কৌশল আঁটলেন। আগে তার ছাত্ররা সিবাওয়াইহকে প্রশ্ন করবে। প্রশ্ন করে, বিরাধিতা করে তার মনোবল ভেঙে দেবে। কৌশল অনুযায়ী সবকিছু চললো। কাসাঈর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ইমাম ফাররা, আহমার, ইবনে সা’দান। প্রশ্নের পর প্রশ্ন; বাসরি দৃষ্টিভঙ্গিতে একের পর এক উত্তর দিয়ে গেলেন সিবাওয়াই। আর তারাও কুফি দৃষ্টিভঙ্গিতে তার খণ্ডন করে গেলেন। একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লেন সিবাওয়াইহ।
এসময় বিতর্কে যুক্ত হলেন কাসাঈ। প্রশ্ন করলেন, كنتُ أظن أن العقرب أشد لسعة من الزنبور فإذا هو هي، أو فإذا هو إياها؟ (আমি মনে করি বিচ্ছুর বিষ ভোমরার বিষ থেকে মারাত্মক। এখন এটা ‘হিয়া’ হবে না ‘ইয়্যাহা’।)
সিবাওয়াইহ বললেন, ‘هي’
কাসাঈ বলেন, ‘দুটোই শুদ্ধ। জায়েজ।’ তার সঙ্গে সুর মেলালো আরবের বিভিন্ন ব্যক্তি। যারা ভাষাজ্ঞানে দক্ষ ও অভিজ্ঞ। হেরে গেলেন সিবাওয়াইহ। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। শুধু বাগদাদ নয়, এবার তিনি ইরাক ছেড়ে পারস্যের আল-বায়দায় চলে এলেন। বিতর্কে হেরে যাবার পর মানসিক যে আঘাত পেয়েছিলেন তিনি, কেউ কেউ বলেন এই আঘাতই তার মৃত্যুর কারণ। কেউ কেউ বলেন, আগে থেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন তিনি। পরাজয় এই অসুস্থতা আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৮০ হিজরি, ৭৯৬ খৃস্টাব্দ মোতাবেক তিনি ইনতেকাল করেন।
বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কিতাব’
ইলমে নাহুর মৌলিক এবং পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ‘আল-কিতাব’। বিষয়-বৈচিত্র্য এবং অধ্যায় বিন্যাসে যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে এসেছে। ইমাম মুবাররিদ বলেন, ‘সিবাওয়াইহর এই গ্রন্থটির মতো আর কোনো গ্রন্থ এ বিষয়ে লেখা হয়নি। হ্যাঁ, এ বিষয়ে যা লেখা হয়েছে, তা পড়তে গেলে অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়। কিন্তু ‘আল-কিতাব’ পড়তে গেলে কারও দ্বারস্থ হতে হয় না।’
সাহিত্যিক জাহিয বলেছেন, ‘ইলমে নাহুতে এর মতো কিতাব লেখা হয়নি। নাহুর যত কিতাব লেখা হয়েছে, তার সবগুলোই সিবাওয়াইহর আল-কিতাবের মুখাপেক্ষী।’
ইবনে কাসির বলেছেন, ‘ইলমে নাহুতে তিনি এমন কিতাব লিখেছেন, এর পরবর্তীরা তার ধারে-কাছে যেতে পারেনি।’
আল জাজিরা অবলম্বনে
