মানুষ নাকি ‘মাংসের পিণ্ড’ : সুন্দরী প্রতিযোগিতায় যেভাবে মর্যাদা হারাচ্ছেন নারীরা

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশে তৃতীয়বারের মতো শুরু হয়েছে ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী নারী আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এন্টার শোবিজ ও ওমিকন এন্টারটেইনমেন্ট নামের দুটো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

এ বছর প্রাথমিকভাবে সাঁইত্রিশ হাজারেরও অধিক তরুণী ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আবেদন করেছিলেন। এর মধ্য থেকে পঁয়ত্রিশ জনকে বাছাই করে মূল প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, যা প্রতি শুক্র ও সোমবার রাত আটটায় এটিএন বাংলা টিভিতে সম্প্রচারিত হচ্ছে।

পশ্চিমা কালচারে সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিষয়টি অনেক প্রাচীন হলেও শুরু থেকেই নানা অঙ্গন থেকে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক ছিল। কিন্তু সকল বাধা ও বিতর্ক ডিঙিয়ে বিশ্বায়নের কল্যাণে পশ্চিমাদের একান্ত এ সংস্কৃতিটা আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। অনিবার্যভাবে সেই হাওয়ায় দুলছে আমাদের বাংলাদেশও।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বাদ দিলেও মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমন সংস্কৃতির চর্চা ও প্রতিযোগিতার আয়োজন নিতান্ত অসুস্থ মানসিকতা থেকে উদ্ভুত বলে মন্তব্য করে আসছেন বিভিন্ন ঘরানার মানুষজন।

এই উদ্ভট প্রতিযোগিতায় নারীর যে অসম্মান ও অপমানের চর্চা হয়, তা বলাই বাহুল্য। একজন নারীকে নিতান্ত ‘মাংসপিণ্ড’ হিসেবে বিচার করা হয়ে থাকে এখানে। তাঁর মেধা, মনন কিংবা মানবিক গুণাবলির কার্যত কোনো মূল্যায়ন থাকে না। কোমর, বুক, হাইট, গায়ের রং ইত্যাদির মাপঝোঁকই এখানে মুখ্য। এবং এই মাপঝোঁক করতে গিয়ে নানা অশালীন ও কুৎসিত কায়দা-কানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হয় একজন প্রতিযোগীকে।

সুন্দরী প্রতিযোগিতার পেছনের গল্প

প্রথমেই বলা হয়েছে সুন্দরী প্রতিযোগিতার এ অসুস্থ কালচার নিতান্তই পশ্চিমাদের ঐতিহ্য। পশ্চিমে মধ্যযুগে মে ডে অর্থাৎ স্প্রিং ফেসটিভ্যাল বা বসন্ত উৎসব উদযাপিত হতো। এই উৎসবে একজন ‘মে কুইন’ নির্বাচিত হতো। পরবর্তীতে আমেরিকাতে একজন তরুণীকে উৎপাদনশীলতা ও গোষ্ঠীর আদর্শের প্রতীক হিসেবে নির্বাচনের রীতি প্রচলিত হয়। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় শুধুমাত্র অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েরাই অংশ নিতে পারত।

এরপর ঊনিশ শতকে ১৩তম আর্ল অব এগলিংটন আর্চিবল্ড মন্টগোমারি মধ্যযুগীয় স্কটিশ রীতি ফিরিয়ে এনে আবারও সুন্দরী প্রতিযোগিতা চালু করেন। তিনি ১৮৩৯ সালে এগলিংটন ট্যুরনামেন্ট নামে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন যেটিতে সমারসেটের ডাচেস জরজিয়ানা সেমোর বিজয়ী হন। তাকে ‘কুইন অব বিউটি’ বা সুন্দরীদের রাণি উপাধি দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ১৮৫৪ সালে উদ্যোক্তা ফিনিস টেইলর বারনাম প্রথমবারের মতো আধুনিক আমেরিকান সুন্দরী নির্বাচনের প্রতিযোগিতা আয়োজন করেন যা পরে গণরোষের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৮৮০ সালের দিকে এসে এ ধরনের প্রতিযোগিতা আবারও চালু হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম সুন্দরী প্রতিযোগিতা শুরু হয় আমেরিকায়। ১৯২০ সালে টেক্সাসের গ্যালভেস্টনে ‘স্প্ল্যাশ ডে’ নামে একটা প্রতিযোগিতা হয় যেখানে নানা দেশ থেকে যাওয়া সুন্দরী তরুণী ট্যুরিস্টরা অংশ নিতে পারত।

তারপর বৈশ্বিক আধিপত্য যখন পশ্চিমাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন এ প্রতিযোগিতা বিশ্বায়নের কল্যাণে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান সুন্দরী প্রতিযোগিতার যে আদল, তার সঙ্গে পুঁজিবাদী চিন্তা ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কারণ এ আদলের শুরুটা মূলত বাণিজ্যিক।

১৯৪৬ সালে বিকিনি আবিষ্কারের পর বিকিনিকে জনপ্রিয় করতে আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নারীদের বিকিনি পরে অংশ নিতে হতো। কিন্তু ক্যাথলিক চার্চ ও পোপের আপত্তিতে সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে বিকিনি রাউন্ড বাদ দেওয়া হয়। এরপর অন্য আরও নানা দেশ থেকেও বিকিনির ব্যাপারে আপত্তি ওঠে। ধারাবাহিকভাবে বিতর্কিত হওয়ায় ২০১৪ সালে অন্যতম বিউটি প্যাজেন্ট মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা থেকে বিকিনি রাউন্ড বাদ দেওয়া হয়।

কিন্তু বিকিনি রাউন্ড বাদ দেওয়ার মানেই কি নারীকে পণ্যায়ন করা থেকে মুক্ত করা হয়েছে? কখনোই না। নারীর এ রূপসৌন্দর্য্যকে আরও নানাভাবে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিল করছে ভোগবাদী গোষ্ঠী।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজে সুন্দরী প্রতিযোগিতা পণ্য প্রচারণা ও বিক্রয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত। নিতান্ত ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে প্রাসঙ্গিক করে রাখা হয়েছে। যার ফলে একবিংশ শতাব্দীর এই সচেতন সময়ে এসে একদল নারী মূল্যায়িত হচ্ছেন নিতান্ত মাংসপিণ্ড হিসেবে।

আগের সংবাদডিএমপির আট থানার ওসি রদবদল
পরবর্তি সংবাদএকেপি থেকে দাউদ উগলু’র পদত্যাগ : বিভক্তি কি বদলে দেবে তুরস্কের রাজনীতির মানচিত্র?