জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নৈশ মাদরাসা

রাগিব রব্বানি :

চলতি ও বিগত দশকে বয়স্ক ও কর্মজীবী ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের দীনি শিক্ষা গ্রহণের জন্য রাজধানীসহ দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে নৈশ মাদরাসা নামে বেশ কিছু বিশেষায়িত মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বতন্ত্র সিলেবাসে এ ধরনের মাদরাসায় একজন সাধারণ শিক্ষিত লোক নিজের কর্মব্যস্ততার বাইরে পড়াশোনা করে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত উত্তীর্ণ হবার সুযোগ রয়েছে।

স্বতন্ত্র সিলেবাসে পরিচালিত এসব নৈশ মাদরাসা নজর কাড়ছে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ধর্মপ্রাণ শ্রেণির নাগরিকদের। চাকরি ও পেশাগত দৈনন্দিন কাজ শেষে সন্ধ্যের দিকে দীনি শিক্ষাগ্রহণের এ সুযোগকে কাজে লাগাতে চান তাঁরা।

রাজধানীর মুহাম্মদপুরে বসিলা রোডস্থ একটি নৈশ মাদরাসায় পড়াশোনা করেন সাইদুল আলম। বসিলা রোডে তাঁর টেইলারিংয়ের দোকান রয়েছে। সন্ধ্যার দিকে নৈশ মাদরাসায় তিনি নিয়মিত ক্লাস করেন। একবছরের ফরজে আইন কোর্স সমাপ্ত করে এখন তিনি তরজমায়ে কুরআন কোর্সের ছাত্র। তিনি জানান, ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি তাঁর প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। কিন্তু পড়াশোনার বয়স পার হয়ে যাবার কারণে এবং দিনমান দোকান পরিচালনার ব্যস্ততা থাকার কারণে এ বিষয়ে তিনি হতাশ ছিলেন। গত বছর তাঁর এলাকায় নৈশ মাদরাসার কথা প্রথম জানতে পারেন তিনি। তারপরই সিদ্ধান্ত নেন, এ মাদরাসায় ভর্তি হবেন। দিনমান দোকানের ব্যস্ততা গোছিয়ে সন্ধ্যায় প্রতিদিন ক্লাস করতে যান সেখানে।

নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে সাইদুল আলম বলেন, কুরআন শুদ্ধ করে পড়তে পারতাম না, নামাজ-কালামেও কোনো শুদ্ধাশুদ্ধি ছিল না, একবছর ক্লাস করে এখন আলহামদুলিল্লাহ জীবনযাপনের আবশ্যিক ইলমগুলো অর্জন করতে পেরেছি। কুরআন তেলাওতও সহি হয়েছে। আমার ইচ্ছা, নৈশ মাদরাসায় পড়ে দাওরা পর্যন্ত আমি উত্তীর্ণ হবো।’

নৈশ মাদরাসাগুলোর পড়াশোনার দেখভাল ও সমন্বয়ের জন্য রয়েছে ‘নৈশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ নামে স্বতন্ত্র একটি শিক্ষাবোর্ড। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবোর্ডটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন রাজধানীর মসজিদুল আকবর কমপ্লেক্স মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা নাজমুদ্দিন। মহাসচিবের দায়িত্বে আছেন মুফতি জহিরুল ইসলাম সিরাজি।

মাওলানা সিরাজি জানান, রাজধানীসহ চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, গাজীপুর, শেরপুর এবং টঙ্গীতে বোর্ডের অধীনে ২২টির মতো নৈশ মাদরাসা রয়েছে। বোর্ডের নেসাব অনুযায়ী মোট তিনটি মারহালায় এ সমস্ত মাদরাসায় পাঠদান করে ছাত্রদেরকে দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি হবার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়।

তিন মারহালার প্রথমটি ফরজে আইন কোর্স। এ মারহালার মেয়াদ একবছর। শিক্ষার্থীরা প্রাথমিকভাবে এই মারহালায় পড়াশোনা করে নামাজ-কালাম তেলাওত বিশুদ্ধকরণসহ দীনের আবশ্যিক জ্ঞান অর্জন করেন।

দ্বিতীয় মারহালা তরজমায়ে কুরআন কোর্স। এ মারহালার মেয়াদ দুই বছর। সরফ-নাহবেমির পর্যায়ের কিতাবের পাশাপাশি এ দুই বছরে তরজমায়ে কুরআন মোটামুটি আয়ত্ব করার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।

তৃতীয় মারহালা আলেম কোর্স। এ মারহালার মেয়াদ তিন বছর। তিন বছরে একজন শিক্ষার্থীকে মেশকাত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কিতাবাদি পড়িয়ে দিয়ে দাওরায়ে হাদিসে ভর্তি হবার উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়।

মাওলানা সিরাজি জানান, নৈশ মাদরাসা বোর্ডের অধীনে প্রতি বছর এ তিন মারহালার ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। বোর্ডের অধীন প্রায় সবকয়টি মাদরাসাই এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। তবে ফরজে আইন কোর্সের ছাত্রসংখ্যাই বেশি থাকে অন্যান্য মারহালার তুলনায়।

নৈশ মাদরাসার প্রতি ধর্মপ্রাণ জেনারেল শিক্ষিত ও কর্মজীবী মানুষের তুমুল আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন নৈশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের মহাসচিব মুফতি জহিরুল ইসলাম সিরাজি। একই মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন সিলেটের ইসলামিক ফিকহ ইন্সটিটিউটের অধীনে পরিচালিত নৈশ মাদরাসার নির্বাহী পরিচালক মুফতি জিয়াউর রহমানও।

মুফতি জিয়াউর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে আমরা যখন নৈশ মাদরাসা চালু করি, তখন থেকে আশাতীত সাড়া পেয়ে আসছি সাধারণ শিক্ষিত ও কর্মজীবী মানুষদের কাছ থেকে।

তিনি বলেন, দীন শেখার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বিকল্প নেই। তাবলিগ বা দাওয়াতি মেহনতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আমলের উন্নতি হয় ঠিক, কিন্তু দীনি ইলম অর্জনে সেভাবে কোনো তরক্কি হয় না। তাই সাধারণ শিক্ষিতদের মধ্যে দীনি ইলম চর্চা ব্যাপক করার লক্ষ্যে নৈশ মাদরাসা একটি কার্যকরী পদক্ষেপ। এই চিন্তা থেকেই আমরা সিলেটে নৈশ মাদরাসা চালু করেছি। এ দুই বছরের মেহনতে আমাদের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখন তরজমায়ে কুরআন কোর্সে আছেন। তাঁরা, আলহামদুলিল্লাহ, এখন কুরআনের তরজমা বুঝতেও সক্ষম। অথচ দুবছর আগে তাঁদের অনেকের কুরআন তেলাওতও বিশুদ্ধ ছিল না। নিজেদের দৈনন্দিন ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা রাত্রিবেলার নিয়মিত ক্লাস করে যাচ্ছেন।

কিন্তু চাহিদার তুলনায় এ ধরনের মাদরাসার সংখ্যা কম থাকায় এবং কর্মস্থল থেকে মাদরাসাগুলোর দূরত্বের কারণে এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছেন না অনেকেই। এমনটা জানিয়েছেন নৈশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের মহাসচিব মুফতি জহিরুল ইসলাম সিরাজি।

মাওলানা সিরাজি বলেন, কর্মজীবী ধর্মপ্রাণ মানুষদের কাছ থেকে নিয়মিত ফোন আসে আমাদের কাছে, যাতে তাদের এলাকায় একটা মাদরাসা চালু করা হয়। কারণ, নিজের আবাস ও কর্মস্থলের কাছাকাছি না হলে নৈশ মাদরাসায় ক্লাস করা তাদের জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের এই চাহিদা ও আগ্রহের তুলনায় আমাদের সামর্থ ও উদ্যোগ অনেক কম। যার ফলে তাদের আগ্রহে আমরা সেভাবে কোনো সাড়া দিতে ব্যর্থ হই।

আগের সংবাদমহাকাশ থেকে কাবার ছবি তুলে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করলেন মুসলিম নভোচারী
পরবর্তি সংবাদফারাক্কার ধাক্কায় প্লাবিত সারাদেশ