
রাকিবুল হাসান :
চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া পুরুষদের সুন্নত খতনা নিষিদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে সুইডেনের ‘সেন্টার পার্টি’। গত সপ্তাহে তাদের বার্ষিক বৈঠকে পুরুষদের খতনা প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হলে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বিতর্ক হয়। সুন্নত খতনাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আইন করারও প্রস্তাব দেয়া হয় বৈঠকে। ধর্মীয় দিকটি বিবেচনার বাইরে রেখে শিশুর অধিকারের কথা বলে এই খতনা নিষিদ্ধকরণের প্রস্তাবনা আনা হয়।
সুইডেনে বসবাসকারী প্রায় দশ লক্ষ মুসলমান এমন প্রস্তাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি উদ্বিগ্ন হচ্ছেন ইহুদীরাও। তবে এমন প্রস্তাব ‘সেন্টার পার্টি’ এই প্রথম উত্থাপনকারী করল বিষয়টি তেমন নয়। বরং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ডানপন্থী দল এবং বামপন্থী দল গডেস্ক ক্রোনিকা ‘১৮ বছর বয়সের আগে খতনা নিষিদ্ধ’ এই মর্মে একটি আইনের খসড়া প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছিলো।
ইস্যুটির নেপথ্যে
ইস্যুটি বহুবছর আগের। ২০০৯ সালে পৌরসভা এবং সংসদ মিলে হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মাধ্যমে খতনা প্রক্রিয়া কার্যকরের প্রস্তাব করে। ফলে খতনার পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধায় ডাক্তাররা। তারা খতনা করতে অস্বীকার করে বসে।
২০০৯ সালের এক জরিপ অনুসারে ৭০ শতাংশ বিশেষজ্ঞ সার্জন খতনা করাতে অস্বীকার করে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করে—’ডাক্তারগণ শরীরের অসুস্থ অংশ কিংবা রোগীর বর্ণনার ভিত্তিতে চিকিৎসা করে। সভ্যতা ও ধর্মের অংশ হওয়ার কারণে চিকিৎসা করে না।’
বিশেষজ্ঞরা সরে দাঁড়ালে অবিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়েই খতনা করানো শুরু হয়। এতে কয়েকজন বাচ্চা খুব জটিলতার মুখে পড়ে। এরপর জনগণের প্রবল চাপে হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞদের খতনা করানোর কাজে তৎপর করতে বাধ্য হয় রাজনৈতিক নেতারা। বিবিসির প্রতিবেন বলছে, জনগণের এই খতনার পক্ষে দাঁড়ানোর এই ঢেউ অন্যান্য দেশকেও দোলা দিয়ে যায়।
আইসল্যান্ড
সুইডেনে খতনা প্রসঙ্গটি বক্তৃতা-বিবৃতি, প্রস্তাবনা এবং নির্বাচনী আলোচনায় আবদ্ধ। কিন্তু আইসল্যান্ডে ২০১৮ সালে সংসদে একটি প্রস্তাবনা আনা হয়। তাতে বলা হয়—২০০৫ সালে করা মহিলাদের খতনা নিষিদ্ধ আইনের সাথে পুরুষদের খতনা নিষিদ্ধ আইনটিও যুক্ত করা হোক। যেন সব শিশুদের খতনা নিষিদ্ধ নিয়মটি ব্যাপক হয়ে যায়।
কিন্তু সংসদ প্রস্তাবটি পাশ করেনি। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনটি কয়েকজন চিকিৎসকের তীব্র সমর্থন পেয়েছিলো এবং সঙ্গে তিন ধর্মীয় নেতাদের পক্ষ থেকেও প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলো।
বাচ্চাদের অধিকার প্রশ্ন
খতনা নিষিদ্ধের পক্ষে যারা ওকালতি করছেন, তাদের প্রধান শ্লোগান হলো বাচ্চাদের অধিকার রক্ষা। কেননা ধর্মীয়ভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে মা-বাবারা বাচ্চার খতনা করান। এতে বাচ্চার স্বাধীন অধিকার খর্ব হয়। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার তাসামিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পুরুষদের খতনা আইন সংশোধন চিকিৎসাগতভাবে ন্যায়সঙ্গত নয়’ বলে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। তাতে তুলে ধরা হয় বিভিন্ন প্রশ্ন, ডাক্তারদের সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম তত্ত্ব, বাচ্চাদের অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মাঝে পার্থক্য। অবশ্য একে ইসলামোফোবিয়া বলে সন্দেহ করার অনেক কারণ আছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলে?
আমেরিকান একাডেমি অফ ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানদের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘যারা সুন্নত খতনা করে না, তাদের তুলনায় যারা সুন্নত খতনা করে তারা যৌনরোগ থেকে সুরক্ষিত থাকে বেশি । আরও অনেক গবেষণায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সুন্নত খতনা যৌনাঙ্গে ক্যান্সার হওয়া থেকে রক্ষা করে।’
যাদের খতনায় সমস্যা হয়, তাদের সংখ্যা দশ হাজারে মাত্র ছয়জন। সুতরাং এই হিসাব থেকে প্রতীয়মান হয়, খতনার ক্ষতিকারক দিকটি কত দুর্লভের চেয়েও দুর্লভ!
আল জাজিরা অবলম্বনে
