
রাগিব রব্বানি :
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছাত্র-রাজনীতি বেশ প্রতিষ্ঠিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সবকয়টি আলিয়া মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির চর্চা বিদ্যমান। সেই সুবাদে আশির দশক থেকে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোতেও শুরু হয় ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র-রাজনীতির চর্চা। বর্তমানে সবকয়টি ইসলামি দলের ছাত্র সংগঠন আছে এবং মাদরাসা-ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র রাজনীতিতে সকলেই তৎপর। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর থেকে মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে আলেমদের বড় একটি অংশ মাদরাসাভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র-রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছেন শুরু থেকেই। এ বিষয়ে ইসলাম বিষয়ক লেখক মাওলানা মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী বিশিষ্ট রাজনীতিক মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী’র বরাতে বলেন, ৮০-র দশকে হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.-এর খেলাফত আন্দোলন চলাকালীন প্রশ্ন ওঠে মাদরাসায় ছাত্রেরা রাজনীতিতে যুক্ত হবে কি না। এ প্রশ্নে মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. ও শাইখুল হাদীস মাওলানা আজিজুল হক রহ. ছাত্র-রাজনীতির পক্ষে মতামত দেন। পক্ষান্তরে লালবাগ মাদরাসার তৎকালীন পরিচালক মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ সাহেব রহ. ও মুহাদ্দিস মাওলানা ছালাহ উদ্দীন সাহেব রহ. মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির বিপক্ষে মতামত দেন। মুহতারাম মাওলানা আব্দুর রহীম ইসলামাবাদী সাহেব, যিনি সে-সময় খেলাফত আন্দোলনের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন, এমনটাই বলেছেন আমাকে।
মাওলানা গোলাম রব্বানী বলেন, এখান থেকেই খেলাফত আন্দোলনের ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং শেষোক্ত দুই হযরত লালবাগ ছেড়ে জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি প্রতিষ্ঠা করে চলে যান। অর্থাৎ, বহুল আলোচিত খেলাফত আন্দোলনের ভাঙ্গনের শুরুর কারণ ছিল মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির প্রসঙ্গ।
তবে শুরুতে হজরত হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর অমতের কারণে খেলাফত আন্দোলন মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা করলেও বর্তমানে সংগঠনটি এ বিরোধিতা থেকে সরে এসেছে। বর্তমানকার ইসলাম-ভিত্তিক সকল রাজনৈতিক দলেরই ছাত্র সংগঠন আছে এবং প্রায় সকল ঘরানার ইসলামি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাদরাসায় ছাত্ররাজনীতিকে সমর্থন করেন।
হাফেজ্জি হুজুর রহ. মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির কেন বিরোধিতা করেছিলেন এবং বর্তমানে কেন তাঁর দল এ বিরোধিতা থেকে সরে এল? এ বিষয়ে কথা বলেছেন খেলাফত আন্দোলনের বর্তমান আমির এবং হাফেজ্জি হুজুরের সাহেবজাদা মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ হাফেজ্জি।
মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির চর্চায় হজরত হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর বিরোধিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আব্বাজান রহ.-এর কাছে যখন অধ্যাপক আখতার ফারুক রহ.-সহ অনেকে ছাত্র সংগঠনের প্রস্তাব দিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, ছাত্র সংগঠনের কিছু নিয়মনীতি থাকে আর মাদরাসারও নিয়মনীতি আছে। উভয় নিয়মনীতি, কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় কঠিন। আর ছাত্ররা দেখা যাবে অনেক সময় মাদরাসার নিয়মের চেয়ে সংগঠনের নিয়মকে বেশি প্রাধান্য দেবে। এর দ্বারা উস্তাদদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের আশঙ্কা থাকে। আর মাদরাসার ছাত্রদের পূর্ণ সফলতা নির্ভর করে উস্তাদদের নিয়মের কাছে নিজেদের পরিপূর্ণ সমর্পণের মধ্যেই। তাই আব্বার পরামর্শ ছিল ছাত্ররা উস্তাদদের তত্ত্বাবধানে সরাসরি আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করুক। আলাদা ছাত্র রাজনীতির আওতায় না যাক। তবে যেহেতু স্কুল কলেজে সঠিক ইসলামি আন্দোলন করার সুযোগ নেই তাই আলেমদের সাথে তাদের সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য সেখানে ইসলামি ছাত্র সংগঠন হতে পারে।
হাফেজ্জি হুজুরের সেই মত থেকে দলের সরে আসার বিষয়ে মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ হাফেজ্জি বলেন, সময় এখন অনেক বদলেছে। আব্বা রহ. যখন রাজনীতি করেছেন, তখন আলেমরা সবাই এক পতাকার নিচে ছিলেন। আলাদা ছাত্র সংগঠনের দরকার ছিল না। এখন বিভিন্ন সংগঠন হয়েছে, সহীহধারার পাশাপাশি বাতিল ধারার সংগঠনও বর্তমানে বিদ্যমান। তাই ছাত্রদের সহীহ ধারায় ধরে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের তত্ত্বাবধানে ছাত্র সংগঠন করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ ও সময়ে পরিবর্তন এসেছে। পরিবেশ ও প্রয়োজনের ভিন্নতার কারণে যেহেতু শরিয়তের হুকুমও পরিবর্তন হতে পারে তাই হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর কথাও বর্তমান সময়ে এভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
রাজনীতিক আলেমগণ মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে সম্মত থাকলেও দেশের অরাজনৈতিক আলেমগণ এ ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানে নেই। ছোটবড় অধিকাংশ কওমি মাদরাসায়ই ছাত্র রাজনীতি আইনত নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ছাত্রদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি এবং একাধিক সংগঠন থাকার কারণে ছাত্রদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হতে পারে।
রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ মাদরাসা জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদের নায়েবে মুহতামিম মুফতি নুরুল আমীন ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ছাত্র রাজনীতির ফলে মাদরাসায় ছাত্রদের মধ্যে নানামাত্রিক উশৃংখলতার সৃষ্টি হয়। একাধিক দল থাকার কারণে মাদরাসায় রাজনীতির অনুমতি দিলে একদল আরেক দলের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া নিজ দলের সঙ্গে মাদরাসার কোনো উসতাদের মতের অমিল দেখলে সেই উসতাদকে নানাভাবে অবজ্ঞা করার চেষ্টা করে ছাত্ররা। পড়াশোনার ক্ষতি তো আর আছেই। এসব এখন বাস্তবতা। এই বাস্তবতা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছেন আমাদের মাদরাসার আকাবিররা। তাই শুরু থেকেই ফরিদাবাদে ছাত্র রাজনীতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
মুফতি নুরুল আমিনের এই কথাগুলোকে আরেকটু বিস্তারিত করে বলেছেন মাওলানা গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, ছাত্র-রাজনীতির বিষয়টি এখন মাদরাসার জন্য বেশ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তি-পাল্টাযুক্তি দিয়ে তর্ক-বিতর্কের উঠোন হয় তো বড় করা যেতে পারে কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফলাফল সকল যুক্তিকেই পরাজিত করছে এখন। ছাত্র-রাজনীতি কওমি মাদরাসার মধ্যে এখন দু’টো মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। এক. ছাত্রদের মধ্যে বিভক্তি। দুই. শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা হ্রাস। যেহেতু ছাত্রেরা তাদের পছন্দানুযায়ী দল করে, সেখানে একেক দলের একেক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনুসারী ছাত্রেরাও ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শুরু হয় নিজ-দলের দৃষ্টিভঙ্গিকে অপর-দলের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রাধান্য দেয়ার পালা। জন্ম নেয় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতা, নিজদলের নেতাদের প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন আর অন্যদলের নেতাদের ছোট করে দেখার মানসিকতা। এগুলোই ধীরে-ধীরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের প্রতি দায়বদ্ধতাকে ব্যহত করে। ছাত্রেরা দলকে সবকিছুর ঊর্ধে স্থান দেবার চেষ্টা করে। যে শিক্ষক তার দলকে সমর্থন করেন না বা বিরোধিতা করেন, সে-শিক্ষককে তির্যক-দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা শুরু হয়। এখান থেকে জন্ম নেয় অভদ্র আচরণ বা শৃঙখলা ভঙ্গের মতো নিন্দনীয় কাজ। অনেক সময় দেখা যায়, একটি দলের অনুসারী কোনো ছাত্রের বিরুদ্ধে মাদরাসা ব্যবস্থা নিলে সে-দলের অন্যেরা প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়।
মাওলানা গোলাম রব্বানী বলেন, মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির অতীত থেকে আমি নিজে সেসব তিক্ত ঘটনার কথা জেনেছি। ১৯৮৫ সালে হাটহাজারী মাদরাসায় কওমী আদর্শ পরিপন্থী একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মী-সমর্থক কর্তৃক হামলার ঘটনায় উপরের সব উপাদান উপস্থিত ছিলো। ওসব কারণে পরবর্তীতে ফটিকছড়ির নাজিরহাট বড় মাদরাসায়ও হামলার ঘটনা ঘটে।
তবে মাদরাসায় ছাত্র-রাজনীতির চর্চার পক্ষে যাঁরা জোরালো বক্তব্য দেন, তাঁদের যুক্তি হচ্ছে ছাত্রদের প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরি করা অতীব জরুরি, আর এ নেতৃত্ব তৈরির জন্য ছাত্র রাজনীতির চর্চা আবশ্যক।
এ বিষয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজধানীর বারিধারা মাদরাসার শায়খুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, একজন তালিবুল ইলমকে দরসি পড়াশোনার পাশাপাশি বক্তব্য ও লেখালেখিতে পারঙ্গম করে তোলা যেমন জরুরি, তেমনি দেশ ও উম্মাহ’র সংকট ও সম্ভবনা সম্পর্কে সচেতন করে তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের যোগ্যতা বিকশিত করাও আবশ্যক। আর এ জন্য ছাত্র রাজনীতির বিকল্প নেই।
মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, বাংলাদেশ বলুন আর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বলুন, মুসলিম উম্মাহ নানাভাবে বিপর্যস্ত আজ। বাংলাদেশে ইসলামি শক্তির অবস্থা নতজানু হয়ে আছে। যোগ্য নেতৃত্বের অভাব এখানে প্রকট। আজকের মাদরাসার ছাত্ররাই আগামী দিনের উম্মাহর কাণ্ডারী। তাদেরকে যদি রাজনীতি বিষয়ে এখন থেকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া না হয়, তাহলে পড়াশোনা শেষ রাজনীতির এ যোগ্যতাটা হাসিল করবার সুযোগ তাঁদের আর হবে না। এসব দিক বিবেচনা করেই আমরা বলি, দেশের প্রতিটা মাদরাসায় ইসলামি রাজনীতির চর্চা অবাধ করে দেওয়া জরুরি।
রাজনীতি করতে গিয়ে মাদরাসার অভ্যন্তরে নানাবিধ উশৃঙ্খলা সৃষ্টির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বারিধারা মাদরাসার প্রবীণ এ আলেম বলেন, শিক্ষকদের সঠিক নেগরানি থাকলে এবং তাঁরা শুদ্ধধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে বা এ বিষয়ে সচেতন থাকলে ছাত্রদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ থাকবে না।
নিজের মাদরাসাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বারিধারা মাদরাসায় তো আমভাবে ছাত্ররা রাজনীতি করছে, কই এখানেতা বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় না৷ রাজনীতির কারণে ছেলেদের পড়াশোনায়ও কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। বেফাকে প্রতি বছরই তো আমাদের ছেলেরা ভালো ফলাফল করে আসছে।
