আবরার ফাহাদ যেভাবে চিন্তা করতেন

হামমাদ রাগিব :

৭ অক্টোবরের আগে আবরার ফাহাদকে কেউ চিনত না। বুয়েটের আর দশজন শিক্ষার্থীর মতো তিনিও ছিলেন সাধারণ এক শিক্ষার্থী। যে ফেসবুক-অ্যাক্টিভিটির কারণে তিনি খুন হয়েছেন, সেখানেও তিনি সেলিব্রেটি পর্যায়ের কেউ ছিলেন না। আর দশজন ফেসবুক-অ্যাক্টিভিস্টের মতোই ছিল তাঁর অ্যাক্টিভিটি। কিন্তু ৭ অক্টোবর নির্মমভাবে শাহাদত বরণের পর আবরার ফাহাদ হয়ে উঠেছেন আধিপত্যবাদের রাহুগ্রাসে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের জ্বলন্ত এক দৃষ্টান্ত।

আবরার ফাহাদ যে চিন্তার লালন করতেন, সেটা আটপৌরে কিন্তু সচেতন একজন বাঙালি মুসলিম তরুণেরই চিন্তা। ফেসবুকে তাঁর পাবলিক পোস্টগুলো পর্যালোচনা করলে অন্তত এটাই প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এ দেশের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে যেমন তিনি সচেতন ছিলেন, তেম্নি একজন মুসলিম হিসেবে, তারচেয়েও বড় পরিচয় একজন মানুষ হিসেবে তিনি কাশ্মীরের মজলুম মুসলমানদের পক্ষেও ছিলেন সোচ্চার। আর এ দুয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ভারতের। ভারত একদিকে যেমন কাশ্মীরকে দখলদারিত্ব যাতাকলে পিষ্ট করছে বিগত ৭০ বছর ধরে, অন্যদিকে একাত্তরের পর থেকে নানাভাবে বাংলাদেশের ন্যায্য অনেক অধিকার কুক্ষিগত করে রেখেছে। সেই সঙ্গে আধিপত্যবাদের কৌশলী চাল চেলে এ দেশের নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে অবাধে।

আর এখান থেকেই মূলত ভারতের প্রতি আবরার ফাহাদের ঘৃণা এবং দ্বেষের জন্ম। এ ঘৃণা যে কেবল আবরার ফাহাদের একার, এমন নয়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব-সচেতন প্রতিটা তরুণের ভেতরই এমন ঘৃণা কাজ করে প্রতিনিয়ত।

এই ঘৃণা কিংবা দেশপ্রেম থেকেই ভারত-বিরোধী ব্যাঙ্গাত্মক দুই-চারটা কথাবার্তা ফেসবুকে লিখেছিলেন আবরার ফাহাদ। এবং এই কথাবার্তার কারণেই ‘সার্বভৌমত্বের রক্ষকদের’ হাতে জীবন দিতে হয়েছে তাঁকে।

আবরার কীভাবে বা কেমন চিন্তা করতেন, আমরা তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনের পাবলিক পোস্টগুলোর দিকে নজর দিলেই একটা নিকেষ দাঁড় করাতে পারব। কারণ, আবরার মৃত্যুর আগ অবধি ওভাবে আলোচিত ছিলেন না, কিংবা খুব বিশেষ ও আলাদাভাবে তাঁর কোনো চিন্তা ছিল না, তাই ফেসবুকের পাবলিক পোস্টগুলোতে নিজের যে অবস্থান তিনি জানান দিয়ে রেখে গেছেন, ওগুলোই মূলত তাঁর চিন্তা হিসেবে বিবেচ্য।

ভারতের আগ্রাসন এবং দেশের ক্রান্তি ও সমস্যা নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্যই মূলত নানাভাবে নিজের টাইমলাইনে শেয়ার করতেন তিনি। সর্বশেষ যে পোস্টের কারণে ছাত্রলীগ নেতারা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, সেখানে তিনি ভারতকে বন্দর, নদীর পানি ও গ্যাস দেওয়া প্রসঙ্গে বেশ মার্জিত ও শালীন ভাষায় ব্যাঙ্গ করেছেন।

এর আগের পোস্টেও কদিন আগে ফারাক্কা বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেওয়া এবং বাংলাদেশ কর্তৃক ভারতকে ইলিশ উপহার দেওয়া প্রসঙ্গে ব্যঙ্গ করেছেন। ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ভারতকে হিন্দুস্তান বলেও উল্লেখ করেছেন।

তার আগের দুই-তিনটি পোস্টে হলের খাবার-দাবার, নিজের বিয়ে নিয়ে মজাক করেছেন। এই বয়সের তরুণরা যেমনটা করে থাকেন সচরাচর। কদিন আগে কনে কর্তৃক বরকে বিয়ে করে নিয়ে আসার ঘটনা নিয়েও বিবিসির একটা নিউজ শেয়ার করে হাল্কা মজাক করেছেন।

আগস্ট মাসে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাঙালির জেনোফোবিক রেসিস্ট মনোভাব এবং সরকার-স্পন্সর্ড জনমতের বিপক্ষে বেশ জোরালো মন্তব্য করেছেন। এর আগে পাকিস্তান ভাঙার ইতিহাস সম্পর্কে একটা নিউজ শেয়ার করে ছোট্ট একটা মন্তব্য করেছেন।

এর আগে ভারত কর্তৃক কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় কাশ্মীরিদের পক্ষে বেশ কয়েকটি নিউজ শেয়ার করে নিজের মন্তব্য জুড়ে দিয়েছেন। ‘কাশ্মীর নিয়ে মন্তব্য করায় এক বাংলাদেশি গ্রেপ্তার’ শিরোনামের একটা নিউজ শেয়ার করে সেখানে লিখেছেন, ‘কলকাতার দাদারা কিন্তু আপনাগো ওপর ক্ষেপবো।’ এই সময়টায় ‘স্টপ কিলিং ইন কাশ্মীর’ শিরোনামের একটা পিকচারে নিজের ছবি লাগিয়ে প্রোফাইল পিকচারে সেঁটে দিয়েছেন। পিকচারটি এখনও সেভাবেই সেঁটে আছে।

৯ আগস্ট ঢাকায় অধ্যয়নরত কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলের একটি ভিডিও শেয়ার করে সেখানে লিখেছেন, ‘এই ছেলে-মেয়েগুলা জানে না তারা কি অসাধ্য কাজ করেছে। শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে তাকবির ধ্বনি! কোন ইসলামপন্থী কাউকে শহীদ মিনারের আঙিনায় দেখলেই তেড়ে আসা মুখোশধারী নাস্তিকদের উপেক্ষা করে এই ধ্বনি বাংলার জন্যও মাইলফলক।’

তাঁর এই কথাগুলো থেকেই মূলত তাঁর চিন্তার জায়গাটা মোটামুটি পরিস্কার হয়ে যায়। একদিকে নিজের দেশপ্রেম, দেশের সার্বভৌমত্ব চিন্তা, অপরদিকে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাস,আস্থা এবং ধর্মবিদ্বেষীদের ব্যাপারে নিজের খেদ তাঁর এই এক পোস্ট থেকেই সামগ্রিকভাবে উঠে আসে।

আবরার ফাহাদ নিজের ফেসবুক টাইমলাইনের পোস্টগুলোর প্রাইভেসি সাধারণত অনলি ফ্রেন্ড করে রাখতেন। খুব কম পোস্টের প্রাইভেসি তিনি পাবলিক করতেন। অনলি ফ্রেন্ড পোস্টেও তাঁর ধর্মানুরাগের বিষয়টি বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত। গত ২২ মে নীলক্ষেতের একটি আরবি ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সের বিষয়ে স্ট্যাটাস লিখেন তিনি। কোর্সটি তিনি দুই মাস ধরে করছেন এবং দুই মাসে বেশ উপকৃত হয়েছেন এবং আরবি শিখতে তাঁর বেশ ‘মজা’ লাগছে বলে জানান সেই স্ট্যাটাসে। পাশাপাশি বুয়েট ছাত্রদের এরকম একটা কোর্স করে নিজেদের স্কিল আরও ডেভলপ করার আহ্বানও জানান।

সেই পোস্টের কমেন্টবক্সে আরবি ভাষাকে হেয় করে তাঁর দুইএকজন বন্ধুর আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জবাবে তিনি যে কথাগুলো ভদ্র ও মার্জিতভাবে বলেছেন, সেখানে ধর্মের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণের দিকটাই ফুটে ওঠে।

এ ছাড়া তিনি যে সৎ এবং সত্যান্বেষী একজন তরুণ ছিলেন, তাঁর শাহাদাতের পর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটা স্ক্রিনশটেও তা বেশ ভালোভাবে অনুধাবন করা যায়। স্ক্রিনশটটিতে দেখা যায় সেলিব্রেটি পর্যায়ের ইসলামপন্থী কোনো দাঈর কাছে ইনবক্সে তিনি পরামর্শ চেয়েছেন। গত বছর নভেম্বরের ২৪ তারিখে সেন্ড করা ম্যাসেজটিতে তিনি লিখেছেন, ‘ভাইয়া, আমি বুয়েটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমি বর্তমানে হলে থাকি। হলে আসার পর থেকে রাজনৈতিক অরাজনৈতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে আমাকে তাদের দলে যুক্ত হবার দাওয়াত দিচ্ছে। এদের মধ্যে তাবলিগ জামাতকেই আমার কাছে উত্তম বলে মনে হচ্ছে। এই ব্যাপারে ভাইয়া আপনার মতামত চাই। তাবলীগের অনেক আকিদা সম্পর্কেই বিভ্রান্তি আছে বলে অনেকে বলছে, এগুলো কি সত্য? বা এর থেকে উত্তম কোনো গোষ্ঠী আছে কিনা তা জানতে চাই।’

আবরারের ধর্মানুরাগ ও সত্যান্বেষণের আগ্রহ কতটা প্রবল ও প্রগাঢ় ছিল, ছোট্ট এ ম্যাসেজ থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায়।

তাঁর এই ধরনের অ্যাকটিভিটি, দেশপ্রেম, সত্যান্বেষণ এবং ধর্মানুরাগের কারণেই তাঁকে শিবির-কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে তাঁর হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার কোশেশ করেছে ছাত্রলীগ। সেই কোশেশ ধুপে না টিকলেও এটাকে আবার জিন্দা করার চেষ্টা হয়তো করছেন অনেকে। শিবির করা সাংবিধানিকভাবে কিংবা রাষ্ট্রীয় আইনে যদিও কোনো অপরাধ না, কিন্তু গত একদশকের নানা প্রচার-অপপ্রচারের মাধ্যমে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনগুলো থেকেও খতরনাক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবরার শিবির করলেও, এবং শিবিরকে ‘খতরনাক’ সংগঠন হিসেবে ধরে নিলেও তাঁকে সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলার কারণে হত্যা করে ফেলা কোন আইনে বৈধ হয় আল্লাহ মালুম।

আবরার শিবির করতেন, এটার প্রমাণ এখন পর্যন্ত ওভাবে কেউ দিতে পারেননি। ফেসবুক টাইমলাইনে উদ্ধৃত যে কথা ও চিন্তার শেয়ার তিনি করেছেন, শুধু এ কারণে তাঁকে শিবির ট্যাগ দেওয়া হলে এ দেশের কোটি তরুণকে শিবিরকর্মী বলতে হবে। কারণ, আবরার যে আটপৌরে চিন্তার লালন করতেন, সেটা কেবল তাঁর একার চিন্তা না, দেশের সচেতন প্রতিটা বাঙালি মুসলিম ঠিক একই চিন্তার লালনে নিজেকে নিমগ্ন রাখেন সর্বদা।

আগের সংবাদআবরার ফাহাদের শাহাদাত ও তাঁর চিন্তাগত সিলসিলা
পরবর্তি সংবাদ‘আবরারকে হত্যা করেছে কি অসিদ্ধ ছাত্র-রাজনীতি?’