আবরার ফাহাদের শাহাদাত ও তাঁর চিন্তাগত সিলসিলা

মুসান্না মেহবুব :

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব-প্রশ্নে সোচ্চার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের শাহাদাত দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে অন্যরকম এক নাড়া দিয়ে গেছে। ভারত যেখানে বাংলাদেশকে নানাভাবে ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে আসছে, সেখানে নতুন করে দেশটিকে আমাদের বন্দর, নদীর পানি এবং গ্যাস প্রদানের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মার্জিত ভাষায় ব্যাঙ্গাত্বক ফেসবুক-পোস্টের জেরে মেধাবী এ শিক্ষার্থীকে খুন করে ফেলা হয়েছে। তাঁর মর্মান্তিক এ শাহাদাতের পর বাংলাদেশের প্রতিবাদহীন পরিবেশ বেশ অনেকদিন পর আবারও প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে।

বুয়েটসহ অন্যান্য প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। আবরার হত্যার দ্রুত বিচারসহ ১০ দফা দাবি নিয়ে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে সোচ্চার হয়েছেন সচেতন শ্রেণির মানুষজনও। মোটকথা আবরারের মর্মান্তিক এ শাহাদাত দীর্ঘদিনের প্রতিবাদহীন নিস্তরঙ্গ পরিবেশে নতুন এক মাত্রা এবং হাহাকারের আওয়াজ তৈরি করেছে।

আবরার ফাহাদ দেশের সার্বভৌমত্ব-প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন, একই সঙ্গে শঙ্কাগ্রস্থও। বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র হবার পরও ভারতের কূটনীতির কাছে বরাবর ও বারবার নতজানু হয়ে থাকা, বাংলাদেশকে নানা ধরনের অসুবিধার মধ্যে রেখেও ভারত নিজেদের যাবতীয় সুবিধা আদায় করে নেওয়া ইত্যাদি বিষয় তাঁকে ব্যথিত ও হতাশ করে রেখেছিল। তাঁর মতো আরও যাঁরা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে শংকাগ্রস্ত, দেশের নানা দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে সোচ্চার, তাঁর এ শাহাদাত, চিন্তাগত সিলসিলা এবং শাহাদাত-পরবর্তী প্রতিবাদমুখরতা আগামীর দিনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম দেশের কয়েকজন ইসলামিক স্কলারের সঙ্গে।

চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেম ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজ-অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন শহীদ আবরারের মর্মান্তিক শাহাদতকে এ দেশের রাজনীতির চূড়ান্ত অবক্ষয়ের পরিণতি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ক্ষমতায় যখন যারা থাকে, তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো দেশের শিক্ষাঙ্গনে নানামাত্রিক অন্যায় ও অপকর্ম ছড়ায়। ফলে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি বিগত দুয়েক দশকে আমাদের কপালে কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়েছে। আর এই কলঙ্কের সর্বশেষ উদাহরণ আবরার ফাহাদের মর্মান্তিক শাহাদাত।

তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতির দ্বারা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন হয়েছে, ছয় দফা আন্দোলন হয়েছে, স্বাধীনতার পরে নব্বই দশক অবধিও ছাত্ররাজনীতি আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও অধিকার প্রশ্নে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু এখন এসে এটা আমাদের কলঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শিক্ষাঙ্গনকে এই রাজনীতি থেকে মুক্ত করা এখন অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আমি মনে করি।

আবরারের শাহাদাত, শাহাদাত-পরবর্তী প্রতিবাদমুখরতা এবং সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে তাঁর চিন্তাগত অবস্থান আগামীতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে জানতে চাইলে ড. আ ফ ম খালিদ বলেন, সার্বভৌমত্ব-প্রশ্নে সচেতন থাকাটা আমাদের জন্য জরুরি, আবরার জীবন দিয়ে সেটা জানিয়ে গেছেন। এর দীর্ঘমেয়াদি একটা প্রভাব অবশ্যই থাকবে বলে আমি মনে করি।

তবে আবরারের শাহাদত-পরবর্তী প্রতিবাদমুখরতায় খুব বেশি আশাবাদী নন আলেম চিন্তাবিদ ও ইসলাম টাইমস টুয়েন্টি ফোর ডটকমের সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, বর্তমানে প্রতিবাদহীনতার একটা সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি, মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছি সকল অন্যায়, এই সময়টায় আবরার ফাহাদের স্ট্যাটাস, স্ট্যাটাসের জেরে তাঁর শাহাদাত এবং এই মর্মান্তিক ঘটনায় দেশজুড়ে মানুষজনের বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া—এগুলো আশাবাদী করে তুলে যে, আগামীতে দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে তরুণ সমাজসহ বিভিন্ন অঙ্গনকে কথা বলতে, মাঠে নামতে উদ্বুদ্ধ করবে। কিন্তু নিকট অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক আশাবাদ সৃষ্টি করার মতো ঘটনাও নানা কারণে নানাভাবে স্তিমিত করে দেওয়া হয়েছে, অথবা স্তিমিত হয়ে গেছে। এজন্য নীরবতার একটা অন্ধকার সময় শেষ না হলে, এ ধরনের ঘটনা, যে ঘটনাগুলো মানুষকে ব্যাপকভাবে জাগ্রত করার কথা, নিকট ভবিষ্যতে কতটা প্রভাব ফেলবে তা চূড়ান্তভাবে বলা মুশকিল।

তিনি বলেন, নীরবতায় নীরবতায় এই সময়টা প্রলম্বিত হতে থাকে কি-না, নানা কারণে এই আশঙ্কাটা আমার কাছে প্রবল মনে হয়। বাকি, আবরারের শাহাদাত কিংবা এই ধরনের প্রতিবাদ যে বৃথা, সেটা কিন্তু না। এই ঘটনাগুলো খুব সাম্প্রতিক কালে কোনো ধরনের প্রভাব যদি না-ও ফেলে, তারপরও এর একটা গুরুত্ব ইতিহাসের পাতায় আলাদাভাবে অবশ্যই থাকবে। কারণ, ছোট ছোট এসব ঘটনা, দ্রোহ এবং প্রতিবাদ সমন্বিতভাবে একটা বড়রকমের ফলাফলের দিকেই ধাবিত হয়।

তবে আবরারের এই আত্মদানকে আধিপত্যবাদ মুকাবেলার বড় একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন গবেষক আলেম ও কবি মুসা আল হাফিজ। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, আবরার এখন আর আবরার নয়, আধিপত্যবাদ প্রতিরোধের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আবরার জীবন দিয়ে আধিপত্য প্রতিরোধের যে পয়গাম শুনিয়ে গেছেন, আমরা, বাংলাদেশের মানুষ, সেভাবে সেই পয়গামে সাড়া দিতে পারিনি। এ থেকে কিছু আশঙ্কা স্পষ্ট হতে চলছে। আধিপত্যবাদ আরো যদি উলঙ্গ হয়, তবুও সম্ভবত কিছু কিছু আবরার শহীদ হবে, আর আমরাও থাকবো আমাদের মতো, মেনে নেবো সবকিছু।

মুসা আল হাফিজ বলেন, আবরার ইস্যুটাকে বুঝতেই দেয়া হচ্ছে না। এটা ছাত্রলীগের অন্য আট-দশটা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা নয়। এটা এ দেশের মধ্যে দেশের স্বার্থ দেখা, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া বনাম দেশের স্বার্থ দলিত করা এবং আধিপত্যবাদের গোলামিকে অনিবার্য করার ইস্যু। প্রথম চেতনার রক্ত ঝরেছে দ্বিতীয় চেতনার কাছে, আর এতে ঘটেছে চেতনাপন্থীর শাহাদাত। অতএব নিছক বিচার চাওয়া আর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশই এ ঘটনার উচিত প্রতিক্রিয়া নয়। এর পাশাপাশি এদেরকে নিছক খুনী হিসেবে দেখা হবে নাকি স্বাধিকারের রক্ষীদের হত্যায় নিয়োজিত শক্তির সাথে এদের যোগসাজশ তলিয়ে দেখা হবে, সে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকটাকে এড়িয়ে নিছক একটি খুনের প্রতিক্রিয়া আর কয়েকজনের বিচারের আবদার জানানো অতিসরল এক প্রক্রিয়া, যা দেখে আধিপত্যবাদ ও তার সান্ত্রী-সেপাইরা হয়তো মজা করে হাসবে।

কবি মুসা আল হাফিজ আরও বলেন, আধিপত্যবাদের মুকাবেলায় জাতীয় স্বার্থরক্ষার যে আওয়াজ আবরার উচ্চারণ করেছেন, এ আওয়াজই এখন আসল আবরার। তাঁকে বাঁচাবো নাকি দ্বিতীয়বার মারবো, আমাদের ভেবে দেখা দরকার।

আগের সংবাদআবরার হত্যাকাণ্ড : মিডিয়া যেভাবে উপস্থাপন করেছে
পরবর্তি সংবাদআবরার ফাহাদ যেভাবে চিন্তা করতেন