
হামমাদ রাগিব
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে প্রতিবাদ ও ক্ষোভের তৈরি হয়েছে পুরো দেশ জুড়ে। ৭ অক্টোবর সোমবার গভীর রাতে ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে শেরে বাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারত-বিরোধী স্ট্যাটাস লেখার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রক্যাডারদের হাতে আবরার ফাহাদ খুন হয়েছেন বলে ব্যাপকভাবে অভিযোগ উঠেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুয়েটের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীসহ দেশজুড়ে আবরার হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ চলমান। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডকে আলাদা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সারা দেশের মানুষ।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত সামাজিক মাধ্যমগুলোর পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বেশ গুরুত্বের সঙ্গে কাভার করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মধ্য থেকে রয়টার্স, ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল কারণ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানিচুক্তি বিষয়ে আবরারের ফেসবুক পোস্টের সমালোচনাকে উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া আল জাজিরা, গালফ নিউজ, গার্ডিয়ান, বিবিসিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচিত হয়েছে হত্যাকাণ্ডের খবর।
হত্যাকাণ্ডের পরপর সোমবার সকাল অবধি দেশীয় মিডিয়াগুলো খুব একটা সরব না হলেও সকাল সাড়ে আটাট-নটায় বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সর্বস্তরের মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অফলাইনেও যখন তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন, তখন থেকেই তৎপর হয়ে ওঠে মিডিয়াগুলো। এবং এ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত আপডেট জানাতে শুরু করে।
আবরার হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশে মিডিয়ার তৎপরতা এবং উপস্থাপনার ইতি ও নেতিবাচকতা বিষয়ে একান্ত পর্যবেক্ষণ জানতে চেয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে কথা হয়েছিল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এন্থ্রোপলজি বিভাগের সিনিয়র লেকচারার খন্দকার রাকিবের সঙ্গে।
খন্দকার রাকিব বলেন, সামগ্রিকভাবে মিডিয়াগুলো আবরার হত্যাকাণ্ডকে বেশ পেশাদারিত্বের সাথে কাভার করেছে এবং করে যাচ্ছে। কিন্তু এই পেশাদারিত্ব তাঁরা নিয়ে এসেছে হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে। হত্যাকাণ্ডের দিন সকাল আটটা-নয়টা অবধি কিন্তু মূলধারার বেশ কয়েকটি মিডিয়াকে আমি দেখেছি এ ঘটনাকে তারা ‘শিবির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা’ বলে প্রচার করেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের সমাজে কাউকে প্রকাশ্যে নিপীড়ন এবং মারধর করা হলে বিষয়টা নিয়ে সমাজে এক ধরনের সংবেদনশীলতা কাজ করে। কিন্তু যদি এই নিপীড়নের শিকার ব্যক্তির নামের আগে ‘শিবির’, ‘জিহাদি বইসহ আটক’, ‘জঙ্গীবাদী’ এ ধরনের শব্দ জুড়ে দেয়া হয়, তাহলে দেখা যায় আগের সংবেদনশীলতাটা সেরকম কাজ করে না। ফলে সমাজে এই নিপীড়নের একটা বৈধতার পাশাপাশি নিপীড়নের ঘটনাকে সহজেই ‘ডি-ক্রিমিনালাইজ এবং ডি-হিউম্যানাইজ’ করা যায়। আব্রারের হত্যার পর অনেক মূলধারার মিডিয়া কিন্তু নিপীড়কদের বয়ান মোতাবেক এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে হত্যা বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষের কাছে এক একধরনের নৈতিক বৈধতা দিতে চেয়েছিল শুরুতে। কিন্তু আবরার যেহেতু বুয়েটের শিক্ষার্থী, আর বুয়েট যেহেতু সমাজের মধ্যবিত্তসহ নানান শ্রেণীর অভিভাবকদের সন্তানদের প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনার সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত জায়গা, তাই এখানে এ ধরনের একটা হত্যাকাণ্ড সকলের কাছেই অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। ফলে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণিকে ঘটনাটা স্পর্শ করেছে প্রচণ্ডভাবে।
খন্দকার রাকিব বলেন, স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা এ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ফেসবুক-ইউটিউবসহ নিও-মিডিয়াতে প্রতিবাদী ও সোচ্চার হয়েছেন। পাশাপাশি সাধারণ শ্রেণির মানুষজনও বুয়েটের মতো একটা জায়গায় এমন হত্যাকাণ্ডে হতবাক হয়েছেন। তাঁরাও সোচ্চার হয়েছেন। ফলে ‘শিবির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা’ টাইপের শিরোনাম ও বক্তব্য দিয়ে সকাল নয়টার পরে আর খবর প্রকাশ করতে দেখা যায়নি তেমন কোনো গণমাধ্যমকে। বরং এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত আপডেট দিতে তাঁদের অনেককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও পূর্ণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে দেখা গেছে। কয়েকজন সংবাদকর্মীর বেশকিছু রিপোর্ট প্রশংসাযোগ্যও বটে। তবে হত্যাকাণ্ডের পর এই হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট নানাবিধ বিষয়কে যে উপায়ে হাজির করার কথা, সেটা নিয়ে কিছু প্রশ্ন কিন্তু এখনও থেকে গেছে।
এদিকে আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মিডিয়ার ভূমিকাকে প্রশ্নাতীত বলতে রাজি নন ফ্যাক্টচেক ডটকমের সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশিরও। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এই প্রথম নয়, নিকট অতীতে আমরা দেখেছি ক্ষমতাসীন রাজনীতির ছত্রছায়ায় আরও অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেসব হত্যাকাণ্ডের তুলনায় আবরার হত্যার বিষয়টা মিডিয়ার কাভারেজ ভালো পেয়েছে এবং তুলনামূলক ইতিবাচকভাবেই পেয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ এবং এর মদদদাতাদের বিষয়টি নানাভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
কদরুদ্দীন শিশির বলেন, আবরার হত্যার পেছনে এখন পর্যন্ত যে সমস্ত তথ্য উঠে এসেছে এসব তথ্যের ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় তাঁর ভারত-বিরোধী অবস্থানের কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। অন্য আরও নানা তথ্য উঠে এসেছে, তবে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য। কিন্তু মিডিয়ার সামগ্রিক কভারেজে এই বিষয়টাকে বারবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা একটা বিষয়। দ্বিতীয় যে বিষয়টা সেটা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট, তাদের মূল পরিচয়কে, আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, রাজনৈতিক পরিচয়কে সরাসরি উল্লেখ না করে ঘুরিয়ে বলার প্রবণতা। অথচ এ ক্ষেত্রে মিডিয়া জোরালো ভূমিকা রাখতে পারত। এবং রাখাটাই পেশাদারিত্ব।
কদরুদ্দীন শিশির আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্র বা ক্ষমতার যে একটা ছত্রছায়া ও অভিভাবকত্ব রয়েছে, সেটাকেও আড়াল করে রাখা হচ্ছে মিডিয়ার কভারেজ থেকে। হত্যাটাকে নিছক ছাত্ররাজনীতির পরিণতি বা র্যাগিং সংস্কৃতির ফল হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ এখানে র্যাগিং ও ছাত্ররাজনীতির চেয়েও বড় বিষয় ছিল ক্ষমতাসীনদের আস্কারা ও মদদ।
তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতির সুবাদে বাংলাদেশে অতীতে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঠিক, কিন্তু সেটা সংঘর্ষ বা দুপক্ষের আক্রমণ প্রতিআক্রমণের মধ্য দিয়ে হয়েছে। কাউকে প্ল্যান করে সিস্টেমেটিকলি এভাবে মারধোর করা এবং মেরে ফেলা নিছকই ছাত্ররাজনীতির কারণে হয় না। বরং অন্য কোনো পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের জন্যই করা হয়। যেখানে বিপুল ক্ষমতাশীলদের মদদ থাকে। আর আবরার হত্যাকাণ্ডে মিডিয়া সরব ভূমিকা পালন করলেও এই বিষয়গুলো ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, কৌশলে এড়িয়ে গেছে।
