‘আবরারকে হত্যা করেছে কি অসিদ্ধ ছাত্র-রাজনীতি?’

মনযূরুল হক :

প্রশ্নের উত্তর সেই বহুল চর্চিত রাজনৈতিক গল্পটা দিয়ে শুরু করি—
প্রতিবেশি একটা দুষ্টু ছেলেকে জব্দ করতে বড় ছেলেকে বাবা দায়িত্ব দিলেন, পেলেই যেন তাকে দাবড়ানি দেয়। তো একদিন হাতেনাতে পেয়ে বড় ছেলে দিলো ধাওয়া। ছেলেটা পালাতে গিয়ে রাস্তার খাম্বার সাথে ধাক্কা খেলো। মাথা ফেটে গেলে তার। মরো মরো অবস্থা। বাবা তার ছেলেকে বললেন, এর জন্য দায়ি আমি নই। তুই অপরাধী। আর অপরাধীর কোনও পরিবার নেই। তোর জন্য এই ঘর নিষিদ্ধ। তো ছেলে ঘর ছাড়া হলো। এবার বাবা তার ছোট ছেলেকে পূর্বের দায়িত্বে নিয়োগ দিলেন।

আবরার হত্যাকাণ্ডকে এই গল্পের সঙ্গে মেলান। যদিও তাকে ‘শিবির সন্দেহে’ হালকা আঘাত করতে গিয়ে দুর্ঘটনাক্রমে তার মৃত্যু হয়েছে—এই বিষয়ে আমরা একমত নই। ইফতির স্বীকারোক্তি অনুসারে তাকে অনিক যে-পরিমাণে স্ট্যাম্প দিয়ে মেরেছে, তাতে বুয়েটের ইলেক্ট্রনিক্সের ছাত্র তো ভালো, মেডিকেলের কার্ডিয়াকের ছাত্র হলেও মৃত্যু ঘটবে। চলুন, আমরা দেখি, তাকে কি ছাত্র-রাজনীতি মেরেছে, নাকি মুরব্বি রাজনীতি।

এক.

আবরারের খুনের মোটিভ কী ছিল—?

১. শিবির সন্দেহ করা। শিবির হচ্ছে একাত্তরের রাজাকার জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন। ছাত্রলীগ যেহেতু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী আওয়ামীলীগের ছাত্রসংগঠন, সুতরাং আদর্শিকভাবে ছাত্রলীগ তাকে খুন করতে পারে।

২. সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে আওয়ামীলীগ সরকারের চুক্তির বিরোধিতা করে ফেসবুকে নিহতের পোস্ট। ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে যে চুক্তি, সেটা কি ছাত্রলীগ দ্বারা সংঘটিত, নাকি ছাত্রলীগের একান্ত নিজস্ব সাংগঠনিক নীতি-বিরোধী? বরং আওয়ামীলীগের বিরোধিতা কেউ করলে তাকে যেন আঘাত করা হয়, এটা হলো ছাত্রলীগকে দেওয়া আওয়ামীলীগের অ্যাসাইনমেন্ট। তাহলে দায়টা কার?

৩. র‌্যাগিং। এই অপরাধ পৃথিবীজুড়ে বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এটা শুধু রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্ররা করে, তা নয় এবং ছাত্ররাজনীতি যেখানে নেই সেখানে হয় না, তা-ও নয়। প্রশ্ন হলো, এমন একটা অপরাধ ছাত্রলীগের ছেলেরা ঘটালো কী করে? উত্তর, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়, তাই লীগের তাবেদার বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসন পরোক্ষ ছাত্রলীগকে প্রশ্রয় দেয়। প্রশাসনের লোকদের সিসিটিভি ফুটেজ গোপন করার চেষ্টা এবং আবরারের লাশ আর তার চারপাশে খুনিদের দেখেও প্রভোস্ট যে একবার পুলিশ পর্যন্ত ডাকেন নি, তাতে স্পষ্ট, তারা এসব কাণ্ড সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। তাহলে দোষের মূলে কারা?

প্রমাণ হয়, আবরার হত্যাকাণ্ড ছাত্র-রাজনীতির নিজ-সৃষ্ট অপরাধ নয়, বরং মূলধারার রাজনীতি ও প্রশাসনের অপরাধ। ছাত্ররা এখানে দাবার ঘুটিমাত্র। তারা নিশ্চিত ছিল, যেহেতু তাদের নির্দেশদাতা-দল ক্ষমতায় এবং প্রশাসন তাদের পক্ষে, সুতরাং গ্রেপ্তার হলেও সমস্যা নেই। বরং এমন হলে তারা মূলদলের আরও বেশি আস্থাভাজন হবে। ভবিষ্যতে আরও বড় নেতা পারবে। সুতরাং ছাত্র-রাজনীতি যদি অসিদ্ধ হয়, তাহলে মুরব্বিদের রাজনীতি সিদ্ধ হয় কী করে? আর এ-কারণে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যৌক্তিক হয়, তাহলে মূলধারার রাজনীতি আরও আগে নিষিদ্ধ করা উচিত নয় কেনো? তাদের কারণে, তাদের ছত্রচ্ছায়ায়, তাদের প্রশ্রয়ে, তাদের নির্দেশেই তো খুনোখুনিটা হয়। ছাত্ররা এখানে কেবল অস্ত্র—খুনি হলো বড়রা। তো আপনি খুনিকে সিদ্ধ বলে অস্ত্রকে নিষিদ্ধ বলছেন কী করে? খুনিকে গ্রেপ্তার না-করে অস্ত্রকে জেলখানায় পুরবেন কেনো? অস্ত্রকে, চাকুকে, লাঠিকে নিষিদ্ধ করবেন—যেহেতু ওটা কাটে, ভাঙে, মারে? তাহলে আপনার মা তরকারি কুটবেন কী দিয়ে, আপনার দাদা হাঁটবেন কিসে ভর করে, আপনার বাবা ডাকাত তাড়াবেন কী দিয়ে?

এখন এই কুযুক্তি দেবেন না যে, আদতে মূলসংগঠনের সঙ্গে ছাত্রসংগঠনের সম্পর্ক নেই এবং ছাত্রলীগের মতো দলগুলো অঙ্গসংগঠন না—তারা স্বতন্ত্র, তাদের সংবিধান আলাদা (যে-যুক্তি প্রধানমন্ত্রী দিচ্ছেন); তাই ছাত্রসংগঠন যা করছে, তার দায় তাদের। প্রশ্ন করি, ছাত্রলীগের সাংগঠনিক-প্রধান পদে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী কেনো? ছাত্রলীগের নেতৃত্বের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আওয়ামীলীগের বোর্ডমিটিংয়ে নেওয়া হয় কেনো? কেনো খুনিকে ধরতে আওয়ামী-মন্ত্রীদের নির্দেশ লাগে? তারা সরকারে থাকলে ছাত্রলীগের খুনিরা খালাস পায় কেনো? আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কেনো তাদের সাফাই গান? তাদের ইতিহাস কেনো আওয়ামীলীগের ইতিহাস বলে প্রচার করা হয়?

দুই.

আবরার হত্যার পরে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি উচ্চকিত হচ্ছে। তাদের যুক্তি হলো:

প্রথমত: ছাত্রসময়ে যারা রাজনীতি করে, তারা লেখাপড়ায় ভালো হয় না। তারা নিশ্চয় জানেন, রাজনীতিক বিজ্ঞানী বা গবেষক নন, যে তাকে স্টাডিতে এক নম্বর হতে হবে। হ্যাঁ, গবেষকও কখনও কখনও রাজনীতিক হয়ে ওঠেন। রাজনীতি একটা ভিন্ন চর্চা, ব্যবসার মতো শিখতে হয়। পড়ালেখাও জানতে হয়। ভালো ছাত্র ভালো রাজনীতিক না-ও হতে পারেন। আবার ঠিক উল্টোটাও হতে পারে। শেখ মুজিবুর ভালো ছাত্র ছিলেন না। শেরে বাংলা ভালো ছাত্র ছিলেন, ভালো রাজনীতিক নন। হোসেন সোহরাওয়ার্দি দুটোই ছিলেন। দেশের লাগাম থাকে রাজনৈতিকদের হাতে, কেতাবকীট শিক্ষাবিদ, ছাপোষা গবেষক, আলাভোলা বিজ্ঞানী, মাথামোটা সৈনিক, আর নরম হৃদয়ের বিশেষজ্ঞরা হরদম রাজনীতিবিদদের হুকুম তামিল করতে থাকেন।

ছাত্র-সময়ে যদি রাজনীতি করতে না পারে, কখন করবে? ছাত্রত্বের মেয়াদ কতদিন? ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’ টাইপের ফাউল কথা যদি বাদও দিই, তাহলেও বাস্তব অবস্থা একবার দেখুন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে একটা ছেলের বয়স নিদেনপক্ষে ২৪ বছর হয়। বিরাট একটা অংশের বয়স ২৭-২৮-ও পার হয়ে যায়। স্পেশালিস্ট হওয়ার আগ্রহ থাকলে এমফিল-পিএইচডি করতে আরও অন্তত ৬ বছর। নয়তো বিসিএস টাইপের কোচিং বা ইন্টার্নশিপ করতে গিয়ে কিংবা চাকরি খুঁজতে খুঁজতে বেশিরভাগের চাকরির বয়স যায় যায়। যদি কোনওমতে একটা জুটিয়েও ফেলা যায়, তবেও নিশ্চয় জানেন, কোনও প্রতিষ্ঠানে আজকাল রাজনীতি করা সিদ্ধ নয়। আবার রাজনীতিকদের লাভজনক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকাও নিষিদ্ধ। যৌবন কতদিন? বিয়ে-সংসার তো রাজনীতিক করবেন না। তিনি ত্যাগী। ওদিকে তাকে দল থেকে মাসে মাসে খোরপোশের যোগান দেওয়া হয় না।

তাই আমরা দেখি ছাত্র-রাজনীতি যারা করেন, তারা বছরের পর বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে দেন। সংগঠনের সভাপতি হন ৪২-৪৫ বছর বয়সে। লেখাপড়া চুকিয়ে ঢুকবেন যুব-সংগঠনে। যুবক থাকবেন ৬০ বছর অবধি। অবশেষে মূলদলে যদি কোনওমতে ঠাঁই হয়, তাহলে ৮০ বছর বয়সে ক্ষমতায় গেলে রেলমন্ত্রণালয়ের পেলেও পেতে পারেন।

একটা ছেলে ছাত্র-বয়সে রাজনীতি করতে পারবে না, পড়ন্ত যৌবনে চাকরি-বাকরি জুটিয়ে যুব-সংগঠন করবেন, তা-ও পারবেন না, তাহলে রাজনীতি করবে কারা? অশিক্ষিত-মূর্খ শ্রমিক আর বুড়োরা? রাজনীতি তো এমনিতেই বুড়োদের হাতে, যদিও ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ নয়, তাতেই। আর বন্ধ হলে তখন মৃত্যুমুখে পতিত মুমূর্ষুদের হাতে চলে যাবে, নিশ্চিত থাকেন।

ফলাফল কী? যেহেতু কর্মজীবনে চাকরি করলে রাজনীতি করা যাবে না, তা-ই সে-চেষ্টাও তারা করেন না। ফলে লেখাপড়াটাও হয়ে যায় পানসে। যুব সংগঠনে গিয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জুয়া আর আর ক্যাসিনো ছাড়া তো ভরসা নেই। সুতরাং সেটা ছাত্র-রাজনীতিক থাকতেই শিখে ফেলাই ভালো।

দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক হতে হলে ছাত্রসময়ে রাজনীতি করা দরকার নেই। যেমন ইমরান খান, অ্যাঞ্জেলা মার্কেল প্রমুখ যার উদাহরণ। আচ্ছা, নজরুল তো ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছিলেন। এখন কি বলবেন যে, ভালো সাহিত্যিক হতে হলে ক্লাস এইটের বেশি পড়তে হবে না? এরদোগান, আরাফাত, মাহাথির ও আহমেদিনেজাদের মতো বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক নেতাদের কেন চোখে পড়ে না? খান কিংবা মার্কেল হলেন বাইচান্স রাজনীতিক। বাইচান্স রাজনীতিক আর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিক এক নয়। আমরা আজকাল আসলে রাজনীতিকে অবৈধ ক্ষমতার গর্জনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি। রাজনীতি শুনলেই আমাদের বুকের জল শুকিয়ে যায়। হ্যাঁ, রাজনীতি সাহসী লোকেরই কাজ, ভীতুদের জন্য এ-পথ নয়।

তৃতীয়ত: এখন সুস্থধারার রাজনীতির চর্চা নেই, তাই ছাত্রদের এতে জড়িত হওয়া উচিত নয়। আচ্ছা, রাজনীতি তো জনমতের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। সুতরাং, এর মানে কি এটাই দাঁড়ায় না যে, জনমত হয়তো অসুস্থ অবস্থায় পৌঁছেছে? অথবা সঠিক রাজনীতির চর্চা নেই, কেবল ক্ষমতার নীতি প্রতিফলিত হচ্ছে। এটা যদি বুঝেই থাকেন, তাহলে সেটাকেই তো সমাধান করা দরকার।

চতুর্থত: ছাত্র-আন্দোলন থাকতে পারে, ছাত্র-রাজনীতি নয়। আন্দোলন ও রাজনীতি এক না। এ-ব্যাপারে কথা হলো, যে-কোনও আন্দোলন দাঁড়ায় কোনও শক্তিশালী থিউরির ওপর ভর করে। শিক্ষা আন্দোলন শিক্ষার ওপর, দাওয়াতি আন্দোলন দাওয়াতের ওপর, খেলাফত আন্দোলন খেলাফতের ওপর এবং রাজনৈতিক আন্দোলন রাজনীতির ওপর। তো ছাত্ররা যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলবে সেটা দাঁড়াবে কিসের ওপর? ‘আন্দোলন’ হলো রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের একটা মাধ্যম। রাজনীতি বন্ধ হলে নিশ্চয় রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য আন্দোলনের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে; অথবা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
একটা রাজনৈতিক আন্দোলন তখনই সফল হয়, যখন তাতে সর্বস্তরের জনগণের অংশ থাকে। রাজনীতিকদের কাজ হলো জাতীয় ইস্যুকে জনগণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়া। জাতীয় ইস্যুর সফলতা কিংবা ব্যর্থতার দায় সাধারণ মানুষ নেয় না। তাই কোনও গণআন্দোলন যদি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয় না-পায়, তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মতো আন্দোলনগুলো এ-কারণে সফল হয়েছে। নিকট অতীতের হেফাজত-শাহবাগ আন্দোলনকে সে-মতে বিচার করা যায়। রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন যতটুকু এগুলোতে, ঠিক ততটুকুই সফল এবং সেটুকু টিকে আছে। বাকিটুকু ধোয়াশা। কোটা-সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন মাঠে মারা গেছেও এ-কারণেই।

পঞ্চমত: একদলের দাবি, ছাত্র-রাজনীতি থাক, তবে সেটা ক্যাম্পাসের বাইরে। অর্থাৎ, মারামারি করবা, করো, প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে। সিনেমা দেখবা দেখো, তবে মাদরাসা থেকে দূরে। প্রতিষ্ঠান হলো মসজিদের মতো পবিত্র, ওখানে মাছি মারা যাবে না, শুধু কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে।

এটা কোনও মৌলিক কথা হতে পারে না। রাজনীতির প্রাক্টিস শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানেই হওয়া উচিত। যা করা হবে, তা শিক্ষকদের চোখের সামনে গবে। তাতে জবাবদিহিতা থাকবে, উভয় পক্ষের। আবরার খুনের পরে শিক্ষকদের যেই ভূমিকা আমরা দেখলাম, প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকলে সেটা হবে না, শিক্ষকরা দায় নেবে না। এমনকি বহিষ্কারের ক্ষমতাও তাদের থাকবে না। যা সে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে করেনি, তার দায় প্রতিষ্ঠান কেনো নেবে? ফলে লঘুপাপে হয় গুরুদণ্ড পাবে, নয় পাপ থেকে একেবারেই দায়মুক্তি ঘটবে পাপীর। অভিভাবকের আস্থা রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান কি তখন ছাত্রদের পূর্বযুগের মতো শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখবে? যদি রাজনীতির চর্চা বিশুদ্ধ হয়, তাহলে সেটা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে হলে আরও ভালো। আর যদি নষ্ট হয়, তাহলে রাজনীতি প্রতিষ্ঠানকে বাইরে টেনে নিয়ে যাবে, রাজনৈতিক দলের অফিসে গিয়ে প্রতিষ্ঠান নমঃ নমঃ করবে। আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের চেয়ে রাজনীতি অনেক বেশি পাওয়ারফুল।
শরাব পিনে দে মসজিদ মেঁ বৈঠ কর
ইয়া ওহ জাগা বাতা জাহাঁ খুদা নেহি…

তিন.

হ্যাঁ, এটা মানতে বাধা নেই যে, জাতীয় স্বার্থে বিশেষ পরিস্থিতিতে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু এই সময়ে দেশের যে-পরিস্থিতি, তাতে এমন দাবি তোলা হবে আত্মঘাতি। এখন হলো অবৈধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে ছাত্রদের আওয়াজ তোলার সময়। অবৈধ ক্ষমতাধারী সরকার কিন্তু সেটাই চায়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও মুখ ফসকে বলেছেন, ওটা তো মিলিটারি ডিকটেটরদের কাজ, তবে বুয়েটের বিষয়ে বিবেচনা করা যাবে। অর্থাৎ, ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের দাবিদাররা প্রকারন্তরে বিড়ালকে সাঁকো নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। মনে রাখবেন, এখন পর্যন্ত যতটুকু রাজনৈতিক আন্দোলন অবশিষ্ট আছে, সেটা সাহসী ছাত্রদের বদৌলতেই আছে। বুড়োরা তো কবেই সাহস হরিয়েছেন।

আজ ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করুন—কাল ছাত্রদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হবে, পরশু নিষেধাজ্ঞা আসবে ছাত্রদের রাজনৈতিক আলাপে। স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনের সময় ছাত্ররা চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকবে। অবৈধ একনায়কতন্ত্রের রাজত্ব চিরতরে উন্মুক্ত হবে। একটা ঠুণ্ডা জাতি গঠন হবে ধীরে ধীরে। সৌদিআরব ও মিয়ানমার এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

মূলধারার রাজনীতি নোংরা হওয়ার কারণেই যেহেতু ছাত্র-রাজনীতি কলুষিত হচ্ছে, তাই হয়তো মূলধারার রাজনীতিতে সংস্কার আনতে হবে, নয়তো মূলধারার রাজনীতি থেকে ছাত্র সংগঠনকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। ছাত্র অবস্থায় ক্যাম্পাসে বাইরের কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া নিষিদ্ধ হতে পারে। ক্যাম্পাসে আলাদা রাজনৈতিক দল থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে তারা নিবন্ধিত হবে। এজন্য ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। দেখুন মূলধারার রাজনীতি যারা করে, তারা একটা গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, চেয়্যারম্যান থেকে নিয়ে সংসদ সদস্য হতে পারে,। ছাত্ররা তো বুড়োদের তোয়াজ করা ছাড়া আর কিছুই পায় না। অথচ এই বয়সটা হলো অস্থির বয়স, কিছু করে দেখানোর বয়স। নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ চালু থাকলে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব উঠে আসবে।

এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসনিক নিয়োগ বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। তাদের যদি নিরপেক্ষ করা না-যায়, যদি দলান্ধ থাকে, তাহলে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলেও প্রশাসনের পেটুয়াবাহিনী ছাত্রদের নাকাল করতেই থাকবে। প্রয়োজনে তারা গুন্ডা ভাড়া করবে। ক্যাম্পাসভিত্তিক সাংগঠিন কার্যক্রম জোরদার করা গেলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ট্রান্সপারেন্সি থাকলে সেরা রাজনৈতিক নেতা গড়ে উঠবেই। বরং শিক্ষা শেষে যেমন বিভিন্ন চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান মেধাবী চাকুরেকে খুঁজে নেয়, তেমনি মেধাবী ছাত্রনেতাদের দলে নিতেও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো ঝাঁপিয়ে পড়বে।

সবিশেষ—
ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ করলে খুন বন্ধ হবে না। ক্যারিয়ারের পিছনে ইঁদুর দৌড় দৌড়াতে দৌড়াতে ছাত্ররা তো আজকাল রোবট হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি থাকলে অন্তত জাতীয় স্বার্থের অঙ্গার এসে মাঝেমধ্যে হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে যায়, না-থাকলে প্রদীপের সেটুকু আলোও নিভে যাবে। ব্যক্তিস্বার্থ এত বেশি মাথাচড়া দেবে যে, অর্থবিত্ত আর ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতায় খুন-খারাবি তখন হবে ডালভাত। খুন তো রাজনীতির কারণে হয় নাই—হয়েছে পাওয়ারের দাপটের কারণে। রাজনীতি কেবল একটা প্রলেপ মাত্র, যেটা দিয়ে জিনিসটার নোংরা দিকটা ঢেকে রাখা যায়। বরং রাজনীতি চর্চার অভাবেই থাকার ফলেই খুনটা হয়েছে। রাজনীতির মাঠ নষ্ট করে ক্ষমতার অন্যায় ব্যবহারই এই সকল জঘন্য কর্মকাণ্ডের জন্মদাতা। রাজনীতি থাকলে পাওয়ার কেন্দ্রীভূত হতে পারে না—গুণ্ডাদের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে না। অবৈধ ক্ষমতা জুলুমের সরুপথকেও মহাসড়ক বানিয়ে ফেলে।

ছাত্র রাজনীতি আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে কারা—নিরাবেগ রোবটরা? ছাত্র রাজনীতি নয়, বৃদ্ধ-রাজনীতি বন্ধ করুন। দেশে যা চলছে, যা স্রেফ বুড়াদের ভীমরতিমাত্র। দেশের প্রতিটি শিক্ষা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি চর্চার অবাধ সুযোগ তৈরি করার বিকল্প নেই এখন। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরলে অবৈধ ক্ষমতার পথ রুদ্ধ হবে বলেই রাজনীতির মাঠটাকে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি করে এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদের ভেতর নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারার দাবি তুলবেন না। আবরার হত্যার ফলাফল এমন জঘন্য হতে পারে না। বরং যেই ভারতীয় আধিপত্যবাদ আর বাংলাদেশি নতজানু মনোভাবের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মতামত দিতে গিয়েই আবরারের মতো মেধাবী ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে—আপনিও সেই ব্যাপারে একমত হন।

manzurul.haque267@gmail.com

আগের সংবাদআবরার ফাহাদ যেভাবে চিন্তা করতেন
পরবর্তি সংবাদআসরের পর হাফেজ এটিএম হেমায়েত উদ্দিনের জানাজা