
হামমাদ রাগিব :
সমকালীন ইসলামি রাজনীতির যে রূপ এবং অবয়ব, এর মূলে যাঁর নাম ও অবদানের দাস্তান বিমূর্ত হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়, তিনি মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসানুল বান্না রহমতুল্লাহ আলায়হি। এখন অক্টোবর মাস চলছে, শতাব্দীকাল পূর্বে, ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের এই মাসেই, ১৪ অক্টোবর, শহীদ হাসানুল বান্না মিশরের মাহমুদিয়া এলাকার সম্ভ্রান্ত এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
হাসানুল বান্নার বাবা শায়খ আহমদ আবদুর রহমান ছিলেন হাফেজে কুরআন এবং ইসলামি আইন শাস্ত্রে পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। আলেম বাবার কল্যাণে একদম শিশুঅবস্থায় প্রাথমিক পড়াশোনার হাতেখড়ি নিজের পরিবারে সম্পন্ন করে নেন হাসানুল বান্না। হিফজ করে নেন পবিত্র কুরআনও।
মিশরের ইসমাঈলিয়া শহরে তাঁর অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার সূচনা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ধর্মীয় জ্ঞানে ঋদ্ধ হন। এবং ১৪ বছর বয়সেই কিছুদিন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকেন। তারপর উচ্চশিক্ষাগ্রহণের জন্য ভর্তি হন আল আজহার ইউনিভার্সিটি’র শাখাপ্রতিষ্ঠান কায়রো দারুল উলুমে। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে দারুল উলুম থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেন। একই বছর মিশরের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসমাঈলিয়া শহরের মাদরাসা আমিরিয়ায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান।
ছাত্র থাকাবস্থায় সেই কৈশোর থেকে হাসানুল বান্নাকে মিশরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নানা কিসিমের ভাবনায় তাড়িত করত। রাষ্ট্রপক্ষের পশ্চিমা তোষণ, ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপ, খ্রিষ্টান মিশনারিদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি বিষয় তাঁকে পীড়া দিত। পীড়া দিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির টালমাটাল অবস্থাও। ইসলামি পুনর্জাগরণ নিয়ে তিনি ভাবতেন একান্তে, পড়াশোনা করতেন। সাথি-সঙ্গীদের আলাপচারিতায়ও উপস্থাপন করতেন এসব বিষয়।
কায়রো দারুল উলুমের যখন তিনি ছাত্র, সে সময়টায় ছোটখাটো সভাসেমিনারে নিজের বাগ্মিতার চর্চা করতেন, এই সুযোগে বক্তৃতায় মেলে ধরতেন নিজের চিন্তা ও ভাবনার ডালি। উপস্থিত শ্রোতারা তাঁর চিন্তা ও বাগ্মিতায় বিমুগ্ধ হতেন।
পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে তিনি যখন কায়রো থেকে ইসমাইলিয়া শহরে ফিরে আসলেন, ইসলামি জাগরণ ও তাঁর ভাবনার বাস্তবায়নের জন্য একটা কিছু করতে চাইলেন। এ উদ্দেশ্যে মাদরাসার ছুটির ফাঁকে ফাঁকে দেশের বড় বড় চিন্তাবিদ আলেমদের সঙ্গে দেখা করতে লাগলেন। চিন্তার বিনিময় করলেন বড় বড় মাশায়েখদের সাথে। কিন্তু সবার মধ্যে পুনর্জাগরণের কামনা থাকলেও বাস্তবপন্থায় উদ্যোগ গ্রহণে কাউকে আগ্রহী পেলেন না।
অবশেষে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ দানের এক বছরের মাথায়, ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে নিজের ছয় বন্ধুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আজকের বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন।
শুরুতে সামাজিক ও ধর্মীয় দাওয়াহমূলক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও একসময় তা রাজনৈতিক কর্মতৎপরতায় সক্রিয় ভূমিকা ও প্রভাব বিস্তার করে। প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ বছরের মতো সময় ইসমাঈলিয়া শহরে ছিল এর প্রধান কার্যালয়। হাসানুল বান্না নিজের দাওয়াতি মেজাজ, বাগ্মিতা ও যোগ্যতা বলে মিশরের আবু সবির, পোর্ট সায়িদ, সয়েজসহ ইসমাঈলিয়ার আশপাশের এলাকায় ইখওয়ানের ব্যাপক পরিচিতি ও সদস্যসংগ্রহে সক্ষম হন। এই সময়ের মধ্যে উল্লেখিত এলাকাগুলোতে ইখওয়ানের দশটি শাখা গঠিত হয়।
মিশরের ক্ষমতাসীন সরকার তাঁর এই তৎপরতাকে ভালোভাবে নিচ্ছিল না। তাই ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইসমাইলিয়ার মাদরাসা থেকে তাঁকে বদলি করে কায়রোর একটি মাদরাসায় পোস্টিং দেয়। হাসানুল বান্নার জন্য এ পোস্টিং আশির্বাদ হয়েই দেখা দেয়। কায়রো এসে তিনি নিজের কর্মপরিধিকে আরও বিস্তৃত করেন। ইসমাইলিয়া থেকে ইখওয়ানের হেডকোয়ার্টার কায়রোতে নিয়ে আসেন।
এ সময় তাঁর লিখনী ও বক্তৃতার সুবাদে মিশরের তরুণ শ্রেণি ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয় ইখওয়ানের প্রতি। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের বার্তা।
রাষ্ট্রপক্ষ শুরু থেকেই ভীত ছিল ইখওয়ানের তৎপরতায়। কিন্তু হাসানুল বান্না বারবার এ কথা বলে আসছিলেন যে, ক্ষমতা লাভের জন্য তাঁরা এসব করছেন না, বরং ক্ষমতাসীন যাঁরা আছেন তাঁদের ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ চিন্তায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত এবং দেশের তরুণদের ইসলামি চিন্তাধারায় সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতেই তাদের এই প্রয়াস।
হাসানুল বান্না তাঁর চিন্তাধারার আলোকে ইখওয়ানকর্মীদেরকে ইসলামের জিহাদনীতি বিষয়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে একাগ্র ছিলেন। একটা সময় সশস্ত্র বাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের কাছে বিভিন্ন দাওয়াতি পত্র লেখা হয়। যেখানে মন্ত্রীপরিষদের প্রতি আহ্বান জানানো হয় মিশরে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য।
তিরিশ ও চল্লিশের দশকে মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতায় নানাভাবে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, প্রত্যেক নতুন সরকারের কাছেই হাসানুল বান্না পত্র ও সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ইসলামি আইন বাস্তবায়নে নিজেদের আহ্বান পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু কোনো সরকারই কর্ণপাত করেনি সে আহ্বানে।
তিরিশের দশকের মাঝামাঝিতে ইখওয়ানের জয়জয়কার যখন মিশর জুড়ে, তখন জাতীয় নির্বাচনে হাসানুল বান্না অংশগ্রহণ করেন। ইসমাঈলিয়া এলাকা থেকে বিপুল ভোটে তিনি জয়লাভও করেন। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব ইখওয়ানের এ জয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রপক্ষ নানা অজুহাতে নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করে।
১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে হাসানুল বান্না ইখওয়ানের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে আরব বাহিনীর সহযোগিতা প্রদানের জন্য ফিলিস্তিন প্রেরণ করেন। আরব বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইখওয়ানকর্মীরা লড়াই করে। এ ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্ব ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। এবং তাদের অনুগত সরকারের মাধ্যমে একই বছরের ৮ ডিসেম্বর ইখওয়ানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কালো তালিকা ভুক্ত করা হয়।
নিষিদ্ধ ঘোষণার পর দেশজুড়ে ইখওয়ানের লাখ লাখ কর্মীকে গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের অপরাধ কেবল একটাই, তারা ইখওয়ানের সদস্য। ইখওয়ানের নেতাকর্মীকে গণহারে গ্রেপ্তার করা হলেও হাসানুল বান্নাকে গ্রেপ্তার করা হয় না। তবে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছিল। এমনকি তাঁর দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
হাসানুল বান্না বুঝে গিয়েছিলেন সরকারের এই কূটচাল। বিগত দুই দশকে তাঁকে নানা অজুহাতে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই দেশজুড়ে সমালোচনা এবং কোনো ধরনের অপরাধ সাব্যস্ত না হবার কারণে তাঁকে বেকসুর খালাস দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। তাই এবার আর গ্রেপ্তার বা বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, গুপ্তহত্যার আশ্রয় নিয়ে চিরতরে শেষ করে দিতে হবে।
হাসানুল বান্না নিজের নেতাকর্মীদের বলেও রেখেছিলেন এ কথা। এবং নিজেও প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এই পর্যায়ে যেকোনো সময় তাঁকে প্রাণ দিতে হতে পারে।
সেদিন ছিল ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি। কায়রোতে একটি সেমিনারে বক্তব্য প্রদান শেষে সভাস্থল থেকে বেরিয়ে আসার পথে সন্ধ্যেবেলা প্রকাশ্যে গুলি করে শহিদ করে দেওয়া হয় ইসলামি পুনর্জাগরণের অকুতোভয় এই সিপাহসালারকে।
