মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেলের ইন্তেকালের পর প্রতিক্রিয়া : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে যা বলেছিলেন

(৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খিষ্টাব্দ রবিবার দিন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল দেশের ধর্মীয় সমাজ ও পরিবার-পরিজনকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁর এই অকস্মাৎ বিদায়ে শোকে মুহ্যমান হয়েছিলেন বন্ধু, সহকর্মী, ছাত্র-উসতাদ এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা। ইন্তেকাল-পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁকে নিয়ে ফাতেহ সাপ্তাহিকী’র আজকের আয়োজনে সেসব অনুভূতির একাংশ তুলে ধরা হলো।)

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহ তাঁর ইন্তেকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের অনুভূতি’র কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমার ভাই ও বন্ধু হযরত আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহমতুল্লাহ আলায়হি অনেক গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তিনি মুজাহিদে মিল্লাত মুফতী আমিনী রহ.-এর প্রতিটি ঈমানী আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। মুফতী আমিনী রহ.-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। হক কথা নির্দ্বিধায় বলতেন। শরিয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেন। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য একটি চরম দুর্বিষহ সংবাদ।’

ইসলামি ঘরানার বিশিষ্ট লেখক মাওলানা ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘বন্ধু ওয়াসেল ছিলো―খুব মনোযোগী শ্রোতা এবং কল্যাণকামী উপদেষ্টা। পরিস্থিতি যতো কঠিন ওয়াসেল ততো সহজ-শান্ত-প্রাজ্ঞ। এই অমূল্য গুণ দিয়েই ওয়াসেল উঠে গেছে উপরের দিকে, একের পর এক সিঁড়ি। লেখক। সুসাহিত্যিক। মুহাদ্দিস। খতীব। মুহতামিম। সংগঠক। রাজনীতিক। সংবাদ বিশ্লেষক। বিশ্ব পরিক্রমার বোদ্ধা ভাষ্যকার… এইগুলো সব শিরোনাম! ভেতরে লুকিয়ে আছে সাফল্যের সোনালি-রুপোলি ছবি!’

খেলাফতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর ও ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী বলেন, ‘মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. ছিলেন একজন বিচক্ষণ আলেম, রাজনীতিবিদ ও কলমসৈনিক। তিনি কথা বলতেন কম, কাজ করতেন বেশি। আল্লামা মুফতী আমিনী রহ.-এর প্রিয় আস্থাভাজন ছিলেন। এত তাড়াতাড়ি তিনি মাওলার ডাকে সাড়া দেবেন তা আমাদের কারো কল্পনায়ও ছিল না। তাঁর ইন্তেকালে দেশ ও জাতি একজন প্রতিভাধর আলেম রাজনীতিবিদকে হারালো। আমি হারিয়েছি আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীকে।’

বিশিষ্ট অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা ওয়ালিউল্লাহ আরমান লেখেন, ‘আমাদের উভয়ের সাংগঠনিক কাজের ধরণ কিংবা ক্ষেত্র একইরকম ছিলো৷ প্রচারের কাজ করতাম আমরা৷ যদিও তিনি এই কাজে আমার চেয়ে অনেক যোগ্য এবং সিনিয়র ছিলেন৷ তাছাড়া দীর্ঘদিন মুজাহিদে মিল্লাত মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.-এর প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনের কারণে মিডিয়ার সাথে সম্পর্ক বিবেচনায় সমসাময়িক যেকোনো প্রচার সম্পাদকের চেয়ে তিনি বেশ এগিয়ে ছিলেন।

‘২০১৩-এর মার্চ-মে’তে হেফাজতে ইসলাম-এর নাস্তিক-মুরতাদবিরোধী উত্তাল আন্দোলন সংগ্রামের সময়ে ঢাকা মহানগর হেফাজত প্রচার সেল সদস্য হিসেবে ওয়াসেল ভাইর সাথে কাজের সূত্রে অম্লমধুর অভিজ্ঞতা হয়৷ কিছু প্রতিযোগিতা হয়৷ মিডিয়ার সাথে কাজের কার্যকর যুৎসই কিছু প্রক্রিয়া রপ্ত করি৷ গণমাধ্যমকে ‘লালবাগ থেকে বারিধারা’মুখী করতে গিয়ে কিছু অনাকাঙক্ষিত তিক্ততা হয় অগ্রজ ওয়াসেল ভাইর সাথে৷ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে, সরাসরি বিতর্কও হয়৷ কিন্তু সেই সাংগঠনিক প্রতিযোগিতার কারণে সম্প্রীতি ও সৌজন্যে সামান্যতম ঘাটতি আসেনি৷ দেখা হলে বরাবর সৌহার্দ্যপূর্ণ কথা হতো আমাদের মাঝে৷ সর্বশেষ গত রমজানের পূর্বে এক বিকেলে ঢাকা ভার্সিটির দোয়েল চত্বর অতিক্রমের সময় চলতি রিকশায় তার সাথে সালাম কালাম হয়৷ আচমকা আজ দুপুরে সেই আহলুল্লাহিল ওয়াসেল ভাইর মৃত্যুর সংবাদে বুকের বাম পাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছি৷ বড় অসময়ে হুট করে তিনি চলে গেলেন।’

ইসলামি লেখক ফোরামের সভাপতি জহির উদ্দীন বাবর লেখেন, ‘আহলুল্লাহ ওয়াসেল ভাই সাংবাদিকবান্ধব ছিলেন। আলেমদের মধ্যে এতো সাংবাদিকবান্ধব আর কাউকে দেখিনি। বিবিসি থেকে শুরু করে যেকোনো মিডিয়া থেকে যোগাযোগ করলে তিনি আশানুরূপ সাড়া দিতেন। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি মিডিয়ার দায়িত্ব পালন করতেন খুব দক্ষতার সঙ্গে। ২০১৫ সালে পল্টনের সালসাবিলে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের ছয়টি বইয়ের পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠানে লেখালেখির অনেক অজানা কথা জেনেছিলাম ওয়াসেল ভাইয়ের মুখ থেকে।

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয় উপস্থাপক গাজী সানাউল্লাহ লেখেন, ‘আমাদের সকলের প্রিয় মানুষ জামিয়া লালবাগের সিনিয়র উস্তাদ মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেব আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রজিউন। খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। থমকে দাঁড়ালাম। হায়..মৃত্যু আমাদের কত নিকটে। আর ভাল মানুষগুলো সব দুনিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার পরিবারকে সান্ত্বনা জানাবার ভাষা নেই। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ সাহেবের আপন খালাতো ভাই ছিলেন ওয়াসেল সাহেব। শরীফ ভাই আবেগী মানুষ। কীভাবে এই শোক সইবেন তিনি। নাহ… আর ভাবতে পারছি না। হে জান্নাতের মালিক, প্রিয় এই মানুষটিকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব কর। তার পরিবার,স্বজন ও সকল ছাত্রদের সবরে জামিল নসিব কর। আমিন। ইয়া রাব্বাল আলামিন।’

আওয়ার ইসলামের নির্বাহী সম্পাদক রোকন রাইয়ান লেখেন, ‘মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেবের সঙ্গে যতবার কথা বলেছি খুব বিনয়ের সঙ্গে তিনি সময় দিয়েছেন। নানারকম তথ্য জানাতেন কোনো রাখঢাক ছাড়াই। ভালো লাগতো বিষয়গুলো। তিনি খুব দ্রুতই চলে গেলেন। আল্লাহ তায়ালা উনাকে জন্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।’

ইনসাফ টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক মাহফুজ খন্দকার লেখেন, ‘ওয়াসেল সাহেব অনেক বছর মুফতী আমিনী রহ-এর প্রেস সচিব ছিলেন। মুফতী সাহেবের বক্তব্যগুলো প্রায় তিনিই লিখতেন। তিনি খুব সুন্দর করে প্রেস রিলিজ তৈরি করতে পারতেন। আমার দেখা ইসলামী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও গোছালো প্রেস রিলিজ তৈরি করে পাঠায় ইসলামী ঐক্যজোট। দলটির এই কৃতিত্বের পেছনে বড় অবদান ওয়াসেল সাহেবের।

‘২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলন চলাকালীন সময় তিনি ছিলেন সংগঠনটির প্রচার সেল প্রধান। সে সময় বেশ কিছু টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন তিনি। তখন বেশ তরুণ মনে হতো লোকটাকে। কিন্তু ২০১৬/১৭তে এসেই বেশ বুড়ো বুড়ো ভাব চলে আসলো চেহারায়। হয়তো দ্রুত চলে যাবেন বলেই এমন হচ্ছিল…। ওয়াসেল সাহেব অনেক কাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিশেষ করে মিডিয়া পাড়ায় তার কথা ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসবে।’

তাঁর ব্যক্তি জীবন নিয়ে আব্দুল্লাহ আল আমীন লেখেন, ‘আমিনী সাহেবের দীর্ঘদিনের সহকর্মী ছিলেন তিনি। নব্বইয়ের পর থেকে সবকটি আন্দোলনে সংগ্রামী অংশগ্রহণ রয়েছে তার। হুজুরের ব্যক্তিগত প্রেসসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বাতিলের ভিত কাঁপানো আমিনীর বজ্রকণ্ঠ বিভিন্ন পত্রিকায় তার হাত ধরেই পত্রস্থ হতো। তাই সংবাদ জগতে তাঁর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। শেষ সময়ে তার এই কাজে শরীক থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তার কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু দু বছর তিনি আমাকে দিয়ে নিউজ লেখা ও পাঠানোর কাজ করিয়েছেন। আমিনী সাহেব যেদিন মারা যাবেন, সেদিন দুপুরে ওয়াসেল সাহেব আমাকে দেখিয়ে বললেন, হুজুর! এখন তো নিউজের কাজ ও-ই করে। ওরে একটা কী-বোর্ড কিনে দেন। হুজুর বললেন, দাম কতো? বললেন, পাঁচশত টাকা। বললেন, আচ্ছা রাত্রে দিমুনে। রাতে হুজুর পরপারে চলে গেলেন।

আব্দুল্লাহ আল আমীন আরও লেখেন ‘আমিনী সাহেবকে একনিষ্ঠভাবে মহব্বত করতেন যারা তাদের মধ্যে ওয়াসেল সাহেব অন্যতম। হুজুরের ইন্তেকাল মুহূর্তেও তার এই মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ দেখেছি। হাসপাতালের শয্যাপাশে বসে সেই যে কাঁদছেন, কেঁদেই যাচ্ছেন। হুজুরের নিথর দেহে পরম মমতায় হাত বুলাচ্ছেন আর কেঁদেই যাচ্ছেন। সে সময় তার মতো অঝোরে কাঁদতে কাউকে দেখিনি। খুব নরম হৃদয়ের একজন আবেগী মানুষ। স্বল্পভাষী। কথা বলতেন মৃদু কণ্ঠে। পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক মতানৈক্যের এ কালে সব পক্ষের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গেই কথা বলতেন। বিনয়ের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাই ছিলো তাঁর প্রধানতম পরিচয়।’

‘তার মৃত্যুতে বেশি হতাশা এ জন্য যে, আমিনি রহ. এর জীবনী সম্বলিত জাতীয় স্মারকের কাজে তাকে খুব প্রয়োজন। তিনি কয়েকবার কাজ শুরুও করেছিলেন। টিমও তৈরী করেছিলেন। আমি প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণও সংগ্রহ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তা আর এগোয়নি। তার মৃত্যুতে হুজুরের জীবনের অনেক কিছুই হয়তো এখন অজানা থেকে যাবে।

‘তার জানাযার আয়োজন হয় তার দীর্ঘ তিরিশ বছরের স্মৃতি বিজড়িত লালবাগ শাহী মসজিদ প্রাঙ্গণেই। প্রিয় ছাত্রদের হাতেই গোসল ও কাফন সম্পন্ন হয়। জানাযায় হাজির হন দেশ বরেণ্য অনেক আলেম। তার সময়বয়সী বন্ধু, সহপাঠী ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্য দিয়ে জানাযা সম্পন্ন হয়। উপস্থিত শোক প্রকাশ করেন মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মনযুর আহমদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলী, মাওলানা শরীফ মুহাম্মদসহ আরো অনেকেই। এসময়ে তাঁর অনুজ আপন খালাতো ভাই মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এক সঙ্গে পড়াশুনা করেছি। বড়ভাই হিসেবে সব সময় তাকে বাবা চাচাদের মতই সম্মান করেছি। তিনি এভাবে এত অল্প সময়েই চলে যাবেন, কখনো ভাবতে পারিনি। আপনারা সবাই তাকে মাফ করে দেবেন।’

আগের সংবাদকাশ্মীরে দুই ট্রাক-চালককে গুলি করে হত্যা, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ
পরবর্তি সংবাদব্রিটেনে লরি থেকে ৩৯ উইঘুর মুসলিমের লাশ উদ্ধার