স্মৃতির আয়নায় আমাদের আহলুল্লাহ ওয়াসেল

মুফতী ফয়জুল্লাহ :

মরহুম মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেলের সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের দীর্ঘদিনের। তাঁর এই আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বে কোনোধরনের কৃত্রিমতা ছিল না। বন্ধুমহলে সে পরিচিত ছিল বন্ধুবৎসল ও আন্তরিক একজন মানুষ হিসেবে। এমনকি যে কারও সাথে তার আচরণ ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ, হোক সে অপরিচিতি। সকলেই তার ব্যবহারে বিমুগ্ধ হতেন।

হজরত মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি’র নেতৃত্ব ও অভিভাবকত্বে আমরা যে সংগ্রাম শুরু করেছিলাম, আহলুল্লাহ ওয়াসেল ছিল সেই সংগ্রামের সহযোদ্ধা। ১৯৮৯/৯০ সালের দিকে সে যখন লালবাগ মাদরাসায় মেশকাত জামাতে এসে ভর্তি হয়, আমরা তখন লালবাগের নতুন উসতাদ। কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামের নানা ব্যস্ততা ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ফলে সিনিয়র-জুনিয়রের পার্থক্য ঘুচিয়ে তাকে আমরা বন্ধু করে নিয়েছিলাম।

নব্বইয়ের দশকের বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লংমার্চ আন্দোলন, তসলিমা নাসরিনের ধর্মবিদ্বেষী লেখালেখির সূত্রে নাস্তিক-মুরতাদ-বিরোধী আন্দোলন, শূন্য দশকের শুরুতে ফতোয়া নিষিদ্ধের রায়-বিরোধী আন্দোলন—এ সময়গুলোতে আমরা তরুণ ছিলাম। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শুরুর ভাগে তারুণ্য টগবগ করছিল আমাদের ভেতর। সেই সময়টায় দেয়াল লিখন, আন্দোলনের প্রচার-প্রচারণা ইত্যাদির কাজ আমরাই করতাম সরাসরি। ওয়াসেলের হস্তলিপি খুবই চমৎকার ছিল, তার ওপর দেয়াল লিখনের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল।

বাবরি মসজিদ ভাঙা ও তসলিমা নাসরিন-বিরোধী আন্দোলনের সময় রাতের বেলা আমরা বেরিয়ে পড়তাম দেয়াল লিখনের কাজে। তখন প্রতিবাদ-প্রচারণার অন্যতম মাধ্যম ছিল দেয়াল লিখন। রাতের ঢাকা শহরে ঘুরে ঘুরে আমরা এমনসব স্থানের দেয়ালেও দেয়াল লিখন করতাম, যেখানে সেই সময়কার অন্য কেউ লিখতে সাহস করতে পারত না। ওয়াসেল ছিল এ ক্ষেত্রে বেশ সাহসী। বঙ্গভবনের দেয়ালেও আমরা লিখে আসতাম প্রতিবাদ ও সংগ্রামের নানা শ্লোগান।

একবার বঙ্গভবনের দেয়ালে এরকম লিখতে গিয়েছি, ওয়াসেল নিবিষ্ট মনে লিখছিল, আমরা পাশে থেকে এটা ওটা সাহায্য করছিলাম তাকে, এমন সময় হঠাৎ দেখি পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলেছে। ঘটনাটা খুব সম্ভব বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লংমার্চ আহ্বানের সময়কার। তো, হঠাৎ পুলিশের এমন উপস্থিতিতে আমরা হতচকিত হয়ে ওঠি, কিন্তু ঘাবড়ে যাইনি। আমরা দশ-পনেরো জন ছিলাম, সকলেই তরুণ এবং সচেতন। পরিস্থিতি কীভাবে মুকাবেলা করতে হবে, আমাদের ভালোভাবেই জানা আছে। এই মুহূর্তে কোনোভাবেই গ্রেপ্তার হওয়া যাবে না, কারণ শহরজুড়ে প্রচার-প্রচারণা এবং তরুণ নেতৃত্বে আমাদের এই দলটিই ছিল মুখ্যভূমিকায়। পরস্পর চোখের ইশারায় আমরা করণীয় নির্ধারণ করে ফেললাম। পুলিশ গাড়ি নিয়ে এসেছিল, আমরা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে একেক গলিতে একেকজন ঢুকে পড়ি, এবং যার যার মতো করে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করি। পুলিশ আমাদের টিকিটিরও নাগাল পায়নি। ওয়াসেলের এই শূন্যতার সময়ে এসে সেসময়কার আরও কত স্মৃতি যে মনে পড়ে! সবাই আছে, কেবল আমাদের আহলুল্লাহ ওয়াসেল নেই। আর নেই আমাদের সিপাহসালার ও দীক্ষাগুরু হজরত মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি।

আহলুল্লাহ ওয়াসেলের সঙ্গে দীর্ঘ একটা সময় ধরে আমরা কাজ করে এসেছি, সেই নব্বইয়ের দশক থেকে। কিন্তু দীর্ঘ এই জার্নিতে কখনও কোনো মনোমালিন্যের তৈরি হয়নি। তার মধ্যে এতাআত এবং আনুগত্যের মাদ্দা ছিল খুব বেশি। এবং আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ছিল প্রচণ্ড। যার ফলে কারও সাথেই তার সম্পর্কের অবনতি ঘটত না কখনও।

আল্লাহ তাআলার ফয়সালা, অনেক আগেই সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আল্লাহ তাঁর কবরকে রওজাতুম মিররিয়াজিল জান্নাহ হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

মুফতী ফয়জুল্লাহ : মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট। মুহাদ্দিস জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ, ঢাকা
শ্রুতলিখন : হামমাদ রাগিব

আগের সংবাদব্রিটেনে লরি থেকে ৩৯ উইঘুর মুসলিমের লাশ উদ্ধার
পরবর্তি সংবাদ‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কেবল পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটছে’