রাকিবুল হাসান
১
আগ্রার কেন্দ্রীয় কারাগারের বারান্দায় স্টিলের টুলে বসে আছেন সত্তর বছর বয়সী হামিদা বেগম। ভারত শাসিত কাশ্মীরের হিমালয় অঞ্চল থেকে ৯৬৫ কিলোমিটার (৬০০ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছেন। মুখের প্রতিটি ভাঁজে ক্লান্তির করুণ দাগ। কিন্তু তবুও ভেঙে পড়ছেন না, সটান বসে আছেন। এতদূর শহরে এসে হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। তারই মত আরেক হতভাগ্য গওহার মাল্লার সঙ্গে দেখা হওয়াতে ভাগ্যিস বেঁচে গেছেন। এখানে এসে দেখেন আরও অনেকেই বসে আছে মনমরা হয়ে, অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে তিক্ত হয়ে। তারা সবাই এসেছেন কাশ্মীরে আটক হওয়া তাদের আত্মীয় স্বজনদের দেখতে। হামিদা বেগম এসেছেন তার ছেলেকে দেখতে।
বিশ বছরের এক তরুণ হামিদা বেগমের সামনে একটি পানির বোতল এগিয়ে ধরল। হামিদা বেগম পানিটা হাতে নিলে তরুণটি বলল, আাশা হারাবেন। আপনি একা নন। ছেলের দেখা অবশ্যই পাবেন। হামিদা বেগম আকাশের দিকে হাত তুলে বললেন, আল্লাহ আমাদের ধৈর্য দিন।
হামিদা বেগমের বড্ড মনে পড়ে, সেই কারাগারের বারান্দায় বসে থেকে, গত ৫ আগস্টের একটি ভয়কাতর সকালের কথা। ভারতীয় সেনারা ঘরে এসে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ছেলেকে। ছেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। টানা দশদিন কাশ্মীরের বিভিন্ন কারাগারে দৌড়ালেন, এমনকি পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কারাগুলোতেও। চোখের সামনে থেকে এমন নির্দয়ভাবে টেনে নিয়ে গেলো, এখন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার মনে তখন প্রলয় বইছে। মাঝেমধ্যে ছেলের শহীদ হয়ে যাওয়ার কল্পনাও দানা বাঁধছে। ঠিক এমন সময় খবর নিয়ে এল এক আগন্তুক, ‘আপনার ছেলে আগ্রার জেলে আছে।’
ছেলেকে দেখার জন্য ৬০০ মাইল পাড়ি এখানে এসেছেন। অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। তার ডাক পড়ল ভেতরে। পনেরো বিশ মিনিট পর ভেতর থেকে বাইরে এসে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলেন হামিদা বেগম। সুখের আবরণে কেমন মুখের ক্লান্তির দাগ মুছে গেছে। তিনি বললেন, ‘আমি এখন পৃথিবীর সবচে সুখী মানুষ। আমার ছেলেকে যখন দেখলাম—আমার মনে হল আজ আমার ঈদ। আমি তো একজন মা। কতদিন পর দেখলাম ছেলেটাকে।’
২
হামিদা বেগম যার সাহায্যে পথ চিনে এসেছেন, সেই গওহার মাল্লাও পরিবার নিয়ে এসেছেন কেন্দ্রীয় কারাগারে বোন জামাই আমির পারভেজকে দেখতে। ৬ আগস্ট সকালে তাকে ভারতীয় সেনারা ধরে নিয়ে যায়। এতদিন কাশ্মীরের বিভিন্ন কারাগারে আটকে রাখার পর এখন তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে কাশ্মীরের বাইরে আগ্রায়।
এক হাজার ডলার ঋণ করে তিনি বোন জামাইকে দেখতে এসেছেন। বোন জামাইকে দেখে যখন রুম থেকে বেরুলেন, কী অদ্ভুত এক প্রশান্তি খেলা করছিল তার মুখের চাহনিতে। আবেগ উদ্বেল কণ্ঠে তিনিও বললেন, তাকে দেখার পর আমার মনে হয়েছে পুরো পৃথিবী হাতের মুঠোয় পেয়েছি। টাকা গেছে যাক।
আমির পারভেজের স্ত্রী মরিয়ম রসূল স্বামীর কথা বলতে গিয়েই কান্না করে দিলেন। কান্নাভেজা কণ্ঠেই বললেন, ‘প্রচণ্ড গরমের কারণে তার মুখ ফুলে গেছে। আমরা একে অপরকে জড়িয়ে কান্না করেছি। এই গুমোট পরিবেশ তাকে যদি বেশিদিন রাখা হয়, তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে।’ মরিয়মের শ্বাশুড়ি আচল দিয়ে বৌয়ের চোখের জল মুছে দিচ্ছেন। এদিকে মরিয়ম তার উষ্ণ মমতার বুকে জড়িয়ে রেখেছে তার পাঁচ বছরের ছেলেকে। সে হয়ত ঠিক বুঝছে না তার মা কেন কান্না করছে।
৩
আশরাফ মালিকের হাতে কিছু ডকুমেন্টস। তিনি কারাগারের এখানে সেখানে দৌড়াদৌড়ি করছেন। তার ছেলে আাসিফ আশরাফ আগ্রার এই কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক। আগস্টের সেই থমথমে সময়ে তিনটি গুলিবিদ্ধ হয় আসিফের পেটে। কেবল আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে গেছে। কিন্তু এটাকে বেঁচে যাওয়া বলে? হাসপাতালের বেড থেকেই তাকে গ্রেফতার করে আনা হয়েছে। বুলেটের ক্ষত এখনো সারেনি যার, তাকেও জেলে পুরে দিয়েছে ভারত। মালেলের প্রশ্ন, আর কোনো দেশ এতটা নৃশংসতা দেখিয়েছে?
৪
৫ আগস্ট হিন্দু জাতিয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার ভারত শাসিত কাশ্মীরে তাদের বিশেষ মর্যাদা সম্বলিত ৩৭০ ধারা বাতিল করে দেয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল, ইন্টারনেট এবং যাবতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। অ্যাসোসিয়েট প্রেস নিউজ এজেন্সির বরাতে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছে, ৫ আগস্টের পর গ্রেফতার করা হয়েছে চার হাজার। এদের মধ্যে অধিকাংশই যুবক। ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার যুবককে মুক্তি দেয়া হয়েছে। কিন্তু আড়াইশ আটক যুবককে কাশ্মীরের বাইরে বিভিন্ন কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জননিরাপত্তা আইনে তিনশ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এতে তারা দুই বছর বিনা বিচারে আটক থাকবে কারাগারে।
বহু বছর ধরেই মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি জনগণকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতারের অভিযোগ করে আসছে। কিন্তু বরাবরই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত বলেছে, এগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপপ্রচার। তারা স্বাধীনতা চায় বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়।
চল্লিশের দশকের শেষদিক থেকেই কাশ্মীর সমস্যাটির শুরু। এই অঞ্চলটি কেন্দ্র করে দুটি দেশ যুদ্ধ করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ১৯৮৯ সালে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর এই পর্যন্ত কাশ্মীরের ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। গ্রেফতার কত, তার তো হিসেব নেই। ৫ আগস্টের পর উপত্যকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেছে।
কাশ্মীর কিংবা বাইরের কারাগারগুলোতে সাক্ষাৎপ্রার্থী স্বজনদের ভীড়। কেউ এসেছে বাবার সঙ্গে দেখা করতে, কেউ স্বামীর সঙ্গে, কেউ ভাইয়ের সঙ্গে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পনেরো বিশ মিনিট সময়ের জন্য দেখা করার সুযোগ পায়। কিন্তু ঠিকমত কথাও বলা যায় না। কর্তৃপক্ষের ভয়ে পুলিশরা তাদেরকে তাড়াতাড়ি বের করে দেয়। ৬০০ মাইল পাড়িয়ে দিয়ে আরও কত হামিদা বানু ছেলের সঙ্গে এক পলক দেখা করতে আসেন! মনভরে কথাও বলতে পারেন না। ফিরে আসতে হয় পুলিশের তাড়ায়। তখন হয়ত ছেলেটা চোখের জলেই মাকে বিদায় দিয়েই বলে, চলে যাও মা। ওরা ভালো না। আমি অচিরেই ফিরে আসব।
কাশ্মীর এখন অজানা অচেনা শহর এক। গ্রেফতারের যেমন ঠিকানা নেই, তেমনি নেই ছাড়া পাবার ঠিকানাও। অচিরেই সময়টা কখনো হয়ে যেতে পারে কয়েক বছর।
এপি নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগ্রার কারাগারের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল সঞ্জিব ত্রিপাঠি আগ্রা কেন্দ্রীয় কারাগারে কাশ্মীরি বন্দীদের সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সরকার আমাকে মিডিয়ার কাছে কোনো তথ্য দিতে বারণ করেছে।
