শামস আরেফিন :
কাশ্মীর পৃথিবীর ভূস্বর্গ। আর এই ভূস্বর্গের অধিকাংশ বাসিন্দাই মুসলিম জনগোষ্ঠী। ভারতবর্ষ যখন ১৯৪৭ সালে বিভক্ত হয়েছিল, তখন এই ভারতবর্ষেও অধিকাংশ প্রাকৃতিক সম্পদশালী রাজ্যসমূহ ভাগ করা হয়েছিল–এমনভাবে যাতে বৃটিশ পরবর্তীসময়ে দুই পরাশক্তি পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে বিবেদ লেগেই থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ভাগ করা হয় পাঞ্জাবকে। ভাগ করা হয় বাংলাকে। ভাগ করা হয় অন্যান্য রাজ্যসমূহকে। ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি সেই সময় চাণক্যের মতো ভূমিকা পালন করে। যেমন ১৯৪৮ সালে তারা নিজাম-শাসিত মুসলিম অধুষ্যিত হায়দ্রাবাদে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। নিজামের সমর্থক ও হায়দ্রাবাদের নিরাপত্তা বাহিনীসহ জওহরলাল নেহেরুর এই সহনশীল কংগ্রেসের সরকার সেদিন ৪০ হাজার মুসলিমকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে নিজামকে বাধ্য করে ভারতের সাথে সংযুক্ত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে। যেহেতু হায়দ্রাবাদের চারদিক ভারতীয় অঞ্চল, তাই নিজামের প্রতিরোধে পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশ তেমন সহায়তাও দিতে পারেনি। বৃটিশরা চলে যাওয়ার পরও হায়দ্রাবাদ, সিকিম, কাশ্মীরসহ অন্যান্য যেসব অঞ্চলকে স্বায়ত্ব শাসন বা স্বাধীনরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, এর কোনটিকেই পাকিস্তান বা ভারতের সাথে সংযুক্ত করেনি। আশ্চর্য হলেও সত্য এ সব কটি রাষ্ট্র কখনোই স্বাধীনতা বা স্বায়ত্ব শাসন কোনটাই নিশ্চিত করতে পারেনি। তার প্রায় সবগুলো ভারতের সাথে সংযুক্ত হতে বাধ্য হয়।
যে-কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের চরিত্র জানতে হলে সে দেশের বা সমাজের দার্শনিক অবস্থান সর্ম্পকে জানতে হবে। যেমন ভারতীয় রাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় চাণক্য বা কৌটিল্য বা চাণক্যের নীতি অনুযায়ী; যারা বিশ্বাস করে গ্রেটার ইন্ডিয়া বা ভারতীয় পুরো মহাদেশ নিয়ে ভারত গঠন করতে হবে। যে দর্শন প্রতিবেশী দেশের সাথে কর্তৃত্বমূলক বা বড়ভাই মূলক সর্ম্পক রাখতে বিশ্বাসী করে তোলে। যদি প্রতিবেশী দেশ ভারতীয় প্রভাব বা প্রতিপত্তি না মেনে নেয়, তবে সে ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশে সৃষ্টি করতে হব অন্তর্ঘাত। দুর্বল বিরোধীদলকে সমর্থন দিয়ে সবল করতে হবে। তারপর সেই বিরোধীদের ক্ষমতাসীন করার মাধ্যমে নিজস্ব স্বার্থ আদায় করতে হবে। এই একই পক্রিয়ায় লেন্দুপ দর্জিকে দিয়ে সিকিমের প্রধান বিরোধীদল গঠন করেছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ডঅ্যানালাইসিস উইং ‘র’। তারা সিকিমের অপরিচিত লেন্দুপ দর্জির নতুন দলটিকে সমর্থন দেয়। আর এর বিনিময়ে সেই লেন্দুপ দর্জি ক্ষমতায় আসার পর সংসদে ভারতের সাথে সিকিম সংযুক্তির ব্যাপারে প্রস্তাব উত্থাপন করে। আর সিকিমের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পিছিয়ে পড়া সেই জনগণের প্রতিনিধি সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে ভারতের সাথে সংযুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দিয়ে নিজেদের স্বাধীনতাও বিসর্জন দেয়। তারপর তারা সিকিম দখল করে নেয় ১৯৮০ সালে। অথচ আজকে ভারতের পর্যটন আয়ের এক তৃতীয়াংশ আসে এই সিকিম থেকে।
বৃটিশরাজ যখন ভারত ত্যাগ করে তখন কাশ্মীর শাসন করত সনাতনি রাজা। কাশ্মীরের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী মুসলমান হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি ভারতের সাথে সংযুক্ত হওয়ার জন্য উঠে-পড়ে লাগেন। শুরু হয় রাজা ও জনতার মধ্যে দ্বন্দ। এখানেও চাণক্যনীতির সফল প্রয়োগ হয়। ১৯৪৮ সালে ভারত সরকার এক ধরনের স্বায়ত্বশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিরোধী মুসলমান জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করতে সংবিধানে ৩০ নং অনুচ্ছেদ সংযোজন করে। যাতে স্পষ্ট করে বলা হয়–কাশ্মীরের মানুষের নিজস্ব সংবিধান, নিজস্ব আইন থাকবে। আর কাশ্মীরে শুধু তাদেরই জমি ক্রয় বা দখলের অধিকার থাকবে। কাশ্মীরের বাইরের কেউ এই ভূখণ্ডের জমি ক্রয় বা দখল করতে পারবে না। শুধুমাত্র পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণে ক্ষমতা থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের। তবু কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী জনগণ হিন্দু রাজার এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। তারা শুরু করে বিদ্রোহ। এই প্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত হয় যুদ্ধ। যে যুদ্ধে ভারত দখল করে নেয় জম্মু ও কাশ্মীরের উপত্যকা লাদাখ। আর পাকিস্তান আজাদ কাশ্মীর তথা কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চল মুক্ত করতে সক্ষম হয়। ১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তানের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শেষে সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যাতে উভয়পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের শেষ সীমাকে লাইন অব কন্ট্রোল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কাশ্মীর অঞ্চলের সমস্য শুধুমাত্র দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে সম্মত হয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে।
তারপর ১৯৮০’র দশকে কাশ্মীরের রাজ্য সরকারের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের মতবিরোধ বাড়তে থাকে। কাশ্মীরকে শাসনের তুলনায় অত্যধিক মাত্রায় নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনা মোতায়েন করতে থাকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। শুরু হতে থাকে হত্যা, গুম, ধর্ষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। মুখোশ উন্মোচিত হয় চাণক্য নীতির। পৃথিবীর দীর্ঘতম সময় ধরে স্বাধীনতার জন্য আলাদাভাবে স্বশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে একটি দল। আরেকটি দল কেন্দ্রীয় সরকারের আনুগত্য করে টিকে থাকাকে শ্রেয় মনে করে। অর্থাৎ ভারতের উচ্চবর্ণের সনাতনী যারা ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করেছেন, কখনো তারা বিজেপি রূপে বা কখনো কংগ্রেসরূপে ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছেন। কিন্তু মুসলমানদের প্রতি তাদের আচরণ কংগ্রেস আমলে কিছুটা সহনশীল হলেও বিজেপি আমলে পুরোটাই নিপীড়নমূলক। একটি বর্ণ-প্রথা-নির্ভর ভারতে একটি নিপীড়ন মূলক রাষ্ট্র হিসেবে তার চরিত্র কখনোই পরিবর্তন করতে পারেনি।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১লা জানুয়ারি কাশ্মীরের জনগণের জন্য একটি গণভোট আয়োজন করার প্রস্তাব করে। যাতে উল্লেখ ছিল কাশ্মীর চাইলে ভারতের সাথে বা পাকিস্তানের সাথে অথবা স্বাধীনরাষ্ট্র হিসেবে গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু ভারত সরকার আজ পর্যন্ত সেই গণভোটের আয়োজন করেনি। অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে দ্বিপাক্ষিক সিমলা চুক্তি ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত হয়, তার অজুহাত দেখিয়ে ভারত এ ব্যাপারে কারও মধ্যস্থতাও মানতে নারাজ। আবার এ বিষয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো ভারতকে চটাতে চায় না। কারণ ভারত হচ্ছে ১২০ কোটি মানুষের বাজার। এ বৃহৎ বাজার কে চায় হাত ছাড়া করতে? এমনিতে আমেরিকান অগ্রাসী বাণিজ্যনীতির কারণে বিশ্বের মন্দাবস্থা।
এ বছর জুলাইয়ের দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যদি মোদি চান, কাশ্মীরের ব্যাপারে তিনি মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রানায়েম জয়শংকর এর তীব্র বিরোধিতা করে ভারতীয় সংসদে বলেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীরের ব্যাপারে তাকে মধ্যস্থতা করতে অনুরোধ করলে তিনি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিবেন। আমি এই সংসদে বলতে চাই, এ ধরনের কোন অনুরোধ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী করেননি। এমনকি ২৩ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় যখন ‘হোডি মোদি’ অনুষ্ঠানে মোদিকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল, একজন সাংবাদিক ট্রাম্পকে কাশ্মীরের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি চাই সবকিছু যেন স্বাভাবিক থাকে। কাশ্মীরে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়। এখানে দুটি শক্তিশালী দেশ জড়িত যারা একে অপরকে হুমকি দিচ্ছে। তারা একে অপরের সাথে যুদ্ধও করছে। আমি গতকাল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চরম আগ্রাসী বক্তব্য শুনেছি।
আর তাকে যখন মধ্যস্থতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলো, তখন ট্রাম্প বলেন, যদি উভয় দেশ চায় আমি প্রস্তুত আছি এবং এ সমস্যা সমাধান করতে আমি সক্ষম।
তাহলে এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত, পৃথিবীর কোথাও যেমন বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিম, চীনে উইঘুর মুসলিম, বসনিয়া, ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরে মুসলিম জনগণ যখন নির্যাতিত হয়, তখন এই জাতিসংঘ ও তার নিরাপত্তা পরিষদের ততটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। কিন্তু একই বিষয় যখন অন্য সম্প্রদায়ের বেলায় উত্তর সুদান, ইন্দোনেশিয়া বা অন্যকোন দেশে হয়, তখন বিশ্বের নেতাদের অবস্থান সহজেই বোঝা যায়। এ পরিস্থিতে একজন সাধারণ মুসলমান যেমন আহত হওয়া স্বাভাবিক, বিশ্ব ব্যবস্থার শান্তিরক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ ও তার নিরাপত্তা পরিষদ তখন কেন চুপ থাকে? এই প্রক্রিয়ায় চুপ থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থা এমনভাবে করা হচ্ছে–কীভাবে মুসলমানদের উগ্র করে তোলা যায়।
২ মাসের অধিক সময় ধরে কাশ্মীরে কারফিউ বিদ্যমান। চলছে গুম, হত্যা। ত্রিশ হাজার তরুণকে ধরে নিয়ে গেছে নিরাপত্তা বাহিনী। ভারত সরকার স্বীকার করেছে ১৩০০ কিশোর গ্রেফতারের বিষয়টি। এই কাশ্মীরিরা মানুষ না পশু যে তাদের এভাবে ৯ লাখ সেনা দিয়ে অবরুদ্ধ করে পশুর মতো রাখতে। আবার এভাবে মুসলমানরা নির্যাতিত হওয়ার পর প্রতিরোধ করতে আসলে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণ করা হচ্ছে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা বলা হয় না। অসংখ্য আত্মঘাতী হামলা চালোনোর পরও শ্রীলংকার তামিল টাইগাররা সন্ত্রাসী হয় না কিন্তু মুসলমানদের দু’একজন করলে তারা হয়ে যায় জঙ্গি। তখন খুব সহজেই ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম বিদ্বেষ ছড়িয়ে কাশ্মীরে, ফিলিস্তিনে, মায়ানমারে ও চীনে মুসলমানদের সন্ত্রাসী বানানো হয়। এভাবে আর কতো ইসলামোফোবিয়া ব্যবহার করে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালানোর সুযোগ দিবেন মুসলিম নেতৃবৃন্দ এরদোয়ান, মাহাথির ও ইমরান, তাদের কাছে আমাদের এই প্রশ্ন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন আমাদের নীরব বুদ্ধিজীবীদের প্রতি। কাশ্মীরের ব্যাপারে তাদের মাঝে এক ধরনের মৌনতা দেখা যায়। অথচ একজন সৎ বুদ্ধিজীবী কখনো কাশ্মীরের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে পারে? রাষ্ট্র তার নিজস্ব রাজনৈতিক প্রয়োজনে কখনো তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু তার সংবিধান বলে দেয়- রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? আপনি ৭২-এর সংবিধানের দোহাই দেবেন, গণতন্ত্রের দোহাই দেবেন বা মানবাধিকারের দোহাই দেবেন, কিন্তু সংবিধান বা মানবাধিকারের যে অংশ আপনার একটু বিরুদ্ধে যাবে তা মানবেন না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২য় ভাগের ২৫ নং অনুচ্ছেদে রয়েছে–আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও ঐক্য রক্ষায় বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রত্যেক নির্যাতিত মানুষের স্বাধীনভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে সমর্থন করবে এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামে বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষকে সমর্থন করবে। তাই বুদ্ধিজীবী হিসেবে রাষ্ট্রকে পথ দেখানোর তুলনায়, রাষ্ট্র থেকে নিজের আখের গোছানোর ধান্ধায় আমরা এসব সুবিধাজীবিদের বেশি দেখি। এ প্রেক্ষিতে বুদ্ধিবৃত্তিক চেষ্টা ও পঠন-পাঠন বাড়াতে হবে সাধারণ মানুষের। সাধারণ মানুষ ও জনগণই পারে বাংলাদেশকে পথ দেখাতে।
লেখক : কবি ও গবেষক
