রাকিবুল হাসান :
মঙ্গোলরা বাগদাদ দখলের ২৬ বছর আগে, ৬৩০ হিজরি জুমাদাল উখরায় সম্পন্ন হয় জামেয়া মুসতানসিরিয়ার নির্মাণ কাজ। এসময় শিক্ষকদের বেতন, ছাত্রদের ভরণপোষণ এবং জামেয়ার অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে বিশাল অংকের একটি ‘শিক্ষাবৃত্তি’ দেয়া হয় জামেয়ায়। ইমাম যাহাবির হিসাব অনুযায়ী সেই শিক্ষাবৃত্তির পরিমান ৯০০ হাজার দিনার। বর্তমানের হিসাবে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যাহাবি বলেন, দামেশকের বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এতবড় অংকের শিক্ষাবৃত্তি দেয়া হয়নি।
অক্সফোর্ড ডিকশনারী ‘শিক্ষাবৃত্তি’র সংজ্ঞা দিয়েছে—যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এমন আর্থিক অনুদান, যা একজন শিক্ষার্থীর পড়াশুনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।’ বর্তমানে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়ার প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষ করে একাডেমিক পর্যায়ের ছাত্রদের মাঝে। সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ধরনের সংস্থা আজকাল এই শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে।
ছাত্র এবং শিক্ষকগণ যেন পাঠগ্রহণ ও পাঠদান পূর্ণ নিষ্ঠা ও মনোযোগের সাথে করতে পারেন, এজন্য মুসলিমরা সেই প্রাচীন কাল থেকেই শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে আসছে। এই নিবন্ধে ইসলামি সভ্যতায় শিক্ষাবৃত্তির ধারা কতটা প্রচলিত ও প্রসারিত ছিল, তার নির্মোহ একটি চিত্র ফুটিয়ে তুলব।
নবিজির যুগে
হুজুর সা. যখন জন্মগ্রহণ করেন, কুরাইশ বংশে তখন লিখতে পারত হাতেগোনা কয়েকজন। কে প্রথম লেখা শিখেছিল কুরাইশ বংশে, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। কেউ বলেছেন উমাইয়া ইবনে হারব, তার থেকে শিখেছেন তার ছেলে আবু সুফিয়ান। কেউ বলেছেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এবং কুরাইশের একদল লোক।
একজন শিক্ষার্থীর খরচ কতটুকু ছিল তখন, তা সঠিকভাবে জানা নেই। তবে অনুমান করা হয় একজন শিক্ষার্থীর খরচ ছিল ৪০০ দিরহাম। আর একজন বন্দীর মুক্তিপণ ছিল ৪ হাজার দিরহাম। এজন্যই হয়ত রাসূল সা. বদর যুদ্ধে বন্দীদের একেকজনকে ১০ জন মুসলিমকে লেখা শেখাতে বলেছিলেন তাদের মুক্তিপণ হিসেবে।
ইসলাম এলো। কোরআনে বর্ণিত হলো শিক্ষিতদের মর্যাদা। বলা হল—যে জানে আর যে জানে না, দুজন কি সমান?’ হাদিসে নববিতে উচ্চারিত হল ইলম এবং ইলম শেখানোর ফজিলত। আহলে সুফফার শিক্ষার দায়িত্ব নিলেন রাসূল সা. নিজেই। ইসলামের মেহমান হিসেবে তাদের জন্য বরাদ্দ করলেন জাকাত, সাদকা, হাদিয়া। তাদের প্রত্যেক দুইজনের জন্য প্রতিদিন দিতে লাগলেন এক মুদ (আধা কি.গ্রা.) খেজুর। তালহা ইবনে আমর নাজরির সূত্রে তাবরানির হাদিসে এমনই এসেছে।
আহলে সুফফার সদস্য ছিলেন ৭০ জন। আবু নাঈম ৫২ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে আবু হুরায়রা, সালমান ফারসি, আবু সাঈদ খুদরি, আবু জর গিফারির মত শাহেনশাহ ইলমি সাহাবিগণও রয়েছেন। রাসূল সা. তাদের শেখাতেন। আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, ‘রাসূল সা. আহলে সুফফার সদস্যদের পড়াতেন।’
সাহাবিদের যুগে
নবিজির কাল শেষ হয়েছে। সহাবিদের কালে এসে এই শিক্ষাবৃত্তির ধারা আরও প্রসারিত হয়েছে। প্রতিভার প্রতিপালনে অনেক সাহাবি শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে গেছেন ব্যক্তিগতভাবে।
আবু জামরাহ জুবাঈর জীবনীতে ইমাম যাহাবি আরেকজন থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইবনে আব্বাস রা. আমাকে তার সঙ্গে চৌকিতে বসিয়ে বললেন, আরকিছুদিন আমার সঙ্গে থাকো। আমি তোমাকে কিছু টাকা পয়সা দিব। টাকাটা হাতে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।’ আবু জামরাহ ছিলেন ইবনে আব্বাস রা. এর ইলমি মজলিশের দোভাষী। তিনি আরবি থেকে ফার্সিতে তাৎক্ষনিক অনুবাদ করতেন।
ইমামদের যুগে
একটা সময় এসে যখন বাইরের এই শিক্ষাবৃত্তি যথেষ্ট হত না, তখন এই বৃত্তিটা আসতে লাগল ইলমের নেতৃত্ব পর্যায়ে যারা থাকত, তাদের কাছ থেকে।
ইমাম আবু হানিফা রহ. আবু ইউসুফ রহ. এর ভেতর মেধার ঝলক দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু ইউসুফ রহ. ছিলেন এতীম, অর্থ সঙ্কটের তাড়নায় তাড়িত। টাকা উপার্জনের ব্যস্ততায় মজলিশে আসতে পারতেন না ঠিকমত। ব্যাপারটা টের পেয়ে আবু হানিফা রহ. তাকে ডেকে একশ দিরহামে একটি থলি দিয়ে বললেন, প্রতিদিন মজলিশে আসবে। যখন টাকা শেষ হয়ে যাবে, আমাকে বলবে। ইউসুফ রহ. প্রতিদিন আসতে লাগলেন মজলিশে। কিছুদিন পর আবু হানিফা রহ. আবার তাকে একশ দিরহাম দিলেন। এভাবে ইউসুফ রহ. নিজে অর্থ উপার্জনের সুযোগ হওয়া পর্যন্ত তিনি বৃত্তি দিয়ে গেছেন। ফলে আবু ইউসুফ রহ. হয়ে উঠেছিলেন হানাফি মাজহাবের এক শক্তিমান রুকন।
ইমাম শাফেয়ী রহ. শৈশবে খুব দরিদ্র ছিলেন। শিক্ষার খরচ বহনের মত সামর্থ্য তার ছিল না। তাই তিনি তার শিক্ষকের সঙ্গে একটি চুক্তি করলেন। উসতাদ যখন ক্লাসে থাকবেন না, তিনি বাচ্চাদের দেখাশুনা করবেন। এর বিনিময়ে তার শিক্ষকের বেতন মাফ। একে সমকালীন শিক্ষকতা সহকারীর সমপর্যায়ের বলে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। শাফেয়ী রহ. এর ছাত্র, ইমাম বুখারী রহ. এর শায়েখ আবু বকর হুমাইদি ( মৃ. ২১৯ হি.) বলেন, শাফেয়ী রহ.কে বলতে শুনেছি, ‘আমি এতিম ছিলাম। শিক্ষকের বেতন দেয়ার সামর্থ্য ছিল না মায়ের। কিন্তু শিক্ষক এই শর্তে আমার বেতন মাফ করলেন যে, তিনি যখন থাকবেন না, বাচ্চাদের আমি দেখাশুনা করব।’
যুবক বয়সে শাফেয়ী রহ. ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর মজলিশে বসতেন। শাফেয়ীর মাঝে প্রতিভা টের পেয়ে মুহাম্মদ রহ. তাকে শিক্ষাবৃত্তি দিতে লাগলেন। আবু উবাইদ হারবি (মৃ: ২২৪হি.) থেকে যাহাবি বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ রহ.কে দেখেছি শাফেয়ী রহ. কে ৫০দিনার দিচ্ছেন। এর আগেও ৫০ দিনার দিতে দেখেছি। দিনার দিয়ে বলতেন, আগ্রহী হলে মজলিশে বসবেন।’
শিক্ষাবৃত্তির ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি
খাইরুল কুরুন তথা হিজরি তিন শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। শিক্ষাবৃত্তির এই ধারণাটা মানুষের মনেও বদ্ধমূল হয়ে গেছে। তার উপর ফকিহদের ফতওয়া এই শিক্ষাবৃত্তিকে করে তুলেছে আবশ্যকীয় কর্তব্য।
আবু মনসুর মাতুরিদীর (মৃ:৩৩৩হি.) বয়ানে হানাফি ফকিহদের সিদ্ধান্তে হল—একজন ছাত্র যখন পড়তে বের হয়, তার দায়িত্ব নেয়া মুসলমানদের কর্তব্য। যদি তারা দায়িত্ব নিতে না চায়, যাকাতের মতই তা আদায় করতে বাধ্য করা হবে।’ তারা এটাও বলেছেন, যাকাত নিকটজনদের আগে দিতে হয়। নিকটজনদের রেখে দূরের কাউকে দেয়া নিষেধ। কিন্তু ছাত্রদের জন্য হলে অন্য দেশেও যাকাত পাঠানো জায়েয।
নববি রহ. (মৃ:৬৭৬হি.) বলেছেন, ‘কর্মক্ষম কেউ যদি ইলম অর্জনে মগ্ন হয়, তার জন্য যাকাত নেয়া জায়েয। কেননা ইলম অর্জন ফরজে কেফায়া।’ সব ইলমকেই এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার দ্বারা দ্বীন ও দুনিয়ার উপকার হয়। এমনই বলেছেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃ:৭২৮হি.)।
যদিও ছাত্র, আলেমদের দায়িত্ব বহন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেছেন ফকিহগণ এবং রাষ্ট্রের বাজেটে এর অংশও নির্ধারণ করতে বলেছেন। যেমন ইমাম ইবনে আবিদিন হানাফি (ম:১২৫২হি.) ‘রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আলেম এবং ছাত্রদের ব্যয়ভারের দায়িত্ব বাইতুল মাল বহন করবে।’ কোনো কোনো আলেম বলেছেন, আর্থিক স্বচ্ছল হলেও একজন ছাত্র যাকাত নিতে পারবে। যেমন ‘আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাতে বর্ণিত হয়েছে।
এই ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে শিক্ষাবৃত্তির বিভিন্ন প্রকার ও উদ্দেশ্য হতে পারে। যার মাধ্যমে আলেমদের থেকে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ বিশেষ উপকার লাভ করা যেতে পারে।
যেমন খালেদ বিন ইয়াজিদ উমাবি (মৃ:৮৪) অন্য জাতির ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ আলেমদের উপস্থিত করে অন্য জাতির গ্রন্থ অনুবাদের জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। এটিই ছিল ভিন্ন ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদের প্রথম পদক্ষেপ। এ ব্যাপারে ‘আল ফাহারাসতে’ নাদিম বলেছেন, খালেদের যখন কারিগরি বিদ্যার কথা মাথায় এল, তখন তিনি মিসরে বাস করে এবং আরবি খুব ভাল পারে এমন ইউনানী দার্শনিকদের উপস্থিত করতে বললেন। দার্শনিকরা উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে ইউনানী ভাষা থেকে কারিগরি বিদ্যার কিতাব আরবিতে অনুবাদ করতে নির্দেশ দিলেন। ইসলামে এটাই ছিল এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় প্রথম অনুবাদ।’
শিক্ষাবৃত্তির প্রকার
শিক্ষাবৃত্তির বিভিন্ন প্রকার ও পদ্ধতি হতে পারে। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুসারে।
ইবরাহিম বিন সাঈদ রিফাঈ নাহবি (মৃ:৪১১হি.) এর জীবনীতে এসেছে, তিনি অন্ধ ছিলেন। ইলম অর্জনের জন্য ইরাকের একটি মধ্যবর্তী শহরে এসে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে’ ভর্তি হলেন। তিনি আবদুল গাফফার হুসাইনির (মৃ:৩৬৬হি.) ক্লাসে বসতেন। ওই ক্লাসের শিক্ষার্থীদের খাবার থেকেই তার খাবার হয়ে যেত। ছাত্রদের পরস্পরের মাঝে খাবার বন্টন করে খাওয়াটাও ‘শিক্ষা সাহায্যে’র অনন্য এক দৃষ্টান্ত।
কখনো এই শিক্ষাবৃত্তি কাপড় দেয়ার মাধ্যমে হয়। যেমন ৮৩১ হিজরিতে হিন্দুস্থানের কালবার্গা শহরের সুলতানের পক্ষ থেকে আলাউদ্দিন ইবনুল বুখারির কাছে ৩ হাজার গজ কাপড় আসে। তিনি এক হাজার গজ আলাদা করলেন তার ছাত্রদের দেয়ার জন্য।
কখনো কখনো পুরষ্কারের আঙ্গিকে দেয়া হত শিক্ষাবৃত্তি। অমুক কিতাব মুখস্থ করতে পারলে অত টাকা পুরষ্কার দেয়া হবে। যাহাবি রহ. লিখেছেন, ইবনুল আদিল আইয়ুবি (মৃ:৬২৪হি.) ছিলেন হানাফি মাজহাবের কঠিন সমর্থক। তিনি একদিন ঘোষণা করলেন, যে ‘মুফাসসাল’ কিতাবটি ব্যাখ্যা করতে পারবে সে পাবে একশ দিনার। আর যে ‘জামিউল কাবির’ কিতাবটি ব্যাখ্যা করতে পারবে সে পাবে দুইশ দিনার।
বাদশা, আমির, ব্যবসায়ী, আলেমগণ যেমন শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছেন, তেমনি খলিফা এবং সুলতানগণও শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আব্বাসি খলিফা হারুনুর রশীদ (মৃ:১৯৩হি.), তার ছেলে মামুনুর রশীদ (মৃ:২১৮হি.), সুলতান নুরুদ্দিন মুহাম্মদ জঙ্গী (মৃ:৫৬৯হি.) অন্যতম। নুরুদ্দিন জঙ্গী মুসলিম এতিমদের পড়ানোর জন্য একদল শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের বেতন নির্ধারণ করেছিলেন। এই শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (মৃ:৫৮৯হি.)। সালাহউদ্দিন আইয়ুবি পরবর্তীতে অনেক মাদরাসা নির্মাণ করেছেন।
সুলতান এবং খলিফাদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মন্ত্রীগণও শিক্ষাবৃত্তি দিতেন। যেমন আব্বাসি খেলাফতের মন্ত্রী ফাতাহ ইবনে খাকান (মৃ:২৪৭হি.) আরবি গদ্যের সম্রাট আবু উসমান জাহিযসহ (মৃ:২৫৫হি.) আরও অনেক আলেমকে দান করতেন। এমনকি জাহিযের জন্য বাজেটেই বরাদ্দ রাখা হত তার সারা বছরের খরচার হিসাব। যেন সে মনোযোগ দিয়ে গ্রন্থ রচনায় কাজ করতে পারে। বাগদাদের মন্ত্রী আবুল হাসান ইবনে ফুরাত (মৃ:৩১২হি.) যখন দেখলেন সাহিত্যের ছাত্রদের অনুদান প্রয়োজন, তিনি তাদের জন্য নিয়মিত অনুদান বরাদ্দ করে দিলেন।
মিসরে ইখশিদীদের মন্ত্রী আবুল ফজল ইবনে খিনজাবাহ (মৃ:৩৯১হি.) কিতাব সংগ্রহ এবং আলেমদের জন্য খরচ করতেন। তার অবারিত দানের কারণেই দারাকুতনি মিসরে পাড়ি জমিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় তার দরবারে কাটিয়ে শিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন।
আলেমদের শিক্ষাবৃত্তি দান
আলেমগণ সবসময় শিক্ষাবৃত্তি নিতেন বিষয়টা এমন নয়। আর্থিক স্বচ্ছল আলেমগণ শিক্ষাবৃত্তি দিতেনও। ইমাম আবু হানিফা এবং মুহাম্মদ রহ. এর কথা আগে পড়েছি। এই দলে আছেন মিসরের ইমাম লাইস বিন সাদ। তিনি ইমাম মালেক রহ.কে নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি দিতেন। যেন মদিনা মুনাওয়ারায় তিনি একনিষ্ঠতার সঙ্গে হাদিস এবং ফিকহের পাঠদান করতে পারেন। হুরমালা বিন ইয়াহইয়া তুজিবি মিসরি (মৃ:২৪৩হি.) থেকে ইমাম যাহাবি বর্ণনা করেন, তুজিবি বলেন, লাইস বিন সাদ বছরে মালেক রহ.-এর কাছে ১০০ দিনার পাঠাতেন। বর্তমানের ক্যালকুলেটরে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার। একবার মালেক রহ. তার উপর কিছু ঋণের কথা লাইসকে লিখে পাঠালেন। লাইস মালেক রহ. এর কাছে ৫০০ দিনার পাঠিয়ে দিলেন।
তিউনিসিয়ার মালিকি ইমাম ইবনু আবি যায়েদ কিরানবি (মৃ:৩৮৬হি.) এই দলের আরেক মহিপাল। আবু যায়েদ দাববাগ আনসারি (মৃ:৬৯৬হি.) ‘মাআলিমুল ইমান ফি মারিফাতি আহলিল কিরাওয়ান’ গ্রন্থে বলেন, ‘কিরানবি ছাত্রদের জন্য খরচ করতেন। তাদের জামা কাপড় দিতেন। তাদের দেখতে যেতেন।’ ইয়াহইয়া বিন অব্দুল্লাহ মাগরিবি যখন কিরাওয়ানে আসলেন, কিরানবি দেড়শ দিনার উপহার নিয়ে উপস্থিত হলেন তার কাছে। কথিত আছে, কাজি আবদুল ওহহাব বাগদাদি মালেকি (মৃ: ৪২২হি.) এর কাছে এক হাজার দিনার পাঠিয়েছেন। কারণ বাগদাদে কাজি সাহেব তখন নিদারুণ সঙ্কটে দিন গুযরান করছিলেন। বর্তমান ক্যালকুলেটরে তার পরিমান ১৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
এই দলে আরও আছেন আবুল হাসান নিশাপুরি (মৃ:৩৫৫হি.)। যাহাবি রহ তাকে ‘ব্যবসায়ী ইমাম’ বলে অভিহিত করেছেন। তাজউদ্দিন সুবকি রহ. (মৃ:৭৭১হি.) বলেন, খতিব বাগদাদি রহ. ছাত্রদের প্রচুর শিক্ষাবৃত্তি দিতেন।’ যাহাবি রহ. এর ভাষায়—ঐতিহাসিক ইমাম ইযযুদ্দিন ইবনুল আসির (মৃ:৬৩০হি.) এর বাড়িটি ছিল ছাত্রদের আশ্রয়স্থল। ইযদুদ্দিন ইজি (মৃ:৭৫৬হি.) এর যেমন প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল, তেমনি ছাত্রদের প্রচুর দানও করতেন।
মুসলিমরা যেমন শিক্ষাবৃত্তি দিত, তেমনি ইসলামি সভ্যতার অধীন অন্যান্য ধর্মালম্বীরাও শিক্ষাবৃত্তি দিত। যেমন একজন খৃস্টান চিকিৎসক ইবনুত তিলমিজ বাগদাদি (মৃ:৫৬০হি.), যাহাবি রহ. যাকে ‘শাইখুত তিব্ব’ বলে অভিহিত করেছেন, তিনি ছাত্রদের বছরে ২০ হাজার দিনার শিক্ষাবৃত্তি দিতেন। বর্তমানের ক্যালকুলেটরে তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাগদাদে তার ঘর ছিল মাদরাসায়ে নেজামিয়ার লাগোয়া। মাদরাসার কেউ যখন অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তাকে ঘরে এনে চিকিৎসা করতেন। বিদায় দেবার সময় দুই দিনার হাতে গুজে দিতেন।
বর্তমানে শিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে অনেক শর্ত। এই শর্তগুলো পূরণ করতে পারলেই একজন শিক্ষাবৃত্তি পায়। কখনো কখনো ধর্ম অথবা ফিকহি মাজহাবের পার্থক্যের কারণে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি শিক্ষাবৃত্তি পায় না।
ইয়াকুত হামাবির ‘মু’জামুল উদাবা’ গ্রন্থে আবু যায়েদ বলখির জীবনীতে বর্ণিত আছে—হুসাইন বিন আলী মারওয়ারজি এবং তার ভাই সালুক নিয়মিত আমাকে শিক্ষাবৃত্তি দিতেন। কিন্তু যখন ‘ফিল বাহসি আনিত তাবিলাত’ লিখলাম, তারা দুজনই আমার বৃত্তি বন্ধ করে দিলেন। আবু আলী জিহানিও আমাকে শিক্ষাবৃত্তি দিতেন। যখন ‘আল কারাবিন ওয়ায যাবাঈহ’ লিখলাম, তিনি বৃত্তি বন্ধ করে দিলেন। হুসাইন ছিলেন কারামতি এবং জিহানি ছিলেন দ্বিত্ববাদী।
স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা
দান ও অনুদানের ধারা বিস্তৃত হলে একটা সময় মসজিদ থেকে মাদরাসা আলাদা হয়ে যায়। তখন স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে দিকে দিকে।
ইবনে খাল্লিকান এবং যাহাবির মতে, প্রথম স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন সেলজুকি মন্ত্রী নেজামুল মুলক (মৃ:৪৮৫হি.)। তবে সুবকি রহ. নেজামুল মুলকের জীবনীতে বলেছেন, যাহাবি মনে করেছেন নেজামুল মুলক প্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। অথচ নিশাপুরে মাদরাসায়ে বায়হাকি নেজামুল মুলকের জন্মের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিশাপুরে মাদরাসায়ে সাদিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন নসর বিন সুবকতকিন (মৃ:৪১২হি.)। কিন্তু মাদরাসায়ে নেজামিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, কারণ নেজামুল মুলক প্রথম মাদরাসায় নিয়মিত বেতন চালু করেছেন শিক্ষকদের জন্য। ইবনুস সালাহ ‘তাবাকাতুল ফুকাহাঈশ শাফিঈয়্যাহ’ গ্রন্থে বলেছেন, যাহাবির কথাও উক্ত কথাটিকে সমর্থন করে। তিনি বলেছেন, নেজামুল মুলক ছাত্রদের প্রচুর দান করতেন।’ মূলত তিনি প্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেননি।
প্রকৃতপক্ষে আব্বাসি খলিফাদের সময় থেকেই মাদরসা প্রতিষ্ঠার চিন্তাটা প্রসার লাভ করে। ঐতিহাসিক মাকরিযী (মৃ:৮৪৫হি.) ‘আল খুতাত’ গ্রন্থে বলেন, খলিফা মু’তাজিদ বিল্লাহ (মৃ:২৮৯হি.) বাগদাদের শামসিয়াতে যখন প্রাসাদ নির্মাণ করছিলেন, তখন তিনি সেখানে আলাদা কয়েকটি ঘর বানিয়েছিলেন বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য। এবং তাদের জন্য খাবারও বরাদ্দ করেছিলেন।
‘আল মাওয়ায়েজ ওয়াল এতেবার’ গ্রন্থে মাকরিযী বলেন, ৩৭৮ হিজরিতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফাতিমি খলিফা আজিজ বিল্লাহ (মৃ:৩৮৬হি.)। এটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার মন্ত্রী ইয়াকুব বাগদাদির ইশারায়। মন্ত্রী তার কাছে ১৫০ সদস্যের একটি ফকিহ দলের জন্য অনুদান বরাদ্দ চাইছিলেন। খলিফা তাদের জন্য বার্ষিক অনুদান বরাদ্দ করে দিলেন।
সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গী হাদিস পড়ানোর জন্য সর্বপ্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দামেশকে। তার জন্য বরাদ্দ করেছিলেন বিরাট অংকের শিক্ষাবৃত্তি। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি কায়রোতে কয়েকটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘মাদরাসাতুস সালাহিয়্যাহ’। এতে পড়ানো হত উলুমে শরইয়্যাহ, জোতির্বিজ্ঞান, স্থাপত্যকলা। উন্দুলুসের পর্যটক ইবনে জুবাইর (মৃ:৬১৪হি.) মিসর ভ্রমণে এসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মাদরাসা দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, এই মাদরাসাগুলো এতিমদের আশ্রয়স্থল। তাদের জন্য বরাদ্দ আছে প্রচুর অনুদান। এই অনুদান থেকে ছাত্র, শিক্ষক এবং মাদরাসার ব্যয়ভার বহন করা হয়। মাদরাসাগুলো মিসরের গর্ব।’
মাকরিযী ‘আস সুলুক’ গ্রন্থে বলেছেন, সুলতান বারকুক (মৃ:৮০১হি.) কায়রোতে এমন একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কায়রোতে এর আগে এমন মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতিদিন ছাত্রদের খাবার হিসেবে দেয়া হত রুটি, মেষ শাবকের গোশত ভুনা। প্রতি মাসে ছাত্রদের দেয়া হত হালুয়া, তেল, যাইতুন, সাবান, নগদ পয়সা।’
পুরুষরাই কেবল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং মহিলারাও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। বাহাউদ্দীন জুনদি (মৃ:৭৩২হি.) ‘কিতাবুস সুলুক ফি তাবাকাতিল উলামা ওয়াল মুলুক’ গ্রন্থে বলেছেন, ইয়ামানে মালিক মুজাফফার রাসূলির মেয়ে (মৃ:৬৯৪হি.) দুইটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটি যুবাইদে, আরেকটি যুফারে।
মাদরাসাগুলোর ভূমিকা
মাদরাসাগুলো প্রতিষ্ঠার সবচে বড় উপকার হল, ইসলামি সভ্যতায় শিক্ষাটা কেবল এলিট ও উচ্চ শ্রেণির মানুষের সাথেই নির্দিষ্ট হয়ে যায়নি। বরং সব শ্রেণির মানুষ শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পেয়েছে। তবে সভ্যতায় স্পেন এত উন্নতি করার পরও সেখানে কোনো এমন মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যেখানে কেউ বিনা বেতনে পড়তে পারে। ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন মুকরি (মৃ:১০৪১হি.) বলেন, স্পেনে এমন কোনো মাদরাসা নেই, ছাত্ররা বিনা বেতনে পড়তে পারে। বরং সেখানে মসজিদে, একেকজন শিক্ষকের কাছে বেতন দিয়ে পড়তে হয়।’ কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য, বেতন দিয়ে পড়ার কারণে ইলমের ময়দানে অনেকেই হয়ে উঠেছেন সেকালের ধ্রুব নক্ষত্র।
আল-জাজিরা অবলম্বনে
