ডিভাইড অ্যান্ড রুল : ভারতীয় মুসলমানদের অনৈক্য

ডিভাইড অ্যান্ড রুল : ভারতীয় মুসলমানদের অনৈক্য

অযোধ্যার শহিদ হওয়া বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক বেশ পুরানো। সেই ব্রিটিশ আমলে হিন্দু মৌলবাদীরা বাবরি মসজিদের জায়গা নিয়ে বিতর্ক তুলেছিল, আদালতে মামলাও করেছিল এই ইস্যুতে।

মোগল সম্রাট বাবরের নির্দেশে তাঁর সেনাপতি মীর বাঁকি ১৫২৮-২৯ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করে এর নাম রেখেছিলেন বাবরি মসজিদ। মসজিদটি যেখানে নির্মিত হয়েছিল, সেখানটার নাম রামকোট হিল (রামের দুর্গ)। এই পাহাড়ে মসজিদের পাশেই হিন্দুরা উপাসনা করত। দীর্ঘ দিন ধরে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বী পারস্পরিক সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এভাবেই যার যার প্রার্থনা যার যার মতো করে করছিল। মুসলমানেরা মসজিদে নামাজ পড়তেন, আর হিন্দুরা বাবরি মসজিদের বাইরের জায়গাটায় করতেন তাদের রামের উপাসনা।

১৮ শতকের গোড়ার দিকে হিন্দু মৌলবাদীদের একটি গ্রুপ দাবি তুলে বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছে রাম মন্দির ভেঙে। এ দাবিতে তারা ব্রিটিশ আদালতে মামলাও করে। কিন্তু ব্রিটিশ আদালত হিন্দুদের এ দাবি প্রমাণিত না হওয়ায় মামলা খারিজ করে দেয়। তখন থেকেই মূলত বিতর্কের সূচনা। এ নিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে নানাবিধ কলহ ও বিতর্কে জড়ায় তারা।

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে নতুন এক চাল চালে হিন্দু উগ্রবাদীরা। তারা হিন্দু মহাসভার সাথে জোট বেঁধে গোপনে বাবরি মসজিদের অভ্যন্তরে একটি মূর্তি প্রতিস্থাপন করে। এরপর দাবি করে, মূর্তিটি এখানেই ছিল। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির অজুহাতে মসজিদটি সিলগালা করে দেয় তৎকালীন ভারতীয় প্রশাসন। তারপর থেকেই এখানে মুসলমানদের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ।

তারপর ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে শিবসেনা ও বিজেপি’র সন্ত্রাসী করসেবকেরা মসজিদটি শহিদ করে দেয়। বাঁধে দাঙ্গা। যে দাঙ্গায় সরকারি হিসাবেই মারা গিয়েছিলেন তিন সহস্রাধিক মানুষ। যাদের সিংহভাগই মুসলমান।

তারপর থেকেই বাবরি মসজিদ ইস্যুতে মামলা মুকাদ্দমা চলে আসছিল আদালতে। রাম মন্দির ভেঙে যে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল হিন্দুদের হাতে স্পষ্ট কোনো দলিল ছিল না। এখনও নেই। তাই তারা ভিন্ন কৌশল আঁটে।

ভারতে মসজিদগুলোর মালিকানা প্রধানত মুসলমানদের দুটো গ্রুপ শিয়া ও সুন্নি মতাবলম্বীদের মধ্যে ভাগ করা। কিছু মসজিদের তত্ত্বাবধান করে শিয়া ওয়াকফ বোর্ড, আর বাকি সবগুলো মসজিদের তত্ত্বাবধান সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে। বাবরি মসজিদের তত্ত্বাবধানও ছিল সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের হাতে। কিন্তু শিয়া ওয়াকফ বোর্ড দাবি করে এটা তাদের মসজিদ। কারণ, মীর বাকি, যিনি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন, তিনি শিয়া মতাবলম্বী ছিলেন। এই বিবাদ শেষমেশ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ফৈজাবাদ আদালত এ বিতর্কের মীমাংসা করে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষে রায় দেয়। এই রায়ের জেরে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বাবরি মসজিদ মামলায় উত্তর প্রদেশের সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড বিবাদী হয়। শিয়া ওয়াকফ বোর্ডকে মামলার কোনো পক্ষে অংশীদার করা হয়নি।

কিন্তু তারপরও শিয়া ওয়াকফ বোর্ড তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। হিন্দুত্ববাদী শক্তি নানা প্রলোভনে তাদেরকে এ বিতর্ক জিইয়ে রাখতে প্রাণিত করেছে। এবং সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের সঙ্গে বিবাদের সূত্রে এখন তারা হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করেছে।

গত ৯ নভেম্বর বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে মসজিদের জায়গা যখন মন্দিরের জন্য দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট, তখন শিয়া ওয়াকফ বোর্ড সোৎসাহে স্বাগত জানিয়েছে এ রায়কে। এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবরে তিরিশ পাতার একটি হলফনামা প্রকাশ করে তারা বলেছিল, বাবরি মসজিদের জায়গা আমাদেরই। বাবরি মসজিদের জায়গায় যদি মন্দির নির্মাণের রায় আসে, তাহলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

রায় ঘোষণার পর শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান ওয়াশিম রিজমি তাঁর পক্ষ থেকে বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণে ৫১ হাজার রুপি অনুদান প্রদানেরও ঘোষণা দিয়েছেন।

এখান থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়, বাবরি মসজিদের মালিকানা নিয়ে শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে বিবাদ তৈরির পেছনে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে কলকাঠি নেড়েছে।

বাবরি মসজিদের রায়কে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী শক্তির এটা ছিল প্রথম কূটচাল। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তারা শিয়াদেরকে নিজেদের পক্ষে নিতে পেরেছে। এ ছাড়া সুন্নিদের মধ্যে আরেকটি বিভক্তিও তাদের কল্যাণে এসেছে। আহলে হাদিস এবং মাজহাবের অনুসারী মুসলিম জনগোষ্ঠী। আহলে হাদিস ফিরকার লোকজনও বাবরি মসজিদ ইস্যুতে মোটামুটি নীরব দর্শকের কাতারে ছিল। বরং তারা হিন্দুত্ববাদীদের দিকে একধাপ এগিয়ে এই রায়কে ভারতীয়দের ‘বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ তৈরির এই কূটচাল অবলম্বনের পেছনে হিন্দুত্ববাদীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিতর্কিত এবং একপাক্ষিক রায়ের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। এবং মুসলমানরা যাতে এ রায়ে কোনো প্রতিবাদের জায়গায় না যেতে পারে, তা নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া রায় ঘোষণার আগে মোটা দাগে আরও দুটি কূটচাল এঁটেছিল তারা। প্রথমত মুসলমানদের মধ্যে হত্যার ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাবরি মসজিদের রায়ের পর যাতে কেউ কোনো প্রতিবাদ না করে, এ জন্য বারবার ১৯৯২-এর ভয়াবহ সেই দাঙ্গার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

দ্বিতীয়ত মুসলিম অথোরিটিগুলোর ওপর ভারতীয় প্রশাসন এক ধরনের চাপ প্রয়োগ করেছিল, যাতে রায় ঘোষণার আগে মুসলমানদেরকে এ রায় মেনে নেওয়ার জন্য বিবৃতি দেন তাঁরা। ভারতীয় মুসলিমদের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দে উচ্চ পদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রায় ঘোষণার আগে মিটিং করেছেন। সেখানে দারুল উলুম কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করিয়েছেন আগত রায়কে যেন সকলেই মেনে নেন।

রায় ঘোষণার পর তাই স্বভাবতই প্রায় সকলে রায়টি মেনে নিয়েছেন। মেনে না নিয়ে উপায়ও ছিল না। একদিকে প্রশাসনিক চাপ, অপরদিকে দাঙ্গার ভয়। রায়কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের প্রতিবাদ করতে গেলে দেশজুড়ে আবারও হিন্দুত্ববাদীরা হিংস্র ভূমিকায় নেমে পড়ত। এ জন্য তারা প্রস্তুত হয়েই ছিল। তাই প্রভাবশালী মুসলিম নেতৃবর্গের অনেকে রায়ের ফলাফলে দুঃখপ্রকাশ করলেও প্রতিবাদ থেকে নিজেরাও বিরত থেকেছেন, সাধারণ মুসলিমদেরকেও বিরত থাকতে বলেছেন। আর অনৈক্যের সূত্র ধরে শিয়া ও আহলে হাদিস মতাবলম্বীরা সরাসরি প্রশংসা করেছেন এ রায়ের। ফলে সম্পূর্ণ একপাক্ষিক, বিতর্কিত এবং আইন-বহির্ভূত এই রায়ের একধরনের গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়ে গেছে ভারতের ভেতরে।

আগের সংবাদইসলাম যেভাবে সংখ্যালঘু প্রশ্ন মোকাবিলা করে
পরবর্তি সংবাদবাবরি মসজিদের রায় : কেন এত বিতর্কিত?