রাগিব রব্বানি :
ভারতের আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি তালিকা থেকে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি তালিকা করতে তোড়জোড় চালাচ্ছে দেশটির কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। এনআরসি থেকে বাদ পড়া আসামের ১৯ লক্ষ মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও জীবনযাত্রা দেখে এখন আতঙ্কে ভুগছেন কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ।
পশ্চিমবঙ্গে যদি এনআরসি হয়, তবে হিন্দু দলিতরা ছাড়াও সমস্যায় পড়বেন কোটি মুসলমান। এমনটা বলছেন সারা ভারত মতুয়া মহাসংঘের সহসভাপতি সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস।
গত ২২ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘দক্ষিণ এশিয়া উদ্বাস্তু সংকট ও মানবাধিকার প্রশ্ন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, পশ্চিমবঙ্গের এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক মুসলিম এমন, যাঁরা রাজ্যের পুরানা বাসিন্দা এবং ভূমিপুত্র, কিন্তু তাঁদের কোনো কাগজপত্র নেই। এনআরসি তালিকা হলে আইনের মারপ্যাঁচে তাঁরা নিজেদেরকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করতে বেগ পোহাতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রে প্রমাণ করা অসম্ভবও।
এদিকে হিন্দুদের মধ্যে যাদের কাগজপত্র ঠিক নেই, এবং যারা ৭১-এর আগে-পরে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলেন তাদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। বরং মুসলমানদের চেয়েও সংখ্যায় তাঁরা বেশি। কিন্তু এনআরসি তালিকা থেকে তাঁরা বাদ পড়লেও পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাঁরা তালিকায় নাম উঠিয়ে নিতে পারবেন। ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর একাধিক ভাষণে বলেছেন, হিন্দুদের কোনো ভয় নাই, তাদের একজনকেও দেশ থেকে বার করা হবে না।
বিজেপির পক্ষ থেকে একাধিক ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সমস্ত হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-জৈন-পার্শি নাগরিক ভারতে এসেছেন, তাদের নাম এনআরসি থেকে বাদ পড়লে পুনরায় তাদেরকে তালিকাভুক্ত করা হবে।
কিন্তু মুসলমানদের ব্যাপারে এ রকম কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। মুসলমানদের মধ্যে যারা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারবেন, তাদের বাকি জীবন ডিটেনশন ক্যাম্পেই কাটাতে হবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের কোটি মুসলমান একটা আতঙ্কের ভেতর দিয়েই সময় পার করছেন।
চব্বিশ পরগনা জেলার ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টিট ইউনিভার্সিটির ছাত্র সাজিদ আহমদ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, এনআরসিকে সামনে রেখে অসংখ্য মুসলিম নাগরিক দুশ্চিন্তায় আছেন। ভূমিপুত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের অনেকের কাছে এমন কাগজপত্র নেই, যার দ্বারা তারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবেন। আবার বেশির ভাগ মানুষ প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসের কারণে নিজেদের নাগরিকত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারে নূন্যতম জানাশোনাটুকুও নেই।
সাজিদ বলেন, একই শংকা হিন্দুদের মধ্যেও কাজ করছে, যারা ৭১-এর আগে-পরে বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন এবং যাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের মতো কোনো কাগজপত্র নেই। কিন্তু বিজেপি যেহেতু হিন্দুত্ববাদী দল, তাই আখেরে এরা নাগরকিত্ব পেয়ে যাবে। সমস্যা ও আশঙ্কা কেবল মুসলমানদের জন্যই শেষমেষ থেকে যাবে। মুসলমানদের মধ্যে যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবেন না, তাদের শেষ ঠিকানা ডিটেনশন ক্যাম্প অথবা বাংলাদেশে পুশব্যাক।
