পাল্টে যাচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম : প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে কাটছে না ধর্মীয় শিক্ষার বিপর্যয়

পাল্টে যাচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম : প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে কাটছে না ধর্মীয় শিক্ষার বিপর্যয়

রাগিব রব্বানি:

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ২০২১ সাল থেকে পরিবর্তিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠদান করা হবে সরকার অনুমোদিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। ‘যোগ্যতা’ ও ‘দক্ষতা’-কে গুরুত্ব দিয়ে পরিমার্জিত এ শিক্ষাক্রম সাজানো হলেও বরাবরের মতো উপেক্ষিত থাকছে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টি। ফলে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমের মাধ্যমেও ধর্মীয় শিক্ষার চলমান বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা কতখানি সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে।

শিক্ষাক্রমের খসড়া রূপরেখা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ১০টি মূল দক্ষতা এবং ১০টি বিষয় শেখানো হবে শিক্ষার্থীদের। মূল দক্ষতাগুলো হলো সূক্ষ্ম চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যার সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সহযোগিতা, যোগাযোগ, বিশ্ব নাগরিকত্ব, জীবিকায়ন, স্ব-ব্যবস্থাপনা এবং মৌলিক দক্ষতা।

আর যে ১০টি বিষয় শেখানো হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, জীবন ও জীবিকা, পরিবেশ ও জলবায়ু, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা, শারীরিক-মানবিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। শ্রেণি অনুযায়ী এসব বিষয় শেখানো হবে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ইতিমধ্যে নতুন শিক্ষাক্রম তৈরির কাজ গুছিয়ে এনেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে দুই বছর মেয়াদি (বর্তমানে এক বছর) ধরে শিক্ষাক্রম তৈরি করা হচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে ২০২১ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের নতুন বই দেওয়া শুরু হবে।

এ ছাড়া মাধ্যমিক স্তর (দশম শ্রেণি) পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে একই ধরনের বিষয় পড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে এনসিটিবি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত হলে এখনকার মতো নবম শ্রেণি থেকে একজন শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষায় শাখায় ভাগ করা হবে না। এই ভাগ হবে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে গিয়ে। তবে এটি হলেও ২০২৪ সাল থেকে চালু হতে পারে।

কিন্তু পরিবর্তিত সিলেবাসে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে মোটা দাগে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। শেখানোর জন্য যে ১০টি বিষয় রয়েছে, সেখানে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পাঠ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সেটা কীভাবে এবং কতখানি শেখানো হবে, ধর্মের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র থাকবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এ দিকে বর্তমান সিলেবাসে ধর্মীয় শিক্ষার পাঠ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তা পাঠদানে দেশের বেশির ভাগ স্কুলেই নেই বিশেষজ্ঞ কোনো শিক্ষক। ফলে বিষয় সম্পর্কে অনভিজ্ঞ এবং অযোগ্য শিক্ষকরাই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন ধর্ম শিক্ষার ক্লাস। ক্লাসটিতে থাকছে না আলাদা কোনো গুরুত্ব। নিতান্ত দায়সারা গোছেই পাঠদান করানো হচ্ছে। এমনকি অভিযোগ আছে, দেশের বিভিন্ন প্রাইমারি স্কুল ইসলাম শিক্ষার ক্লাস নিচ্ছেন হিন্দু শিক্ষকেরা।

প্রাথমিক স্কুলগুলোতে ধর্ম শিক্ষার জন্য আলাদা একজন শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে বর্তমান সরকার প্রায় ১০ বছর আগে একটা ঘোষণা জারি করেছিল। কিন্তু অজানা কারণে, সেই ঘোষণাটির বাস্তবায়ন আজ অবধি হয়নি।

ধর্মীয় ঘরানার বিশিষ্টজনেরা বলছেন, সাধারণ শিক্ষার সিলেবাসে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে পাঠদান করানো জরুরি। কারণ, এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী নিজের ধর্ম সম্পর্কে জানার পাশাপাশি নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের চর্চাও উত্তমরূপে করে নিতে পারে। ধর্মের সংশ্লেষ ছাড়া নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পাঠদান আদতে সম্ভবপরও নয়। তাই পরিবর্তিত সিলেবাসে শেখানোর জন্য যে ১০টি বিষয় রাখা হয়েছে, সেখানে ধর্মশিক্ষার বিষয়টিও আলাদাভাবে গুরুত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা আবশ্যক।

ইসলাম বিষয়ক লেখক ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ স্কুল পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বিষয়ে বলতে গিয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের সকলকে সোচ্চার হতে হবে। কোমলমতি মুসলিম শিশুদের জন্য ধর্ম শিক্ষা আবশ্যিক একটা বিষয়। বাংলা ইংরেজি গণিতের চেয়েও এ বিষয়টা ক্ষেত্রেবিশেষে তাদের জন্য জরুরি। অথচ আমরা সচরাচর যেটা দেখে আসছি, বছরের পর বছর ধরে অবহেলার শিকার হয়ে আসছে এ শিক্ষাটি। এখন খবর পাওয়া যাচ্ছে, শিক্ষাক্রমে আমূল পরিবর্তন আনার খসড়া পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে, কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টি সেখানেও গুরুত্বহীন থেকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, তাই স্কুল পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ববহ করে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে ব্যাপকভাবে আওয়াজ উঠিয়ে সরকারের উচ্চপদস্থদের দৃষ্টি আকর্ষণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

এদিকে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন একই কথা বলছেন। তিনি বলেন, ধর্মকে বাদ দিয়ে বা ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্বহীন রেখে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সিলেবাস অপূর্ণাঙ্গই থেকে যায়। কারণ, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ ধর্মশিক্ষার মাধ্যমে যেভাবে শেখা যায়, অন্য কোনো পন্থায় তা সম্ভবপর নয়। তাই আমি মনে করি, স্কুলের পাঠ্যসূচিতে ধর্মীয় শিক্ষার পাঠকে গুরুত্বের সঙ্গে এবং আরও গঠনমূলক পন্থায় অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

আগের সংবাদভারতে অতিরিক্ত সময় অবস্থান করলে ২০০ গুণ বেশি জরিমানা গুণতে হয় বাংলাদেশি মুসলিমদের
পরবর্তি সংবাদমুসলিমবিরোধী নাগরিকত্ব বিল পাশ : বিজেপির বিরুদ্ধে উত্তাল আসাম