মৃত্যুর সাত বছর: মুফতী আমিনী কেন এখনো সমান প্রাসঙ্গিক?

মৃত্যুর সাত বছর: মুফতী আমিনী কেন এখনো সমান প্রাসঙ্গিক?

রাগিব রব্বানি:

বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতি এবং ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষার আন্দোলনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি। আজ ১২ ডিসেম্বর। ২০১২ সালের এ দিনে অনেকটা হঠাৎ করেই তিনি পরপারের ঠিকানায় পাড়ি জমান।

মৃত্যুর সাত বছরের মাথায় মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি এ দেশের ধর্মীয় পরিমণ্ডল এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে কেন এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম আলেম কবি ও বিশ্লেষক মুসা আল হাফিজের সঙ্গে।

মাওলানা মুসা আল হাফিজ বলেন, একটা জাতি বা গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে থাকা বা প্রতিষ্ঠিত থাকার মৌলিক উপাদানগুলোর একটি হচ্ছে ওই জাতি তাঁর জাতিগত শত্রু কারা এবং কারা তাদের মিত্র, তা চিনতে পারা। মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি ফ্যাসিবাদ এবং রাজনৈতিক স্থবিরতার এই সময়ে তাঁর জীবৎকালের মতোই সমান প্রাসঙ্গিক থাকবার প্রধানতম কারণ হচ্ছে, তিনি জাতিগত শত্রু এবং মিত্রদের চিনতে পারতেন। জাতিগত শত্রুদের সঙ্গে কখনোই আপোস করতেন না।

মুসা আল হাফিজ বলেন, জাতিগত শত্রুমিত্র চিনতে পারাটা কিন্তু অনেক বড় একটা ব্যাপার। এখানে ভুল হলে কর্মপ্রক্রিয়ার বাকি জায়গাগুলোতে ক্রমাগত ভুল হতে থাকে। মুফতী আমিনী ছিলেন এ ব্যাপারে চৌকান্না এবং সচেতন। ফলে জাতিগত শত্রুরা কখনোই তাঁকে কাবু করতে পারেনি। কিন্তু বর্তমানে এই সচেতনতাটা নেই বললেই চলে। আমাদের জাতিগত শত্রুমিত্রের পার্থক্যটা এখন নানাভাবে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি নিরেট আদর্শের কথা যাঁরা বলছেন, তাঁদেরকেও শত্রুমিত্রের পার্থক্য সম্পর্কে বেখেয়াল করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি এই ব্যাপারটাকে বলতেন ‘কিবলা’। বলতেন, কাজের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথমত কিবলা নির্ধারণ করতে হবে। মতাদর্শিক কিবলা ঠিক রেখে কাজ করতে হবে। এই সময়ে এসে মুফতী আমিনীর সেই কথাটার গুরুত্ব বোঝা যায়। কিবলা বা লক্ষ্য ঠিক রাখার জায়গাটায় আমরা যেখানে আরও সচেতন হবার কথা, সেখানে আরও নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু মুফতী আমিনী ছিলেন লক্ষ্যের প্রতি অবিচল। একজন আমিনীর প্রাসঙ্গিকতা এই কারণেও এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হি’র বহুমুখী কর্মতৎপরতার কথা উল্লেখ করে মাওলানা মুসা আল হাফিজ বলেন, একদিকে তিনি ছিলেন দক্ষ একজন শায়খুল হাদীস, অপরদিকে ছিলেন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। হাদিসের দরসে তাঁর ইলমি পাণ্ডিত্য ছিল বিস্ময়কর, ময়দানের রাজনীতিতেও তাঁর নেতৃত্বের দাপট ছিল আপোসহীস এবং প্রজ্ঞাদীপ্ত।

মুসা আল হাফিজ বলেন, রাজনীতির গতিপথ বুঝতেন মুফতী আমিনী, বুঝতেন সময়ের প্রয়োজন এবং চাহিদা। ‘হাওয়া বুঝে পাল খাটানো’র যে একটা প্রবণতা আছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনেকের মধ্যে, মুফতী আমিনী তেমন ছিলেন না। তিনি বাস্তবতার আলোকে এবং চাহিদার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। অনেকে বলেন, তিনি ‘গরম গরম বক্তব্য’ দিতেন। হ্যাঁ, তিনি দিতেন। কিন্তু সেটা অবাস্তব কোনো বক্তব্য হতো না। তিনি যখনই কোনো হুংকার দিয়েছেন, এই হুংকারকে যথাযথভাবে কাজেও লাগিয়েছেন। অবাস্তব কোনো হুংকার তিনি দেননি।

মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহ আলায়হির আন্দোলন-সংগ্রামে সফলতা ও তৎপর থাকার দিকটা উল্লেখ করে মুসা আল হাফিজ বলেন, তাঁর সংগঠন এত বড় বা গণমুখী ছিল না, কিন্তু তিনি যে সমস্ত আন্দোলন করেছেন, ময়দানের রাজনীতিতে তাঁর আহ্বানে গোটা দেশ যেভাবে সাড়া দিয়েছে, চারদলীয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকেও বিস্ময় মানতে হয়েছে। তাঁর জীবনের সর্বশেষ আন্দোলন নারীনীতি বিরোধী হরতাল, মিছিল-মিটিংয়ে তিনি যে সাড়া ফেলেছিলেন, যেভাবে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন, সেসময়কার বিরোধীদলীয় প্রধান তাঁর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বলেছিলেন, মাওলানার আন্দোলন-সংগ্রাম থেকেও তো অনেক কিছু শিখতে পারের আপনারা।

মুসা আল হাফিজ বলেন, আমি বলছি না রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তিনি কখনো ভুল করেননি। মানুষ হিসেবে ভুল করতেই পারেন। কিন্তু জেনে বুঝে কখনো ভুলের পথে পা বাড়াননি। ভুল করেছেন ভুলক্রমে।

তিনি আরও বলেন, মুফতী আমিনীর সবচেয়ে বড় গুণগুলোর একটি ছিল তিনি আপোসহীন ছিলেন। ৪ এপ্রিলের হরতালের পর তাঁকে কার্যত বন্দী করে রাখা হয়েছিল। নানাভাবে তাঁর সঙ্গে আপস করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু মুফতী আমিনী নিজের আদর্শ ও আপোসহীনতার জায়গা থেকে সরেননি। একজন আপোসহীন মুফতী আমিনী পরিচয়েই তিনি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর এই আপোসহীনতা, ত্যাগ এবং রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতা বাংলাদেশের সর্বগ্রাসী স্থবিরতার এই সময়ে তাঁকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

আগের সংবাদআন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রমাণ করা কতটা সম্ভব?
পরবর্তি সংবাদআন্তর্জাতিক আদালতে সু চি’র মিথ্যাচারে ক্ষুব্ধ রোহিঙ্গারা