
আজ ১২-১২-২০১৯ ইসাব্দ। ২০১২-এর এই দিনে বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামের সিপাহসালার আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. ইনতেকাল করেছিলেন। তাঁর জীবন সম্পর্কে জানতে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম মুফতি আমিনীর বিশিষ্ট শাগরিদ, লালবাগ মাদরাসার মুহাদ্দিস, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ-এর।
ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর-এর পাঠকদের জন্য আজ আপনার কাছ থেকে মুফতী আমিনী রহ. সম্পর্কে কিছু শুনতে চাইব।
জি, শোকরিয়া। কীভাবে শুরু করবেন, বলুন।
আপনি খুব কাছ থেকে মুফতি আমিনী রহ.-কে দেখেছেন, তিনি ঠিক কেন স্বতন্ত্র ছিলেন?
মুফতি আমিনী রহমতুল্লাহি আলায়হি নানা কারণে স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার অধিকারী ছিলেন। পয়েন্ট আকারে যদি তাঁর স্বাতন্ত্র্যের কারণ বলতে যাই তবে সর্বাগ্রে তাঁর যে গুণটি বলতে হয় তা হলো, তীক্ষ্ণ মেধা এবং বুদ্ধিমত্তা। মেধা ও বুদ্ধিমত্তার জোরে তিনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। এটা তাঁর স্বাতন্ত্র্যের বড় একটা দিক। দ্বিতীয়ত ইসলাম ও দেশের স্বার্থে যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার সাহস ছিল তাঁর। তৃতীয়ত প্রতিটা কাজেই তিনি দোআর পাশাপাশি সব রকমের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন। চতুর্থত সবার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে তিনি কাজ করতে পারতেন। এবং ইলম ও আমলের দিক দিয়ে অনেক উঁচু পর্যায়ের একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এরকম আরও অনেক কারণে তিনি বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনে স্বতন্ত্র একজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।
ঠিক কবে থেকে আপনি তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত আন্দোলনগুলোতে আপনার ভূমিকা ঠিক কি ছিল?
এ তো অনেক দীর্ঘ ফিরিস্তি! যেহেতু জানতে চেয়েছেনই, সংক্ষেপে বলি। মুফতি আমিনী রাহঃ এর স্নেহছায়ায়ই আমার রাজনৈতিক জীবনের বেড়ে ওঠা এবং কর্মজীবনের সূচনা। সেই ৮৬-৮৭ সালে যখন দাওরায়ে হাদিস পড়ি, তখন থেকেই আমি তাঁর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করি। তারপর থেকে জাতীয় নির্বাচন ও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে আমি তাঁর নেতৃত্বে কাজ করি। ৮৮-এর নির্বাচন, ৯১-এর নির্বাচন, ৯২-তে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা দুর্বার আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম।
বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে বাংলাদেশ থেকে ঐতিহাসিক যে লংমার্চ হয়েছিল, মুফতি আমিনী রাঃ এর সদস্য সচিব এবং প্রধান সমন্বয়ক। লংমার্চের একজন কর্মী হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করার বিরল সুযোগ আমার হয়েছে। লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য তালিকায়ও আমার অন্তর্ভুক্তি ছিল। লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল যশোর হয়ে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে অযোধ্যা অভিমুখে। লংমার্চের স্বেচ্ছাসবক বাহিনীর প্রধান বানানো হয়েছিল আমাকে।
তারপর তসলিমা নাসরিনের ধর্মবিদ্বেষী লেখালেখি ও নাস্তিকতা বিরোধী আন্দোলনের যে ঢেউ উঠেছিল পুরো দেশে, মুফতি আমিনী রহমতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন এর কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। সেসময়ও তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলনে আমার সম্পৃক্ততা ছিল। ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা প্রতিরোধ মোর্চার আমি ছিলাম সাংগঠনিক সম্পাদক। নব্বইয়ের দশকে খতমে নবুওত আন্দোলনেও মুফতী আমিনীর নেতৃত্বে কাজ করেছি।
২০০১-এ হাই কোর্টের ফতোয়া-বিরোধী রায়ের পর যে আন্দোলন হয়েছিল, হুজুরের নেতৃত্ব সেখানেও আমার ভূমিকা ছিল। ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত করা হয় আমাকে। এই আন্দোলনে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক ও মুফতী আমিনীকে যখন কারাবরণ করতে হলো, বেফাক মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদী তখন আন্দোলনের হাল ধরেন। আমরা জাহানাবাদীর নেতৃত্বে আন্দোলন আরও বেগবান করি এবং শায়খুল হাদিস ও মুফতি আমিনী রহ. কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি বি-বাড়িয়া থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, সে নির্বাচনেও আমাকে তিনি সঙ্গে রেখে তাঁর নির্বাচনী প্রচার কাজের মূল হিসেবে আমাকে নিয়োজিত করেন। তারপর গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন কুরআন-বিরোধী নারীনীতি আইন প্রণীত হয়, মুফতী আমিনী রহ. দুর্বার আন্দোলন শুরু করেন।
২০১১-এর ৪ এপ্রিল তাঁরই ডাকে সারাদেশে নজিরবিহীন হরতাল পালিত হয়। নারীনীতি বিরোধী আন্দোলনেও শুরু থেকে যথারীতি আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। হুজুরের নেতৃত্বেই নানা কর্মসূচিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। তারপর ২০১২-তে এসে তো হুজুর আমাদের ছেড়ে চলেই গেলেন রফিকে আ’লার সান্নিধ্যে।
তাঁর সঙ্গে আপনার অনেক স্মৃতি আছে, কিছু একান্ত স্মৃতির কথা বলবেন?
আমার জীবনটাই তো তাঁর স্মৃতি দিয়ে ভরপুর। কোনটা রেখে কোনটা বলব?
সেটা তো জানি আমরা সকলেই, তারপরও থাকে না বিশেষ দু-চারটা! ওইখান থেকে যদি বলতেন!
হুজুরের সঙ্গে আমি দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় সফর করেছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফরের সময়ও তিনি আমাকে নিয়ে যেতেন। বিভিন্ন জেলায় যখন একা সফর করতেন, তখনও আমাকে সঙ্গে রাখতেন। তো বিশেষ স্মৃতি হিসেবে যদি কোনো একটা রোমন্থন করতে বলেন, তবে তাঁর বিদেশ সফরের একটা কথা বারবার মনে পড়ে।
লন্ডন সফরে যখন তাঁর সঙ্গে যাই, রাস্তা দিয়ে চলার সময় ইউরোপিয়ানদের চলাফেরা এবং জীবনযাপন দেখে তিনি বলেন, ‘এদের এই যে জৌলুস, বাহ্যিক চাকচিক্য আর বিলাসিতা, এগুলো দেখে আমি কখনও মুগ্ধ হই না। কারণ এরা এসব শিখেছে আমাদের মুসলিমদের দেখেই। মুসলিমদের কাছ থেকেই এরা সভ্যতার প্রথম পাঠ নিয়েছে। স্পেনে মুসলিমরা যখন উন্নত জীবনযাপনের জন্য নানা কিছু আবিস্কার করছিল, সভ্যতার সঙ্গে এই ইউরোপিয়ানদেন তখন নূন্যতম কোনো সম্পর্কও ছিল না। পরে স্পেনের মুসলমানদের কাছ থেকেই তারা শিখেছে কীভাবে সভ্য হয়ে জীবনযাপন করতে হয়। তো এদের আজকের এই চাকচিক্য আর বিলাসিতা দেখে আমি কেন মুগ্ধ হব? এটা তো আমার পূর্বপুরুষেরই অবদান!’
হুজুরের সেই কথাগুলো আজও আমার হৃদয়ে বাজে। আজও ইউরোপিয়ানদের দেখলে সে কথাগুলো মনে পড়ে। আমার মনে আছে, একবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়েছিলেন হুজুর। আমি ও সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখন অক্সফোর্ডে ঢুকি তখন অক্সফোর্ডের বিশাল লাইব্রেরি বন্ধ। এই সময়টাতে কাউকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় হুজুরের জন্য লাইব্রেরি উন্মুক্ত করে দেয়।
এটা কত সালের কথা?
দু’হাজার পাঁচের। হুজুর তখন সংসদ সদস্য।
ও আচ্ছা। জি, তারপর?
হুজুর লাইব্রেরিতে ঢুকে বেশ কিছু কিতাব খুঁজে খুঁজে বের করে আমাদের দেখিয়ে বললেন, ‘এইগুলো সেই কিতাব, ইউরোপিয়ানরা যেগুলো বাগদাদসহ বিভিন্ন মুসলিম সাম্রাজ্য থেকে নিয়ে এসেছে। এবং এগুলোর ওপর রিসার্চ করেই আজকের এই চাকচিক্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা তারা গড়ে তুলেছে। তাই পশ্চিমাদের বিলাসিতা দেখে আমাদের অভিভূত হবার কিছু নেই।’
এভাবেই তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ বিষয় দিয়েও তিনি আমাদের উৎসাহিত করতেন, অনুপ্রাণিত করতেন দীনের জন্য। তাঁর শিক্ষাটা আসলে ছিল কাজের ওপর। মানুষ, তোমরা কাজ করে যাও। নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলো। যেন দীনের প্রতিটা কাজই তোমরা আঞ্জাম দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পার। কাজ করে যেতে হবে। মানুষ কী বলল সেদিকে কর্ণপাত করা যাবে না। কাজ করলে কিছু মানুষ ভালো বলবে, কিছু মানুষ বিরোধিতা করবে। নানাভাবে কটাক্ষ করবে। এ দিকে কোনো নজরই দেবে না। পাশাপাশি শুহরত-সুখ্যাতির জন্যও কাজ করবে না। কাজ করবে, নিয়ত থাকতে হবে আল্লাহ তাআলাকে রাজি-খুশি করা, ব্যাস। মুফতি আমিনী রহ. এ শিক্ষাটাই আমাদের দিয়ে গেছেন।
মুফতী আমিনী রহ.-কে তো আপনি দীর্ঘ একটা সময় কাছ থেকে দেখেছেন, সান্নিধ্য নিয়েছেন, আপনার একান্ত সেই দেখা এবং সান্নিধ্য নেওয়া থেকে তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মানুষ যখন কোন কাজে সফল হয় তখন মানুষের সম্মান বেড়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ এমনও থাকে যারা কোন কাজে সফল হলে সেই কাজের সম্মান বেড়ে যায়। মুজাহিদে মিল্লাত মুফতী আমিনী রহ. এমনই একজন মনীষী তিনি যখন কোনো কাজে সফল হতেন তখন সেই কাজের সম্মান বেড়ে যেতো।
মুফতী আমিনী রহ.-এর গভীর মায়াবী ও অন্তর্ভেদী দুটি চোখ আমি দেখেছি। তাঁর কণ্ঠে আমি নীল সমুদ্রের গভীরতা আর হিমালয়ের উচ্চতা দেখেছি। দরসে হাদীসের মসনদে এক জীবন্ত কিংবদন্তি দেখেছি, চেতনা-বিশ্বাসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আসহাবে রাসুল, সালফে সালেহিন ও আকাবের-আসলাফের বিশুদ্ধ আদর্শকে লালন ও পালনকারী এক উজ্জ্বল প্রদীপ দেখেছি। অসাধারণ, তীক্ষ্ণ মেধাবী, অসীম প্রজ্ঞার অত্যুজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি ও শক্তিশালী ঈমানদার, একাগ্র, কর্মক্ষম ও সফল কর্মবীর, যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়ার এক দুর্লভ প্রতিভা দেখেছি। একবিংশ শতাব্দীর এক মহানায়ককে দেখেছি। এতসব গুণে সমৃদ্ধ এবং বলিষ্ঠ, তাজা, সতেজ ও প্রাণবন্ত ঈমানে বলীয়ান ছিল মুজাহিদে মিল্লাত মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.-এর জীবনধারা।
কিন্তু একজন মুফতী আমিনী হওয়ার জন্য এতসব বিরল গুণে সমৃদ্ধ হওয়া যথেষ্ট নয়; কারণ একজন মুফতী আমিনী প্রতিদিন প্রতি যুগে সৃষ্টি হন না।
মুফতী আমিনী রহ. এত কিছুর পরেও ছিলেন আখলাকে হাসানা, বিনয়, নম্রতা, সহনশীলতায় আসহাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ধারার মূর্তপ্রতীক।
উম্মাহর অতন্দ্রপ্রহরী মুজাহিদে মিল্লাত মুফতী আমিনী রহ.। অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন পুরুষ। স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। বড় বড় কথা বলতেন, তার চেয়েও বড় বড় কাজ করতেন। ইসলাম, দেশ, জাতির চিন্তা, ফিকির, মানুষের দুরবস্থার বেদনায় তিনি নির্ঘুম রাত কাটাতেন। আমরা তাঁকে হারিয়েছি। তাঁকে হারানোর সাথে, অন্য অনেক কিছু হারানোর তুলনা চলে না ।
মহান আল্লাহ! তাঁকে পূর্ণ মাগফিরাত দান করুন, জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে আসীন করুন। আমীন।
