হামমাদ রাগিব :
ভারতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাশ হবার প্রতিবাদে পুরো দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ এবং সহিংসতা চলছে। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথাক্রমে তাদের পূর্বনির্ধারিত ভারত সফর হঠাৎ করেই বাতিল করেন। এরই সূত্র ধরে একটা প্রশ্ন বড় হয়ে সামনে এসেছে, ভারতের সাথে কি তবে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘খারাপ’ হচ্ছে?
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিক তিন টার্ম ধরেই বেশ ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’। তিস্তার পানি থেকে নিয়ে নানা ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করলেও বাংলাদেশ বরাবরের মতো মৈত্রী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নয়া দিল্লির বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ঢাকাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে খবর আসছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে।
মাস দুয়েক আগে কোনো ঘোষণা ছাড়াই ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশে হু হু করে বেড়ে যায় পেঁয়াজের দাম। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে দিল্লির কাছে অনুরোধও করেন, ভবিষ্যতে কোনো পণ্য রপ্তানি বন্ধ করলে বাংলাদেশকে যেন আগে থেকেই জানানো হয়। একই সঙ্গে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় বাংলাদেশ যে সমস্যায় পড়েছে, সে কথাও সেখানে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
এদিকে ভারতের আসাম রাজ্যে এনআরসি তালিকা চূড়ান্তকরণ, পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি তালিকা করার ঘোষণা প্রদান এবং বাঙালিদেরকে ব্যাপকভাবে ধরপাকড়ের ফলে ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে দলে দলে মানুষ অনুপ্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। ফলে বিভিন্ন সীমান্তে বাংলাদেশকে নজরদারি বাড়াতে হয়েছে।
এরই মধ্যে ভারতের লোকসভায় বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এনে এর প্রেক্ষাপটে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন অব্যাহত থাকার অভিযোগ তোলেন। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেই নির্যাতন হয়নি বলে পরবর্তীতে তিনি সাফাই দিয়েছেন, কিন্তু সেসময় তিনি এ কথাও বলেছেন, একাত্তরের পরেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপরে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।
অমিত শাহার এই বক্তব্যের পর বৃহস্পতিবার রাতেই পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। বক্তব্যে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘ভারতের নিজের দেশে অনেক সমস্যা রয়েছে। ওরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করুক, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। বন্ধু দেশ হিসেবে আমরা আশা করছি ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়।’
অমিত শাহাকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো খুব কম দেশই আছে আছে, যেখানে এতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান। উনি (অমিত শাহা) আমাদের দেশে কয়েক মাস থাকলেই দেখতে পাবেন, এখানকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নজির স্থাপন করতে পারে।’
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সংখ্যালঘুদের সুবিধা দিয়ে দেশটির নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশের সময় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে যেভাবে বারবার পাকিস্তানের সঙ্গে একই নিক্তিতে রেখে বাংলাদেশকে মাপা হয়েছে, তা বাংলাদেশ সরকারের জন্য বেশ অস্বস্তিকর ও বিড়ম্বনাময় ছিল।
এই পরিস্থিতিতে বিল পাশের পরদিন বৃহস্পতিবার প্রাথমিক কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেষ মুহূর্তে এসে তাঁদের ভারত সফর বাতিল করলে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়। চলমান পরিস্থিতে ভারতকে কোনো বার্তা দেওয়ার জন্যই কি তবে গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হলো?
এই প্রশ্ন নিরসনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল শুক্রবার জানিয়েছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবসকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁদের ভারত সফর বাতিল করেছেন। এর বাইরে আর কোনো কারণ নেই। ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে মন্ত্রীদয়ের সফর বাতিলের কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে বিবিসি বলছে, ভারতের এনআরসি, পেঁয়াজ রপ্তানি হঠাৎ করে বন্ধ করা এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশের সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ অস্বস্তিতে পড়েছে এবং সফর বাতিলের মাধ্যমে তার একটা প্রকাশ দেখানো হয়েছে।
তবে অস্বস্তি বা প্রশ্ন যাই থাকুক না কেন, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ সেটা প্রকাশ করতে চাইছে না।
বিবিসির ভাষ্য মতে, পুরো এই বিষয়টা নিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সর্বশেষ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে এবং রাজনৈতিক যে প্রেক্ষাপট, তাতে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন সৃষ্টি হোক, সেটা চাইবে না। এদিকে ভারতও এই অঞ্চলে অন্য দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে পারেনি। ফলে তাদেরও বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। অতএব অস্বস্তি থাকলেও দুই দেশই স্ব স্ব তাগিদ থেকে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে বলে মনে করেন তারা।
