হঠাৎ বন্ধ কাতার ইন্টারভিউ : নেপথ্যে কী?

হঠাৎ বন্ধ কাতার ইন্টারভিউ : নেপথ্যে কী?

রাগিব রব্বানি:

গত কয়েক বছরে বেশ কয়েক ধাপে কাতার ধর্মমন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দেশটির বিভিন্ন মসজিদে। উন্নত সুযোগ-সুবিধা, ভালো অংকের সম্মানী এবং বিশেষ সম্মানের সঙ্গে তাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ে মুয়াজ্জিনি, ইমামতি এবং জুমার খুতবা প্রদানের দায়িত্ব পালন করছেন। এতে একদিকে ব্যক্তিগতভাবে যেমন তাঁরা সম্মানিত ও স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেম্নি দেশও পাচ্ছে মোটা অংকের রেমিট্যান্স।

কাতার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিশেষ একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে কয়েক হাজার হাফেজের মধ্য থেকে বাছাই করে তাঁদেরকে নিয়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছরও প্রতিনিধিদলটি এসেছিল। তাঁদের আগমন উপলক্ষে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দেশের ৬ সহস্রাধিক হাফেজ বাছাইপর্বে অংশগ্রহণের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও ইন্টারভিউ অনুষ্ঠানের আগের দিন হঠাৎ করেই জানানো হয়, ইন্টারভিউ অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

এতে দেশের ৬ সহস্রাধিক হাফেজ, যারা মাস ব্যাপী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন ইন্টারভিউয়ের জন্য, তাঁরা আশাহত হন। সেই সঙ্গে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায় বাংলাদেশের বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনের উল্লেখযোগ্য একটি সুযোগ।

কেন হঠাৎ করেই এই ইন্টারভিউ স্থগিত করা হলো, ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল এ বিষয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কাতার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদলটি কয়েক বছর পর পর বাংলাদেশে আসে। রাজধানীর কোন উল্লেখযোগ্য মসজিদে আয়োজন করা হয় ইন্টারভিউয়ের। নির্দিষ্ট তারিখের আগে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় ইন্টারভিউয়ে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া। দেশের আগ্রহী হাফেজগণ প্রক্রিয়া অনুসারে আবেদন পূর্বক ইন্টারভিউয়ে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সরাসরি এ ইন্টারভিউ গ্রহণ করেন, এবং তাঁদের মনোনয়নে যাঁরা উত্তীর্ণ হন তাঁদেরকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে প্রতিনিধিদল কাতার নিয়ে যান। এখানে বাংলাদেশি কারও কোনো সুপারিশ বা প্রভাব থাকে না। এমনকি মধ্যস্থতাকারীদেরও কোনো প্রভাব থাকে না ইমাম-মুয়াজ্জিন বাছাইয়ে। এ নিয়মানুসারেই গত কয়েক বছর ধরে এ কার্যক্রম চলছিল।

ইন্টারভিউ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত একটি সূত্র ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে জানায়, নিয়ম মাফিক এ বছর যখন ইন্টারভিউ আহ্বান করা হয়, তখন প্রভাবশালী একটি পক্ষ দাবি তোলে, ইন্টারভিউ তাদের অধীনে হতে হবে। প্রভাবশালী এই পক্ষ তাঁদের নির্দিষ্ট করা কয়েকজন হাফেজকেও মনোনয়নে উত্তীর্ণ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। নয়তো বাংলাদেশে এ ইন্টারভিউ হতে দেওয়া হবে না বলেও তারা হুমকি দেয়। ফলে কাতারের প্রতিনিধিদল এ খবর জানতে পেরে নির্দিষ্ট তারিখের ইন্টারভিউ বাতিল ঘোষণা করে এবং এভাবে তাঁরা ইমাম নেবে না জানিয়ে কাতার ফিরে যায়।

সূত্র জানায়, তারপর থেকে দেশের হুফফাজদের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাদের ফিরে আসার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু অসদুপায়ে বা তাদের সিলেকশনের বাইরে কোনো হাফেজকে তাঁরা নিতে পারবে না বলে অস্বীকৃতি জানায়।

অবশেষে গত ৫ ডিসেম্বর জাতীয় হাফেজ কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ব্যানারে হাফেজদের একটি দল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে সরকারের কাছে দাবি জানায়, কাতারের প্রতিনিধিদলকে তাদের শর্ত মতো যেন ফিরিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনা হয় এবং সরকারের কাছে একই দাবি জানানো হয় হাফেজ আলেম ও ধর্মীয় ঘরানার পক্ষ থেকে।

এরই প্রেক্ষিতে ৫ ডিসেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়, বিষয়টি ইতিমধ্যেই সরকারের গোচরীভূত হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আলেম সমাজের উদ্বেগের বিষয়টি বাংলাদেশ দূতাবাস অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এ বিষয়ে কাতার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে কাতারে দায়িত্বরত বাংলাদেশি ইমামদের অনেকে জানিয়েছেন, বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা না করলে কাতার চলতি মাসের মধ্যেই বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে মরক্কো থেকে ইমাম নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আগের সংবাদআমরণ অনশনে জুট মিলের আরও এক শ্রমিকের মৃত্যু
পরবর্তি সংবাদ১০ হাজার ৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ