জাতি গঠনে আরবী ভাষার ভূমিকা

জাতি গঠনে আরবী ভাষার ভূমিকা

নাজমুল হুদা :

নিঃসন্দেহে জাতি গঠনে ইতিহাস, ধর্ম ও অর্থনৈতিক উপাদানের ন্যায় আরবী ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যার উপর মুসলিম জাতির পরিচয়ের ভিত্তি রচিত। আরবী ভাষা এই জাতির প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিত্ব বিনির্মাণে মৌলিক উপাদানের নামান্তর। আরব ও মুসলিম জাতির কাছে যে কারণে এর অধিকতর গুরুত্ব বেড়ে যায়, সেটি হলো, রাসুল (সা.) এর মহান মোজেজার একটি হলো এই কোরআন। যা সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। বিগত কয়েক যুগ ধরে আরবী ভাষার উপর নানা মিথ্যা অপবাদ চাউর দিয়ে উঠেছে। যেমন এর ব্যাকরণ ও মূলনীতি খুব কঠিন এবং এর অনুধাবন সাধ্য-চেষ্টার উর্ধ্বে। এমনকি এটি জ্ঞানশূন্য ভাষা। এ কারণে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলগুলোতে শুদ্ধতাকে পরিহার করে ভাষার অশুদ্ধ চর্চার উপর আওয়াজ উঠে। কিছু সংখ্যক চিন্তাশীলরা বিংশ শতাব্দীর শুরু হতে এ আহ্বানের উপর বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তোলে। এমনকি এ যাবৎকাল পর্যন্ত উপরোক্ত আহ্বানটি চলে আসছে।

কিন্তু তাঁদের এ চেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। কোন আরব দেশ তাঁদের ‘সরকারি ভাষা’ হিসেবে কেউই আরবী ভাষার আঞ্চলিকতার উপর নির্ভর করেনি। কিন্তু বিপরীত ভাবাপন্ন অংশটির শুদ্ধ আরবী ভাষা বাদ দেয়ার এ হীন চেষ্টাটি অন্যভাবে সফল হয়েছে। সেটি হলো, প্রাথমিক স্তরে ইংরেজির মতো ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটানো। এমনকি আরব বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত, পদার্থ ও রসায়ন শাস্ত্র; এসব বিষয়ের পাঠদানে অনারবী ভাষা ও পরিভাষার জয়জয়কার। এমনকি আজ বিক্রয়কেন্দ্র, লেনদেন ও ঘোষণাপত্রেও অনারবের প্রসার ও বিস্তার। যা নিতান্তই দুঃখজনক ও অনেকটা হতাশার।

রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের পর সাহাবাগণ তাদের বুদ্ধিদীপ্ততা ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে মৌলিক তিনটি উপাদানের গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন। যে তিনটি বিষয়ের উপর জাতির সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভিত্তি স্থাপিত। সে তিনটি বিষয় হলো- কোরআনুল কারীম, রাসুলের হাদিস ও আরবী ভাষা। তাঁরা এটিও বুঝেছেন যে, অতীত জাতির মাঝে মতানৈক্য ও বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ হিসেবে ছিলো তাঁদের নবীদের মহান বাণীকে সংরক্ষণ না করা। এ কারণে সাহাবাগণ কোরআন সংরক্ষণের প্রতি পূর্ণ আগ্রহী হন। যার শুরুটি ছিলো, ঐতিহাসিক ইয়ামামার যুদ্ধে অধিক সংখ্যক হাফেজে কুরআন শহীদ হওয়াকে কেন্দ্র করে। ইমাম বুখারী রহ. হতে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর (রা.) হযরত আবু বকর (রা.)-কে কোরআন একত্রিত করার অনুরোধ করে বলেন, ‘ইয়ামামার দিবসে অনেক হাফেজে কোরআন শাহাদাত বরণ করেন। অন্যান্য স্থানেও আমি হাফেজদের শহীদ হওয়ার আশংকা করছি।’ অতঃপর আল্লাহ তাআ’লা হযরত ওমরের এ মতামতে আবু বকর রা. বক্ষকে প্রসারিত করে দিলেন। তারপর কোরআনুল কারীম নানাজন ও বিভিন্ন গ্রন্থ হতে একত্রিত করার প্রয়াসে হযরত যায়েদ বিন সাবেত (রা.) এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। তারপর জমাকৃত সে কপিটি হযরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে। এক সময় সে সংরক্ষণ দায়িত্ব হযরত ওমর (রা.) হয়ে শেষে হযরত হাফসা (রা.) এর কাছে অর্পিত হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যখন ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে গেল, অনারব লোকেরা ইসলামে দীক্ষিত হতে লাগলো, তখন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হলো। কোরআনের ভাষা হতে তাদের ভাষা ভিন্ন হওয়ায় কোরআনে নানাভাবে ভুলের বিস্তৃতি ঘটতে লাগলো। উদ্ভূত এ সমস্যা হতে উত্তরণকল্পে হযরত ওসমান (রা.) হযরত হাফসা (রা.) এর নিকট সংরক্ষিত মৌলিক কপিটির একেক কপি মক্কা, শাম, বসরা, কূফা, ইয়ামেন ও বাহরাইনে দূত মারফত পাঠিয়ে দেন। তন্মধ্যে একটি কপি মদীনাতে তিনি নিজের কাছে রেখে দেন; যাতে করে বিভিন্ন প্রান্ত হতে আগতদের কোরআন তেলাওয়াতে সূচিত পার্থক্যের সমাধান দিতে পারেন।

তারপর ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রয়োজন দেখা দিলো। তার একটি ছিলো, কোরআনুল কারীম তেলাওয়াতের সঠিকতা নিরূপণ। এতে করে জ্ঞানগর্ভমূলক একটি উদ্ভাবন সম্পন্ন হয়। সেটি ছিলো, হরফসমূহে বিন্দুচিহ্ন শব্দসমূহে স্বরচি‎‎‎হ্ন যুক্তকরণ। তারপর কোরআনে কারীমের অর্থাবলী ও আহকাম জেনে সুস্পষ্ট অনুধাবন তৈরী করার প্রয়োজনে আরবী ব্যাকরণ নাহু-সরফের অভিনব উদ্ভাবন সম্পন্ন হয়। কোরআনুল কারীমের অলৌকিকতা ও তাঁর অর্ন্তনিহীত ভেদ অনুধাবনের জন্য আরবী অলংকার শাস্ত্রের বিভিন্ন শাখার উদ্ভাবন ঘটে।

কোরআনের ভাষাকে যথাযথ সুবিন্যাস ও তা অনুধাবনে মতানৈক্য সৃষ্টি না হওয়া সংশ্লিষ্ট পূর্বের সকল জ্ঞানগর্ভমূলক উদ্ভাবন এটি সাব্যস্ত করে যে, জাতির ঐক্যে ধর্মীয় ঐক্যই হলো মৌল।

অন্য সকল নবীদের তাঁদের নবুওয়াতের প্রমাণস্বরূপ যে সকল মোজেজা ছিলো, তার সবকিছুই তাঁদের ইন্তেকালের পর নিঃশ্বেষ হয়ে যায়। আর রাসুল (সা.) এর উপর মুজেজা স্বরূপ অবতীর্ণ তাঁর ইন্তেকালের পরও অবশিষ্ট রয়েছে।

মোটকথা, আমাদের জাতিগঠনের কেন্দ্রবিন্দুর মৌলিক একটি কেন্দ্র হলো আরবী ভাষা। আমাদের ব্যক্তিত্ব বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ একটি চালিকাশক্তি। রাসুলের কোরআনুল কারীমের মতো মহান মুজিজাকে জানা এবং তাকে মনে-প্রাণে স্বীকার করার মৌলিক প্রবেশপথ এই আরবী ভাষা। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর একটি আরবী ভাষার অবদানের কথা কেয়ামত অবদি মহান গুরুত্বের বিষয় হয়ে থাকবে।

শিক্ষাথী, উম্মুল-কুরা বিশ্ব্ববিদ্যালয়, মক্কা মুকাররমা।

আগের সংবাদভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখান পাকিস্তান হিন্দু কাউন্সিলের
পরবর্তি সংবাদমুসলিমবিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন স্থগিত করেনি ভারতের সুপ্রিমকোর্ট