আলিয়া ও ধর্মীয় শিক্ষায় সংস্কার প্রস্তাব : মুয়াজ্জেম থেকে চৌধুরী কমিটি

আশরাফ উদ্দীন খান :

মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটি ১৯৪৬
মাওলানা আকরম খাঁ (সাব) কমিটি ১৯৪৯
আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী কমিটি ১৯৫৫

নিউ স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা এই অঞ্চলের অনেক মুসলমানের জন্য তদানীন্তন শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান সমস্যার একটি সহজ সমাধান এনে দিয়েছিল –বলেই মনে হয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মুসলমানদের আগ্রহের মাত্রা দেখে মনে হয় যে, সম্ভবত তারা এই ধরণের কোন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার অপেক্ষাতেই দীর্ঘদিন অতিবাহিত করছিলেন। ১৯১৫ সাল থেকে নিউ স্কীম শিক্ষাধারা চালু হয়। তবে এই শিক্ষাধারার ব্যাপারে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। অনেকেই মনে করতে থাকেন যে, ধর্মীয় শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্য বা দীনী শিক্ষা থেকে উম্মতকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন এক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এই ধরণের চিন্তাকে কেন্দ্র করে তাই ওল্ড স্কীম মাদ্রাসাও নতুন করে তৈরি হতে লাগল। তাই দেখা যায় যে, ১৯১৫ সালের পর থেকে অধিকাংশ শিক্ষা কমিটি বা কমিশনের প্রধান দায়িত্ব ছিল ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীম এই দুই শিক্ষা ধারার মাঝে কোনভাবে সমন্বয় সাধন করা যায় কিনা সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটি’ গঠিত হয়। দেশ বিভাগের পর, আলিয়া মাদ্রাসাকে ঢাকাতে স্থানান্তরিত করার পূর্বে এটাই ছিল সর্বশেষ কমিটি।

মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটি ১৯৪৬ সাল

“বাংলা সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জনাব সৈয়দ মুয়াজ্জেম উদ্দীন হুসাইনকে সভাপতি করে ১৯৪৬ সালের ৪ জুলাই একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্তি কমিটি ১৯৪৬ সালের ১২ জুলাই কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের জন্যে একটি সাধারণ আলোচনায় মিলিত হয়। এই আলোচনা বৈঠকেই মাদ্রাসা শিক্ষার দুটি ধারা ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীমের সিলেবাস কারিকুলাম নিরীক্ষণের জন্য দুটি ভিন্ন উপ-কমিটি গঠিত হয়।

উভয় কমিটি স্ব স্ব আলোচ্যসূচি আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে নতুন প্রস্তাবনা তৈরির জন্য পৃথক পৃথকভাবে বৈঠক করতে শুরু করেন। উভয় কমিটি ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীম মাদ্রাসার সংস্কার-উন্নয়নের নিমিত্তে কিছু প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেন। ১৯৪৬ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর উভয় কমিটির সম্মিলিত ২য় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার প্রস্তাবকৃত নীতিমালার উপর সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, প্রস্তুতকৃত উক্ত নীতিমালার উপর পরীক্ষামূলকভাবে জনমত যাচাই করা হবে।

অতঃপর প্রস্তাবিত ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা সম্পর্কিত নীতিমালা আলোচনা-সমালোচনা ও মন্তব্যের জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও শিক্ষানুরাগীদের মধ্যে তার কপি বিতরণ করা হয়। ফলে ইসলামী শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাবিত নীতিমালার উপর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। তার আলোচনা-সমালোচনা কমিটির নিকট প্রেরণ করা হয়। এমনকি স্থানীয় পত্র-পত্রিকার মাধ্যমেও তা প্রকাশ করা হয়।

১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি সৈয়দ মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটির ৩য় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাতে আলোচনা, সমালোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে কিছু নীতিমালার একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। সেই নীতিমালার কিছু দিক ছিল নিম্মরুপ:

বাংলা প্রদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার উন্নতির প্রয়াসে একটি মুসলিম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা, যা থাকবে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে, যাতে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার সমতা রক্ষা করা যায় ।

ওল্ড স্কীম মাদ্রাসাসমূহের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে ‘মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেঙ্গল’ নামে একটি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন করা।

‘বেঙ্গল টেক্সট বুক বোর্ডে’র অধীনে একটি সাব-কমিটি গঠন করে জনশিক্ষার সহকারী পরিচালককে তার সভাপতি নিয়োগ করে মাদ্রাসার জন্য নতুন পাঠ্য পুস্তক নির্ধারণ করতে হবে।

মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্যে একটি ট্রেনিং কলেজ স্থাপন করা, যোগ্য শিক্ষকরদের আরোও উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার জন্য অন্যান্য মুসলিম দেশের শিক্ষালয়ে পাঠানো হবে।

ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীম মাদ্রাসার প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সিলেবাস সমন্বয় করে তা প্রাথমিক শিক্ষা তহবিলের অধীনে ন্যস্ত করতে হবে।

মাদ্রাসার প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায় থেকে ইংরেজি বিলুপ্ত করতে হবে।

মুসলমানদের জন্য পৃথক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণী থেকে আরবি থাকতে হবে।

ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার জুনিয়র শ্রেণীসমূহে বাংলা বিষয় আবশ্যিক হিসাবে থাকবে।

ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীম মাদ্রাসায় ৩য় শ্রেণী হতে উর্দু আবশ্যিক বিষয় হিসাবে থাকবে।

প্রথামিক শিক্ষা সমাপ্তির পর ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার শিক্ষা বর্ষ হিসাবে নিম্নলিখিত স্তরে বিন্যাস করা হয়:
জুনিয়ার: ৪ বছর
আলিম: ৪ বছর
ফাজিল: ২ বছর
কামিল: ২ বছর

ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার ছাত্রদের পর্যায়ক্রমে উপরোক্ত ৪ টি স্তরে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে হবে.

পঠিত বিষয়সমূহ

প্রাথমিক শ্রেণীসমূহে আরবি, বাংলা, উর্দু, দীনিয়াত, পাটি গণিত, ভূগোল।.

জুনিয়র শ্রেণীসমূহে আরবি সাহিত্য, আরবি ব্যাকরণ, ফিকাহ, পাটি গণিত, ইসলামের ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থ বিদ্যা, বাংলা, ইংরেজি অথবা ফার্সির মধ্যে যে কোন একটি।

আলিম শ্রেণীতে আরবি সাহিত্য, আরবি ব্যাকরণ, ইনশা, কুরআন, হাদিস, ফিকাহ, ফারায়েয, মানতিক, মুনাযেরা, উসুলুল ফিকহ, বালাগাত, ইসলামের ইতিহাস এবং নৈর্বাচনিক বিষয়- বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি, পৌরনীতি। এছাড়া দর্জির কাজ ও শপ মেকিং এসব বিষয় হতে যে কোন একটি বিষয় নিতে পারবে।
ফাজিল শ্রেণী্তে আরবি সাহিত্য, আরবি ব্যাকরণ, ইনশা, হাদিস, উসুলুল হাদিস, তাফসীর, উসুলে তাফসীর, উসুলে ফিকাহ, কালাম, আধুনিক দর্শন, মানতিক, তাসাউফ, এবং নৈর্বাচনিক বিষয়- বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি, অর্থনীতি, পৌরনীতি, দর্জির কাজ, কার্পেন্টারি বা শপ মেকিং এসব বিষয় হতে যে কোন একটি বিষয় নিতে পারবে।

কামিল শ্রেণীতে হাদিস, তাফসীর, ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, আরবি সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস, ও সংস্কৃতি, ইসলামী দর্শন ও সূফীবাদ, তাবলীগ
আলিম ও ফাজিল শ্রেণীতে দর্জি, কাঠের কাজ, সাবান তৈরি ইত্যাদি কারিগরি বিষয়সমূহের মধ্য থেকে অতিরিক্ত বিষয় হিসাবে যে কোন একটি নিতে পারবে।

নিউ স্কীম বা হাই মাদ্রাসার সিলেবাস নিম্মরুপ

আবশ্যিক বিষয়: মাতৃভাষা (বাংলা/উর্দু), ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্র, গণিত, ইতিহাস ও ভূগোল, আরবি ১ম ও ২য় পত্র, ফিকাহ, ফারায়েয ও আকায়িদ
নৈর্বাচনিক বিষয়ঃ অতিরিক্ত ইংরেজি, উচ্চতর গণিত, ইসলামের ইতিহাস, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান, বৈজ্ঞানিক উপাদান সম্পর্কিত জ্ঞান, পদার্থ ও রসায়ন বিদ্যা, সেলাই ও সুচকর্ম ও গার্হস্ত্য বিজ্ঞান (মেয়েদের জন্য), ব্যবসা ও কারবার পদ্ধতি, উর্দু, ফার্সি।

সরকার ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার জন্য প্রস্তুতকৃত সংশোধিত সিলেবাস মেনে নিয়ে, ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই প্রস্তাবিত সিলেবাস বাস্তবায়নের জন্য একটি সরকারী আদেশ জারি করা হয়। ফলে এই সিলেবাস বাংলাদেশের সমস্ত ওল্ড স্কীম মাদ্রাসায় চালু হয়। নতুন সিলেবাস অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তকও প্রণীত হয়।
কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন রকম সংস্কারমুখী কার্যক্রমে হাত দেন, কিন্তু তা বাস্তবায়নের পুর্বেই ভারত ও পাকিস্থান নামে দুটি নতুন দেশের সৃষ্টি হল। ফলে বাংলা প্রদেশও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। পুর্ব বাংলা হল পাকিস্থানের অংশ। ঢাকা পুর্ব বাংলার রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করল।

এই সময় বাংলা প্রদেশের গুরুত্বপুর্ণ অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ভাগ-বণ্টন নিয়ে নানা রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিক্ষা দপ্তর কর্তৃক গঠিত একটি শিক্ষা সাব-কমিটির সিদ্ধান্ত এস. সি. নং ৮৭৭ রেজুলেশনের মাধ্যমে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার এংলো-পার্সিয়ান বিভাগ কলিকাতায় ও এরাবিক বিভাগ পুর্ব বাংলা বা ঢাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে শর্ত হলো পশ্চিম বাংলা লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মুসলিম লীগের নেতা খাজা নাজিম উদ্দীন যদি এতে সম্মত হয়।

মুসলিম লীগের নেতা এ প্রস্তাবে রাজি হন এবং মাদ্রাসার সমস্ত আসবাবপত্রসহ শিক্ষকমণ্ডলীকে ঢাকায় স্থানান্তরের জন্য সম্মতি দান করেন। মাদ্রাসার দুই জন শিক্ষক ছাড়া বাকি সবাই উক্ত আসবাবপত্রের বহনের জাহাজে আরোহণ করে ঢাকা আসেন।

কলিকাতার মত ঢাকায় ওল্ড স্কীমের কোন মাদ্রাসা না থাকায়, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার বৃহদাকার লাইব্রেরীর বই-পুস্তক, আসবাবপত্রসহ ঢাকার সদর ঘাটের নিকট ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজের হোস্টেলে স্থান লাভ করে। কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধিকাংশ ছাত্র ছিল পূর্ব বাংলার। ফলে মাদ্রাসা স্থানান্তরের সাথে সাথে তারাও ঢাকায় চলে আসে। অতঃপর পাকিস্থান সরকারের নির্দেশে ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজেই সকাল ৭টা হতে ১০টা পর্যন্ত মাদ্রাসার ক্লাস চালু করা হয়।

সেখানে এক বছর ক্লাস চলার পর, ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজের আওতাধীন ‘ডাফরীন’ হোস্টেলে মাদ্রাসা স্থানান্তরিত হয়। এখানে নিয়মিতভাবে ক্লাস চালু হয়। মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটি কর্তৃক প্রবর্তিত সিলেবাস অনুযায়ী প্রণীত ৪ স্তরের পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হতে থাকে।

নতুন দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুতেই পূর্ব বাংলা সরকার একটি আদেশ জারি করে, মুয়াজ্জেম উদ্দীন কমিটির পাঠ্যসূচি অনুযায়ী মাদ্রাসার ৪ স্তরের পরীক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন করেন দেন। পরীক্ষা সম্পর্কিত পরামর্শ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটা উপদেষ্ঠা কমিটিও গঠন করা হয়।

মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি পাকিস্থানী শাসক গোষ্ঠীর অনাগ্রহ ও অমনোযোগিতা মাদ্রাসা শিক্ষার অনুরাগী ও সমর্থকদের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার করে। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত একটি মুসলিম দেশের শাসকবলয় মাদ্রাসা শিক্ষা তথা ইসলামী শিক্ষার প্রতি এরুপ উদাসীনতা মাদ্রাসা ছাত্র, অভিভাবক, জনতাকে ধীরে ধীরে আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। কলিকাতা থেকে স্থানান্তর কৃত আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকগণ দেশে ফিরে পরবাসীর মতো অন্যের দ্বারে অনুগ্রহের পাত্র হয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অবশেষে ছাত্র-জনতা রাজপথে আন্দোলন শুরু করে।

মাদ্রাসা শিক্ষার মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার প্রবল দাবীর মুখে, পূর্ব বাংলা সরকার ১৯৪৮ সালের ১৬মার্চ, মাওলানা আকরম খাঁকে চেয়ারম্যান করে, মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ের তদারক ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে একটি সাব-কমিটি গঠন করার মাধ্যমে আন্দোলন থামানোর চেষ্ঠা করা হয়। (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ২০০-২১০)

মাওলানা আকরম খাঁ (সাব) কমিটি ১৯৪৯ সাল

“পূর্ব বাংলার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার উদ্দেশ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করার জন্য, ১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ, (পূর্ব বাংলা শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন কমিটি) East Bengal Education System Reconstruction Committee নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। মূল কমিটি ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষার অভ্যন্তরীণ শৃংখলা, ব্যবস্থাপনা, ক্লাসের পুনর্বিন্যাস ও পাঠ্য-পুস্তক প্রণয়ণ ইত্যাদি কাজ সম্পর্কে আরোও একটি রিপোর্ট তৈরি করার জন্যে মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁকে চেয়ারম্যান করে মাদ্রাসা শিক্ষা সাব-কমিটি নামে আরোও একটি কমিটি গঠিত হয়।

উক্ত সাব-কমিটিকে রিপোর্ট তৈরির জন্য কিছু টার্ম এন্ড রেফারেন্স দেওয়া হয়, যার উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল নিম্মরুপ

ওল্ড স্কীম, নিউ স্কীম মাদ্রাসা ও হাই স্কুলের শিক্ষা পদ্ধতি একই ধারায় সমন্বয় করা যায় কিনা এবং ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামের মূলনীতিসমূহ গুটিকতক অনুষ্ঠান সর্বস্ব পরকালের ধর্ম হিসাবে না পড়িয়ে একটি জীবন ব্যবস্থা হিসাবে পড়ানো যায় কি না, সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা
নারী শিক্ষা উন্নয়নের জন্যে একটি সুনিয়ন্ত্রিত কর্মপন্থা তৈরি করা।

এই কমিটির উপর ঢাকাতে নব প্রতিষ্ঠিত আলিয়া মাদ্রাসাকে সম্পুর্ণ নতুনভাবে নতুনরুপে গঠন করার উদ্দেশ্যে ছাত্র-জনতার দাবীসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মাদ্রাসার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের নিমিত্তে সুপারিশ পেশ করার গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয়।

উক্ত কমিটি ১৯০৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কিত যত কমিটি/কমিশন গঠিত হয়েছিল সেসব রিপোর্ট পর্যালোচনা করে একটি রিপোর্ট তৈরি করে ১৯৫১ সালে সরকারের সামনে পেশ করে। সেখানে ২০ দফায় সুপারিশমালা তৈরি করা হয়। উক্ত সুপারিশের প্রধান দফাগুলো ছিল নিম্মরুপ :

১. ভিন্ন ভিন্ন তিন প্রকার শিক্ষা ব্যবস্থা

পূর্ব বাংলায় তিন প্রকার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এক: সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা। দুই: ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। তিন: নিউ স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা। প্রথম পদ্ধতি সম্পূর্ণরুপে সেকুলার, দ্বিতীয় পদ্ধতি সম্পূর্ণরুপে ধর্মীয় আর তৃতীয় পদ্ধতিতে উভয় পদ্ধতির শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছিল। শেষোক্ত দুটি পদ্ধতির মৌলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রিটিশ শাসকরা এই দেশে শিক্ষা পদ্ধতিতে ইংরেজি প্রচলন করেছে, যখন তারা তা জনস্বার্থের অনুকূল মনে করেছিল। মুসলমানরা সময়ের চাহিদা অনুসারে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষাকেও গ্রহণ করেছিল, কিন্তু ততদিনে তাদের ক্ষতির পরিমাণ পৌঁছেছিল অনেক দূর।

২. ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার প্রধান সমস্যা

দেশের রাষ্ট্রভাষা যখন ফার্সি, তখন ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের প্রশাসনের জন্য ছাত্রদের গড়ে তোলা হতো, কিন্তু যখন ইংরেজি ভাষা ফার্সির স্থলাভিষিক্ত হল, তখন মাদ্রাসা শিক্ষা নিরাশায় ভরে উঠল। মুসলমানেরা তাদের ধর্মীয় বিধানের আলোকে শিক্ষাধারাকে মনেপ্রাণে ভালবাসত এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ধর্মতত্ত্ব শিক্ষার প্রতি অনুরাগী ছিল। এই শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অসুবিধা হলো, এর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষার কোন সম্পর্ক ছিল না। যদি বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ততা থাকত তাহলে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা নিজের ও সমাজের আরো বেশী উপকারে আসতে পারতো।

৩. মাদ্রাসা শিক্ষা পুনর্গঠনের অসুবিধাসমূহ

আধুনিক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতিকে ব্যবহারিক ও যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাবার উদ্যোগ সময়ে সময়ে গ্রহণ করা হয়। মাদ্রাসার পাঠ্যসূচীতে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হিসাবে ইতিহাস, ভূগোল, ইংরেজি, মাতৃভাষা, গণিত প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এই সকল বিষয় ঐচ্ছিক থাকায় তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। অন্যদিকে এই বিষয়সমূহ মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তির প্রধান অসুবিধা হলো মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী সাধারণ বিষয়সমূহের চেয়ে উচ্চ মানের, যে কারণে একই শ্রেণীতে তার সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব হয়নি।

মাদ্রাসা শিক্ষা সাধারণ শিক্ষার সাথে একত্রিত হয়ে একটি সুন্দর শিক্ষাক্রমের সূচনা করেছিল, যেমন সাধারণ বিষয়ের ইংরেজি, মাতৃভাষা, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান এবং মৌলিক ইসলামিক বিষয় –যেমন আরবি, কুরআন, ইসলামী আইন, ধর্মতত্ত্ব।

১৯১৫ সাল থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার পুনর্গঠনের সূচনা হয়। বাংলাদেশে এই পুনর্গঠিত শিক্ষা ব্যবস্থা দারুণভাবে বিজয়ী হয় এবং মুসলমানদের মধ্যে অভূতপুর্ব শিক্ষা জাগরণ সৃষ্টি করে। যারা দীর্ঘকাল যাবত ইংরেজি শিক্ষাকে অবহেলা করে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল, তাদের জন্যও শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হলো। এতে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জুনিয়র ও হাই মাদ্রাসা পুনর্গঠিত শিক্ষা ধারায় চালু করা হয়। বাংলার মুসলমানরা তাদের অশিক্ষা ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়ার পদক্ষেপ হিসাবে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মাদ্রাসা পুনর্গঠনের বৃহত্তর কর্মকান্ড শুরু করেন, তখন সমাজের অধিকাংশই ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, যা ছিল একেবারেই সেকুলার শিক্ষার সমতুল্য। যদিও হাই মাদ্রাসার শিক্ষার বিষয় হাই স্কুলের শিক্ষার বিষয়ের প্রায় অনুরূপ, তথাপি মাদ্রাসা শিক্ষার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসাধারণকে আকৃষ্ট করে রাখে।

৪. ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা ও সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষা একত্রীকরণ

এই জন্য প্রথমে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মাদ্রাসা শিক্ষার পুরনো পদ্ধতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষার অংশ হিসাবে ইসলামিক শিক্ষার যথোপযুক্ত ও মৌলিক ধারাসমূহ এই শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করা এবং সাধারণ শিক্ষার বিষয়সমূহ থেকে ব্যবহারিক বিষয়সমূহকে এর সাথে সম্পর্ক্ত করা। এতে ইসলাম ধর্মের মূল বিষয়ের সাথে দুই ধারার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ধারার সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
এটা সত্য যে, ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা আধুনিক সমাজের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তবে তারা অন্যান্য বিষয়ের সমাধান দিতে পারে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রদের ইসলামিক জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা বৃদ্ধি করা, যারা বিচারকার্যে ইসলামী আইন প্রয়োগ করতে পারে এবং সমাজে ধর্মীয় নেতৃত্ব দিতে পাড়ে।

দেশ বিভাগের পূর্বে, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র দেওবন্দ, রামপুর, লাখনৌ, দিল্লী, সাহারানপুর সহ উত্তর ভারত ও অন্যান্য স্থানে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাতায়াত করতো। কিন্তু বিদেশি এলাকায় আমাদের স্কলারদের পড়াশুনা সহজসাধ্য ছিল না। একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে ইসলামী শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারণ হওয়া উচিত ছিল।

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, সরকার ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা বন্ধ করে দিলেও, মুসলিম জনগণ ধর্মীয় চেতনা থেকে নির্ভয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েছে। যে অবস্থায় সরকারী পরিচালনায় অনেক মাদ্রাসার উন্নতি হয়েছে, বিশেষ করে যারা নিউ স্কীম মাদ্রাসাকে স্বাগত জানিয়েছে। অধিকন্তু যে সব মাদ্রাসা ওল্ড স্কীম শিক্ষাক্রম চালু রেখেছে, তাদের সরকারী অনুদানের অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে যদিও তা কাম্য হওয়া উচিত নয়।

সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার একত্রীকরণের বিষয় রিপোর্টে আলোচনা ও যুক্তি পেশ করতে ও একত্রীকরণের বাস্তবতা নিয়ে ও সমন্বয়ের সম্ভাবনার বিষয়ে বলা হয়, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার সাথে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষার সমন্বয় হবে। শিক্ষার্থীর বয়স ১৪ বছর পর্যন্ত বা জুনিয়র স্কুল স্টেজ (৮ম শ্রেণী) পর্যন্ত। জুনিয়র স্কুল স্টেজ পাসের পর ছাত্ররা তাদের নিজ বুদ্ধির প্রকাশ ঘটাতে পারবে। যদি সে ইসলামী শিক্ষা পছন্দ করে তবে ইসলামী শিক্ষার উপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে লাভবান হতে পারবে।”

৫. কারিগরি শিক্ষার সুযোগ

ছাত্রদের স্বাবলম্বী এবং স্ব-উপার্জিত জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব অনুসরণে সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষায় ভকেশনাল বিষয় যেমন তিব্বিয়া, দর্জি বিজ্ঞান, কার্পেন্টারি, সোপ মেকিং ইত্যাদি যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের সিলেটে সর্বপ্রথম মেডিক্যাল বিভাগের আওতায় সরকারি তিব্বিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদ্রাসা পাস ছাত্রদের জন্য তিব্বিয়া কলেজে ৪ বছরের কোর্স খোলা হয়। আমাদের রিপোর্টে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী জনপ্রিয় কারিগরি বিষয় যেমন দর্জি বিজ্ঞান, কার্পেন্টারি, সোপ মেকিং এখানে স্থান পায়নি, বরং আমাদের প্রস্তাবিত কোর্সে আমরা অন্য তিনটি বিষয় স্থান দিয়েছি। সেগুলো হল ক্যালিওগ্রাফি, কম্পোজিটরশীপ ও সাংবাদিকতা। প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে শিখাবার সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কিছু মাদ্রাসায় শুরু করা হবে।

৬. মাদ্রাসা মঞ্জুরি

ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা বর্তমানে আর্থিক দিক থেকে এক শোচনীয় অবস্থায় নিপাতিত হচ্ছে। এই অবস্থা শিক্ষার পরিবেশের জন্য যথাযথ নয়। শিক্ষার জন্য কিছুই বরাদ্দ ছিল না। শুধু সরকারীভাবে একাডেমিক অনুমোদন ছাড়া মাদ্রাসার শিক্ষকদের আর কিছুই ছিল না। পুর্বের ব্রিটিশ রীতিনীতি পরিবর্তন করা হবে। অতএব আমরা সরকারের কাছে জোরালো আবেদন জানাই যাহায্য বণ্টনের ক্ষেত্রে যেন (ওল্ড স্কীম) মাদ্রাসার জন্য সমভাবে বণ্টন করা হয়।

৭. সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষার সমমান

মাদ্রাসার ওল্ড স্কীম বিভাগ হতে পাস করা শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের সমমান ধরা হয় না। যদিও ওল্ড স্কীমের কামিল বা টাইটেলের শিক্ষাক্রম কোনক্রমেই আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের চেয়ে কম মানের নয়। কমিটির পরামর্শ হলো, ওল্ড স্কীমের ফাজিল ও কামিলকে ইসলামিক স্টাডিজ –এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর সমমান গণ্য করা হোক।

৮. ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন

বর্তমানে ওল্ড স্কীম মাদ্রাসার মঞ্জুরি ও পরীক্ষা গ্রহণের কাজ ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধীনে হচ্ছে। এই কমিটির পরামর্শ হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষার উচ্চ স্তরের মাদ্রাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। ফাজিল, কামিল মাদ্রাসাসমূহকে এফিলিয়েশন (অনুমোদন), পরীক্ষা গ্রহণ, ডিপ্লোমা, ডিগ্রীর সনদ প্রদানের জন্য একটি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরী।

৯. মাদ্রাসায় পাশ ছাত্রদের উচ্চতর ইসলামিক জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় নিয়োগ

মাদ্রাসার পাস ছাত্রদেরকে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্যে মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণ করা যেতে পারে, তদ্রুপ ভারতের দারুল মুসান্নিফীন আযমগড়, আলিগড়সহ অন্যান্য মুসলিম দেশে প্রেরণ করা যায়।

কমিটির রিপোর্টের মূল্যায়ন

মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে এই রিপোর্টে যে সুপারিশ করা হয়েছিল, একটি সদ্য স্বাধীন দেশের শিক্ষা উন্নয়নে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে তা যথেষ্ঠ ছিল। কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়নে তার বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, জাতীয় শিক্ষা ধারার একটি পর্যায় পর্যন্ত সবার জন্য এক শিক্ষা হবে, তবে শর্ত হবে এর শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রচিত হবে। বাস্তবে দেখা গেল মাদ্রাসার প্রাথমিক স্তরকে সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষার সাথে একত্রীকরণ করা হয়েছে। এর ফলাফল হলো, সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণী পাস করে মাদ্রাসার দাখিল আউয়ালে অর্থাৎ পুনরায় তাকে ১ম শ্রেণীতেই ভর্তি হতে হয়। উপরুন্ত এই সব শিক্ষার্থীকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত পার হতে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে দাখিল, আলিম ও ফাজিল এই তিনটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হয়। এদের দুর্দশা এখানেই শেষ নয়। ফাজিল পাসের পর, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হতে চাইলে তাদের পুনরায় ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সাথে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত ছিল। সামগ্রিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাসহ জাতীয় শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়নে এই রিপোর্টে যে উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে, বাস্তবে তা মাদ্রাসা শিক্ষার তেমন কোন উপকারে আসেনি”। (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ২১১-২২৫)

আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী কমিটি ১৯৫৫ সাল

সরকারের ভাবনা ছিল যে, মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরকে এক করে, একটি অভিন্ন নিয়ম ও কারিকুলামে পরিচালিত করা। এই চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে কেন্দ্র করে আরো কিছু সমস্যার কারণ ও সমাধান নির্ধারণ করা জন্যে সরকার ১৯৫৫ সালে একটি শিক্ষা কমিটি গঠন করেন। যেই কমিটি ‘আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী কমিটি’ নামে পরিচিত।

“‘মাদ্রাসা শিক্ষা এডভাইজারী সাব-কমিটি (বাংলাদেশ)’ গঠিত হয় ২৯ নভেম্বর ১৯৫৫ সালে। এই কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে উদ্ভুত বিষয়াদি সম্পর্কে সুপারিশ করার জন্য। কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০শে ডিসেম্বর, ১৯৫৫ সালে। সাব-কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হয় ২১ ও ২২শে ডিসেম্বর ১৯৫৫ ও ৩১শে মার্চ ১৯৫৬ সালে।

সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পর্কে কিছু অভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা হয়। তাতে মাদ্রাসার প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার প্রান্তিক স্তরের সাথে একত্র করার বিষয় প্রাধান্য পায়। ফলে এই সভার পর্যালোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার প্রাথমিক স্তর একই নিয়মে চলতে পারে। ফলে সর্বসম্মতভাবে এই রেজুলেশন পাস হয় যে, মাদ্রাসা শিক্ষা ধারা সাধারণ শিক্ষা ধারার সাথে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত একীভূত হয়ে যাবে। বর্তমানে প্রচলিত উভয় ধারার শিক্ষা বিষয়ে একটি অভিন্ন কোর্সে চলবে।

সেই সাথে উক্ত কমিটির নীতিমালা অনুসারে মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম ও পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচী প্রণয়নের জন্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়।

সাব-কমিটি, পাঠ্যসূচি বিশেষজ্ঞ কমিটির নিকট থেকে প্রাপ্ত পাঠ্যসূচি কতিপয় আধুনিকায়ন বিবেচনা করেন। মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির একটি খসড়া তৈরি করে পেশ করে। সেখানে বলা হয়:

মাদ্রাসা কোর্স ফাজিল পর্যন্ত অগ্রায়ন করা হলো, বর্তমানে যা ১ম থেকে ১০ম পর্যন্ত। কিন্তু দাখিল ও আলিম শ্রেণীর সময় নিম্নের ছক অনুসারে পরিবর্তন করা হলো।

এক. দাখিল ৬ বছর

দুই. আলিম ২ বছর (বিদ্যমান আলিম ৪ বছরের কোর্সের দুই বছর, দাখিলের ৪ বছরের সাথে সংযুক্ত করে দাখিলের কোর্স ৬ বছরে উপনীত করা হল)

তিন. ফাজিল ২ বছর

চার. কামিল ২ বছর এবং কামিল শ্রেণীতে ৪টি গ্রুপ থাকবে; হাদিস, ফিকাহ, তাফসীর ও আরবি সাহিত্য এবং বর্তমানে আরো দুটি গ্রুপ বর্ধিত হবে; তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি।

আরবি শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং অন্যান্য বিষয় যেমন কুরআন, হাদিস, তাফসীর, ফিকাহ, উসুল, বালাগাত, মানতিক, ইসলামের ইতিহাস মৌলিক সূত্র থেকে পড়াতে হবে। আরবি ভাষা শিক্ষার ব্যাপারে গোড়া থেকেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রথম দুই বছর ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক পদ্ধতি অনুসারে দুই বছর পড়ানোর পর, বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ৩য় শ্রেণীতে আরবি গ্রামার শিখবে। শিশুরা দু বছর আরবি শেখার পর স্বাভাবিকভাবেই আরবি ভাষা তাদের নিকট সহজ বোধ্য হবে।

ফাজিল শ্রেণী পর্যন্ত উর্দু ভিন্ন বিষয় হিসাবে থাকবে এবং ফার্সি থাকবে ইংরেজির পরিবর্তে ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে। আরবি ও ধর্মীয় বিষয় ব্যতীত অতিরিক্ত সাধারণ বিষয় যেমন মাতৃভাষা, ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, সাধারণ জ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন ইত্যাদি হাই স্কুলের মানের হবে। মানের দিক থেকে ফাজিল শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, গণিত হবে সাধারণ শিক্ষা ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার সমমান। এই প্রস্তাবের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ফাজিল পাশের পর কামিল পড়তে পারবে, আবার ইংরেজি ও মাতৃভাষা এই দুটি বিষয়ে পৃথকভাবে পাসের পর উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারবে।

বর্তমানে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে। দাখিল পরীক্ষা ১০টি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হবে; আরবি সাহিত্য, আরবি ব্যাকরণ (ইনশা ও অনুবাদ), কুরআনের অনুবাদ, ফিকাহ, গণিত, ইসলামের ইতিহাস, ভূগোল, উর্দু, বাংলা, ইংরেজি/ফার্সি।

আলিম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১০টি পত্রে; আরবি সাহিত্য, কুরআন ও বালাগাত, ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, হাদিস ও উসুলে হাদিস, লজিক, ইসলামের ইতিহাস, উর্দু, বাংলা, ইংরেজি ও গণিত অথবা ফার্সি ও তাসাওউফ।

ফাজিল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১৪টি বিষয়ে; আরবি গদ্য কম্পোজিশন ও রচনা, আরবি কবিতা ও বালাগাত, তাফসীর ও উসুলে তাফসীর, হাদিস ও উসুলে হাদিস, ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, আকাইদ ও হেকমত, ইসলামের ইতিহাস ও পৌরনীতি, উর্দু, বাংলা, মানতিক, ইংরেজি ও গণিত অথবা ফার্সি ও তাসাওউফ।

কামিল শ্রেণীতে ছয়টি গ্রুপ থাকবে; হাদিস, ফিকাহ, তাফসীর, আদব, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব। প্রত্যেক বিভাগের জন্যে সর্বমোট মান হবে ১০০০। বিষয় বিন্যাস হবে নিম্মরুপ;

এক. হাদিস গ্রুপঃ হাদিস ৬ পত্র (৬০০ মান), তাফসীর ২ পত্র, ইসলামের ইতিহাস ২ পত্র

দুই. ফিকাহ গ্রুপঃ ফিকাহ ২ পত্র, উসুলে ফিকাহ ২ পত্র, হাদিস ২ পত্র, আকাইদ ২ পত্র, ইসলামের ইতিহাস ২ পত্র

তিন. তাফসীর গ্রুপঃ তাফসীর ২ পত্র, উসুলে তাফসীর ২ পত্র, হাদিস ২ পত্র, ফিকহুল কুরআন ও ইযাজুল কুরআন ২ পত্র, ইসলামের ইতিহাস ২ পত্র

চার. আদব গ্রুপঃ আরবি গদ্য (প্রাচীন ও আধুনিক) ২ পত্র, আরবি পদ্য (প্রাচীন ও আধুনিক) ২ পত্র, তাফসীর ২ পত্র, বালাগাত ২ পত্র, ইসলামের ইতিহাস ও আরবি সাহিত্যের ইতিহাস ২ পত্র

পাঁচ. তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব গ্রুপঃ উসুলে ইসলাম ২ পত্র, হিকমাতু তাফসিরুল ইসলাম ২ পত্র, ধর্মের ইতিহাস ও ধর্মীয় সম্প্রদায় ২ পত্র, ইসলাম প্রচারের ইতিহাস ২ পত্র, ইসলামের দাওয়ার ও উহার পদ্ধতি ২ পত্র

ছয়. ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি গ্রুপঃ ইসলামের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস ২ পত্র, মুসলিম রাষ্ট্র ও তার জনসাধারণের ইতিহাস ২ পত্র, বিভিন্ন ইমামদের ইতিহাস ২ পত্র, ইসলামী দর্শন ও দার্শনিক সম্প্রদায়ের ইতিহাস ২ পত্র, সংক্ষিপ্ত বিশ্ব ও জাতিসমূহের ইতিহাস ২ পত্র

শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি, মাদ্রাসার আরো বিভিন্ন বিষয় ও দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। তার উল্লেখযোগ্য কিছু দিক ছিল নিম্মরুপ;

মাদ্রাসার অর্থনৈতিক অবস্থা

মাদ্রাসাসমূহের অর্থনৈতিক অবস্থা সন্তোষজনক নয়। মাদ্রাসাসমূহ জনসাধারণের অনুদানের উপর নির্ভরশীল। মাদ্রাসা শিক্ষা এই প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের একটা অংশ, অথচ স্কুল-কলেজের মতো তাদেরকে সন্মান করা হয় না, বরং সরকারী অনুদানের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হয়।

শিক্ষকদের বেতন স্কেল

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন কাঠামোতে কোন সমতা নেই। বিভিন্ন যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের একই আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়। ছাত্র বেতন, জনগণের সাহায্য, সরকারের মঞ্জুরি এই তিন প্রকার আয়ের উৎস থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলে। মাদ্রাসা ছাত্রদের বেতন খুবই কম হয়ে থাকে, আবার জনগণের অনুদান এক প্রকার অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়েই অতিবাহিত হয়। কাজেই মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন স্কেল পরিবর্তনের একমাত্র নিশ্চিত পথ হতে পারে এই প্রতিষ্ঠানে সরকারী মঞ্জুরির উন্নতির উপর ।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ

যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ব্যতীত ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ব্যতীত মাদ্রাসা শিক্ষা পুনর্গঠন ও উন্নতি হতে পারে না। মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নতির জন্যে মাদ্রাসা শিক্ষকদের অবশ্যই প্রশিক্ষণ দিতে হবে, বর্তমানে মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ নেই।

মাদ্রাসার উত্তীর্ণদের সরকারী চাকরি

বর্তমানে মাদ্রাসার পাস ছাত্রদের খুব কম সংখ্যকই সরকারী চাকরি লাভ করে। মাদ্রাসা ছাত্রদের চাকরির সমস্যাটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ এবং এর প্রভাব সমগ্র মাদ্রাসা শিক্ষাধারার উপরই আবর্তিত হয়। মাদ্রাসা পাশ করার পর নিম্নলিখিত কাজে চাকরির সুপারিশ করা হল;

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা

সাধারণ শিক্ষাধারার নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কুরআন ও দীনিয়াত আবশ্যিক বিষয়ে হিসাবে পড়ানো হবে। তাই আমাদের সুপারিশ হচ্ছে যে, সরকারিভাবে শর্ত থাকবে যে, প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনায় কুরআন ও দীনিয়াত পড়ানোর জন্যে অবশ্যই মাদ্রাসায় আলিম পাস শিক্ষক হতে হবে। আমরা এও সুপারিশ করছি যে, মাদ্রাসার নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে ইংরেজি, মাতৃভাষা, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি সাধারণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যার ফলে আলিম পাশ করার পরে কুরআন ও দীনিয়াত ছাড়া অন্যান্য বিষয়েও শিক্ষাদানের কাজ করতে পারে। আমাদের সুপারিশ ও পরামর্শ অনুসারে এই প্রদেশে প্রায় ২৫,০০০ আলিম পাস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে চাকরি পেতে পারেন।

নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক

পুর্ব বাংলায় ১৬০০ উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল এবং প্রায় ৪০০০ এম. ই. স্কুল এবং জুনিয়র মাদ্রাসা আছে। প্রত্যেক স্কুল পরিচালনার জন্য ইংরেজিসহ ফাজিল পাস যদি আবশ্যিক হয়, তবে কমপক্ষে ৫,৫০০ মাদ্রাসা পাস লোকের চাকরি সংস্থান হবে।

কাযি ও ম্যারিজ রেজিষ্টার

সাব রেজিষ্টার

আমাদের সুপারিশ যে, ফাজিল পাশ যাদের ইংরেজিতে কাজ করার যোগ্যতা আছে, সাব রেজিষ্টার পদের জন্যে ৩০% খালি পদ তাদের জন্যে সংরক্ষিত রাখা হোক। এছাড়া কর্মসংস্থানের জন্যে সরকার বিশেষ কিছু মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন। নির্ধারিত কিছু মাদ্রাসাতে নিম্নের দুটি কারিগরি শিক্ষা কোর্স জরুরী ভিত্তিতে শুরু করা যায়;

তিব্বিয়া কোর্স

অতীতের বিভিন্ন শিক্ষা কমিটি যেমন আর্ল কমিটি, শামসুল হুদা কমিটি ফাজিল পাস করার পর তিব্বিয়া বিজ্ঞান ক্লাস খোলার জন্য সুপারিশ করেছিল। এতে মাদ্রাসা পাস ছাত্রদের জীবিকার ব্যবস্থা হতো। সিলেটে একটি তিব্বিয়া কলেজ পত্তন করা হয় এবং সেখানে মাদ্রাসা পাস ছাত্রদের তিব্বিয়া চিকিৎসার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়েছিল।

কম্পোজিং ক্যালিওগ্রাফি

ঢাকা ও সিলেটের দুটি সরকারী মাদ্রাসায় এক বছরের কম্পোজিং ও ক্যালিওগ্রাফি কোর্স শুরু করা হয়। আলিম পাশের পর, ছাত্ররা এই প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়ে সরকারী বা বেসরকারি প্রেসে চাকরি নিতে পারে। (মাদরাসা শিক্ষা, পৃঃ ২২৫-২৩৬)

উপসংহার

১৯১৫ সালে নিউ স্কীম মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা ছিল আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এবং এই সিদ্ধান্ত মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একদল নিউ স্কীম শিক্ষাব্যবস্থাকে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন আর আরেক দল মনে করতে শুরু করলেন যে, নিউ স্কীম শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল মূলত ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল ও ধীরে ধীরে মূল থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।

১৭৮০ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ১৬৭ বছর যাবত আলিয়া মাদ্রাসা পরিচালিত হয়ে আসছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের হাতে, কাজেই এটা অতি স্বাভাবিক ছিল যে, তারা তাদের আদর্শ, দর্শন ও মূল্যবোধের আলোকেই এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিচালনা করবে। এরপর দেশ বিভাগের পরে, সরকার ও প্রশাসনের পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই আশা জাগ্রত হয় যে, এবার এই শিক্ষা ব্যবস্থার যথেষ্ঠ উন্নতি ও অগ্রগতি হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের মধ্যে, মুসলিম উম্মাহর আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটবে।

সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, ওল্ড স্কীম শিক্ষা ব্যবস্থা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার থেকে দূরে ছিল। নিউ স্কীম শিক্ষা ব্যবস্থা যে সকল মাদ্রাসা গ্রহণ করে, তাদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়, পক্ষান্তরে যারা নিউ স্কীমকে গ্রহণ না করে, ওল্ড স্কীমকে আঁকড়ে ধরে থাকে তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত করা হতে থাকে। এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কমিটি ও কমিশন গঠন করে এই বিষয়ে বিবেচনা করার প্রস্তাব করা হয় যে, ওল্ড স্কীম ও নিউ স্কীম শিক্ষা ব্যবস্থাকে একত্রিভুক্ত করা যায় কিনা। যেই একত্রিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল মাদ্রাসার মূল শিক্ষাধারাকে এংলো-পার্সিয়ান বিভাগে একত্রিকরণের চেষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে।

দেশ বিভাগের পর, আলিয়া মাদ্রাসা যখন কলিকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় তখন আলিয়া মাদ্রাসাকে যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করতে হয়, তার মাধ্যমেও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিরূপ মনোভাব ফুটে উঠে। যার ফলে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যে, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ও হিতাকাঙ্ক্ষীদের আন্দোলন করতে মাঠে নামতে হয়।

আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মত যে, প্রায় প্রতিটি শিক্ষা কমিটি বা কমিশন আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার সুপারিশ করে গিয়েছেন। যেমন আলিম ও ফাজিল শ্রেণীতে দর্জি, কাঠের কাজ, সাবান তৈরি ইত্যাদি কারিগরি বিষয়সমূহের মধ্য থেকে অতিরিক্ত বিষয় হিসাবে যে কোন একটি বিষয় নির্বাচন করার সুপারিশ করেছেন। এর মাধ্যমে বুঝা যায় যে, এই শিক্ষা সরকারের নিকট একটি কর্মহীন শিক্ষা বলেই বিবেচিত ছিল এবং যেহেতু একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার মত পরিবেশ ছিল না, তাই সেই পথে না গিয়ে, যাতে কোনভাবে এই শিক্ষায় শিক্ষিতরা কোন ভাবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম হতে পারে সেই জন্যে এই ধরণের কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল বলেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তবে সরকারী চাকুরি পাওয়া ক্ষেত্রে আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে পাস করে বের হওয়ার পরে যে, ছাত্রদেরকে বৈষম্যের শিকার হতে হয় সেই দিকেও কমিটি ইঙ্গিত করে বলেছিল যে, মাদ্রাসার ওল্ড স্কীম বিভাগ হতে পাস করা শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের সমমান ধরা হয় না। যদিও ওল্ড স্কীমের কামিল বা টাইটেলের শিক্ষাক্রম কোনক্রমেই আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের চেয়ে কম মানের নয়। কমিটির পরামর্শ হলো, ওল্ড স্কীমের ফাজিল ও কামিলকে ইসলামিক স্টাডিজ –এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর সমমান গণ্য করা হোক।
সেই সাথে মাদ্রাসার অর্থনৈতিক দুরাবস্থার দিকেও ইঙ্গিত করে বলা হয়েছিল যে, মাদ্রাসাসমূহের অর্থনৈতিক অবস্থা সন্তোষজনক নয়। মাদ্রাসাসমূহ জনসাধারণের অনুদানের উপর নির্ভরশীল। মাদ্রাসা শিক্ষা এই প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের একটা অংশ, অথচ স্কুল-কলেজের মতো তাদেরকে সন্মান করা হয় না, বরং সরকারী অনুদানের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হয়। এবং শিক্ষকদের বেতন সম্পর্কে বলা হয় যে, মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন কাঠামতে কোন সমতা নেই। বিভিন্ন যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের একই আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়। ছাত্র বেতন, জনগণের সাহায্য, সরকারের মঞ্জুরি এই তিন প্রকার আয়ের উৎস থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলে। মাদ্রাসা ছাত্রদের বেতন খুবই কম হয়ে থাকে, আবার জনগণের অনুদান এক প্রকার অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়েই অতিবাহিত হয়। কাজেই মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন স্কেল পরিবর্তনের একমাত্র নিশ্চিত পথ হতে পারে এই প্রতিষ্ঠানে সরকারী মঞ্জুরির উন্নতির উপর।

একই সময়ে ছাত্রদের কর্মসংস্থানের কথাও এখানে বলা হয়েছিল যে, বর্তমানে মাদ্রাসার পাস ছাত্রদের খুব কম সংখ্যকই সরকারী চাকরি লাভ করে। মাদ্রাসা ছাত্রদের চাকরির সমস্যাটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ এবং এর প্রভাব সমগ্র মাদ্রাসা শিক্ষাধারার উপরই আবর্তিত হয়। মাদ্রাসা পাশ করার পর ছাত্রদের জন্য কিছু চাকরির সুপারিশও করা হয়েছিল, যেমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, সাব রেজিষ্টার, কাযি ও ম্যারিজ রেজিষ্টার, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক ইত্যাদি।

উপরে উল্লেখিত সুপারিশসমূহের মধ্য থেকে অনেক সুপারিশই সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়নি, বরং অবস্থা যেই রকম ছিল সেই রকমই অব্যাহত থাকতে দেওয়া হয়। সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়ে যখন বড় আকার ধারণ করে, তখন আবার কোন একটি শিক্ষা কমিটি বা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে এই অপেক্ষায় থাকা হয়। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ দেখে মনে হয় যে, ১৮৩৫ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক যেমন বলেছিলেন “মাদ্রাসা শিক্ষা সরকারের কোন উপকারে আসছে না, অতএব মাদ্রাসার পিছনে অর্থ ব্যয় করা অনুচিত এবং অচিরেই মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া উচিত” অথবা ধর্মীয় শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সাথে একত্রিভুক্ত করার চিন্তা বলতে গেলে আলিয়া মাদ্রাসার প্রশাসনের সেই আদি চিন্তার একটি চিন্তা ছিল। কারণ দেখা যায় যে, আলিয়া মাদ্রাসার সূচনা যদিও ‘দরসে নিজামি’ মানহাজের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এর কিছু কাল পরেই সেখানে এংলো-পার্সিয়ান বিভাগ চালু করা হয়, এবং সময়ে সময়ে মূল আরবী বিভাগকে বন্ধ করে অথবা এংলো-পার্সিয়ান বিভাগের সাথে সেটাকে মিলিয়ে ফেলার চিন্তা এর আগেও আরো বিভিন্ন সময়ে অনেকেই অনেক ভাবে পেশ করে এসেছে, তদানীন্তন নতুন সরকার ও প্রশাসন যেন মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা আলিয়া মাদ্রাসার ব্যাপারে –পুরাপুরি না হলেও- কিছুটা এই চিন্তায় লালন করে আসছিলেন।

আগের সংবাদশায়খুল হাদীসের সহধর্মিণীর ইন্তেকালে আল্লামা বাবুনগরীর শোক প্রকাশ
পরবর্তি সংবাদলাতিন আমেরিকার দেশ হাইতিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর কুকর্ম