রাকিবুল হাসান :
প্রতি বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিষয়ের উপর গবেষণা করে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে একটি তালিকা প্রকাশ করে। সে তালিকায় বিভিন্ন সূচকে কোন দেশের অবস্থান কত তা উল্লেখ থাকে। এমনকি মাঝে-মাঝে সে তথ্যের উপর বিশ্লেষণ করে পরবর্তী বছরগুলোতে তার কী পরিমান পরিবর্তন হতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।
এই ফিচারে বৈশ্বিক পাঁচটি সূচকে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর কার অবস্থান কত, তা তুলে ধরা হলো।
সামরিক সূচক
২০১৯ এর ২৯ সেপ্টেম্বর ১৩৭টি দেশের সামরিক শক্তির র্যাঙ্কিং প্রকাশ করেছে Global Fire Power (GFP) নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ২০০৬ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠানটি এ ধরণের সামরিক র্যাঙ্কিং প্রকাশ করে আসছে।
এ তালিকায় দেখা যায়—মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সূচকে সবচে এগিয়ে তুরস্ক। তুরস্ক সামরিক র্যাঙ্কিংয়ে ৯ম, ইরান ১৪তম, পাকিস্তান ১৫তম, ইন্দোনেশিয়া ১৬তম, সৌদি২৫ তম, তিউনিসিয়া ৪০তম, মালয়েশিয়া ৪১ তম, বাংলাদেশ ৪৫তম, সিরিয়া ৫০তম, ইরাক ৫৩তম, আফগানিস্তান ৭৪তম, লিবিয়া ৭৭তম, কুয়েত ৮৪তম, বাহরাইন ৯৮তম। এছাড়াও কাতার ১০৬তম, লেবানন ১১৮তম, ইয়ামান ১২৫তম অবস্থানে রয়েছে।
জিএফপি (GFP) জানিয়েছে, একটি দেশের সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যা দিয়ে কেবল এই শক্তিমত্তার বিষয়টি নির্ণয় করা হয়নি। বরং দেশটির সামরিক সরঞ্জাম কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান, জনশক্তি, উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদসহ আরো কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এই তালিকা তৈরিতে। সামরিক শক্তি পরিমাপের ক্ষেত্রে সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনীর শক্তি-সামর্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে জরিপে কোনো দেশের পরমাণু শক্তির বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি।
দুর্নীতির ধারণা সূচক
২৯ জানুয়ারি ১৮০টি দেশের দুর্নীতির ধারণাসূচক তালিকা (Corruption Perceptions Index) প্রকাশ করেছে বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইনটারন্যাশনাল ।
এ তালিকায় দেখা যায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কাতার ৩৩তম, মালয়েশিয়া ৬১তম, তিউনিসিয়া ৭৩তম, কুয়েত এবং তুরস্ক ৭৮তম, ইন্দোনেশিয়া ৮৯তম, বাহরাইন ৯১তম। এ ছাড়াও পাকিস্তান ১১৭তম, ইরান ও লেবানন ১৩৮তম, বাংলাদেশ ১৪৯তম, ইরাক ১৬৪তম, সিরিয়া ১৭৮তম অবস্থানে রয়েছে।
বিগত দুই বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত সর্বনিম্ন ৩টি ও সর্বোচ্চ ১৩টি (অঞ্চল ও দেশভেদে জরিপের লভ্যতার উপর নির্ভর করে) জরিপের সমন্বিত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা প্রণীত হয়েছে। জরিপগুলোতে মূলত ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, সংশ্লিষ্ট খাতের গবেষক ও বিশ্লেষকবৃন্দের ধারণার প্রতিফলন ঘটে থাকে। সিপিআই অনুযায়ী দুর্নীতির সংজ্ঞা হচ্ছে ব্যক্তিগত সুবিধা বা লাভের জন্য ‘সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার’ (abuse of public office for private gain)। আর যে সকল জরিপের তথ্যের ওপর নির্ভর করে সূচকটি নিরূপিত হয় তার মাধ্যমে সরকারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপকতার ধারণারই অনুসন্ধান করা হয়। সূচকের তথ্য সংগ্রহে মূলত চারটি ধাপ অনুসৃত হয়। যেমন: উপাত্তের উৎস নির্বাচন, পুনঃপরিমাপ, পুনঃপরিমাপকৃত উপাত্তের সমন্বয় এবং পরিমাপের যথার্থতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক
২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল ১৮০টি দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক প্রকাশ করেছে প্যারিসভিত্তিক রিপোর্টাস উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ)। স্বাধীনতা সূচকের শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে এবং সর্বনিম্নে রয়েছে তুর্কমেনিস্তান।
তালিকায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক ১৬তম, তিউনিসিয়া ৭২তম, বাহরাইন ১০৮তম, মালয়েশিয়া ১২৩তম, ইন্দোনেশিয়া ১২৪তম, পাকিস্তান ১৪২তম। এছাড়াও বাংলাদেশ ১৫০তম, লিবিয়া ১৬২তম, ইরাক ১৫৬তম, ইরান ১৭০তম, সিরিয়া ১৭৪তম অবস্থানে রয়েছে।
অলাভজনক সংস্থা আরএসএফ মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে বিশ্বজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ২০০২ সাল থেকে তারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচক প্রকাশ করছে যার মাধ্যমে দেশগুলোর মধ্যে গণমাধ্যম কতটা মুক্তভাবে কাজ করতে পারে তার একটি তুলনামূলক অবস্থার কথা জানা যায়।
এবার প্রথম পাঁচটি স্থান পেয়েছে ইউরোপের পাঁচ দেশ। নরওয়ের পরের এই চারটি দেশ হলো যথাক্রমে ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থানও পড়তির দিকে থাকলেও দুটি দেশই গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ভারত রয়েছে ১৪০তম স্থানে।
মেধা সূচক
২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি ট্যালেন্ট কম্পিটিটিভন্যাস ইনডেক্স তথা মেধা প্রতিযোগিতা সূচক প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান INSEAD। সূচকে শর্ষ দেশ সুইজারল্যান্ড এবং সর্বনিম্ন দেশ ইয়েমেন।
তালিকায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কাতার ২৪তম, মালয়েশিয়া ২৭তম, সৌদি ৩৯তম, সিরিয়া ৫০তম, লেবানন ৫৯তম, কুয়েত ৬৪তম, ইন্দোনেশিয়া ৬৭তম। এছাড়াও তুরস্ক ৭৪তম, তিউনিসিয়া ৮৪তম, ইরান ৯৭তম, পাকিস্তান ১০৮তম, বাংলাদেশ ১১৮তম অবস্থানে রয়েছে।
২০১৩ সাল থেকে এই সূচক প্রতিবছর প্রকাশ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এবারের প্রতিবেদনটি ৬৮টি চলকের (ভ্যারিয়েবল) ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উদ্যোক্তা প্রতিভাকে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে কীভাবে এই প্রতিভা বিকাশে উৎসাহ, পরিচর্যা ও উন্নয়ন করা হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে তা কেমন প্রভাব ফেলছে- তা ছিল বিবেচনার কেন্দ্রে।
অর্থনৈতিক সূচক
২৫ জানুয়ারি ১৬৯টি দেশের অর্থনৈতিক সূচক -২০১৯ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। তালিকায় দেশগুলোকে অবদমিত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অমুক্ত, মাঝারি রকমের মুক্ত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুক্ত এবং মুক্ত—এই পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। পুরোপুরি মুক্ত দেশ মাত্র ছয়টি। এর মধ্যে দুটিই এশিয়ার হংকং ও সিঙ্গাপুর। অন্য চারটি হলো নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও আয়ারল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো ধনী দেশগুলো আছে ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুক্ত’ দেশের তালিকায়। বাংলাদেশ আছে ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অমুক্ত’ দেশের তালিকায়।
এ তালিকায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কাতার ২৮তম, মালয়েশিয়া ২২তম, ইন্দোনেশিয়া ৫৬তম, তুরস্ক ৬৮তম, সৌদি ৯১তম। এছাড়াও বাহরাইন ১০৮তম, বাংলাদেশ ১২১তম, সিরিয়া ১৭৪তম, ইয়েমেন ১৬৮তম অবস্থানে রয়েছে।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা ১৯৭৩ সালে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত। হেরিটেজ ফাউন্ডেশন প্রতিবছর ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচক’ প্রকাশ করে থাকে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মাত্রা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, সরকারি আয়-ব্যয়ের পরিমাণ, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নগত দক্ষতা এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলোকে ভিত্তি করে নম্বর হিসেব করা হয়।
শেষকথা
সামরিক সূচকে মুসলিম দেশগুলো খুব বেশি পিছিয়ে নেই। প্রায় পাশাপাশি অবস্থানে আছে তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া। অবশ্য পরমাণু শক্তির হিসাব এখানে আমলে নেয়া হয়নি। নইলে সূচক তালিকা আরেকটু অন্যরকম হতো। দুর্নীতির ধারণা সূচকে বড় বড় মুসলিম দেশগুলো মাঝামাঝি অবস্থানে আছে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে একটু পিছিয়ে পড়েছে মুসলিম দেশগুলো। মেধা সূচকেও খুব বেশি এগিয়ে নেই তারা। অর্থনৈতিক সূচকে মোটামুটি অবস্থানে আছে মুসলিম দেশগুলো।
কোনো তথ্য কিংবা সূচকই শতভাগ পারফেক্ট না। নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সূচক তৈরী করেছে। যেমন মেধা সূচকে শিক্ষার চেয়ে বাণিজ্যের দিকটি বেশি গুরুত্ব এবং প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তবুও এই সূচক থেকে মুসলিম দেশগুলোর সাধারণ একটা দৃশ্য আমাদের চোখে ভেসে উঠবেই। আমরা শুধু তা-ই করতে চেয়েছি।
