সমুদ্রে পরাজয়: যেভাবে মুসলিম সভ্যতায় বিপর্যয় ঘটেছে

সমুদ্রে পরাজয়: যেভাবে মুসলিম সভ্যতায় বিপর্য ঘটেছে

মুজাহিদুল ইসলাম :

প্রাচীন কাল থেকেই দ্বীপ ও সমুদ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে উপনিবেশিক শক্তির। সাম্রাজ্য বিস্তার-কৌশলে দ্বীপ ও সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ আজও গুরুত্বপূর্ণ। মূল ভূমির বাইরে যার যত সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি, তার তত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর উপনিবেশিক ইতিহাস অনেক পুরাতন।

ষোড়শ শতাব্দীতে আন্দালুস থেকে মুসলিম উচ্ছেদের পর স্পেনিশ ও পর্তুগিজরা তাদের অবস্থান মজবুত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াও দ্বিতীয় বার যাতে মুসলিমরা আর আন্দালুসে ফিরে আসতে না পারে, সেজন্য ভৌগোলিকভাবে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে হস্তক্ষেপের পরিকল্পনাই মূল লক্ষ্য। এক্ষেত্রে তারা প্রথমেই দৃষ্টি দেয় প্রাচ্যের ব্যবসায়িক রুটে বিশেষভাবে মশলার বাণিজ্যে।

কেন পর্তুগিজরা আমাদের সমুদ্র দখল করলো

পাশ্চাত্য চিন্তাবিদ রোল্যান্ড গ্যারস তার সভ্যতার ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, স্পেনিশ ও পর্তুগিজদের আবিস্কার-ট্রেন্ডের মূল কারণ তাদের ধর্মগ্রন্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তির নেশা ও স্বর্ণের লোভ। তবে সবকিছুর আগে ধর্ম-তাড়নাই মূল। ক্রসেড যুদ্ধ ইউরোপের খ্রিস্টানদের যুদ্ধের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও অন্যদের অধীন করতে অভ্যস্থ করে তোলে। ১৪৯৮ সালে উত্তমাশা আবিস্কারের পর থেকে পর্তুগিজরা আফ্রিকা ও ভারতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে আরবদের বিতাড়িত করে আরব ও মুসলিম জাহাজের প্রভাব খর্ব করতে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে স্থায়ী ঘাঁটির জন্য পাঁচটি জাহাজের বহর নিয়ে ১৫০২ সালে ভাস্কো দি গামা রওয়ানা হন। মিসর ও শামের মামলুকদের স্বার্থের জন্য এটা সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পর্তুগিজরা ভারত সাগর থেকে আরব ও ভারতের জাহাজ আক্রমণ করে লুটপাট করতো। তাছাড়া তাদের অনুমতি ব্যতীত কোন বাণিজ্যিক জাহাজর পক্ষে এ রুট অতিক্রম করা সম্ভব হতো না। সমসাময়িক ঐতিহাসিক কুতবুদ্দিন বলেন, এ দস্যুতায় সাধারণভাবে সকল ব্যবসায়িক মহল ক্ষতিগ্রস্থ হলেও মূলত ব্যপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে আরব ও মুসলিম বনিকরা। অবস্থার নাজুকতা বিবেচনা করে গুজরাটের সুলতান মুজাফফার শাহ মিসরের সুলতান আশরাফ গুরীর নিকট ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাহায্যের আবেদন পাঠায়। সে যুগের ভারতবাসীরা বন্দুক ও কামানের সাথে পরিচিত ছিল না। তাছাড়া ইয়েমেনের সুলতান আমির বিন আব্দুল ওয়াহাবও ইয়েমেন সাগর ও বন্দরে ইংরেজদের অপতৎপরতা রোধে মিসরের সুলতানের নিকট সাহয্য চেয়ে পাঠায়।

পর্তুগিজ দস্যুদের দস্যুতা এখানেই থেমে থাকেনি। লেসবন থেকে দক্ষিণ লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকান উপকূল জুড়ে সশস্ত্র বাণিজ্যিক কেন্দ্র তারা প্রতিষ্ঠা করে। এশিয়া থেকে ইউরোপের এই নতুন সামুদ্রিক বাণিজ্যরুটের একচেটিয়া প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য তারা তাদের সামরিক ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণে যা করা প্রয়োজন তার কোন কিছুই বাদ রাখেনি।

প্রাচ্যের পণ্যবোঝাই মাল পর্তুগালের জাহাজে সরাসরি লেসবন আর সেখান থেকে সারা বিশ্বে চড়া দামে বিক্রি হতো। পর্তুগালই হয়ে ওঠে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাধ্যম। ইউরোপের সাথে আলেকজেন্দ্রিয়া, দিময়াত ও বৈরুতের মতো প্রাচ্যের মামলুকী বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো অনেকটা পরিত্যক্ত হয়ে যায়। মামলুকী সালতানাতের বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়।

পর্তুগিজ ও মামলুক সংঘাত

ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজদের প্রভাব বৃদ্ধি বিষয়ে মিসরের মামলুকী সালতানাতের আশংকার মধ্যেই তিনি ১৫০৪ সালে ভারতের মালাবারে বাণিজ্যিক বহর পাঠান। স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর মশলা ও ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য সেখানে ছিল। জাহাজ ফিরে আসার সময় ভারতের কিছু আমীর ও হজগমনেচ্ছুকদের নিয়ে রওনা দেয়। কিন্তু জেদ্দাতে পৌঁছার আগেই ভারত সাগরে পর্তুগিজ বহর দ্বারা তারা আক্রান্ত হন। এবং প্রচুর পরিমাণ মশলা ও ভারতীয় পণ্য লুণ্ঠিত হয়।

তবে মামলুক সুলতান এতো সহজেই ছেড়ে দেওয়ার লোক নন। ইউরোপের বাণিজ্যিক সহযোগীদের সাথে যোগাযোগ করে সামরিক সহযোগিতা ও পুনরায় আগের মতো ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য তদবির চালান। তারাও সম্মত হন। তবে তাদের সামরিক সহযোগিতার আগেই তিনি নৌবহর পাঠিয়ে দেন পর্তুগিজদের দমন করার জন্য। নৌ কমান্ডার আমির হুসাইন কুরদীর নেতৃত্বে পঞ্চাশটি নৌবহর রওনা হয়। তাদের সাথে ভারতের বিভিন্ন নৌসমরশক্তি যুক্ত হয়। বিখ্যাত শাওয়াল যুদ্ধে মামলুকরা পর্তুগিজদের পরাজিত করেন। সাগরে পর্তুগিজদের পরাজয় পর্তুগিজ সরকার সহজভাবে নেয়নি। তারা মামলুকদের যুদ্ধপরবর্তী জাহাজ মেরামতের সুযোগে হামলা করে অধিকাংশ ভারতীয় ও মামলুকী জাহাজ ধ্বংস করে দেবং মামলুক কমান্ডার পালিয়ে জেদ্দায় আশ্রয় নেয়। পাশাপাশি পর্তুগিজ নাবিক এ্যালবুকেট আরব সাগর ও তার প্রবেশদ্বারে কঠোর সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করেন। ফলে মিসর ও ইয়েমেনের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

উসমানীদের সহযোগিতা

এ করুণ পরাজয়ের পর মিসরের মামলুকী সালতানাত উসমানীদের নিকট সামরিক সহযোগিতার আবেদন করেন। তখন মামলুকী ও উসমানীদের ভেতর সুসম্পর্ক ছিল। হিজরী ৯১৬ উসমানীরা সামরিক সাহায্য পাঠান কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত তার কিছু ইউরোপের রোডসদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। বিপরীতে মামলুক সুলতান গুরী তার দেশে ইউরোপ ও বান্দাকিয়ার সকল কিছু জব্দ করেন। মামলুক সুলতান পুনরায় তার কমান্ডার হুসাইন কুরদীকে ১৫১৫ ভারতে পাঠান। মামলুকী নৌবহর এডেনের নিকট প্রতিরক্ষা জোরদার করে ইয়েমেনের সুলতান আমির ছানীর নিকট সহযোগিতার আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে ইয়েমেন এবং মিসরের মধ্যে সংঘর্ষ অবিনবার্য হয়ে ওঠে। তবে এক পর্যায়ে ইয়েমেনের তাহেরী সালতানাতের পতন হয়। এবং তা মিসরের মামলুকী সালতানাতের অধীন হয়ে যায়।

অবশ্য পরে আর মামলুকরা পর্তুগিজদের সাথে সংঘর্ষে যায়নি। ১৫১৬ সালে সুলতান গুরী মার্জ দাবিক যুদ্ধে উসমানীদের হাতে নিহত হন। এভাবেই শেষ হয় মামলুকী সালতানাত। সমুদ্র নিরাপদের দায়িত্ব এসে পড়ে উসমানীদের ওপর।

সুলতান গুরীর এ পরাজয় অবশ্যম্ভাবী ছিল। তিনি যুদ্ধ থেকে কথিত শান্তির প্রতি বেশী আগ্রহী ছিলেন। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়া সত্ত্বেও জনগণের ওপর ইচ্ছে করেই করের বোঝা চাপাতেন। গাজা সফরে বায়তুল মোকাদ্দাসের অধিবাসীরা শাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তিনি বরং জনগণকে তাড়িয়ে দেন। দামেশকে বিশাল বহর নিয়ে প্রবেশ করেন। নাগরিকদের বিভিন্ন অভিযোগের সমাধানের পরিবর্তে তাদের নাজেহাল করেন। এভাবে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অত্যাচারী শাসকদের প্রতি নতজানু অবস্থা নেওয়াতে তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার প্রকৃতপক্ষে আর রাখেননি।

সমুদ্রে উসমানীদের সুর্যোদয়

মামলুকী সালতানাতের পতনের পর সমুদ্রে মুসলিমদের রক্ষার দায়িত্ব এসে পড়ে উসমানীদের ওপর। পর্তুগিজরা লোহিত সাগরের তীরবর্তী মুসলমানদের হুমকি ও পুণ্যভূমি হারামাইন শরীফকে (মক্কা ও মদিনা) ধ্বংস করার হুমকির জবাব উসমানীরা খুবই কঠোরভাবে দেয়। ভারতীয় মুসলমানদেরকে হুমকি প্রদানকারী পর্তুগিজদের সালমান রইসের নেতৃত্বে উসমানী নৌবাহিনী পরাভূত করে। কানুনী সুলতান সুলায়মান ১৫৩৮ সালে মিশরের গভর্নর হাদিম সুলায়মানকে পাঠান তাদের এই দুঃসাহসকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

উসমানী নৌবাহিনীর নেতৃত্বে তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও রোডস দ্বীপে পুনরায় ইসলামের সুশীতল ছায়ায় ফিরে আসে। সমুদ্রে বিশ্ব শক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে টহল দিয়ে নিরাপদ সমুদ্র বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে উসমানী নৌবাহিনী।

১৫৩৮ সালে মাত্র পাঁচ ঘন্টার যুদ্ধে ইউরোপের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে উসমানী নৌবাহিনী কোন ধরনের নৌবহর খোয়ানো ছাড়াই প্রিভিজার যুদ্ধে জয়লাভ করেন। ইউরোপ আজো এ তিক্ত পরাজয় ভুলতে পারেনি। সমুদ্রের অপাজেয় শক্তি হিসেবে ফ্রান্সকে স্পেনিশ শত্রু হতে রক্ষা করে উসমানী নৌবাহিনী। এবং তার রক্ষার্থে সেখানেই থেকে যায়।

সমুদ্রে উসমানীদের সূর্যাস্ত

বহু ধর্ম, বর্ণ এবং ভাষার উসমানী সালতানাতের কর্ণধারদের বিলাসিতা, শিল্প ও ফরাসী বিপ্লবের ধাক্কা, বলকান অঞ্চলে ইউরোপ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অটোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং বহিঃশক্তির সংস্কারের চাপ অটোমানদের হাঁপিয়ে তুলে। আবার বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তরুণ তুর্কিদের জাতীয়তাবাদের তীব্র দাবির প্রেক্ষাপটে প্রতিকীভাবে অটোমান সালতানাত অবশিষ্ট থাকে।

এমন সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাচে অবশেষে সমাপ্তি ঘটে ইসলামের এ শক্তি। অটোমান শাসিত অঞ্চল বানরের ভাগের মতো দখল করে নেয় বিজয়ী শক্তি। আর এভাবেই সমুদ্রচারী এই মুসলিম শক্তি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

আগের সংবাদকট্টর হিন্দুত্ববাদী আরএসএস নাৎসি বাহিনীর ছায়া : ইমরান খান
পরবর্তি সংবাদকাশ্মীর নিয়ে এপ্রিলেই বসতে পারে ওআইসির বৈঠক