হিন্দুত্ববাদ প্রতিরোধে কতটা সচেতন বাংলাদেশ?

হিন্দুত্ববাদ প্রতিরোধে কতটা সচেতন বাংলাদেশ?

রাগিব রব্বানি:

ভারত উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ দাপুটে ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে। ভারতে ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষত ইসলাম ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে ইসলামফোবিক কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ যেন বিজেপি ও তার সতীর্থ সংগঠনগুলোর নিত্তনৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছে। কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়া, তিন তালাক বিল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণ, এনআরসি, মুসলিম-বিরোধী সংশোধিত নাগরিক আইন ইত্যাদি ইসলামফোবিক সেইসব কর্মকাণ্ডেরই জ্বলন্ত উদাহরণ।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী সেই আগ্রাসনের প্রভাব অবশ্যম্ভাবীভাবে বাংলাদেশেও পড়ছে। ইসকন-সহ হিন্দুত্ববাদী একাধিক সংগঠন হিন্দুত্ববাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশে তৎপর রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া এনআরসি ও সংশোধিত নাগরিক আইনের জেরে ভারতে যে সমস্ত মুসলমান নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হবেন, তাদের বড় একটি অংশকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হবে, এ আশঙ্কা আছে সচেতন মহলের তরফ থেকে।

হিন্দুত্ববাদী এইসব আগ্রাসনের মুকাবেলায় কতটা সচেতন বাংলাদেশের মানুষ, জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট আলেম ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের সঙ্গে।

তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, হিন্দুত্ববাদ যে একটা সংকট, একটা সমস্যা, এই কথাটুকু উচ্চারণ করার মতো বা এ বিষয়ে মতবিনিময় করার মতো স্বাধীনতা এই সময়ে বাংলাদেশের মানুষের আছে বলে আমার মনে হয় না। ফলে সচেতন যারা, যাঁরা বুঝতে পারছেন এই সংকটের গভীরতা, তাঁরা মুখ খুলে সাধারণ মানুষকে ওভাবে সচেতন করতে পারছেন না। ওলামায়ে কেরামের মধ্য থেকে যারা একটু-আধটু বলছেন, তাঁদেরকেও নানা ইশারা-ইঙ্গিতে বলতে হচ্ছে, খোলামেলাভাবে এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমগুলোও হিন্দুত্ববাদের এই আগ্রাসনকে ওভাবে উপস্থাপন করছে না। করলেও এটাকে নিরেট জাতীয়তাবাদ হিসেবে উপস্থাপন করছে। এখানে যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, সে দিকটা অনুল্লেখই রেখে দিচ্ছে।

কিন্তু অতীতে তো ভারতের বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী কার্যকলাপ ও আগ্রাসনের জোরালো প্রতিবাদ করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে, নব্বইয়ের দশকে বাবরি মসজদি অভিমুখে লংমার্চ এর মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য একটা আন্দোলন ছিল…। এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, হ্যাঁ, তখনও হিন্দুত্ববাদের কার্যকলাপ ছিল, কিন্তু এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে এতো ব্যাপকতা লাভ করেনি। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস ও অন্যান্য উগ্র হিন্দুরা বাবরি মসজিদকে শহিদ করেছিল ঠিকই, কিন্তু ব্যাপকভাবে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের শারীরিক রূপ লাভ করেছে বিগত সাত-আট বছরে। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসবার পর থেকে।

চলমান এই হিন্দুত্ববাদী সমস্যার ভবিষ্যত কী, এর কতটা প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে? এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ভারতের সাম্প্রতিক যে দুটো ব্যাপার, এনআরসি ও ক্যাব, এর বিরুদ্ধে ভারতে ব্যাপকভাবে আন্দোলন চলমান। আমাদের ‘মাননীয়রা’ বারবার বলছেন, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু। অথচ এনআরসি ও ক্যাবের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যত-সংকট ওতপ্রোতভাবে যে জড়িয়ে আছে, তা বুঝতে খুব বেশি চিন্তারও দরকার পড়ে না। ভারতে বসবাসরত অসংখ্য বাঙালি মুসলমান এমন আছেন, এনআরসি ও ক্যাব কার্যকর হলে নানা কারণে তাঁরা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হবেন। এদের সংখ্যা কিন্তু একদম কম না, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চেয়েও এই সংখ্যাটা বেশি হবে। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারের মতোই একসময় তাড়িয়ে দেবে ভারত, পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশেই হবে তাঁদের আশ্রয়, বাংলাদেশ তাদেরকে গ্রহণ করুক বা না করুক।

মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে এখন এম্নিতেই সমস্যায় ভুগছে দেশ, নতুন করে আরও শরণার্থী এলে বাংলাদেশকে কি কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না? আমাদের ‘মাননীয়দের’ চিন্তায় কি সহজ এই ব্যাপারটিও ধরা পড়ে না? এ ছাড়া অনাগরিক হিসেবে সাব্যস্ত সেসব মুসলিমদের তাড়াতে রাখাইনের মতোই, বা আরও ভয়ানক কায়দায় একটা গণহত্যা অবশ্যম্ভাবীভাবে সংঘটিত হবে ভারতে, যদি ক্যাব ও এনআরসি বাস্তবায়ন হয়। তখন এই মুসলিম গণহত্যার সূত্র ধরে বাংলাদেশি মুসলমানদের মধ্যেও ক্ষোভ ও দ্রোহ জেগে উঠবে, বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির জন্য যা অশনি সংকেত হিসেবেই আবির্ভূত হবে।

আগের সংবাদহিন্দু নির্যাতনের সংখ্যাতত্ত্ব : হিন্দুত্ববাদ যেভাবে বাংলাদেশ-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে
পরবর্তি সংবাদহিন্দুত্ববাদের সমালোচনায় শশী থারুর: বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?