‘মুছে দাও মুসলিম চিহ্ন’:  নাম পরিবর্তনের হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প

‘মুছে দাও মুসলিম চিহ্ন’:  নাম পরিবর্তনের হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প

রাকিবুল হাসান:

ভারত বহু-জাতিক এবং বহু-ভাষিক একটি দেশ। এর রাজ্য এবং শহরগুলোর নামও বিভিন্ন জাতি এবং ভাষার সাথে জড়িত। ফলে দেখা যায় শহরের স্থানীয়দের ডাকনাম এবং সরকারি বিভাগ কিংবা এজেন্সির নামের সঙ্গে কখনো কখনো বৈপরীত্য চোখে পড়ে। মূলত এই বৈপরীত্য কমানোর জন্যই সরকারি নথিপত্রের ওপর নির্ভর করে ডাকনাম বদলে দেয়ার একটা প্রচলন ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই শুরু হয়। এই নাম বদলানোর অন্যতম লক্ষ্য ছিল—বৈপরিত্যের কারণে কোথাও যেন নাম নিয়ে সঙ্কট কিংবা সংশয় দেখা না দেয়। কিন্তু এখন ভারতজুড়ে শহরের নাম বদলানোর যে হিড়িক তুলেছে বিজেপি, এই লক্ষ্যের সঙ্গে তার কোনো সংযোগ নেই। বরং এখন নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে মুসলিমদের ওপর বিদ্বেষ পোষণ এবং হিন্দুত্ববাদকে প্রকট করার জন্য। তাহলে আগে শহরের নামগুলো কিভাবে পরিবর্তন হতো?

আগে শহরের নাম পরিবর্তনের মানদণ্ড

ভারতে শহরের নাম বদলানোর ধারণাটি নতুন কিংবা আশঙ্কার কিছু নয়। ১৯৪৭ সাল থেকেই বিভিন্ন রাজ্য এবং শহরের নাম পরিবর্তন হয়ে আসছে। তখন জাতিগত বিদ্বেষে তাড়িত হয়ে এই নাম পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হতো জনগণের ব্যবহারের সুবিধার্থে। যেমন ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের দেয়া নাম ‘জুবুলপুর’কে করা হয়েছে ‘জাবালপুর’। ১৯৪৮ সালে ‘কাউনপুর’কে করা হয়েছে ‘কানপুর’।

অনেক শহরের নাম ইংরেজিতে। সহজীকরণের জন্য ইংরেজি নামটাকেই আরেকটু আঞ্চলিক করে সহজ করা হয়েছে। যেমন ২০০১ সালে ‘কালকাত্তা’কে  ‘কলকাতা’ করা হয়েছে।

কখনো ভাষাভিত্তিক অঞ্চলের দিকে লক্ষ্য করে স্থানীয় ভাষায় শহরের নামকরণ করা হয়েছে। যেমন ১৯৯৬ সালে ‘মাদ্রাজ’ শহরকে ‘চেন্নাই’ বলে তামিল ভাষায় নামকরণ করা হয়েছে। মারাঠিদের ভাষা এবং ডাকনামের দিকে লক্ষ্য করে ‘বুম্বাই’কে করা হয়েছে ‘মুম্বাই’। কখনো বাংলা নামটাকেই একটু পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন ২০০৭ সালে ‘উত্তরাঞ্চল’কে করা হয়েছে ‘উত্তরখণ্ড’। ১৯৫৯ সালে ‘মধ্য ভারত’কে করা হয়েছে ‘মধ্য প্রদেশ’। কোনো কোনো নামে ইংরেজির সঙ্গে বাংলা নামকরণও করা হয়েছে। কখনো উর্দু থেকে হিন্দিতে নামকরণ করা হয়েছে।

এই পরিবর্তনগুলো ভারতের আগের সরকারগুলো আইন করে আনুষ্ঠানিকভাবেই করেছে। পরিবর্তনগুলো থেকে স্পষ্ট—ঐতিহাসিক কোনো নাম পরিবর্তন করা হয়নি। পরিবর্তন করা হয়নি জাতিগত বিদ্বেষ এবং হিন্দুত্ববাদের নাম ছড়ানোর জন্য। যতগুলো পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তা জনগণের সুবিধার্থেই হয়েছে।

এখন কিভাবে নাম পরিবর্তন হচ্ছে?

২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় নাম পরিবর্তনের নতুন জোয়ার, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। তারা বেছে বেছে মুসলিম নামানুসারে ঐতিহাসিক যেসব শহর, সেগুলোর নামকরণ করতে শুরু করে হিন্দুদের নামানুসারে। নাম পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, বরং ওই নামের মুসলিম ব্যক্তিটিকেও মারাত্মকভাবে অপবাদ দিয়েছে।

২০১৮ সালে ‘এলাহাবাদ’কে করা হয় ‘প্রয়াগরাজ’। একই বছর ‘ফৈজাবাদ’কে করা হয় ‘অযোধ্যা’। অন্যদিকে ‘হায়দ্রাবাদ’কে ‘ভাগ্যনগর’, ‘উসমানাবাদ’কে ‘ধারাশিব’, ‘মুজাফফরনগর’কে ‘লক্ষ্মীনগর’ বলে নামকরণ করার প্রস্তাব দিয়েছে রাজ্যের বিজেপি বিধায়করা। এ ছাড়াও সেকান্দরবাদ এবং করিমনগরের নামও বদলে দেয়ার পরিকল্পনা করছে বিজেপি। যেখানেই মুসলিম নাম, সেখানেই হামলে পড়ছে তারা। এমনকি ঐতিহাসিক স্থাপত্যের শহর ‘আগ্রাবাদ’কে পরিবর্তন করে ‘আগ্রাওয়াল’ করার ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছেন কয়েকজন বিজেপি নেতা।

এতদিন কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে হাত দিতে পারেনি গেরুয়াধারী এই দল। ২০১৯ এর আগস্টে কাশ্মীরের বিশ্বাস মর্যাদা বাতিল করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করার পর উঠেপড়ে লেগেছে নাম পরিবর্তনের নেশায়। তারা ঘোষণা দিয়েছে শের-ই-কাশ্মীর নামে পরিচিত ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর নামে যা কিছু আছে, সবগুলোর নাম পরিবর্তন করা হবে। তার নামে কাশ্মীরে আছে দুটি হসপিটাল, একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম, একটি ইনডোর স্টেডিয়াম, একটি পার্ক এবং একটি কনভেনশন সেন্টার। ২০১৯ এর ডিসেম্বরের শুরুতে দি ওয়্যারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, শের-ই-কাশ্মীর স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল স্টেডিয়াম করা হবে।

এর আগে ২৪ অক্টোবর জম্মু-কাশ্মীরে ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেলের নামকরণ করা হয় শ্যামা প্রাসাদ মুখার্জির নামে। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি ছিলেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কংগ্রেসের তীব্র সমালোচক ছিলেন। তিনি অনুচ্ছেদ ৩৭০-এর ঘোরবিরোধীও ছিলেন। বিজেপি প্রায়ই কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিরোধিতা করে দেয়া তার স্লোগান- ‘এক দেশ মেঁ দো বিধান, দো প্রধান আওর দো নিশান নাহি চলেঙ্গা’ (এক দেশে দুই সংবিধান, দুই প্রধানমন্ত্রী, দুই পতাকা, থাকতে পারে না) ব্যবহার করে।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করার পর বিজেপি নেতারা বলেছেন, দলটি অবশেষে মুখার্জির অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গেও নাম পরিবর্তনের বিশাল এক উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে গেরুয়াধারী সংগঠনগুলো এতটাই অতিসক্রিয় যে, প্রশাসনিক স্তরে পত্র বিনিময়ের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই নাম বদল করে ফেলেছে তারা। যেমন, পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুককে ‘তাম্রলিপ্ত’, উত্তরদিনাজপুরের ইসলামপুরকে ‘ঈশ্বরপুর’, মুর্শিদাবাদের বহরমপুরকে ‘ব্রহ্মপুর’ নামেই সাংগঠনিক কাজে মান্যতা দিচ্ছে তারা।

বিজেপি যতগুলো শহরের নাম পরিবর্তন করেছে কিংবা করবে বলে পরিকল্পনা করছে, জনগণের সুবিধার দিকে তাকিয়ে তা করছে না। বরং নিজেদের একক অধিকারের জোরে পরিবর্তন করছে।

নাম পরিবর্তনের নেপথ্যে

ভারতে ঐতিহাসিক শহরের মুসলিম নামগুলো শুধুই নাম নয়, এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, পরিচয়, সংস্কৃতি। এই নামগুলো মুছে দিয়ে বিজেপি আসলে মুসলিমদের ইতিহাসটাকেই আড়ালে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পূর্বাঞ্চলীয় সম্পাদক (সংগঠন) শচীন্দ্রনাথ সিংহ সরাসরি বলেছেন, ‘ব্রিটিশ ও মুঘলরা যারা একদিন এখানে রাজত্ব করেছে, তারা চলে গিয়েছে। তাই তাদের দেওয়া নাম অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া উচিত।’

ঐতিহাসিক মুসলিম নামগুলো পরিবর্তন করে দেয়া হচ্ছে হিন্দুত্ববাদী নাম। মূলত নামগুলো পরিবর্তন করে তারা হিন্দুত্ববাদকে আরো প্রকট এবং উজ্জ্বল করতে চায়। এই হিন্দুত্ববাদ বিকাশের-ই আরেক ধাপ কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, বাবরি মসজিদের জায়গায় হিন্দুদের মন্দির নির্মাণের রায় দেয়া, নাকরিত্ব বিলের মাধ্যমে মুসলিমদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রান্তিক করে দেয়া। বাবরি মসজিদ রায়ের পর আন্তর্জাতিক সবগুলো গণমাধ্যম একই সুরে বলেছে—নরেন্দ্র মোদী হিন্দুত্ববাদের দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভারত।

তবে এর বাইরে গিয়ে কেউ কেউ বলেছেন, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে হিন্দুদের মন জয় করার চেষ্টা করছে বিজেপি। কিন্তু বিজেপি বলছে, মুঘলরা এখানে নেই, তাই তাদের নাম রাখারও দরকার নেই। দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাই নাম বদলাবে।’

ঐতিহাসিরা কী বলছেন?

কারো শাসন শেষ হয়ে গেলেই কি তার দেয়া নাম বদলে দিতে হবে। তা-ও সেটা যখন ঐ দেশের বিশাল একটি জনগণের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসের সাথে জড়িয়ে যায়?

পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি এই ধরনের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে মৌলবাদী চিন্তাভাবনা বলেই মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘তারা (গেরুয়াশিবির) ইতিহাস বোঝেন না। ইতিহাসের ভাবনা কিছু নেই। মুসলিমরা ছিল শাসকদল। এখানে যারা এসেছিলেন, তারা বহুকাল ছিলেন। তাদের কৃষ্টি তো আর উঠে যায়নি। কৃত্তিবাস সৃষ্টি হয়েছিল ইলিয়াস শাহের সময়। সিরাজ-উদ-দৌলাকে ভুলে যাব! এটা একটা মৌলবাদী ভাবনা ছাড়া কিছু না।’

ইতিহাসবিদ হেরাম্ব চতুর্বেদী বলেছেন, ‘বিজেপি রাজনীতিবিদরা মেরুকরণের চেষ্টা করছেন। এটি জাতীয় অখণ্ডতা এবং ঐক্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমি বিশ্বাস করি—ষোড়শ শতাব্দীর মোগল সম্রাট আকবর এলাহাবাদ শহর প্রতিষ্ঠার জন্য কৃতিত্বের প্রাপ্য। আর যে বহুত্ববাদী গণতন্ত্র হিসাবে ভারতের উচিত তার সমৃদ্ধ, বহুমুখী ইতিহাস রক্ষা করা। কারণ সেই বৈচিত্র্যই তার শক্তি।’

অনেক ঐতিহাসিকগণ বলছেন, নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিজেপি নামগুলোর পেছনের যে ইতিহাস তুলে ধরে এর ন্যয্যতা দাবি করছে, তা অনেকাংশেই বনোয়াট এবং ভুল। ইচ্ছেমত গল্প জুড়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে তারা। তারা বলছেন, রাম ও কৃষ্ণের নামে ৭ হাজার গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে। অথচ আকবরের নামে নামকরণ করা হয়েছে মাত্র ২৪৭ টি গ্রামের। এবার বিজেপি ঐ ২৪৭ টি গ্রামের নাম বদলে একেবারে হিন্দুরাষ্ট্রের আদল দিতে চাচ্ছে ভারতকে।

আগের সংবাদবাংলাদেশে গেরুয়া বাতাস: রাজনীতিতে ‘হিন্দুত্ববাদী অনুপ্রবেশে’র চেষ্টা
পরবর্তি সংবাদগেরুয়া উত্থান: প্রতিবেশীরা ভারতকে কেন অপছন্দ করে?