মুসান্না মেহবুব:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলছে খুব নীরবে এবং কৌশলের সঙ্গে। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে সংখ্যালঘু প্রার্থীর সংখ্যা (যাদের প্রায় সকলেই হিন্দু) অন্যান্য বারের চেয়ে অনেক বেশি ছিলেন। ৫ নারী ও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ এই সংখ্যা ছিল ৭৯ জন।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাশ গুপ্ত সেসময় গণমাধ্যমকে তৃপ্তির সঙ্গে বলেছিলেন, ‘এবার যে শুধু সংখ্যালঘু প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে তা নয়, এর আগে কোনো সংসদ নির্বাচনে এত বেশিসংখ্যক সংখ্যালঘু প্রার্থী ছিলেন না।’
বলা বাহুল্য, এই প্রার্থীদের দুই/চার জন বাদ দিলে সকলেই ছিলেন হিন্দু মতাবলম্বী। এরমধ্যে এককভাবে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন ১৮ জন, আর বিএনপি থেকে ছয়জন।
নির্বাচনের আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সাউথ এশিয়ান মনিটরে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে দর কষাকষি এবং দল দুটোর ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে হিন্দু প্রার্থীদের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছে।
সাউথ এশিয়ান মনিটরের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে হিন্দু রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে আরএসএস যে ভূমিকা রাখছে তা তেমন প্রচার করা হচ্ছে না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে (৩ আগস্ট, ২০১৮) সাউথ এশিয়ান মনিটর এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয় যে, আরএসএসের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একজন যিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও ঘনিষ্ঠ – তিনি সে বছরের ২৪ জুলাই দুই দিনের গোপন সফরে ঢাকা আসেন।
ওই রিপোর্টে আরও বলা হয় যে, নরেন্দ্র মোদির সরকার দিল্লীর ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছে আরএসএস। এমনকি বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের অনুসারী কিছু হিন্দু সংগঠন গড়ে তোলার পেছনেও ভূমিকা রেখেছে তারা। তারপর আগস্টে জানা যায়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহকারী, যিনি গুজরাটে মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি ভারতীয় হাই কমিশনের সিনিয়র কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের শীর্ষ কয়েকজন হিন্দু নেতার সাথে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে সংসদীয় আসন থেকে মনোনয়ন দেয়া যেতে পারে, এ ধরনের হিন্দু প্রার্থীদের সম্ভাব্য তালিকা নিয়ে তারা সেখানে প্রাথমিক আলোচনা করেন।
সাউথ এশিয়ান মনিটরের প্রতিবেদন মতে, আরএসএসের এই কর্তাব্যক্তির ঢাকা সফরের চার দিন আগে আসামের আরেকজন সঙ্ঘ নেতা, গৌহাটি ইউনিভার্সিটির ফিজিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের প্রধান প্রফেসর ইশাঙ্কুর সাইকিয়া ঢাকা সফর করেন এবং বেশ কিছু হিন্দু আওয়ামী লীগ নেতা এবং ভারতীয় হাই কমিশনের ক্যাডারদের সাথে আলাদাভাবে বৈঠক করেন। প্রফেসর সাইকিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, তিনি এক সপ্তাহের জন্য ঢাকা সফর করেছেন এবং সেখানে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন। প্রফেসর সাইকিয়া জানান, ‘সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ সফর ছিল তার’।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি তিনি। কিন্তু তাদের এসব সফর কী উদ্দেশ্যে এবং কাদেরকে রাহনুমায়ি ও পরামর্শদানের জন্য ছিল তা পরিস্কার হয়ে যায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাশগুপ্তের এক বক্তব্য থেকে। প্রফেসর সাইকিয়া ও নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সহকারীর বাংলাদেশ সফরের পর সাউথ এশিয়ান মনিটরের সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যাতে আমাদের ৩০টি আসন দেয় আমরা সেই দাবি জানিয়েছি। আমরা এ ব্যাপারে আশাবাদী যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আমাদের এ দাবি বিবেচনা করবেন।
দাসগুপ্ত জানান, বাংলাদেশের হিন্দুদের পক্ষে দর কষাকষির জন্য তিনি ‘তিনবার’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে দেখা করেছেন। তিনি কামাল হোসেন, এইচ এম এরশাদ, এমনকি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথেও হিন্দুদের দাবি নিয়ে কথা বলেছেন বলেও জানান।
নির্বাচনের আগে আরএসএসের এই লবিং এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের নেতাদের দাবি-দাওয়া থেকে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা না, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদকে পাকাপোক্ত করতে ভারতের গেরুয়া বাহিনী কতটা তৎপর এবং সিরিয়াস ভূমিকায় কাজ করছে।
