আফগানিস্তান-পতনে আমেরিকাকে সাহায্য, সুলাইমানির ভয়াবহ গাদ্দারি

আফগানিস্তান পতনে আমেরিকাকে সাহায্য, সুলাইমানির ভয়াবহ গাদ্দারি

মুনশী নাঈম:

বৃহস্পতিবার মার্কিন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সুলাইমানি। ইরানের বিশেষ বাহিনী রেভ্যুলশনারি গার্ডের অভিজাত বাহিনী কুদস ফোর্সের প্রধান। বিগত বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি প্রভাব বিস্তারে বারবারই তার নাম আলোচনায় আসছিলো। ইরানের আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধির প্রধান কারিগর জেনারেল কাসেম। তিনি ইরানের বিপ্লবী বাহিনীর সবচেয়ে প্রভাবশালী কমান্ডার। ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতা আলি খামেনি তার উত্তরসূরি হিসাবে প্রস্তুত করছিলেন তাকে।

মার্কিন সরকার কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার সঙ্গে সঙ্গে তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিদেশি প্রতিপক্ষকেও হত্যা করেছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের অনেকের মতো সুলাইমানির সাথে মার্কিন সম্পর্ক একটু জটিল। তিনি সবসময় মার্কিনীদের বিপরীতে ছিলেন না। বরং ৯/১১ এর পর তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করেছেন। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যে সুলাইমানি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সুলাইমানির উত্থান

১৯৭৯ সালে ইরানি ইসলামি বিপ্লবের সময়ে তৈরী হয় কুদস ফোর্স। ফোর্সটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর মতোই। কুদস ফোর্স মূলত ইরানের বিপ্লবি গার্ডস কর্পস এর বিদেশি গোয়েন্দা এবং গোপন সামরিক অপারেশন শাখা। এটি শুধু এশিয়া নয়, বরং থাইল্যান্ড এবং লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।

ইরাক-ইরান যুদ্ধের (১৯৮০-৮৮) সময় সুলাইমানি ছিলেন বিশেষ একটি বাহিনীতে। চতুরতা এবং কৌশল দিয়ে এ যুদ্ধে তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেন। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের বিপরীতে বেশ কয়েকটি জয় এনে দেন তিনি। এরপর ১৯৯৯ সালে তিনি কুদস বাহিনীর প্রধান হয়ে উঠেন। ইরানের সঙ্গে তখন আমেরিকার কূটনৈতিক কোন সম্পর্ক নেই। কারণ ১৯৮০ সালে আমেরিকার কয়েকজন কূটনৈতিককে ইরানে জিম্মি করার পর আমেরিকা তার কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয়।

বিগত বছরগুলোতে ইরানের পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন কাসেম। গত ১৫ বছর ধরে মেজর জেনারেল কাসেম সুলাইমানি একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশলী হিসেবে তৈরি হয়েছেন। ইরাক ও সিরিয়ায় ক্ষমতা নির্ণয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের উপস্থিতি সুসংহত করতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

তালেবানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে জোট

৯/১১ এর হামলার সময়ে কুদসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কাসেম সুলাইমানি। হামলার পর মার্কিনীদের সঙ্গে হাত মেলান তিনি। ২০০১ সালের অক্টোবরের শুরুতেই জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয় সোলাইমানি এবং মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠক। এখনো কেনো তালেবানদের ওপর হামলা করা হচ্ছে না, এই নিয়ে মার্কিনীদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন সুলাইমানি। এই বৈঠকেই তিনি মার্কিনীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন আফগানিস্তানের ম্যাপ। ম্যাপ দেখিয়ে বলেছিলেন, আগে এখানে আক্রমণ করুন, তারপর ওখানে, তারপর ওখানে।

ম্যাপ হাতে পেয়ে ৭ অক্টোবরই তালেবানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে শুরু করে মার্কিন সেনারা। আক্রমণের ধারাবাহিকতায় মাত্র তিন বছরে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসে মার্কিন সমর্থিত সরকার।

২০১৩ সালে নিউইয়র্কের ডেক্সটার ফিলকিনস এক প্রবন্ধে লিখেন, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে তালেবানের হামলার পর মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অধিকারিক রায়ান ক্রকার ইরানি কূটনীতিকদের সাথে আলোচনা করতে জেনেভায় যান, খুবই গোপনে। ক্রকার আমাকে বলেছেন, ইরানি কূটনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে তালেবানকে ধ্বংস করতে মরিয়া ছিলেন। তারা কখনও কখনও ক্রোকারকে বিভিন্ন বার্তা পাঠাতেন সাংকেতিক চিহ্নে। কখনো কাগজে লিখে কোনো বার্তা পাঠাতেন না। এ সময় কাসেম সোলাইমানি নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন হাজি কাসেম বলে। আমরা তাদের সাথে কাজ করতে মত দেই এবং এতে হাজি কাসেম বেশ সন্তুষ্ট হন।

ফিলকিনস আরও লিখেন, এরপর ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ইরানকে লম্পট বলে অভিহিত করার পর এ সম্পর্কে ভাটা পড়ে। কিন্তু সবসময়ই তখন একটু নমনীয় ছিলেন সুলাইমানি এবং পুনরায় আলোচনা শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেন তিনি। এরপর ২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাকে হামলা করলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও অবনতি হয়। ২০০৮ সালে কারবালায় পাঁচজন মার্কিন সৈন্য নিহত হলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পেট্রিয়াসের কাছে কাসেম সুলাইমানি নমনীয় ভঙ্গিতে লিখেছিলেন, আমি খোমেনির সমাধিতে কসম করে বলছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমি বুলেটকে অনুমতি দেই না।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার আল-আসাদের ইরান সমর্থিত সরকারকে মদদ দেয়া এবং ইরাকে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জেনারেল সুলাইমানি।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘসময় ধরে শত্রুভাবাপন্ন হলেও ইরাকে আইএস’এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আদর্শগত দিক বিবেচনায় পরোক্ষভাবে একে অপরকে সহায়তা করেছিল তারা। জেনারেল সুলাইমানি দুই বৈরী ভাবাপন্ন দেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বন্ধুর বেশে শত্রু

আমেরিকা কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা করে প্রমাণ করে দিলো, আমেরিকা কখনো সোলাইমানিকে বন্ধু ভাবেনি। স্বার্থ উদ্ধারের একটি হাতিয়ার ছিল মাত্র। সুলাইমানিও স্বার্থ উদ্ধারে হাত মিলিয়েছেন প্রয়োজন অনুসারে। সুলাইমানির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ অভিযান ও ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদের মত যুক্তরাষ্ট্রের চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন করতে ইরানের ‘প্রাথমিক অস্ত্র কুদ’স ফোর্স।’ এসব সংগঠনকে তারা অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে বলে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের। কুদস ফোর্সকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও।

একসময় তালেবানের বিরুদ্ধে যে সোলাইমানি সাহায্য করেছিল, আজ সে হয়ে গেল সন্ত্রাসী। তার দলও পেয়ে গেল সন্ত্রাসী-পরিচিতি। কী ইঙ্গিত করে দাবার গুটির এই উলটো চাল?

আগের সংবাদইয়াবাসহ আটক সাবেক সেনাসদস্য
পরবর্তি সংবাদইক্বরা আন্তর্জাতিক ক্বিরাত সম্মেলন ২৪ জানুয়ারি