মুজাহিদুল ইসলাম :
বংশপরিচয়
রাসূলের সাহাবী ওয়ায়েল ইবনে হুজরের বংশের সাথে নিজেদের সম্পর্ক ও পূর্বপুরুষের স্পেন গমন, তারপর সেখান থেকে অবশেষে তিউনিসিয়ায় চলে যাওয়া নিয়ে ইবনে খালদুন বলেন, ‘আমাদের বংশ মূলত ইয়েমেনের হাযরামউতের ওয়ায়েল ইবনে হুজরের সাথে সম্পৃক্ত। দশম পূর্বপুরুষ খালদুন আন্দালুসে আগমন করেন।’
আন্দালুসের প্রশাসন ও রাজনীতিতে পূর্বপুরুষের শক্ত অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইবনে হাইয়্যান ও ইবনে হাযমের মতানুসারে বনী উমাইয়া থেকে তাওয়াইফী পর্যন্ত প্রশাসন ও রাজনীতিতে খালদুন বংশের বেশ প্রভাব ছিল।
জন্ম ও শিক্ষা
তিনি তিউনিসিয়ায় ৭৩২ সালে রমজানের শুরুতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার কোলে বেড়ে উঠেন। একপর্যায়ে কিছুটা বড়ো হলে মকতবের শিক্ষক আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন সাইদ বিন বুররালে নিকট কুরআন পড়েন। তিনি তার জীবনীতে যুগের বিভিন্ন দিকপালের নিকট ফিকহ, ক্বিরাত, আরবী সাহিত্য, অংক ও হাদীস শিক্ষার কথা উল্লেখ করেন।
পিতার মৃত্যু ও রাজদরবারে চাকরি
তিনি বলেন, ‘আমি ইলমের বিভিন্ন হালকাতে ঘুরে ঘুরে জ্ঞান অর্জনে লেগে থাকি, একসময় কিছুটা বেড়ে উঠি। কিন্তু এসময় সর্বব্যাপী প্লেগ নেমে আসে। সমাজের বিশিষ্ট মানুষ ও সকল বড় বড় শায়েখ চলে যান এবং একপর্যায়ে এ দুর্যোগে আমার পিতামাতাও মৃত্যু বরণ করেন। আমি আমাদের শায়েখ আবু আব্দুল্লাহর মজলিসে পড়ে থাকি এবং একাধারে তিনবছর পড়াশোনা করি। যখন কিছুটা লেখাপড়া শিখতে পারি, তখন আমার শিক্ষককে সুলতান আবু ইনান ডেকে নেন এবং আমাকেও তিউনিসিয়ার শাসক তার রাজদরবারে কাজের জন্য ডেকে নেন।’
বিখ্যাত মুকাদ্দিমা লিখন
জীবনে একের পর এক বিভিন্ন রাজদরবার তথা তিউনিসিয়া, আন্দালুস ও মরক্কোসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে রাজনীতির প্রতি একধরনের বীতশ্রদ্ধ হয়ে আলজেরিয়ায় গমন করেন ইবনে খালদুন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন আরিফ বংশের বিন সালামার দূর্গে পৌঁছাই-এ দূর্গটি ছিল সবচে শক্তিশালী-সেখানে আমি দীর্ঘ সময় অবস্থান করি। আমি এই পূর্বাঞ্চল (আলজেরিয়া) ও তিলমিসানে মুকাদ্দিমা লেখায় লেগে থাকি এবং মুকাদ্দিমা লেখা শেষ করি। স্মৃতি থেকে অনেক কিছু লেখার পর সংশোধন-বিয়োজনের জন্য বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা বইপত্রের প্রয়োজন অনুভব করি।’
মিসরে গমন
‘তিউনিসিয়া থেকে ৭৪৮ সালের শাবান মাসের মধ্যভাগে রওনা হই। সমুদ্রযাত্রায় আমাদের প্রায় চল্লিশ দিন লাগে। তারপর আলেকজেন্দ্রিয়ায় ঈদুল ফিতর অবিতবাহিত করি। হজ করার জন্য সেখানে এক মাস অবস্থান করি, কিন্তু এ বছর আমার হজ করা সম্ভব হয়নি।’
এসময় মিসরে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর দেয়া ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান মাদরাসা সালাহিয়্যাহর এক শিক্ষক মৃত্যু বরণ করেন। সুলতান আমাকে তার স্থানে পাঠদানের দায়িত্ব দেন।’
বিচারকের পদে
সালতানাতের চার মাযহাবের বিচারপতির প্রত্যেকে প্রধান বিচারপতির পদ পেতে লবিং শুরু করলে সুলতান মালেকী মাযহাবের বিচারপতির প্রতি ক্রুদ্ধ হন। এসময় বিচারক হিসেবে দৃশ্যপটে আসেন ইবনে খালদুন। তার ভাষায়, ‘যখন ৭৮০ হিজরীতে মালিকী মাযহাবের কাযীকে পদচ্যুত করা হয়, সুলতান আমাকে এই দায়িত্ব দেন। আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি আমাকে দায়িত্ব নিতে বাধ্য করেন।।
পরিবারের সলিল সমাধি
মিসরে পৌঁছে ইবনে খালদুন তিউনিসিয়া থেকে তার পরিবারকে মিসরে চলে আসতে বলেন। কিন্তু মিশরে আসার পথে সমুদ্রে জাহাজডুবিতে তারা মারা যায়। এই স্মৃতিচারণ করে ইবনে খালদুন বলেন, ‘যখন চারদিক থেকে ব্যস্ততা বেড়ে যায়, আমার ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়। এর সাথে যুক্ত হয় সন্তান ও পরিবারের বিচ্ছেদ। পরিবার তিউনিসিয়া থেকে জাহাজে উঠে, তারা আলেকজেন্দ্রিয়ায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের বহনকারী জাহাজটি সমুদ্রে ডুবে যায়। সন্তানসহ সবকিছুই হারিয়ে যায় আমার। আফসোসের আর শেষ থাকে না। চিন্তা বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। অবশেষে সুলতান আমাকে দায়িত্ব (মাদরাসা সালাহিয়্যাহ) থেকে অব্যাহতি দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেন। আমি পাঠদান ও লেখনীর জন্য পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যাই।’
হজের সফরে
স্বাধীনচেতা ইবনে খালদুন এক বছরের মধ্যেই বিচারিক পদ থেকে অপসারিত হবার পর পাঠদানে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এর তিন বছর পর তিনি হজ পালন করেন। হজ সফরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘পদচ্যুতির তিন বছর পর হজ আদায়ের মনস্থির করি। সুলতান এবং আমির-উমারাদের বিদায় দেই, তারা আমার সফরে সহযোগিতা করেন। আমি ৭৮৯ হিজরীর মধ্য রমজানে কায়রো থেকে সুয়েজ সাগরের দক্ষিণের তুর বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হই।’
বিখ্যাত আসাবিয়্যাহ তত্ত্বের প্রয়োগ
ইবনে খালদুন তার যেসব তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত, তার মধ্যে ‘আসাবিয়্যাহ তত্ত্ব বা গোষ্ঠী সংহতির উপর রাষ্ট্র দর্শনের ভিত্তি’ হল অন্যতম। তিনি তৈমুরের সাথে দেখা করে তার প্রশংসা ও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দানের মধ্যে উল্লেখ করেন, ‘যারা আন্দাজে কথা বলে আমি তাদের মতো নই। আমি জ্ঞানজগতের একজন মানুষ। আমার বক্তব্য হল, রাজত্ব মূলত আসাবিয়্যাতের ভিত্তিতেই গঠিত ও প্রতিষ্ঠিত থাকে। যেখানে আসাবিয়্যাতের প্রভাব যত বেশী, সেখানে রাজত্বের স্থিতিও তত বেশী।’
ছয় শতাব্দী আগে আরব চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইবনে খালদুন বলেছিলেন, ‘ইতিহাস চক্রাকারে ঘোরে। একটি বংশধারার প্রতিনিধিত্ব তিন প্রজন্ম স্থায়ী হয়। এরপর তাদের সমৃদ্ধশালী যুগের অবসান ঘটে। একটি বংশধারার অনুসারীদের মধ্যে অভিন্ন উদ্দেশ্যের চেতনা যত দিন উজ্জীবিত থাকে, যতদিন তারা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত থাকেন এবং তাদের মধ্যে সংহতি থাকে, ততদিন তাদের অবস্থা ভালো থাকে। কিন্তু অপর একটি গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর নতুন বংশধারার উন্মেষ ঘটার আলামত শুরু হতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক আরব বসন্তের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এ যে ইবনে খালদুনেরই তত্ত্ব! আসলে বিস্ময়কর প্রতিভাধর ইবনে খালদুনকে আমরা তেমন করে এখনো জানিনা। বিশ্বখ্যাত মুসলিম এই মনীষীকে এখনো অনেক জানার বাকী আমাদের।
