গাজালির জবানবন্দী : আত্মজীবনীতে গাজালির জীবন ও সময়

গাজালির জবানবন্দী : আত্মজীবনীতে গাজালির জীবন ও সময়

মুজাহিদুল ইসলাম:

ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত তুস নগরীতে ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৪৫০ হিজরি সনে হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামেদ মোহাম্মাদ আল গাজালী রহ. জন্মগ্রহণ করেন।

ইসলামী চিন্তার জগতে গাজালি হচ্ছেন অন্যতম মৌলিক চিন্তাবিদ। তিনি ছিলেন একজন বড় সংস্কারক। দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও বাতেনী বিদ্যার অসারতা প্রমাণে আজও মুসলিম বিশ্ব তার নিকট ঋণী । ধর্ম, দর্শন ও সুফীবাদে তার মৌলিক অবদানের জন্য তিনি একজন শেষ্ঠ সৃষ্টিধর্মী চিন্তাবিদ বলে মুসলিম দর্শনে স্বীকৃত ও প্রশংসিত। তার চিন্তাধারা মুসলিম ধর্মতত্ত্বের উচ্চতম বিবর্তন বলে বিবেচিত।

বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মজীবনী লেখার প্রেক্ষাপট

এক দ্বীনী ভাইয়ের অনুরোধে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের পরিবর্তনশীল উপাখ্যান লিখেছিলেন গাজালি রহ.। প্রাচীন সময়ের কোন মনীষীর জীবনী যখন তার নিজ জবানিতে জানা যায়, তা আসলেই শিহরণ জাগায়। আর গাজালি রহ. প্রণীত আত্মজীবনী ছিল ইতিহাসের প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মজীবনী।

আত্মজীবনীর ভূমিকায় গাজালি রহ আত্মজীবনী লেখার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘আমার এক দ্বীনী ভাই আমার নিকট আবেদন করে, আমি যেন তার সামনে বিভিন্ন মত-পথের ভয়াবহতা ও অসারতা তুলে ধরি। তাই আমি আমি তার কাছে বিপরীতধর্মী বিভিন্ন মত ও পথের বিশৃঙ্খলার মধ্য থেকে সত্য উদ্ধারে আমার সীমাহীন কষ্ট-ক্লেশের কথা বর্ণনা করছি।’

জ্ঞান ও তত্ত্বানুসন্ধানে গাজালি

জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার তত্ত্বানুসন্ধানের যোগ্যতা তার খোদাপ্রদত্ত, নিজের কোন কৃত্রিম সৃষ্টি নয়। গাজালির ভাষায়, ‘বুঝ হওয়ার পর থেকে যৌবনের উচ্ছলতার মধ্যে আমি গভীর সমুদ্রের তরঙ্গে ঝাপিয়ে পড়ি, সাহসী পদক্ষেপে সমুদ্রের গভীরতায় প্রবেশ করি। প্রতিটি সমস্যার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য প্রতিটি দলের বিশ্বাস পরীক্ষা করে তাদের কর্মপন্থার ভেদ আবিস্কার করি। বাতিনীর ভেতর, জাহেরীর জাহের, দার্শনিকের দর্শনের পেছনের দরজা, তর্কবিদের কথার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, সুফীর সুফীতত্ত্বের রহস্য, ইবাদতকারীর ইবাদতের মূল অর্জন এবং খোদাদ্রোহীর দুঃসাহসের রহস্য জেনেই তবে তাদের ত্যাগ করি। তত্ত্ব তালাশের এই স্পৃহা জীবনের শুরু থেকে আমার অভ্যাস বরং আমার ধর্ম। এই তত্ত্বানুসন্ধানের যোগ্যতা আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তি, এটা আমার নিজের কোন কৃত্রিম সৃষ্টি নয়।’

বিভিন্ন মতবাদের ব্যবচ্ছেদ ও তাসাউফে আস্থা

দর্শন

গাজালি সমকালীন চারটি মতবাদ-দর্শন সম্পর্কে বলেন, ‘ আমি যখন দর্শন অধ্যয়নের অসারতা অনুধাবন করলাম, তখন বুঝতে পারলাম, উদ্দেশ্যে সাধনে এটা যথেষ্ঠ নয়। জ্ঞানের সকল দাবি পূরণে বুদ্ধি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সকল সমস্যার সমাধান দিতে সে সক্ষম নয়, সক্ষম নয়।

তর্কবিদ্যায় গাজালি

তর্কবিদ্যা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইলমুল কালাম আমি শিখেছি, বুঝেছি। এর বিষেশজ্ঞ ব্যক্তিদের বইপত্র আমি পাঠ করেছি। আমিও যতদূর পেরেছি লিখেছি, অনেক জ্ঞানের ভাণ্ডার এটা। কিন্তু এটা আমার উদ্দেশ্যে পূরণে যথেষ্ঠ নয়।’ তর্কবিদ্যার প্রেক্ষাপট, ইসলাম ও মুসলিমদের আকীদা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা থেকে তার উদ্ভব ও অনেকের তা দ্বারা উপকার সাধিত হওয়ার স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘এটা অন্যদের উদ্দেশ্য সাধনে সক্ষম হতেও পারে, আমি এতে সংন্দেহ করি না।…. আসলে আমার উদ্দেশ্য, যারা এর দ্বারা উপকৃত হয়েছে, তাদের ছোট করা কিংবা উপেক্ষা করা নয়। বরং রোগ ভেদে ঔষধ ভিন্ন হয়। কত ঔষধ একজনের উপকার করেছে অপরজনের আবার ক্ষতি করেছে!’

বাতেনী ধারা ও তাসাউফ

কোন একজন মাসুম ইমামের অন্ধ অনুকরণে বুদ্ধিবিবেকের বিন্দুমাত্র স্থান না থাকায় গাজালি রহ.-এর নিকট বাতেনী মাযহাব ভালো লাগেনি। সবকিছুর পর তাসাউফ প্রতি আস্থা রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন এ সকল ইলম থেকে আমি ফারেগ হলাম, তাসাউফের প্রতি আমার মনোযোগ নিবিষ্ট হল। কারণ, আমি বুঝতে পারি, তাদের কর্মপন্থা জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়ে গঠিত। তাদের মতবাদের সারাংশ হলো, মন্দ আখলাক ও বাজে গুণ থেকে মুক্ত হওয়া এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া সবকিছু থেকে অন্তরকে খালি করে তা আল্লাহর স্মরণ দ্বারা সুসজ্জিত করা। আর আমার জন্য আমল থেকে ইলম বেশী সহজ হওয়ায় আমি তাদের তাদের বিভিন্ন বই অধ্যয়ন শুরু করি। যেমন: আবু তালিব মাক্কীর কুতুল কুলুব…. একপর্যায়ে আমি তাদের জ্ঞানের উদ্দেশ্য ও রহস্য বুঝতে পারি। তাদের গতানুগতিক শিক্ষার মাধ্যমে যা অর্জন করা দরকার, তা আমি শিক্ষার মাধ্যমে অর্জন করি। তবে আমার মনে হল, তাদের বিশেষ ব্যক্তি পর্যায়ে হওয়ার জন্য শুধু শিক্ষা যথেষ্ঠ নয়, বরং বিশেষ রুচি ও হালের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছা সম্ভব। ..তবে উলুমে আকলিয়্যাহ ও শরইয়্যাহ অর্জনের মাধ্যমে আমি যা বুঝেছি, তা হল আল্লাহ, নবুওয়াত ও আখেরাতের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসই আসল।’

আল্লামা ইকবাল গাজালি সম্পর্কে বলেন, ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানীর ইমানুয়েল কান্টের এর মত গাজালির মহান উদ্দেশ্য ছিল প্রেরিত পুরুষের মতই। গাজালির খ্যাতি শুধু মুসলিম জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বব্যাপী।

আগের সংবাদআসামে গেলে ছাত্র আন্দোলনের মুখে পড়বেন মোদি
পরবর্তি সংবাদইসলামী হুকুমত কায়েম হলে ধর্ষণের হার শূন্যের কোটায় আনা সম্ভব : মুফতী ফয়জুল্লাহ