ইরান যেভাবে মিলিশিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে

ইরান যেভাবে মিলিশিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে

মুজাহিদুল ইসলাম:

স্বাভাবিকভাবে মিলিশিয়া বলা হয়, বেসামরিক বাহিনী, যার সদস্যরা সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলেও নিয়মিত সেনাবাহিনীর অন্তর্ভূক্ত নয়। বর্তমানে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর বাহিনীর বাইরে একটি বাহিনী রয়েছে। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই এটা গড়ে তোলা হয়। এই বাহিনীর প্রধান দায়িত্বই হলো ইরানের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখা এবং সে দেশের তথাকথিত ‘ইসলামিক সিস্টেম’ বা সমাজব্যবস্থাকে রক্ষা করা।

বলা চলে, আধুনিক সময়ে তারা মিলিশিয়া বাহিনীর পথিকৃৎ। উত্তর-আধুনিক বিশ্বে প্রথম মিলিশিয়া রাষ্ট্র। তাদের অনুসরণে বিভিন্ন দেশেও গড়ে উঠছে এ পদ্ধতি। তবে আদর্শিকভাবে মিলিশিয়া তথা আধাসামরিক বাহিনী গড়ে তোলার এই দর্শন ইরানে নতুন নয়, বরং ষোড়শ শতাব্দীর সাফাভি রাজবংশের উত্তরাধিকার। বরং তার থেকেও প্রাচীন। এটাকে পারস্যের উত্তারাধিকার বলা যায়। ষোড়শ শতাব্দীর হতে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে কেমন ছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সশস্ত্র বাহিনী থেকে কীভাবে কিছুটা আধুনিক সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত হলো, তারপর আবার পুরাতন সেই সম্প্রদায় ভিত্তিক সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে গড়ে উঠে–এই লেখায় সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে।

ঐতিহাসিক ও মাজহাবি বৈশিষ্ট্য

ঊনবিংশ শতাব্দীতে উসমানি ও মিসরের মুহাম্মাদ আলিরা যখন তাদের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে মনোযোগী হন, সুন্নি শাসকগণ যখন ইউরোপের তৎকালীন প্রযু্ক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি দ্বারা নিজেদের শাসিত অঞ্চল সমৃ্দ্ধ করতে থাকেন, বিপরীতে ইরান তার পূর্বের সনাতন সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন দেশের শিয়া নেতাদের আমন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বকীয়তার ওপর জোর দেয়। সুন্নি মুসলিম বিশ্ব বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাসে ও ইউরোপের উত্থানে উদ্বিগ্ন হলেও ইরানের কর্তা ব্যক্তিদের তেমন চিন্তিত মনে হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীতে ইরানের সাফাভি শাসনের আগে সুন্নি বিশ্বের শিক্ষা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে যে সাংস্কৃতিক রূপ ছিল, মঙ্গলদের আক্রমণে সে-সব কাঠামো ভেঙে পড়ে। মঙ্গলদের রেখে যাওয়া প্রবল গোত্রকেন্দ্রিক সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। ইরানের দ্বাদশপন্থী শিয়াদের সশস্ত্র গ্রুপ ‘কসল বাশ’-এর মাধ্যমে শিয়াইজম প্রতিষ্ঠার আগে মঙ্গলদের এই ব্যবস্থা শিয়াইজমের পথকে সুগম করে।

১৫০১ হতে ১৯২৫ পর্যন্ত ইরান পুরো আভ্যন্তরীণ গ্রোত্রকোন্দল এবং বহির্আক্রমনের মধ্য দিয়ে চলেছে। পূর্বদিক থেকে উজবেক ও আফগান গোত্রের হামলা, উত্তর থেকে রাশিয়া, পশ্চিম থেকে উসমানীয় এবং ভারতে ক্রমবর্ধবান ব্রিটিশ শক্তির হামলায় ইরান থাকে অস্থিতিশীল। একেকদিকে একেক সম্প্রদায় তাদের রক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইরানে দেশি-বিদেশি সমর্থিত মোট পাঁচটি গোত্রকেন্দ্রিক সামরিক শক্তি দেখা যায়।

বিংশ শতাব্দীতে রেজাখানের পাহলবি বংশ ক্ষমতায় এসে সকলকে মোটামুটি একত্রিত করত সক্ষম হয়। তবে বিশ্বযুদ্ধে রেজাখান জার্মান অক্ষ অবলম্বন করায় ব্রিটিশ ও রুশ অক্ষ দ্বারা আবারো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়।

তার ছেলে মুহাম্মাদ রেজা খান পিতার সামরিক উত্তারাধিকার পেলেও তাদের ক্লাসিক সামরিক ব্যবস্থার মাধ্যম ছাড়াই পুলিশি রাষ্ট্রের মাধ্যমে শাসন মজবুত করেন। তবে খামেনি আন্দোলনে সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থাকায় ইরানি বিপ্লব সংঘটিত হয়। তারপরই আবার সামরিক বাহিনীকে ব্যাকফুটে পাঠিয়ে নতুন মিলিশিয়া শক্তি বিপ্লবী গার্ডের উত্থান ঘটে।

সাম্প্রদায়িক সামরিক শক্তি

প্রচলিত সেনাবাহিনীর বাইরে সমান্তরাল বরং তার থেকেও শক্তিশালী বাহিনী তৈরীর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে খামেনি মনে করেন, আধুনিক প্রচলিত সেনাবাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের সাথে সময়পরিক্রমায় ইরানের বিপ্লবীদের মাঝে সাংস্কৃতিক ফারাক তৈরি হবে, যা পরিণামে সামরিক অভ্যূত্থান ঘটাবে। এটা খামেনির একটি বক্তব্য থেকে বেশ ভালোভাবে বোঝা যায়। তিনি বলেন, ‘ইরানে সামরিক ব্যক্তিদের দ্বারা সরকার পরিচালনা আমার শৈশবের স্বপ্ন।’

তাছাড়া ইরান শুরু থেকেই এই বাহিনী প্রতিষ্ঠার বিষয়ে হয়তো চিন্তা করেছে, বৈশ্বিক শক্তি ইরানের নিয়মিত বাহিনীর ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেবে। তাদের পক্ষে দেশের বাইরে ইরানের শিয়াইজম প্রচার ও তার স্বার্থ রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাই স্বতন্ত্র একটি বাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশের বাইরে শিয়াইজমের আদর্শ ধারণ করে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলা, যারা ইরানের হয়ে বিশ্বশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভিন্ন ছিল শুধু সিরিয়া। সিরিয়াতে বর্তমান মিলিশিয়া থাকলেও এটা সিরীয় বিপ্লবের পরে কাসেম সোলাইমানির তত্ত্বাবধানে হয়েছে। সোলাইমানি সিরীয় নেতৃত্বের ওপর যতটা ক্রুদ্ধ, হয়তো তার ঘোরতর শত্রু আমেরিকা, ইসরাইল এমনকি স্টেটের ওপর এতটা ক্রুদ্ধ ছিলেন না। কারণ, যেখানে অন্য শিয়াপ্রভাবিত দেশ তাদের আলাদা মিলিশিয়া বাহিনী দ্বারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে, সেখানে বাশার আল-আসাদের কোনো মিলিশিয়া বাহিনী নেই। সে-জন্য ইরাক ও লেবাননে কাসেম সোলাইমানি তার প্রতিনিধি রেখে সিরিয়ার যুদ্ধে নিজেই নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ইরান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামরিক বাহিনীর সাথে বিশেষ আধাসামরিক বাহিনী গড়ে তুলছে, যাদেরকে আসলে কোনো কোনো মহল রাজনৈতিক বাহিনীও বলার চেষ্টা করে। সেনাবাহিনীকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বড় শহরের বাইরে রেখে গুরুত্বপুর্ণ স্থানগুলোর নিরাপত্তায় আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র সমৃদ্ধ বাহিনীর মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। যেমন তুরস্কে এরদোগানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ সামরিক অভূথান হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করেন। এখন সেনাবহিনীকে বড় শহরগুলোর বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করছেন।

তবে অধুনা বিশ্বের প্রথম ও সকল দিক দিয়ে শক্তিশালী মিলিশিয়ার কৃতিত্ব ইরানের। যারা রাষ্ট্র থেকে শাসকদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষায় যে-কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে পিছপা হয় না। যেমন ইরানের বিপ্লবী গার্ড। বাহিনীটি ক্রমশ ইরানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিমণ্ডলে একটি বিরাট শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাদের নিজস্ব পদাতিক সেনা, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পর্যন্ত আছে। রিভোলিউশনারি গার্ডস হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী সদস্যকে নিয়ে গড়া একটি মিলিশিয়া বাহিনীকেও নিয়ন্ত্রণ করে, যাদের নাম বাসিজ রেজিস্ট্যান্স ফোর্স। তবে ইরানের বেসামরিক জনতার সঙ্গে তাদের আচরণ নিয়ে অতীতে বারে বারেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাদের এখতিয়ারের পরিধি কতটা তা নিয়েও নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আগের সংবাদসফট শিয়াইজম: মুসলিম দেশগুলোতে ইরানের সাংস্কৃতিক প্রভাব
পরবর্তি সংবাদজবর দখলে থাকা কাশ্মীরে ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালুর নির্দেশ ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের