মুসান্না মেহবুব:
দীর্ঘ ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন ফিলিস্তিনের মুসলমানগণ। ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইজরাইল অবৈধভাবে জোরপূর্বক ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করে সেই চল্লিশের দশকের শেষ দিকে যখন রাষ্ট্র গঠন করে, তারও আগ থেকে মুসলমানদের উপর ইহুদিরা নির্যাতন চালিয়ে আসছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ফিলিস্তিনি মুসলমানেরা তাদের পৈতৃক জমিতে চাষবাস করে আসছিলেন, সেই জমিগুলোতে তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে শরণার্থী জিন্দেগি গ্রহণ করতে বাধ্য করে ইহুদিরা। নির্মমভাবে হত্যা করে অসংখ্য ফিলিস্তিনিকে। যে ধারা আজও অব্যাহত আছে। ফিলিস্তিনি মুসলমানদের এই দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি লাভের জন্য আরবের বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ড. ইউসুফ আল কারজাভি তাঁর একটি বইয়ে সাত দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন বহু আগেই। বইটি ‘জেরুসালেম বিশ্ব মুসলিম সদস্য’ নামে বাংলায় অনুবাদও হয়েছে। তাঁর সাত দফা প্রস্তাবে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে করণীয় বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত আকারে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রথম দফা : ইন্তিফাদাকে আরও জোরদার করা
ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলন ইন্তিফাদা। আশির দশকে শুরু হওয়া অভিনব এই আন্দোলন, যেটাকে ইজরাইল স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে এবং এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সঙ্গে বৈঠকেও বসেছে একাধিকবার। ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করতে হবে। এ আন্দোলনের পক্ষে ফিলিস্তিনের আপামর জনতার সাথে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের এবং আরব-অনারব সমস্ত মুসলমান ও মুক্তিকামী মানুষের জোরদার সমর্থন আদায় করে নিতে হবে।
ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হলো ইজরাইল। এটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসের রাষ্ট্র। এটি এমন রাষ্ট্র যার ভিত্তিই হলো জুলুম, নির্যাতন, ঘরবাড়ি ধ্বংস করা এবং ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার নস্যাৎ করার ওপর। ফিলিস্তিনি জনগণের সামনে একটিমাত্রই পথ, আর তা হলো প্রতিরোধ করা। প্রত্যেক জাতিরই অধিকার রয়েছে জবরদখলকারীকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করার। ইজরাইলের মেনাহেম বেগিনরা যখন স্লোগান তুলে, ‘আমি লড়াই করব তাহলেই আমার অস্তিত্ব থাকবে।’ তখন ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের বীর সেনানী শায়খ আহমাদ ইয়াসিন শহিদরা এর পাল্টা স্লোগান তোলেন, ‘আমি প্রতিরোধ করব, তাহলেই আমার অস্তিত্ব থাকবে।’ অবশ্যই আহমাদ ইয়াসিনের সত্য মেনাহেম বেগিনের বাতিলকে পরাভূত করবে।
দ্বিতীয় দফা : ইসরায়েলকে সর্বক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে প্রত্যাখ্যান
ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, ইজরাইলের সাথে কথিত সর্বপ্রকার সমোঝতাকে প্রত্যাখ্যান করা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক–সর্বক্ষেত্রেই ওয়াজিব। সুতরাং ইজরাইলের সাথে কূটনৈতিক লেনদেনও করা যাবে না এবং ইজরাইলি কোনো অফিস খোলার অনুমতিও দেয়া যাবে না। তেমনিভাবে ইজরাইল সফর করাও জায়েজ হবে না, যদিও তা মসজিদুল আকসায় নামাজ আদায়ের দাবিতে করা হয়ে থাকে। কেননা কোনো মুসলমান এ মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর তখনই করবে, যখন তা ইজরাইলি কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হবে।
তিনি বলেন, আমাদের উপর অবশ্য কর্তব্য হবে আরব ও ইসলামি বিশ্বে ইজরাইলি আগমন প্রতিহত ও প্রত্যাখ্যান করা, এ আগমন তারা যে রূপেই বা যে ব্যানারে করুক না কেন। আমাদেরকে অবশ্যই নব্য ইজরাইলি আগ্রাসন ও আক্রমণ প্রতিরোধ করতে হবে এবং আমাদের স্বকীয়তাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। তারা যেন একে কোনোভাবেই কলুষিত করতে না পারে।
তৃতীয় দফা : অর্থনৈতিক বয়কট জোরদার করা
ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, মুসলিম বিশ্বকে ইজরাইলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কট আরো প্রবলভাবে জারি রাখতে হবে এবং এর ক্ষেত্র আরও প্রশস্ত করতে হবে; কেবল আরব দেশগুলোই নয় মুসলিম অন্যান্য দেশেও ইজরাইলি অর্থনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ইজরাইলের সঙ্গে কোনো কিছু বেচাকেনা করা কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ হবে না। এ কাজটি করা মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর ওয়াজিব এবং প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির ওপর অবশ্য কর্তব্য। প্রত্যেক মুসলমানকে এ কথা জানতে হবে যে, দিনার বা দিরহাম অথবা পাউন্ড কিংবা রিয়াল–যে মুদ্রাই ইজরাইলি কেনাবেচায় ব্যবহৃত হবে, তার লভ্যাংশ ইজরাইলে গিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র, বুলেট অথবা বোমায় রূপান্তরিত হয়ে আমার ভাইকে হত্যা করবে, বা তা দ্বারা ইজরাইল আমাকে অথবা আমার ভাইকে হুমকি দেবে। সুতরাং এই বয়কট আরো প্রশস্ত করতে হবে এবং যারা ইজরাইকে সাহায্য সহযোগিতা করছে তাদেরকেও শামিল করতে হবে। বিশেষ করে আমেরিকাকে, যে তার সর্বশক্তি দিয়ে ইজরাইলের পিছনে রয়েছে। সমস্ত মুসলমানের ওপর ওয়াজিব হবে, আমেরিকার পণ্য বর্জন করা, প্লেন থেকে শুরু করে গাড়ি, যন্ত্রপাতিও। এমনকি হ্যামবার্গার, পিজা, কোকাকোলা, সিগারেট… ইত্যাদি।
চতুর্থ দফা : পারস্পরিক বিরোধ ও ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া
ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, আরব ও মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব হলো নিজেদের পারস্পরিক বিরোধ ও ছোটখাট ঝগড়ার কথা ভুলে গিয়ে একে অপরের সাথে এক কাতারে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়ানো। কেননা ইজরাইলের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ হলো মহাযুদ্ধ, কোনোক্রমেই যেন ছোটখাট ঝগড়া-ঝাটি এ মহাযুদ্ধের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।
কবি বলেন–‘বড় বিপদসমূহ বিপদগ্রস্তদের একত্রিত করে দেয়।’ জেনে রাখতে হবে, এই মুহূর্তে আমাদের সব বিপদের মূল ইজরাইল, এবং জমিনের বুকে তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেই চলেছে। তারপরও আমরা কেন ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি না? মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন যারা সারিবদ্ধভাবে আল্লাহর পথে লড়াই করে যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।’ (সূরা সফ : ৪)।
ড. ইউসুফ আল কারজাভি আরও বলেন, আমাদের ওপর ওয়াজিব হবে এই শতধাবিচ্ছিন্ন উম্মতকে টুকরা টুকরা করার প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করা এবং সবাইকে তাওহিদের ছায়াতলে একতাবদ্ধ করা। যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি তাহলে কমপক্ষে তাদেরকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে, আর এটা হচ্ছে দুর্বল ঈমানের পরিচয়।
ভেদাভেদ ছড়াবার কোনো অবকাশ নেই; চাই সেটা শিয়া-সুন্নী, আরব-কুর্দী, আরব-অনারব, ডানপন্থী-বামপন্থী কিংবা ধনী-গরিবের ভেদাভেদ হোক। সব ভেদাভেদ ভুলে যেতে হবে। আমাদের ওপর ওয়াজিব হলো ফিলিস্তিনি বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভেদাভেদ মেটানোর ব্যবস্থা করা। কেননা, সকলে একই গর্তে আটকা পড়েছে, আর তা হলো যায়নবাদী শত্রুর আগ্রাসন ও জবরদখল।
শায়খ আহমাদ ইয়াসিন রহ. কাতারে একবার কত সুন্দর কথাই না বলেছিলেন, যদি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে হত্যা করে, তাহলে আমরা তাদের হত্যা করব না। যদি তারা আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে কষ্ট দেয় তাহলেও আমরা তাদের মতো আচরণ করব না। আমরা হবো আদমের দুই সন্তানের মধ্যে উত্তমটার মতো, যখন তাকে তার ভাই বলেছিল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আপনি আমাকে হত্যা করার জন্য হাত তুলেন, তাহলে আমি আপনাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়াবো না। আমি বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ (সূরা মায়েদা : ২৮)
পঞ্চম দফা : জিহাদের কথা স্পষ্টভাবে বলতে হবে
ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, আমাদের ওপর ওয়াজিব হলো–আমরা ইসলামি জিহাদের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করব। কেননা কুদ্স শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের ব্যাপার নয়, আর শুধুমাত্র আরবদের নয় বরং তা ইসলামের ব্যাপার। এ জন্য আমরা এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করি যা মাঝে মধ্যে বলা হয়ে থাকে যে, কুদস ফিলিস্তিনিদের ব্যাপার। আমরা যতটুকু অধিকারী তার চেয়ে বেশি অধিকারী বলে দাবি করতে হবে। কুদ্স হলো গোটা মুসলিম উম্মাহর ব্যাপার, সে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ যেখানকারই অধিবাসী হোক না কেন। যদি ফিলিস্তিনিরা দুর্বল হয়ে একে সমর্পণ করে, তাহলে গোটা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য হবে তা প্রত্যাখ্যান করা এবং স্বয়ং ফিলিস্তিননিদের প্রতিরোধ করা।
ষষ্ঠ দফা : আকসা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হবে ওলামায়ে কেরামকে
ড. ইউসুফ আল কারজাভি বলেন, কুদসকে উদ্ধারের জন্য ‘বিশ্ব ইসলামী গণপরিষদ’ গঠন করা আমাদের ওপর ওয়াজিব। যদি মুসলমানদের বাইয়াতকৃত ‘খলিফা’ থাকত তাহলে তিনি উম্মতকে একত্রিত করে নেতৃত্ব দিতেন, যেমনটি তেরশ বছর পূর্বে ছিল। তিনি মুসলমানদের আহ্বান জানাতেন এই বলে–আসুন, সকলে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার জন্য ছুটে আসুন। তাহলে মিলিয়ন মিলিয়ন মুসলমান তাঁর ডাকে সাড়া দিত এবং সকলেই একযোগে ইজরাইলি শক্তির বিরুদ্ধে ইজরাইলি অস্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত এবং তাদেরকে হাজারে হাজারে লাখে লাখে হত্যা করত, পক্ষান্তরে তারা সমস্ত মুজাহিদকে হত্যা করতে এবং সকল মুসলমানের মোকাবিলা করতে সমর্থ হতো না। যেহেতু বর্তমানে আমাদের খেলাফত নেই যা দিক-নির্দেশনা দিতে পারত সে জন্য এর বিকল্প হিসেবে ‘বিশ্ব ওলামা সম্মেলন’-এর পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানানো যেতে পারে। স্থানীয় রাজনীতি এবং সরকারি নির্দেশনা থেকে দূরে থেকে তারা তাদের বক্তব্য ও নির্দেশনা উম্মতকে দিতে পারেন। এই পরিষদই কাঙ্ক্ষিত ‘আকসা উদ্ধার পরিষদ’ গঠন করতে পারে।
সপ্তম দফা : কুদস ফান্ড গঠন
ড. ইউসুফ আল করাজাভি বলেন, আলেমদের আহ্বানে আকসা উদ্ধার পরিষদ গঠিত হলে এই পরিষদ ‘কুদ্স ফান্ড’ গঠন করবে বিশ্ব মুসলিমের গণতহবিল হিসেবে। সকল মুসলমান এতে অংশ গ্রহণ করবে। সমস্ত মুক্তিকামী মানুষ দুনিয়ার সমস্ত প্রান্ত থেকে যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তা এখানে দান করবে। কেননা, অল্প অল্প করতে করতেই বেশি হয়। কুদস ফান্ডের এই অর্থ ব্যয় হবে ফিলিস্তিন থেকে ইজরাইলকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং কুদসকে যায়নবাদী আগ্রাসনের হাত মুক্ত করার সংগ্রামে।
তিনি বলেন, আমরা এই প্রস্তাবনাসমূহ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, জনগণ, আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিম এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমস্ত বিকেবান, ভদ্র এবং শান্তিপ্রিয় মানুষের নিকট পেশ করছি। যেন তারা আমাদের এই ন্যায়ের যুদ্ধে সহযোগিতা করেন এবং সত্যের পক্ষে এসে দাঁড়ান। মনে রাখতে হবে, সত্য অবশ্যই বিজয়ী হবে যদিও তা কিছুকাল পরে হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য।’
